~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ৩: যে চোখে লুকানো হাজারো প্রশ্ন
সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
জানালার বাইরে সূর্যের আলো, পাখির ডাক আর শহরের ব্যস্ততা—সবকিছু স্বাভাবিক। অথচ আরিশা রহমানের ভেতরটা যেন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে ছিল।
গত রাতের ছবিটা সে এখনো ভুলতে পারেনি।
ছবিতে তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ ছেলেটি আর কেউ নয়, আদ্রিয়ান মির্জা।
আর ছবির পেছনে লেখা কথাগুলো যেন বারবার তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
“যে মানুষটিকে তুমি বিশ্বাস করতে শিখছ, তার পরিবারই তোমার বাবার শেষ রাতের সত্য জানে।”
—কিন্তু বাবার সঙ্গে আদ্রিয়ানের পরিবারের সম্পর্ক কী?
প্রশ্নটা যতবার মনে আসছিল, ততবারই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল।
আরিশা ছবিটা ব্যাগে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজেকে দেখে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
—আরিশা রহমান, তুই কিন্তু সহজে হার মানার মেয়ে না। সত্যিটা বের করেই ছাড়বি। আর ওই রাগী লোকটার কাছ থেকে উত্তর আদায় করতে হলে সেটাও করবি!
কথাটা বলেই সে নিজের চুল ঠিক করে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল।
কিন্তু সে জানত না, যার কাছ থেকে উত্তর আদায় করার পরিকল্পনা করছে, সেই মানুষটা ইতিমধ্যেই তার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর রাখছে।
মির্জা কর্পোরেটের বিশাল কাচঘেরা অফিসে তখন পিনপতন নীরবতা।
অফিসের কর্মীরা সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। অথচ সবার চোখে-মুখে চাপা আতঙ্ক। কারণ, তাদের বস আদ্রিয়ান মির্জার মেজাজ আজ সকাল থেকেই ভয়ংকর খারাপ।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। এক হাতে দামি ঘড়ি, অন্য হাতে ফাইল। টেবিলের ওপাশে বসে থাকা আদ্রিয়ানের চোখে বরফশীতল দৃষ্টি।
—এই রিপোর্টটা কে তৈরি করেছে?
আদ্রিয়ানের গম্ভীর প্রশ্নে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মীটির গলা শুকিয়ে গেল।
—স্যার, আমি...
—আমি অজুহাত শুনতে চাইনি। কাজের ভুল একবার হয়, বারবার নয়। ঠিক করে আবার জমা দিন।
লোকটি দ্রুত বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান ফাইলটা বন্ধ করতেই তার বিশ্বস্ত সহকারী রায়ান ঘরে প্রবেশ করল।
—স্যার, আরিশা রহমান আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে।
আদ্রিয়ানের আঙুল থেমে গেল।
—আমি কি তোমাকে ওর প্রতিদিনের রুটিন জানতে বলেছি?
রায়ান শান্ত গলায় বলল,
—না, স্যার। তবে আপনি গতকাল নিজেই ওর নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজ নিতে বলেছিলেন।
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
—ওর আশপাশে কোনো অপরিচিত লোক ঘোরাফেরা করছে কি না, খেয়াল রাখবে। কিন্তু ও যেন কিছু বুঝতে না পারে।
—ঠিক আছে, স্যার।
রায়ান বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটু থেমে বলল,
—স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
—বলো।
—আপনি কি সত্যিই ভাবছেন, অতীতটাকে আর কত দিন ওর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন?
ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
—রায়ান।
—জি, স্যার?
