~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ৪: অতীতের দরজায় তুমি
— তোমার পরিবারের ইতিহাস আমি তোমার নিজের চেয়েও বেশি জানি, আরিশা!
আদ্রিয়ানের কথাটা শুনে আরিশা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
— মানে কী? আমার পরিবার সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
আদ্রিয়ান পকেটে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,
— সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না, মিস রহমান।
— আর সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়াও ভদ্রতা নয়, মিস্টার মির্জা!
আরিশার কথায় আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটার একটা অদ্ভুত সাহস আছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই হয়।
— তোমার সাহসটা আমার বেশ পছন্দ, আরিশা।
— আপনার পছন্দ-অপছন্দ জানার কোনো আগ্রহ আমার নেই।
কথাটা বলেই আরিশা চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু আদ্রিয়ানের পরের কথায় তার পা থেমে গেল।
— তোমার বাবার পুরোনো ছবিগুলো এখনো তোমাদের বাড়িতে আছে?
আরিশা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
— আমার বাবাকে আপনি চিনতেন?
এবার আদ্রিয়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। চোখে নেমে এল সেই পরিচিত শীতলতা।
— হয়তো চিনতাম। আবার হয়তো এমন কিছু জানি, যা তোমার জানা উচিত নয়।
— আপনি সবকিছু এত রহস্য করে বলেন কেন? সোজাসুজি কথা বলতে পারেন না?
— কারণ কিছু সত্য মানুষকে বদলে দেয়, আরিশা। আর কিছু সত্য মানুষের প্রিয় মানুষগুলোকে তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়।
কথাটা বলে আদ্রিয়ান চলে গেল।
আরিশা দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর অজানা একটা অস্বস্তি জমতে লাগল। তার বাবা সম্পর্কে আদ্রিয়ান কী জানে? আর তাদের পরিবারের সঙ্গে মির্জাদের সম্পর্কই বা কী?
প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
রাত সাড়ে আটটা।
মির্জা ম্যানশনের বিশাল অফিসকক্ষে বসে আছে আদ্রিয়ান। সামনে কয়েকটি পুরোনো ফাইল ছড়িয়ে আছে। জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, অথচ তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও।
দরজায় টোকা দিয়ে ভেতরে ঢুকল রায়ান।
— স্যার, আপনি যে ফাইলগুলো চেয়েছিলেন, সেগুলো পেয়েছি।
আদ্রিয়ান চোখ না তুলেই বলল,
— রহমান পরিবারের পুরোনো নথিগুলোও?
— জি, স্যার। তবে একটা বিষয় আছে।
এবার আদ্রিয়ান মুখ তুলে তাকাল।
— কী বিষয়?
রায়ান একটু ইতস্তত করে বলল,
— প্রায় বিশ বছর আগের একটা নথি পাওয়া যাচ্ছে না। নথিটা হারিয়ে গেছে, নাকি ইচ্ছা করে সরানো হয়েছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— যে-ই সরিয়ে থাকুক, খুঁজে বের করো।
— আর ম্যাডাম আরিশা রহমান?
নামটা শুনতেই আদ্রিয়ানের দৃষ্টিতে সামান্য পরিবর্তন এল।
— ওর ওপর নজর রাখবে। তবে ও যেন কোনোভাবেই বিপদে না পড়ে।
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— স্যার, একটা কথা বলব?
— বলো।
— আপনি কি সত্যিই ওনাকে শুধু ওই পুরোনো ঘটনার কারণেই নিজের কাছাকাছি রাখতে চাইছেন?
আদ্রিয়ান ফাইল বন্ধ করে তার দিকে তাকাল।
— নিজের সীমার মধ্যে থাকো, রায়ান।
— সরি, স্যার।
রায়ান বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান একা বসে রইল। টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে একটা পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে দুজন পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একজনের মুখে হাসি, অন্যজনের চোখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য।
ছবির পেছনে লেখা একটি নামের ওপর তার আঙুল থেমে গেল।
রহমান।
আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করল। অতীতের সেই রাতের স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
কিন্তু আরিশা কি সত্যিই সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত?
