~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
লেখক : Noor Islam
পর্ব – ১২ : অতীতের আয়নায়
রাত প্রায় বারোটা।
মির্জা ভিলার বিশাল ঘরটিতে পায়চারি করছে আদ্রিয়ান। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি। হাতে থাকা ফাইলটি বারবার উল্টেপাল্টে দেখছে সে।
ফাইলের প্রতিটি পাতায় এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা তার এতদিনের বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
— স্যার, আপনি যা ভাবছেন, বিষয়টা হয়তো ঠিক তেমন নয়।
রায়ানের কথায় চোখ তুলে তাকাল আদ্রিয়ান।
— তুমি আমাকে বোঝাতে এসেছো, রায়ান?
— না স্যার। কিন্তু এত বছরের পুরোনো একটা ঘটনার জন্য আরিশা ম্যাডামকে দায়ী করাটা ঠিক হবে না।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
— আমি আরিশাকে দায়ী করছি না। কিন্তু রহমান পরিবারের সঙ্গে আমার পরিবারের যে সম্পর্ক ছিল, সেটা জানার অধিকার আমার আছে।
রায়ান মাথা নিচু করল।
— স্যার, একটা কথা বলব?
— বলো।
— আপনি আরিশা ম্যাডামকে যতটা দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছেন, দিনশেষে ঠিক ততটাই তার কাছে ফিরে যাচ্ছেন।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে ফাইলটা টেবিলে রেখে দিল।
— রায়ান!
— সরি স্যার।
রায়ান আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। অথচ তার মনের ভেতর চলছে আরও ভয়ংকর এক ঝড়।
অন্যদিকে,
আরিশা নিজের ঘরে বসে আছে। সামনে খোলা বই, কিন্তু পড়ায় কোনো মনোযোগ নেই।
বারবার আদ্রিয়ানের কথা মনে পড়ছে।
মানুষটা কখনো এত যত্ন করে, আবার কখনো এমন আচরণ করে যেন তাকে একদম সহ্য করতে পারে না!
— উফফ! এই লোকটার সমস্যা কী?
বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করে দিল আরিশা।
ঠিক তখনই ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
'আপনি কি জানেন, আপনার বাবার কারণে মির্জা পরিবারের জীবন ধ্বংস হয়েছিল?'
মেসেজটা পড়ে আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে দ্রুত রিপ্লাই দিল,
'আপনি কে? এসব কী বলছেন?'
কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর এল না।
আরিশা ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তার বাবা এমন কী করেছিলেন, যার কারণে আদ্রিয়ানের পরিবারের এত বড় ক্ষতি হয়েছিল?
পরদিন সকাল।
আদ্রিয়ান অফিসে বসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং করছিল। এমন সময় রায়ান দরজায় নক করে ভেতরে প্রবেশ করল।
— স্যার, একটা খবর আছে।
— কী খবর?
— রহমান সাহেবের পুরোনো ব্যবসায়িক পার্টনারের খোঁজ পাওয়া গেছে।
আদ্রিয়ানের চোখ দুটো সরু হয়ে এল।
— নাম?
— মাহমুদ হাসান।
নামটা শুনে আদ্রিয়ানের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
— মাহমুদ হাসান! লোকটা এত বছর কোথায় ছিল?
— সেটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি স্যার। তবে একটা বিষয় পেয়েছি।
— কী?
— মির্জা গ্রুপের সেই পুরোনো দুর্ঘটনার আগের রাতে রহমান সাহেবের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল।
আদ্রিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
— তাহলে এতদিন ধরে যাকে আমরা খুঁজছিলাম, সে আমাদের একেবারে কাছেই ছিল!
বিকেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল আরিশা।
হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে তার সামনে থামল।
গাড়ির কাচ নামতেই পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
— গাড়িতে ওঠো।
আরিশা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কেন? আপনার গাড়িতে উঠলেই কি আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে?
আদ্রিয়ান বিরক্ত চোখে তাকাল।
— আরিশা, আমার হাতে সময় নেই।
— তো আমার হাতে কি আপনার জন্য সময়ের অভাব আছে নাকি?
আদ্রিয়ান এবার গাড়ি থেকে নেমে এল।
— তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।
— আমারও আছে। তবে আগে বলুন, আপনি সবসময় এমন হুকুমের সুরে কথা বলেন কেন?
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— কারণ তোমার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আমার ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়।
আরিশা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— তাহলে কথা বলার দরকার নেই। ধৈর্য বাঁচিয়ে রাখুন।
কথাটা বলেই চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
আদ্রিয়ান তার পথ আটকে দাঁড়াল।
— তোমার বাবার ব্যাপারে কিছু জানো?
