~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ১১ : শত্রু যখন আপনজন
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামছে।
মির্জা ভিলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আরিশা। হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে সেই অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তাটি।
বারবার একটা কথাই মাথায় ঘুরছে—তার বাবা যদি সত্যিই নির্দোষ হয়ে থাকেন, তাহলে এত বছর ধরে কেন সবাই তাকে ভুল বুঝেছে?
আর আদ্রিয়ানের পরিবার ধ্বংসের পেছনে আসলেই কে দায়ী?
— কী ভাবছ এত?
পরিচিত কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকাল আরিশা।
আদ্রিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কালো শার্ট, হাতের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরিশা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— কিছু না।
— আমার সঙ্গে মিথ্যা বলার অভ্যাসটা বাদ দাও, আরিশা।
— সবকিছু কি আপনাকে বলতেই হবে?
আদ্রিয়ান কয়েক পা এগিয়ে এল।
— না। কিন্তু তোমার কোনো বিপদ হতে পারে এমন কিছু আমার কাছ থেকে লুকানোর অধিকার তোমার নেই।
আরিশা এবার বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— আপনি সবসময় এমন করেন কেন? সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান! আমি কী করব, কোথায় যাব, কার সঙ্গে কথা বলব—সবকিছুতেই আপনার অনুমতি লাগবে?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— কারণ পৃথিবীর সবকিছু হারানোর অভ্যাস আমার আছে, আরিশা। কিন্তু তোমাকে হারানোর অভ্যাস আমি করতে চাই না।
কথাটা শুনে আরিশার রাগটা কিছুটা কমে গেল।
তবুও মুখে বলল,
— আপনি খুব বেশি নাটক করেন।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— তোমার সামনে একটু-আধটু করতেই হয়।
— অসহ্য!
কথাটা বলেই আরিশা চলে যেতে উদ্যত হলো।
কিন্তু আদ্রিয়ান তার হাত ধরে থামিয়ে দিল।
— রাতের খাবার খেয়ে তারপর রুমে যাবে।
— আপনি কি আমার বাবা নাকি?
— না। তোমার বাবা হলে এতক্ষণে তোমার সব দুষ্টুমির হিসাব নিতাম।
আরিশা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— আপনি একদম অসভ্য!
আদ্রিয়ান হেসে ফেলল।
অনেক দিন পর তার মুখে এমন হাসি দেখা গেল।
রাত প্রায় দশটা।
আদ্রিয়ান নিজের কেবিনে বসে রায়ানের জন্য অপেক্ষা করছিল।
কিছুক্ষণ পর রায়ান একটি ফাইল হাতে নিয়ে প্রবেশ করল।
— স্যার, লোকটির সঙ্গে কথা হয়েছে। সে আজ রাতেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
— নাম কী তার?
— মাহবুব আলম।
আদ্রিয়ান নামটি শুনে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
— মাহবুব আলম! উনি তো বাবার কোম্পানির পুরোনো হিসাবরক্ষক ছিলেন।
— জি স্যার। প্রায় পঁচিশ বছর আগে তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে যান। সবাই ভেবেছিল তিনি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
আদ্রিয়ান টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটা হাতে নিল।
— এত বছর কোথায় ছিলেন তিনি?
— সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্যার, উনি একটা কথা বলেছেন।
— কী কথা?
— আপনার বাবার মৃত্যুর আগের রাতে তিনি আপনার বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আর সেই রাতেই এমন একটা চুক্তি হয়েছিল, যেটার কথা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।
আদ্রিয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।
— চুক্তির কাগজ কোথায়?
— উনার কাছেই আছে বলে জানিয়েছেন।
আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়াল।
— গাড়ি বের করো। আমি এখনই যাচ্ছি।
অন্যদিকে আরিশা নিজের ঘরে বসে আছে।
তার সামনে খোলা ডায়েরি। কিন্তু লেখার প্রতি আজ কোনো মনোযোগ নেই।
হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে আবার সেই অচেনা নম্বরটি ভেসে উঠল।
'সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে, আরিশা রহমান। সত্যিটা জানতে চাইলে একা এসো।'
আরিশা এবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
সে কাউকে কিছু না জানিয়েই পুরোনো রহমান বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
পুরোনো রহমান বাড়ি।
বাড়িটা বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। চারপাশে নীরবতা, ধুলোমাখা জানালা আর পুরোনো দিনের অসংখ্য স্মৃতি।
আরিশা ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল।
— কেউ আছেন?