নাকি সে এমন একজন, যে নিজেই জানে না তার পরিবার তাকে কত বড় সত্য থেকে দূরে রেখেছে?
পরদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে বসে ছিল আরিশা। কিন্তু তার মনোযোগ কিছুতেই পড়াশোনায় ফিরছিল না।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল একটি পরিচিত ছায়া।
কালো শার্ট, গম্ভীর মুখ আর চোখে সেই দুর্বোধ্য দৃষ্টি।
আদ্রিয়ান মির্জা!
আরিশা অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি এখানে কী করছেন?
— তোমাকে নিতে এসেছি।
— আমাকে? কেন? আমি কি আপনাকে বলেছি আমাকে নিতে আসতে?
— না।
— তাহলে?
আদ্রিয়ান শান্তভাবে বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা আছে।
আরিশা উঠে দাঁড়াল।
— আমারও একটা কথা আছে। আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
আদ্রিয়ান তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল,
— কেউ দেয়নি। কিন্তু তোমার বিপদ হলে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না।
কথাটা শুনে আরিশার বুকের ভেতর কেমন যেন হলো। তবু মুখে বিরক্তি ফুটিয়ে বলল,
— আমি নিজের যত্ন নিতে পারি।
— জানি।
— তাহলে এত চিন্তা কেন?
আদ্রিয়ান একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,
— সব চিন্তার কারণ মুখে বলা যায় না, আরিশা।
এই প্রথম কথাটা শুনে আরিশা কোনো জবাব খুঁজে পেল না।
আদ্রিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— আজ সন্ধ্যায় তোমাদের বাড়িতে যাবো। তোমার বাবার সম্পর্কে কিছু কথা জানাতে চাই।
আরিশার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— আমার বাবার সম্পর্কে?
— হ্যাঁ। আর এমন কিছু দেখাতে চাই, যা দেখার পর হয়তো তুমি আমাকে আর আগের মতো ঘৃণা করতে পারবে না।
কথাটা বলে আদ্রিয়ান চলে গেল।
আরিশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে একসঙ্গে জন্ম নিল ভয়, কৌতূহল আর অদ্ভুত এক অনুভূতি।
সন্ধ্যায় কী জানতে পারবে সে?
আদ্রিয়ান কি সত্যিই তার বাবার অতীত জানে?
নাকি এই মানুষটার হাতেই লুকিয়ে আছে তার পরিবারের সবচেয়ে বড় রহস্য?
সন্ধ্যা নামতেই রহমান বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছাল একটি কালো খাম।
খামের ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ছবি আর ছোট্ট একটি চিরকুট।
ছবিটা হাতে নিয়ে আরিশার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন আদ্রিয়ানের বাবার পাশে।
আর ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা—
“যে সত্য তোমার পরিবার লুকিয়েছে, সেই সত্যই একদিন তোমার ভালোবাসাকে ধ্বংস করবে।”
আরিশার হাত কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“আদ্রিয়ান মির্জাকে বিশ্বাস কোরো না। কারণ তোমার পরিবারের অতীতের জন্য সে তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।”
বার্তাটির দিকে তাকিয়ে আরিশার চোখে পানি জমল।
সে কি আদ্রিয়ানকে বিশ্বাস করতে পারবে?
নাকি যে মানুষটির চোখে সে অজান্তেই একটু একটু করে অন্যরকম অনুভূতি খুঁজে পাচ্ছে, সেই মানুষটিই একদিন তার সবচেয়ে বড় কষ্টের কারণ হবে?
অন্যদিকে, নিজের ম্যানশনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান ফোনের পর্দায় আরিশার ছবির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— তোমাকে ঘৃণা করার কথা ছিল আমার, আরিশা। তাহলে তোমার কষ্টের কথা ভাবলেই আমার নিজের এত কষ্ট হয় কেন?
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছে।
আর তাদের দুজনের অজান্তেই অতীতের বন্ধ দরজাটা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে।
চলবে...🥀🖤