—আমার অতীত নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার আগে ভেবে নেবে।
রায়ান মাথা নিচু করল।
—দুঃখিত, স্যার।
দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই আদ্রিয়ান চেয়ারে হেলান দিল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বিশ বছর বয়সী এক মেয়ের মুখ—না, আরিশার মুখ নয়। বহু বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি।
একটি বন্ধ দরজা। রক্তমাখা মেঝে নয়, বরং ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র। আতঙ্কিত কয়েকটি মুখ। আর তার বাবার শেষ কথাগুলো—
“মির্জা পরিবারের ওপর বিশ্বাস করিস না, আদ্রিয়ান। সবাই যা দেখাচ্ছে, সত্যিটা তা নয়।”
সেদিনের পর থেকে আদ্রিয়ান শিখেছিল, মানুষকে বিশ্বাস করার চেয়ে তাদের গোপন উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা অনেক বেশি জরুরি।
কিন্তু আরিশার ক্ষেত্রে সে নিয়মটা মানতে পারছিল না।
মেয়েটা তার জীবনে আসার আগেই সে তাকে চিনত। অনেক দূর থেকে, অনেক বছর ধরে।
আরিশা জানত না, তার হাসির আড়ালে কতগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন জমে আছে।
আর আদ্রিয়ান জানত না, সত্যিটা প্রকাশ পেলে মেয়েটা তার চোখের দিকে তাকিয়ে আর কখনো বিশ্বাস করতে পারবে কি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢুকেই আরিশা বুঝতে পারল, আজ তার মন পড়াশোনায় বসবে না।
তার বান্ধবী মেহরিন কাছে এসে বলল,
—কী রে, মুখটা এমন শুকনো কেন? সকালে নাশতা করিসনি?
আরিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—নাশতা করেছি। কিন্তু মাথার ভেতর একটা সমস্যা ঘুরছে।
—কী সমস্যা?
—এমন একজন মানুষকে নিয়ে, যাকে দেখলেই আমার রাগ হয়।
মেহরিন চোখ বড় করে ফেলল।
—ওহ! ব্যাপারটা তো সন্দেহজনক। মানুষটা কে?
—একটা চলন্ত রাগের পাহাড়।
—নাম বল!
—আদ্রিয়ান মির্জা।
মেহরিন কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
—কী! সেই আদ্রিয়ান মির্জা? যার ছবি দেখেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের অর্ধেক মেয়ে পাগল?
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—তো কী হয়েছে? দেখতে ভালো হলেই কি মানুষ ভালো হয়ে যায়?
—তুই ওনাকে দেখেছিস?
—দেখেছি। আর আমার মনে হয়েছে, লোকটার মুখে হাসি দেখার চেয়ে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠা বেশি সম্ভব।
মেহরিন হেসে ফেলল।
—তুই সত্যিই অসাধারণ!
আরিশাও হেসে উঠল। কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের কাছে কালো রঙের একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানুষটিকে দেখামাত্র তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান মির্জা!
লোকটা এখানে কেন?
আরিশা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির দরজা খুলে আদ্রিয়ান নেমে এল। কালো পোশাক, দৃঢ় পদক্ষেপ, চোখেমুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য। আশপাশের কয়েকজন ছাত্রী ফিসফিস করে তার দিকে তাকাচ্ছিল।
কিন্তু আদ্রিয়ানের দৃষ্টি ছিল শুধু একজনের দিকে।
আরিশা রহমান।
মেয়েটা দূর থেকে তাকিয়ে এমনভাবে ভ্রু কুঁচকে আছে, যেন সে এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর মানুষটিকে দেখতে পেয়েছে।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
মেয়েটার এই অভ্যাসটা তার ভীষণ পরিচিত।
অন্য সবাই তার সামনে কথা বলার আগে দশবার ভাবে। অথচ আরিশা তার দিকে তাকিয়েই যেন ঝগড়ার প্রস্তুতি নেয়।
আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আদ্রিয়ানের সেটা খারাপ লাগে না।
বরং মেয়েটার এই সাহসটুকুই তাকে বারবার আরিশার দিকে টেনে নিয়ে যায়।
—আপনি এখানে কী করছেন?
আরিশা সামনে এসে দাঁড়াতেই প্রশ্নটা ছুড়ে দিল।
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকাল।
—কেন? এখানে আসতে হলে কি তোমার অনুমতি নিতে হবে?
