তিথির ফিরে আসা
সকালের নরম রোদ জানালার কাচ ভেদ করে মায়ার ঘরে এসে পড়েছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে সে। গত রাতের আরিশের কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে।
“আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমার প্রতিদিনের মধ্যে একটা নতুন অপেক্ষা তৈরি হয়েছে।”
কথাটা মনে পড়তেই মায়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল।
“ধুর! একটা ছেলে দুটো ভালো কথা বলেছে, আর আমি কিনা সেগুলো নিয়েই ভাবছি!”
ফোনটা পাশে রেখে উঠে পড়ল সে।
আজ কলেজে যাওয়ার জন্য একটু তাড়াতাড়ি তৈরি হলো মায়া। সাদা পোশাকের সঙ্গে নীল ওড়নাটা কাঁধে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আমি কিন্তু আরিশের জন্য তৈরি হচ্ছি না!”
কথাটা বলেই নিজে নিজে হেসে ফেলল।
কলেজে পৌঁছাতেই নীলা ছুটে এসে তার হাত ধরল।
“এই মেয়ে, তোর মুখে এত হাসি কেন?”
মায়া স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
“এমনিই।”
নীলা চোখ ছোট করে তাকাল।
“আরিশের সঙ্গে কথা হয়েছে?”
মায়া একটু থেমে বলল,
“হ্যাঁ, গত রাতে।”
“কী কথা হয়েছে?”
“সাধারণ কথা।”
“সাধারণ কথায় কেউ এত হাসে?”
মায়া নীলার হাত ছাড়িয়ে বলল,
“তুই না একদিন আমার মাথা খারাপ করে দিবি!”
নীলা হেসে বলল,
“তোর মাথা খারাপ করার দরকার নেই। মনে হচ্ছে সেটা অন্য কেউ ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে!”
দুজন কথা বলতে বলতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু ক্লাসে ঢুকেই মায়ার চোখ আটকে গেল সামনের বেঞ্চে বসে থাকা দুজন মানুষের দিকে।
আরিশ বসে আছে। তার পাশের চেয়ারে বসে আছে তিথি।
তিথি কিছু একটা বলছে, আর আরিশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। একসময় তিথি হেসে আরিশের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।
মায়ার পা যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
কেন জানি দৃশ্যটা তার ভালো লাগল না।
নিজেকে বোঝাল, আরিশ তার বন্ধু। আর বন্ধুর জীবনে অন্য বন্ধু থাকতেই পারে।
তাহলে তার এত খারাপ লাগছে কেন?
নীলা মায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে সব বুঝে গেল।
সে আস্তে করে বলল,
“কী হয়েছে?”
মায়া চোখ সরিয়ে বলল,
“কিছু হয়নি।”
“তাহলে তুই ওদের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?”
“আমি তাকাচ্ছি না।”
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই তাকাচ্ছিস না। এবার চল, বসি।”
মায়া গিয়ে পেছনের বেঞ্চে বসল।
কিছুক্ষণ পর আরিশ পেছনে ফিরে তাকাল। মায়াকে দেখে হাসল।
“এই যে, এখানে বসেছেন কেন? সামনে আসুন।”
মায়া মুখ ফিরিয়ে বলল,
“এখানেই ভালো আছি।”
আরিশ একটু অবাক হলো।
“কী হয়েছে আপনার?”
“কিছু না।”
“আমার ওপর রাগ করেছেন?”
“না।”
“তাহলে আমার দিকে তাকাচ্ছেন না কেন?”
মায়া এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
“আপনি কি সবার সঙ্গে এমন করে প্রশ্ন করেন?”
আরিশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
“না। শুধু আপনার সঙ্গেই করি।”
কথাটা শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু সে মুখে কিছু প্রকাশ করল না।
ঠিক তখনই তিথি পেছনে ফিরে তাকাল।
“আরিশ, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ?”
আরিশ বলল,
“আমার বন্ধু মায়া।”
তিথি মায়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
“ওহ! তুমিই তাহলে মায়া! আরিশের মুখে তোমার কথা শুনেছি।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
“আমার কথা?”
তিথি মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। গতকালও তোমার কথা বলছিল।”
আরিশ তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
“তিথি, এবার থামবি?”
