সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে। পাখির ডাক আর মায়ের রান্নাঘরের শব্দে ঘুম ভাঙল মায়ার।
মায়া চোখ খুলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই গতকালের বিকেলের কথা মনে পড়ে গেল।
কালো শার্ট পরা ছেলেটা, তার মৃদু হাসি আর সেই অদ্ভুত কথাটা।
“সব অপরিচিত মানুষই যে সারাজীবন অপরিচিত থাকে, তা তো নয়।”
মায়া নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
“কী যে বলেছিল ছেলেটা! আর আমি কিনা এখনো কথাটা মনে রেখেছি!”
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে মায়ের ডাক এল।
“মায়া, আর কত ঘুমাবি? সকাল হয়ে গেছে। আজ না তোর কলেজে যেতে হবে?”
মায়া তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।
“হ্যাঁ মা, উঠছি!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল সে। নাশতার টেবিলে বসে রুটি খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা, আজ একটু তাড়াতাড়ি বের হব।”
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন? আজ আবার কী হলো?”
“কিছু না মা। নীলার সঙ্গে একটা কাজ আছে।”
মা হেসে বললেন,
“আচ্ছা, সাবধানে যাস।”
মায়া ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
কিন্তু সে জানত না, আজকের দিনটা তার জন্য আরও বড় একটা চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে।
কলেজের সামনে পৌঁছাতেই নীলা দৌড়ে এসে তার হাত ধরল।
“এই যে মহারানি! কাল রাতে তো তোর ঘুমই হয়নি, তাই না?”
মায়া চোখ পাকিয়ে বলল,
“আবার শুরু করলি?”
নীলা হাসতে হাসতে বলল,
“আচ্ছা, আর কিছু বলব না। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দে।”
“কী প্রশ্ন?”
“কালকের সেই আরিশ নামের ছেলেটার কথা এখনো মনে আছে?”
মায়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“না।”
নীলা ভ্রু উঁচু করল।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি!”
“তাহলে তোর মুখটা লাল হয়ে গেল কেন?”
মায়া কিছু বলার আগেই নীলা হেসে উঠল।
“বুঝেছি, বুঝেছি! আমার বান্ধবীর মনে বসন্ত এসে গেছে!”
মায়া নীলার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলল,
“আর একটা কথা বললে তোর সঙ্গে কথা বন্ধ!”
দুজন হাসতে হাসতে কলেজের ভেতরে ঢুকে গেল।
ক্লাস শুরু হতে তখনো কিছুটা সময় বাকি। মায়া আর নীলা কলেজের বাগানের পাশে বসে গল্প করছিল।
হঠাৎ নীলার চোখ গেটের দিকে পড়ল।
সে মায়ার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“এই, ওই ছেলেটা কে রে?”
মায়া অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞেস করল,
“কোন ছেলেটা?”
“ওই যে কালো শার্ট পরে আসছে!”
কথাটা শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল।
তারপরই থমকে গেল।
ছেলেটা আর কেউ নয়।
আরিশ!
মায়া নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।
গতকাল যার সঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে দেখা হয়েছিল, আজ সে তাদের কলেজে কেন?
আরিশ গেট দিয়ে ঢুকে চারপাশে তাকাচ্ছিল। একসময় তার চোখ গিয়ে থামল মায়ার ওপর।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
আরিশের ঠোঁটে পরিচিত সেই মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে সোজা মায়াদের দিকে এগিয়ে এল।
নীলা মায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওরে বাবা! ছেলেটা তো সরাসরি তোর দিকেই আসছে!”
মায়া নিচু গলায় বলল,
“চুপ কর তো!”
আরিশ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
“আসসালামু আলাইকুম।”
নীলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
মায়া একটু দেরি করে উত্তর দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
আরিশ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেমন আছেন, মায়া?”
মায়া অবাক হয়ে বলল,
“আপনি এখানে?”
আরিশ মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“কেন? এখানে আসা কি নিষেধ?”
“না, মানে... আপনি আমাদের কলেজে কী করছেন?”