কোনো উত্তর এল না।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল।
আরিশা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
একটা অন্ধকার ঘরের দরজা সামান্য খোলা।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে দেখতে পেল একজন বয়স্ক মানুষ জানালার পাশে বসে আছেন।
— আপনি কি আমাকে ডেকেছেন?
লোকটি ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন।
— তুমি আরিশা?
— জি। কিন্তু আপনি কে?
লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আমি এমন একজন মানুষ, যে তোমার বাবার শেষ দিনগুলোর সাক্ষী ছিল।
আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— আমার বাবা সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
লোকটি টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো খাম বের করলেন।
— তোমার বাবা নির্দোষ ছিলেন, মা। তিনি আদ্রিয়ানের বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।
আরিশার চোখ ভিজে উঠল।
— তাহলে সবাই কেন আমার বাবাকে অপরাধী ভাবে?
— কারণ আসল অপরাধী খুব বুদ্ধিমানের সঙ্গে সব প্রমাণ তোমার বাবার বিরুদ্ধে সাজিয়েছিল।
— কে সে?
লোকটি কিছু বলার আগেই ঘরের বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
লোকটি আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন।
— তুমি এখানে এসেছ, এটা কেউ জানতে পারবে না। এই খামটা নাও। এর মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তোমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে।
আরিশা খামটা হাতে নিল।
— কিন্তু আপনি আমাকে সব বলছেন না কেন?
লোকটি কাঁপা গলায় বললেন,
— কারণ যে মানুষটার নাম তুমি জানতে চাইছ, সে এখনো তোমাদের পরিবারের খুব কাছেই আছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল।
— আরিশা!
পরিচিত কণ্ঠ।
আরিশা দরজার দিকে তাকাল।
আদ্রিয়ান!
আদ্রিয়ান ঘরে প্রবেশ করতেই আরিশার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ ও উদ্বেগ।
— তোমাকে কতবার বলেছি, একা কোথাও যাবে না?
আরিশা এবারও চুপ থাকল না।
— আমি ছোট বাচ্চা নই, আদ্রিয়ান!
— সেটা আমি জানি। কিন্তু তোমার নিরাপত্তা নিয়ে আমি কোনো ঝুঁকি নিতে পারব না।
— আপনি আমার পিছু নিয়েছেন?
আদ্রিয়ান উত্তর দিল না।
বরং তার হাতে থাকা খামটার দিকে তাকাল।
— এটা কী?
আরিশা খামটা নিজের কাছে সরিয়ে নিল।
— আমার বাবার ব্যাপারে কিছু তথ্য আছে।
আদ্রিয়ান বয়স্ক লোকটির দিকে তাকাল।
— আপনি মাহবুব আলম?
লোকটি মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ, আদ্রিয়ান। তোমাকে অনেক আগেই সত্যিটা জানানো উচিত ছিল।
আদ্রিয়ানের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— তাহলে বলুন। আমার পরিবারকে ধ্বংস করেছিল কে?
মাহবুব আলম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— তোমার বাবার সবচেয়ে কাছের মানুষটিই তোমার বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
— নাম বলুন!
— মির্জা পরিবারেরই একজন...
কথাটা শুনে আদ্রিয়ান যেন পাথর হয়ে গেল।
— অসম্ভব!
মাহবুব আলম ধীরে বললেন,
— তোমার বাবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু সেই বিশ্বাসের মূল্য তাকে নিজের জীবন দিয়ে দিতে হয়েছিল।
আদ্রিয়ানের মুঠি শক্ত হয়ে এল।
— এত বছর ধরে আমি ভুল মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভেবেছি?
