~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ১০ : অতীতের শেষ সাক্ষী
রাত তখন প্রায় বারোটা।
মির্জা ভিলার বিশাল ঘরটিতে একা বসে আছে আদ্রিয়ান। তার সামনে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি পুরোনো দলিল, ছবি আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
বারবার চোখ আটকে যাচ্ছে সেই স্বাক্ষরটির ওপর।
যে মানুষটিকে সে এত বছর ধরে নিজের পরিবারের বিশ্বাসঘাতক ভেবে এসেছে, সেই মানুষটির নামের পাশেই আজ পাওয়া গেছে তার নিজের পরিবারের একজনের স্বাক্ষর!
আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিল।
কিছু স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। ছোট্ট একটা ছেলে, যার চোখের সামনে এক রাতেই সবকিছু বদলে গিয়েছিল। পরিবারের হাসি, বাবার ভালোবাসা, মায়ের স্নেহ—সবকিছু যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গিয়েছিল সে।
সেই রাতের পর থেকে আদ্রিয়ান আর কখনো আগের মতো হতে পারেনি।
তার কাছে ভালোবাসা মানেই ছিল দুর্বলতা। আর বিশ্বাস? সেটা যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
— স্যার!
— বলো, রায়ান।
— স্যার, একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর পেয়েছি। যে মানুষটিকে আমরা এত বছর ধরে মৃত বলে জানতাম, তার সন্ধান পাওয়া গেছে।
আদ্রিয়ান সোজা হয়ে বসল।
— কী বললে?
— জি স্যার। লোকটি বেঁচে আছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আপনার পরিবারের সেই দুর্ঘটনার রাতেও সে উপস্থিত ছিল।
আদ্রিয়ানের চোখ দুটো মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
— ঠিকানা পাঠাও। আর খবরটা যেন এই মুহূর্তে আমাদের দুজনের বাইরে আর কেউ না জানে।
— জি স্যার।
ফোন রেখে আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
এবার সত্যিটা জানতেই হবে।
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে আরিশা।
আজ সারাদিন আদ্রিয়ানের আচরণটা তার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। মানুষটা কখনো এতটা যত্ন করে, আবার কখনো এমনভাবে দূরে সরে যায়, যেন আরিশা তার জীবনের সবচেয়ে অচেনা কেউ।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
— ম্যাডাম, স্যার আপনাকে নিচে ডাকছেন।
আরিশা একটু বিরক্ত হয়েই বলল,
— এত রাতে আবার কী হয়েছে?
নিচে নেমে এসে দেখল আদ্রিয়ান সোফায় বসে আছে। হাতে একটি পুরোনো ছবি।
আরিশা এগিয়ে গিয়ে বলল,
— আমাকে ডেকেছেন?
আদ্রিয়ান ছবিটি টেবিলে রেখে বলল,
— এটা দেখো।
ছবিটির দিকে তাকাতেই আরিশার চোখ বড় হয়ে গেল।
— এটা তো... আমার বাবা!
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— হ্যাঁ। আর তার পাশের মানুষটিকে চিনতে পারছ?
আরিশা ছবিটির দিকে ভালো করে তাকাল।
— উনি তো আপনার বাবা!
— ঠিক বলেছ।
— কিন্তু আমার বাবার সঙ্গে আপনার বাবার ছবি এখানে কেন?
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— কারণ আমাদের পরিবার দুটো একসময় খুব কাছের ছিল, আরিশা। কিন্তু সেই সম্পর্কের শেষটা হয়েছিল বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে।
আরিশার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
— আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার বাবা আপনার পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন?