তিথি হেসে বলল,
“আচ্ছা বাবা, আর বলছি না!”
মায়ার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা একটু কমে এল।
অন্তত এটুকু বুঝল, আরিশ তার কথা অন্যদের কাছেও বলে।
কিন্তু তিথির সঙ্গে আরিশের সম্পর্কটা ঠিক কী, সেই প্রশ্নটা তখনো তার মনে রয়ে গেল।
ক্লাস শুরু হওয়ায় আর কথা হলো না।
দুপুরের বিরতিতে মায়া আর নীলা কলেজের ক্যানটিনে গেল। কিছুক্ষণ পর আরিশও সেখানে এসে তাদের টেবিলে বসল।
“কী খাচ্ছেন?”
মায়া উত্তর দিল,
“কিছু না।”
আরিশ অবাক হয়ে বলল,
“কিছু না আবার কী খাবার?”
নীলা হেসে বলল,
“ওর মন খারাপ। তাই খিদেও নেই।”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে নীলার দিকে তাকাল।
“আমি তোকে বলেছি আমার মন খারাপ?”
নীলা নির্বিকারভাবে বলল,
“না বললেও বোঝা যায়।”
আরিশ এবার মায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“আপনি চাইলে আমাকে বলতে পারেন। আমি শুনব।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“সব কথা কি সবাইকে বলা যায়?”
আরিশের মুখের হাসি একটু ম্লান হয়ে গেল।
“না। সব কথা সবাইকে বলা যায় না। তবে কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে না বলেও মনের কথাগুলো বলতে ইচ্ছে করে।”
মায়া তার চোখের দিকে তাকাল।
দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
হঠাৎ তিথি এসে আরিশের পাশে দাঁড়াল।
“আরিশ, তোমার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।”
আরিশ উঠে দাঁড়াল।
“কী কথা?”
তিথি মায়া আর নীলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটু ব্যক্তিগত কথা।”
আরিশ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি একটু আসছি।”
মায়া মাথা নাড়ল।
আরিশ তিথির সঙ্গে চলে গেল।
তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মায়া চুপ করে বসে রইল।
নীলা এবার আর মজা করল না।
সে মায়ার হাত ধরে বলল,
“তুই কি আরিশকে পছন্দ করতে শুরু করেছিস?”
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“জানি না, নীলা।”
“তাহলে ওকে নিয়ে এত ভাবছিস কেন?”
মায়া নিচু গলায় বলল,
“যখন ও আমার সঙ্গে কথা বলে, তখন মনে হয় আমি ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন অন্য কারও সঙ্গে ওকে দেখি, তখন মনে হয় আমি হয়তো ওর জীবনে তেমন কেউই না।”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“মায়া, কাউকে ভালো লাগতে শুরু করলে এমন অনুভূতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তুই নিজের মনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরিশকে ভালো করে চিনে নে।”
মায়া মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার মনটা তখনো অস্থির।
কারণ, সে বুঝতে পারছিল—আরিশ তার কাছে আর শুধুই একজন বন্ধু নেই।
বিকেলে কলেজ ছুটির পর মায়া একাই গেটের দিকে হাঁটছিল। নীলা আগেই চলে গেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে আরিশের ডাক এল।
“মায়া, দাঁড়ান!”
মায়া থামল।
আরিশ দ্রুত তার কাছে এসে দাঁড়াল।
“আপনি আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে যাচ্ছিলেন?”
মায়া শান্ত গলায় বলল,
“আপনি তো তিথির সঙ্গে ব্যস্ত ছিলেন।”
আরিশ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে ব্যাপারটা এই?”
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কোন ব্যাপার?”
“আপনি কি তিথিকে নিয়ে কিছু ভাবছেন?”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
“না! আমি কেন ভাবতে যাব?”
আরিশ হাসল না। বরং একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
“মায়া, তিথি আমার ছোটবেলার বন্ধু। ওর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার জীবনের সব সম্পর্ক একই রকম।”
মায়া চুপ করে রইল।
আরিশ আবার বলল,
“আপনি আমার বন্ধু। আর আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
মায়ার মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতার ওপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিল।
সে নিচু গলায় বলল,
“আমি তো কিছু জিজ্ঞেস করিনি।”
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
“জানি। কিন্তু আপনার চোখে কিছু প্রশ্ন দেখেছিলাম।”
মায়া আর কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে এসে আরিশ হঠাৎ থামল।
“মায়া?”