আরিশ কিছু বলার আগেই নীলা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি এই কলেজে পড়েন?”
আরিশ মাথা নাড়ল।
“জি। আজ থেকে এই কলেজেই আমার ক্লাস শুরু।”
মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“আপনি নতুন ভর্তি হয়েছেন?”
“ঠিক তাই।”
নীলা হাসিমুখে বলল,
“তাহলে তো খুব ভালো হলো! মায়া, দেখেছিস? তোর পরিচিত মানুষ এখন আমাদের কলেজেও!”
মায়া নীলার দিকে এমনভাবে তাকাল যে নীলা হাসি চেপে রাখতে পারল না।
আরিশ দুজনের কথোপকথন দেখে হেসে বলল,
“আপনারা কি সব সময় এভাবেই ঝগড়া করেন?”
নীলা উত্তর দিল,
“ঝগড়া নয়, ভাইয়া। এটা আমাদের ভালোবাসা!”
আরিশ হেসে ফেলল।
কিন্তু মায়া চুপচাপ বসে রইল।
তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন।
আরিশ কি সত্যিই কাকতালীয়ভাবে এই কলেজে এসেছে?
নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
কিছুক্ষণ পর আরিশ বলল,
“আচ্ছা, আপনাদের ডিপার্টমেন্ট কোনটা?”
নীলা উত্তর দিল,
“বাংলা বিভাগ।”
আরিশ একটু অবাক হয়ে বলল,
“সত্যি? আমিও বাংলা বিভাগেই ভর্তি হয়েছি।”
নীলা খুশি হয়ে বলল,
“তাহলে তো আমাদের প্রায়ই দেখা হবে!”
আরিশ এবার মায়ার দিকে তাকাল।
“সেটাই তো ভালো।”
কথাটা শুনে মায়া কিছু বলল না। তবে তার বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই কলেজের ঘণ্টা বেজে উঠল।
নীলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“চল, ক্লাসে যাই। নাহলে আজ আবার স্যারের বকা খেতে হবে।”
মায়াও উঠে দাঁড়াল।
আরিশ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনারা যান। আমার ক্লাসরুমটা খুঁজে নিতে হবে।”
নীলা বলল,
“চলুন, দেখিয়ে দিচ্ছি।”
তিনজন একসঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।
ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছে নীলা আর মায়া ভেতরে ঢুকে গেল। আরিশ যাওয়ার আগে একবার মায়ার দিকে তাকাল।
“মায়া?”
মায়া ফিরে তাকাল।
“জি?”
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
“আজ কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। তাই পালিয়ে যাওয়ার অজুহাতও নেই।”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আপনি সব সময় এমন কথা বলেন?”
“কেমন কথা?”
“যে কথার উত্তর দেওয়া কঠিন!”
আরিশ হেসে বলল,
“তাহলে উত্তর দেওয়ার জন্য সময় নিন।”
এই বলে সে চলে গেল।
মায়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখল।
পেছন থেকে নীলা এসে কাঁধে হাত রাখল।
“কী রে? ছেলেটা কিন্তু মন্দ না!”
মায়া বিরক্তির ভান করে বলল,
“তুই কি একটু চুপ থাকতে পারিস না?”
নীলা হেসে বলল,
“পারব। তবে একটা কথা মনে রাখিস, মায়া—কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে হঠাৎ করে, কিন্তু তাদের জন্যই একদিন আমাদের পুরো পৃথিবীটা বদলে যায়।”
মায়া কথাটার কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু তার মনে হলো, নীলা হয়তো মজা করে এমন একটা কথা বলেছে, যার সত্যতা সে একদিন নিজেই বুঝতে পারবে।
সেদিনের ক্লাসগুলো কেমন করে কেটে গেল, মায়া বুঝতেই পারল না।
বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল ক্লাসের দরজার দিকে।
কেন?
সে নিজেও জানত না।
কলেজ ছুটির পর মায়া আর নীলা গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ ডাকল,
“মায়া, একটু দাঁড়াবেন?”