প্রশ্নটা শুনে আরিশার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— মানে?
— তোমার বাবা আর আমার বাবার মধ্যে কী হয়েছিল, সেটা তুমি জানো?
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
— আপনি কি মনে করেন, আমার বাবা আপনার পরিবারের ক্ষতি করেছেন?
আদ্রিয়ান উত্তর দিল না।
আরিশার চোখে এবার অভিমানের ছায়া ফুটে উঠল।
— একটা কথা মনে রাখবেন, মিস্টার মির্জা। আমার বাবা সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়া আমার পরিবারকে অপমান করবেন না।
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার চোখে পানি চিকচিক করছে, তবুও সে মাথা নিচু করেনি।
আদ্রিয়ান নিচু স্বরে বলল,
— আমি তোমাকে অপমান করতে চাইনি, আরিশা।
— কিন্তু আপনি ঠিক সেটাই করেছেন।
কথাটা বলেই আরিশা চলে গেল।
আদ্রিয়ান এবার তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না।
শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
রাত ১০টা।
আরিশা ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। বাবা-মায়ের কথোপকথনের কিছু অংশ তার কানে এল।
— শুনছো, মাহমুদ আবার ফিরে এসেছে!
আরিশার বাবা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন।
— কী বলছো তুমি? এত বছর পর আবার কেন?
আরিশার মা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
— আমার ভয় হচ্ছে, পুরোনো সব ঘটনা আবার সামনে চলে আসবে।
— কিন্তু আদ্রিয়ান কি সব জেনে গেছে?
— জানি না। তবে ছেলেটা যদি সত্যিটা জানতে পারে, তাহলে আমাদের জন্য খুব কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
কথাগুলো শুনে আরিশার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
মাহমুদ কে?
কী এমন সত্য লুকিয়ে রেখেছে তার পরিবার?
আর আদ্রিয়ানের সঙ্গে তাদের পরিবারের সম্পর্কটাই বা কী?
অন্যদিকে, মির্জা ভিলা।
নিজের বাবার পুরোনো ঘরে প্রবেশ করল আদ্রিয়ান।
বহুদিন ধরে ঘরটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। আজ হঠাৎ করেই পুরোনো কিছু কাগজপত্র খুঁজতে এসেছে সে।
আলমারির নিচের ড্রয়ার খুলতেই একটি পুরোনো খাম চোখে পড়ল।
খামের ওপর লেখা—
'মির্জা পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য।'
আদ্রিয়ান খামটি খুলল।
ভেতরে একটি চিঠি এবং পুরোনো একটি ছবি।
ছবিটা হাতে নিয়ে সে থমকে গেল।
ছবিতে তার বাবা, আরিশার বাবা এবং আরও একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবির পেছনে লেখা—
'বিশ্বাসের মূল্য একদিন সবাইকে দিতে হয়।'
আদ্রিয়ান চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল।
প্রথম কয়েকটি লাইন পড়তেই তার হাত শক্ত হয়ে এল।
চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল—
'আদ্রিয়ান যদি কোনোদিন এই সত্য জানতে পারে, তাহলে তাকে বলবে, রহমান পরিবারের সবাই অপরাধী নয়। আমাদের ধ্বংসের পেছনে এমন একজন মানুষ রয়েছে, যাকে আমরা নিজের পরিবারের সদস্য বলে বিশ্বাস করেছিলাম।'
আদ্রিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল।
তাহলে এতদিন সে ভুল মানুষকে খুঁজছিল?
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটি পরিচিত অথচ বহুদিনের অশ্রুত কণ্ঠ ভেসে এল।
— কেমন আছো, আদ্রিয়ান?
আদ্রিয়ান চমকে উঠল।
— কে আপনি?
লোকটি মৃদু হেসে বলল,
— আমাকে ভুলে গেছো? অথচ তোমার পরিবারের সবকিছুর শুরু আর শেষ আমার হাতেই ছিল।
আদ্রিয়ানের চোখে এবার তীব্র ক্রোধ।
— নিজের পরিচয় দিন!
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— খুব শিগগিরই দেখা হবে, আদ্রিয়ান মির্জা। আর হ্যাঁ, আরিশা রহমানকে সাবধানে রেখো। মেয়েটা যতটা নির্দোষ, তার অতীত ততটাই বিপজ্জনক।
কল কেটে গেল।
আদ্রিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
একদিকে তার পরিবারের অতীত, অন্যদিকে আরিশা।
কিন্তু সে জানে না, এই রহস্যের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক সত্য, যা তাদের দুজনের জীবনই বদলে দিতে পারে।
চলবে...🥀🖤