আদ্রিয়ান সরাসরি উত্তর দিল না।
বরং কিছুক্ষণ পর ধীর কণ্ঠে বলল,
— আমি নিজেও জানি না, আরিশা। এত বছর ধরে যেটাকে সত্যি ভেবে এসেছি, আজ মনে হচ্ছে সেটাও হয়তো মিথ্যা।
আরিশার চোখে পানি জমে উঠল।
— তাহলে এতদিন আমাকে কেন সন্দেহ করেছেন? কেন আমার কাছ থেকে সবকিছু লুকিয়েছেন?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকাল।
— কারণ তোমাকে হারানোর ভয়টা আমার কাছে সত্যিটা জানার ভয় থেকেও বড় হয়ে গেছে।
আরিশা থমকে গেল।
কথাটা শুনে তার সমস্ত অভিমান যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
আদ্রিয়ান ধীরে উঠে তার সামনে দাঁড়াল।
— একটা কথা মনে রেখো, তোমার পরিবারের কেউ অপরাধী হলেও তার দায় তোমার নয়।
আরিশা নিচু স্বরে বলল,
— আর আপনি যদি কোনোদিন জানতে পারেন আমার পরিবার সত্যিই আপনার পরিবারের ক্ষতি করেছে?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
— সেদিনও তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলো মিথ্যা হয়ে যাবে না।
আরিশা আর কোনো কথা বলতে পারল না।
পরদিন সকাল।
রায়ান দ্রুত আদ্রিয়ানের কেবিনে প্রবেশ করল।
— স্যার, লোকটাকে পাওয়া গেছে।
আদ্রিয়ান ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— কোথায়?
— পুরোনো রহমান বাড়ির কাছেই। আর স্যার, লোকটি আপনার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছে।
আদ্রিয়ানের হাত থেমে গেল।
— রহমান বাড়ির কাছে?
— জি স্যার।
আদ্রিয়ান ধীরে ফাইলটি বন্ধ করল।
— তাহলে এতদিন সে আমাদের চোখের সামনেই ছিল!
ঠিক তখনই রায়ান আরেকটি কাগজ এগিয়ে দিল।
— স্যার, লোকটি একটা কথা জানিয়েছে। সে বলেছে, আপনার পরিবারের পতনের জন্য শুধু রহমান পরিবার দায়ী ছিল না। এই ঘটনার পেছনে এমন একজন মানুষ রয়েছে, যাকে আপনি নিজের পরিবারের সবচেয়ে আপনজন বলে জানেন।
আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
— নাম বলেছে?
রায়ান মাথা নাড়ল।
— না স্যার। তবে সে বলেছে, সত্যিটা জানার অধিকার শুধু আপনার নয়। আরিশা রহমানেরও আছে।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
— রায়ান, খেলা এবার অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে।
সেদিন বিকেলে আরিশার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
বার্তাটি মাত্র এক লাইনের—
'তোমার বাবাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলে আজ রাতেই পুরোনো বাড়িতে এসো। তবে আদ্রিয়ানকে সঙ্গে এনো না।'
আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে জানে, এটা কোনো সাধারণ আমন্ত্রণ নয়।
কিন্তু বাবার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সত্যিটা জানার সুযোগও সে হারাতে চায় না।
অন্যদিকে দূর থেকে আরিশার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা আদ্রিয়ান বুঝতে পারল, মেয়েটি কিছু একটা লুকাচ্ছে।
সে শান্ত গলায় বলল,
— আরিশা, কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছ?
আরিশা চমকে তার দিকে তাকাল।
— না তো!
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যা বলতে শেখোনি এখনো, পাখি।
আরিশা কিছু বলল না।
আদ্রিয়ান এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
— একটা কথা মনে রেখো, তোমার অতীত যতই অন্ধকার হোক, সেই অন্ধকারে তোমাকে একা হাঁটতে দেব না।
আরিশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
সে জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে।
শুধু এটুকু জানে, তাদের দুজনের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা এবার খুলতে চলেছে।
কিন্তু সেই দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে এমন এক সত্য, যা হয়তো আদ্রিয়ান ও আরিশার সম্পর্ককেই বদলে দিতে পারে...
চলবে...🥀🖤
