বিকেলের আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। চারপাশে হালকা বাতাস, গাছের পাতায় পাতায় এক অদ্ভুত মায়াবী শব্দ। রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। পরনে সাদা সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে গোলাপি ওড়না, আর চোখে একরাশ স্বপ্ন।
মেয়েটির নাম মায়া।
মায়া খুব সাধারণ একটি মেয়ে। তার জীবনে বড় কোনো চাওয়া নেই। ছোট্ট একটি পরিবার, কিছু আপন মানুষ আর একটুখানি ভালোবাসা—এই নিয়েই তার পৃথিবী। সে বিশ্বাস করে, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো সৌন্দর্য কিংবা অর্থের হিসাব করে না। ভালোবাসা শুধু মনের ভাষা বোঝে।
কিন্তু মায়া জানে না, আজকের এই বিকেলটাই তার জীবনের গল্প বদলে দিতে চলেছে।
হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে এল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হলো বৃষ্টি। রাস্তার মানুষজন যে যার মতো আশ্রয় খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মায়াও দ্রুত পাশের একটি দোকানের ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই তার পাশে এসে দাঁড়াল একটি ছেলে।
ছেলেটির পরনে কালো শার্ট, হাতে একটি ঘড়ি। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা। বৃষ্টির পানিতে তার চুল ভিজে কপালের ওপর এসে পড়েছে।
মায়া একবার ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল।
ছেলেটিও মেয়েটির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,
“আপনি কি সব সময় এভাবে বৃষ্টির মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকেন?”
মায়া একটু অবাক হয়ে তাকাল।
“কেন? বৃষ্টিতে দাঁড়ানো কি অপরাধ?”
ছেলেটি মৃদু হাসল।
“অপরাধ নয়। তবে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে যদি ঠান্ডা লেগে যায়, তখন কিন্তু বৃষ্টিকে দোষ দিয়ে লাভ হবে না।”
মায়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আপনাকে আমার চিন্তা করতে হবে না।”
ছেলেটি আর কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মিনিট পর বৃষ্টি একটু কমে এল। মায়া রাস্তা পার হওয়ার জন্য এগিয়ে যেতেই একটি দ্রুতগতির গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। রাস্তার জমে থাকা পানি ছিটকে তার সাদা পোশাকে লাগল।
মায়া বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আজকের দিনটাই খারাপ!”
পাশ থেকে ছেলেটির হাসির শব্দ শোনা গেল।
মায়া চোখ বড় করে বলল,
“আপনি হাসছেন কেন?”
“না, মানে আপনার রাগ করার ধরনটা একটু অন্য রকম।”
“আপনি কি আমাকে নিয়ে মজা করছেন?”
“একদমই না। তবে আপনার রাগী মুখটা বেশ সুন্দর।”
কথাটা শুনে মায়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। জীবনে অনেক প্রশংসা সে শুনেছে, কিন্তু এই অচেনা ছেলেটির মুখে কথাটা শুনে কেন যেন তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
সে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে বলল,
“আপনি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একটু বেশিই কথা বলেন।”
ছেলেটি এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“হতে পারে। তবে সব অপরিচিত মানুষই যে সারাজীবন অপরিচিত থাকে, তা তো নয়।”
মায়া কথাটার উত্তর খুঁজে পেল না।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
ফোনের ওপাশ থেকে মায়ার বান্ধবী নীলা বলল,
“কোথায় তুই? কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি!”
মায়া বলল,
“এই তো, আসছি। একটু বৃষ্টিতে আটকে গিয়েছিলাম।”
কথা শেষ করে ফোনটা ব্যাগে রাখতেই ছেলেটি জিজ্ঞেস করল,
“আপনার নামটা কি জানতে পারি?”
মায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“মায়া।”
ছেলেটি নামটা একবার মনে মনে উচ্চারণ করল।
“মায়া! সুন্দর নাম।”
মায়া হালকা হেসে বলল,
“ধন্যবাদ। আপনার নাম?”