লোকটি মাথা নিচু করলেন।
— তোমার বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল, তুমি যেন কখনো প্রতিশোধের আগুনে নিজেকে শেষ না করো।
আদ্রিয়ান কিছু বলল না।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার সঙ্গে কাটানো ছোটবেলার স্মৃতিগুলো।
কিছুক্ষণ পর তিনজনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
গাড়িতে বসে আরিশা খামটা আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল।
— এটা আপনি রাখুন।
আদ্রিয়ান খামটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোমার বাবার প্রমাণ। এটা তোমার কাছেই থাকা উচিত।
— কিন্তু সত্যিটা তো আমাদের দুজনেরই জানা প্রয়োজন।
আদ্রিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।
— আরিশা?
— হুম?
— আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেত?
আরিশা চুপ করে রইল।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তোমার ওপর রাগ করতে পারি, তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে পারি, কিন্তু তোমাকে হারানোর কথা ভাবতেও পারি না।
আরিশা আস্তে করে বলল,
— তাহলে এতদিন আমাকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন কেন?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— কারণ তোমার চোখে আমার জন্য ঘৃণা দেখতে চাইনি।
আরিশা মৃদু হেসে বলল,
— বোকা একটা মানুষ!
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল।
— এই বোকা মানুষটার জন্যই তো এত চিন্তা তোমার।
আরিশা লজ্জায় জানালার বাইরে তাকাল।
আদ্রিয়ান ধীরে তার কাঁধের ওপর নিজের জ্যাকেটটা রেখে দিল।
— ঠান্ডা লাগবে। চুপচাপ বসে থাকো।
আরিশা এবার আর কোনো প্রতিবাদ করল না।
রাত গভীর।
মির্জা ভিলায় ফিরে আদ্রিয়ান নিজের ঘরে বসে খামটা খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো চুক্তিপত্র, কয়েকটি ব্যাংকের নথি এবং একটি হাতে লেখা চিঠি।
চিঠিটা খুলতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
সেখানে লেখা—
'আদ্রিয়ান, যদি কোনোদিন এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে আমি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছে হেরে গেছি। কিন্তু মনে রেখো, আমার মৃত্যুর জন্য যাকে তুমি দায়ী ভাবছ, সে আসল অপরাধী নয়। রহমান পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম আমি নিজেই।'
নিচে স্বাক্ষর—
মির্জা কামরান।
আদ্রিয়ানের বাবার নাম।
সে চিঠিটা শক্ত করে ধরে রইল।
তাহলে এত বছর ধরে সে যাকে শত্রু ভেবে এসেছে, সেই রহমান পরিবারই কি তার বাবার শেষ আশ্রয় ছিল?
ঠিক তখনই রায়ানের ফোন এল।
— স্যার!
— বলো।
— স্যার, একটা ভয়ংকর খবর আছে।
— কী হয়েছে?
— মাহবুব আলম নিখোঁজ। আর স্যার, পুরোনো রহমান বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কেউ একজন আমাদের অনুসরণ করছিল।
আদ্রিয়ানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
— কে?
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— স্যার, গাড়ির নম্বরটা যাচাই করেছি। গাড়িটা মির্জা পরিবারের একজনের নামে নিবন্ধিত।
আদ্রিয়ান ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
— রায়ান, এবার আর কাউকে বিশ্বাস করব না। নিজের পরিবারের মানুষকেও না।
ফোন রেখে সে জানালার বাইরে তাকাল।
অন্যদিকে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে আরিশা। সে জানে না, তার হাতে থাকা ছোট্ট খামটি শুধু অতীতের রহস্য নয়, ভবিষ্যতের এক ভয়ংকর সত্যেরও দরজা খুলে দিয়েছে।
কারণ আদ্রিয়ান মির্জার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো এমন একজন, যার সঙ্গে সে প্রতিদিন একই ছাদের নিচে সময় কাটিয়েছে!
আর সেই মানুষটি এবার আরিশা রহমানকেও নিজের নিশানায় পরিণত করেছে।
চলবে...🥀🖤