পরিচিত কণ্ঠস্বর।
মায়া ফিরে তাকাল।
আরিশ দাঁড়িয়ে আছে।
নীলা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমি একটু সামনে যাচ্ছি। তোরা কথা বল।”
মায়া কিছু বলার আগেই নীলা চলে গেল।
মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি কি আমার বান্ধবীকেও আপনার দলে নিয়ে নিলেন?”
আরিশ হেসে বলল,
“আমি তো কিছুই করিনি। উনি নিজেই চলে গেলেন।”
“আচ্ছা, বলুন। কী বলবেন?”
আরিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“করুন।”
“আপনি কি আমাকে অপছন্দ করেন?”
প্রশ্নটা শুনে মায়া অবাক হয়ে গেল।
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?”
আরিশ শান্ত গলায় বলল,
“কারণ, আমি যখনই আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসি, আপনি এমনভাবে তাকান যেন আমি খুব বিরক্তিকর একজন মানুষ।”
মায়া একটু থেমে বলল,
“আমি আসলে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বেশি কথা বলি না।”
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে এখন তো আমরা আর অপরিচিত নই। তাই না?”
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই আরিশ আবার বলল,
“আপনি চাইলে আমরা বন্ধু হতে পারি।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“বন্ধু হতে তো কোনো সমস্যা নেই।”
আরিশের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“তাহলে আজ থেকে আমরা বন্ধু?”
মায়া মাথা নাড়ল।
“জি, বন্ধু।”
আরিশ হাত বাড়িয়ে বলল,
“বন্ধুত্বের শুরুটা তাহলে এখান থেকেই হোক।”
মায়া তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকাল। তারপর হেসে হাত মেলাল।
সেদিন তারা দুজনেই ভেবেছিল, তাদের সম্পর্কের শুরুটা শুধু বন্ধুত্বের।
কিন্তু কেউ জানত না, এই বন্ধুত্বের আড়ালেই ধীরে ধীরে জন্ম নিতে চলেছে এমন এক অনুভূতি, যার নাম ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসার পথেই অপেক্ষা করছে কিছু আনন্দ, কিছু অভিমান, কিছু অশ্রু আর এমন কিছু সত্য, যা জানার পর হয়তো তাদের দুজনকেই নতুন করে নিজেদের চিনতে হবে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে মায়ার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।
অপরিচিত নম্বর থেকে লেখা—
“বাসায় ঠিকমতো পৌঁছেছেন তো, বন্ধু?”
মায়া বার্তাটা পড়ে মৃদু হাসল।
তারপর লিখল,
“জি, পৌঁছে গেছি। কিন্তু আমার নম্বর পেলেন কোথায়?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
“সেটা একটা রহস্য। সব রহস্য কি একদিনে বলে দিতে হয়?”
মায়া হেসে ফেলল।
“আপনি সত্যিই খুব অদ্ভুত!”
আরিশ লিখল,
“আর আপনি?”
মায়া উত্তর দিল,
“আমি আবার কী?”
আরিশের উত্তর আসতে একটু সময় লাগল।
“আপনি এমন একজন, যার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে, অথচ কথা শেষ হয়ে গেলে মনে হয়, আরও কিছুক্ষণ কথা বললে ভালো হতো।”
বার্তাটা পড়ে মায়ার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর অচেনা এক অনুভূতি জন্ম নিল।
সে ফোনটা বুকে চেপে ধরল না, কোনো বড় স্বপ্নও দেখল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
“আরিশ, তুমি কি সত্যিই শুধু আমার বন্ধু হয়ে থাকবে?”
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় তখনো আসেনি।
কারণ, ভালোবাসার গল্পে সবচেয়ে কঠিন বিষয়টি ভালোবাসা শুরু হওয়া নয়।
সবচেয়ে কঠিন হলো, সেই ভালোবাসাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা।
চলবে...
পরবর্তী পর্বে: আরিশের জীবনে এমন একজনের আগমন ঘটবে, যার উপস্থিতি মায়ার মনে প্রথমবারের মতো অদ্ভুত এক প্রশ্ন জাগিয়ে তুলবে—আরিশ কি শুধু তার বন্ধু, নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু?