ছেলেটি উত্তর দিল,
“আরিশ।”
নামটা বলেই সে একটু থামল। তারপর বলল,
“আশা করি আবার দেখা হবে, মায়া।”
মায়া মৃদু হেসে চলে গেল। যাওয়ার আগে একবার পেছনে ফিরে তাকিয়েছিল কি না, সেটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনি।
কিন্তু আরিশ তাকিয়ে ছিল।
মেয়েটি যতক্ষণ দেখা গেল, ততক্ষণ সে সেদিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
কেন এমন হলো, সে জানে না।
শুধু মনে হলো, আজকের বিকেলটা অন্য রকম।
অন্যদিকে, কিছুটা দূরে গিয়ে মায়া নিজের মনকে প্রশ্ন করল,
“ছেলেটা এমন অদ্ভুত কেন?”
পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দিয়ে বলল,
“ধুর! একটা অপরিচিত ছেলে। আর কখনো দেখা হবে কি না, তারই ঠিক নেই।”
কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু কিছু দেখা হয়, যেগুলোকে সামান্য ঘটনা ভেবে ভুল করা যায়।
অথচ সেই ঘটনাই একদিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়া জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে তখনো হালকা বৃষ্টি পড়ছে। তার হাতে এক কাপ চা, চোখ জানালার ওপারে।
হঠাৎ করেই মনে পড়ল ছেলেটির কথা।
“সব অপরিচিত মানুষই যে সারাজীবন অপরিচিত থাকে, তা তো নয়।”
কথাটা মনে পড়তেই মায়া নিজের অজান্তে হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই নীলা ফোন করল।
“কী রে, তোর গলায় এত হাসি কেন? কাউকে পেয়েছিস নাকি?”
মায়া চমকে উঠল।
“কী সব বলিস! তেমন কিছু না।”
নীলা দুষ্টুমি করে বলল,
“তেমন কিছু না হলে এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”
“আমি লজ্জা পাচ্ছি না!”
“আচ্ছা, আচ্ছা। বিশ্বাস করলাম। এবার বল, ঘটনাটা কী?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আজ একটা ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বৃষ্টির সময়।”
নীলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে উঠল।
“তারপর? দেখতে কেমন? নাম কী? কথা হয়েছে?”
মায়া হেসে বলল,
“এত প্রশ্ন একসঙ্গে করিস না। নাম আরিশ।”
নীলা একটু থেমে বলল,
“আরিশ! নামটা তো সুন্দর। আবার দেখা হলে আমাকে কিন্তু সব বলবি।”
মায়া কথাটা হেসে উড়িয়ে দিল।
সে তখনো জানত না, আরিশ নামের সেই ছেলেটি খুব শিগগিরই তার জীবনের এমন একজন হয়ে উঠবে, যাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেও ভুলতে পারবে না।
আর শহরের অন্য প্রান্তে, নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আরিশও বৃষ্টি দেখছিল।
তার ফোনে একের পর এক কল আসছিল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো মনোযোগ ছিল না।
তার মনে শুধু একটি নাম ঘুরছিল।
মায়া।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল,
“ভাইয়া, কী হয়েছে তোমার? আজ এত চুপচাপ কেন?”
আরিশ ফিরে তাকাল। তার ছোট বোন রাইসা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
আরিশ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“কিছু হয়নি। তুই এখানে কী করছিস?”
রাইসা চোখ ছোট করে তাকাল।
“কিছু হয়নি? তোমার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে জীবনে প্রথমবার কারও প্রেমে পড়েছ!”
আরিশ হেসে উঠল।
“তোর মাথায় সব সময় এসবই ঘোরে?”
রাইসা দুষ্টুমি করে বলল,
“তাহলে সত্যিই কেউ আছে?”
আরিশ উত্তর দিল না। আবার জানালার বাইরে তাকাল।
সে নিজেও জানত না, মায়ার সঙ্গে দেখা হওয়াটা নিছক কাকতালীয়, নাকি তার জীবনের নতুন কোনো গল্পের শুরু।
কিন্তু একটা বিষয় সে বুঝতে পারছিল।
মেয়েটির চোখে এমন কিছু ছিল, যা তাকে বারবার সেই চোখ দুটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
আর এই প্রথমবার, কোনো অচেনা মানুষের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছিল তার।
কিন্তু ভাগ্য কি এত সহজে তাদের আবার দেখা করাবে?
নাকি তাদের গল্পের শুরুতেই অপেক্ষা করছে এমন কোনো রহস্য, যা তাদের দুজনের জীবন বদলে দেবে?
সেই উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী দিনের পাতায়।
চলবে...