“জি?”
“একটা কথা বলবেন?”
“কী কথা?”
আরিশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কখনো কি এমন হয়েছে, কাউকে হারানোর ভয় পাওয়ার আগেই তাকে হারানোর কথা ভেবে আপনার মন খারাপ হয়েছে?”
মায়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
প্রশ্নটা যেন তার নিজের মনের কথাই বলে দিল।
সে মৃদু স্বরে বলল,
“হয়তো হয়েছে।”
আরিশ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“সেই মানুষটা কে?”
মায়া উত্তর দিল না।
শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে দিতে নেই।”
আরিশ হেসে ফেলল।
“এই কথাটা তো আমার বলার কথা ছিল!”
মায়াও হেসে উঠল।
সেদিন প্রথমবার তাদের হাসির মধ্যে কোনো অস্বস্তি ছিল না। ছিল না কোনো অভিমান।
ছিল শুধু দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি হতে থাকা এক অদ্ভুত বোঝাপড়া।
কিন্তু তারা কেউই জানত না, এই শান্ত বিকেলের পরই তাদের গল্পে এমন একটি অধ্যায় শুরু হবে, যা তাদের সম্পর্ককে নতুন এক পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবে।
রাত সাড়ে নয়টা।
মায়া পড়ার টেবিলে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ ফোনে তিথির একটি বার্তা এল।
মায়া অবাক হয়ে বার্তাটি খুলল।
তিথি লিখেছে,
“মায়া, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা ছিল। আশা করি ভুল বুঝবে না।”
মায়া উত্তর দিল,
“বলো।”
কয়েক মিনিট পর তিথির উত্তর এল।
“আরিশকে তুমি কতটা চেনো?”
প্রশ্নটা পড়ে মায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে লিখল,
“কেন?”
তিথি এবার যে কথাটা লিখল, সেটা পড়ে মায়ার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
“আরিশকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার আগে ওর অতীতটা তোমার জানা উচিত।”
মায়ার হাত থেমে গেল।
সে কাঁপা আঙুলে লিখল,
“কী হয়েছে আরিশের?”
তিথি উত্তর দিল,
“সব কথা মেসেজে বলা সম্ভব নয়। কাল কলেজে দেখা করো। তোমাকে এমন একটা কথা বলব, যা হয়তো তোমার আর আরিশের সম্পর্কটা বদলে দিতে পারে।”
মায়া ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
আরিশের অতীতে কী আছে?
তিথি কেন তাকে এসব বলছে?
আর সবচেয়ে বড় কথা, আরিশ কি তার কাছ থেকে কোনো সত্য লুকিয়ে রেখেছে?
মায়া জানালার বাইরে তাকাল। রাতের আকাশে চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেছে।
তার মনে হলো, কিছুক্ষণ আগেও যে পৃথিবীটা সুন্দর লাগছিল, সেই পৃথিবীর কোথাও যেন অদৃশ্য একটা ছায়া নেমে এসেছে।
সে শুধু একবার নিজের মনকে প্রশ্ন করল,
“আরিশ, তোমার জীবনে এমন কী আছে, যা আমাকে জানাতে তুমি ভয় পাচ্ছ?”
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ তখন তার পাশে ছিল না।
আরিশ তখন নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটি ছবি দেখছিল।
ছবিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
ছবিটার পেছনে লেখা একটি তারিখ দেখে আরিশের চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপর সে খুব ধীরে ছবিটা ড্রয়ারে রেখে দিল।
মৃদু স্বরে বলল,
“অতীত কখনো কখনো মানুষকে ছেড়ে যায় না। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করে।”
আর সেই অপেক্ষার শেষ যে খুব কাছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
পরবর্তী পর্ব: তিথি মায়াকে আরিশের অতীতের এমন একটি অধ্যায় জানাবে, যা শুনে মায়ার মনে জন্ম নেবে নতুন এক দ্বিধা। সত্যিটা কি তাদের আরও কাছে আনবে, নাকি দূরে সরিয়ে দেবে?