—না। তবে আমার পিছু নেওয়ার অভ্যাস থাকলে আগে থেকে বলে রাখবেন, আমি কিন্তু ভয় পাই না।
আদ্রিয়ানের চোখে ক্ষীণ amusement ফুটে উঠল।
—তুমি কি সবসময় এত বেশি কথা বলো?
—আর আপনি কি সবসময় এত অহংকার নিয়ে চলেন?
পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী থেমে গেল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। এমন একজন মানুষের সঙ্গে এভাবে কথা বলার সাহস খুব কম লোকেরই আছে।
আদ্রিয়ান এক পা এগিয়ে এল।
আরিশা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।
—আমাকে ভয় পাও না?
—কেন পাব? আপনি কি ভূত?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিচু গলায় বলল,
—তুমি জানো না, তুমি কাকে নিয়ে কথা বলছ।
আরিশার হাসি মিলিয়ে গেল।
—তাহলে চিনিয়ে দিন নিজেকে। তবে পরিচয় দেওয়ার সময় আপনার টাকার অঙ্কটা বলার প্রয়োজন নেই। মানুষ হিসেবে আপনি কেমন, সেটাই জানতে চাই।
কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
মেয়েটা জানে না, ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর সে নিজেও বহু বছর ধরে খুঁজছে।
মানুষ হিসেবে সে কেমন?
একজন প্রতিশোধপরায়ণ মানুষ? একজন সফল ব্যবসায়ী? নাকি অতীতের কিছু ভুলের ভারে আটকে থাকা এমন একজন, যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেও সত্যিটা বলতে ভয় পায়?
আদ্রিয়ান কিছু বলল না।
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
—কী হলো? উত্তর নেই?
—সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে নেই, আরিশা।
নিজের নামটা তার মুখে শুনে আরিশা থমকে গেল।
—আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?
আদ্রিয়ান চোখ সরিয়ে নিল।
—তোমার সম্পর্কে জানার মতো অনেক কিছুই আছে।
—মানে?
—সময় হলে বুঝবে।
—আপনি সব কথা এভাবে ধাঁধার মতো বলেন কেন? সরাসরি কথা বলতে সমস্যা হয়?
আদ্রিয়ান এবার তার দিকে পুরোপুরি ফিরে তাকাল।
—তুমি যদি সব সত্যি জানতে পারো, তাহলে কি সেটা মেনে নিতে পারবে?
আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ছবিটার কথা মনে পড়ল। বাবার সঙ্গে তার দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণ ছেলেটি। আর ছবির পেছনের ভয়ংকর বাক্যটা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
—সত্যিটা যত কঠিনই হোক, আমি জানতে চাই।
আদ্রিয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—তাহলে একটা কথা মনে রেখো। সব সত্যি জানার পর মানুষ আগের মতো থাকে না।
—আমি বদলে যাওয়ার ভয় পাই না।
—আমাকে ঘৃণা করতেও ভয় পাবে না?
আরিশা তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেন জানি না, প্রশ্নটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা তার রাগকে মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল।
তবুও সে বলল,
—ঘৃণা করার মতো কিছু করলে অবশ্যই করব।
আদ্রিয়ান দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল,
—সেই দিনটা যেন কখনো না আসে।
কথাটা বলে সে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আরিশা পেছন থেকে ডাকল,
—শুনুন!
আদ্রিয়ান থামল, কিন্তু ফিরে তাকাল না।
—আমার বাবাকে আপনি চিনতেন?
প্রশ্নটা শুনে তার কাঁধ শক্ত হয়ে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে বলল,
—তোমার বাবার ব্যাপারে যা জানো, তার সবটাই সত্যি নয়।
আরিশার মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে।
—মানে কী?
কিন্তু আদ্রিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না। গাড়িতে উঠে চলে গেল।
আরিশা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে এখন একটাই প্রশ্ন—
আদ্রিয়ান মির্জা তার বাবার অতীত সম্পর্কে কী জানে?
সন্ধ্যায় মির্জা ভিলার দোতলার একটি বন্ধ ঘরে বসে ছিল আদ্রিয়ান।
ঘরটিতে বহু বছর ধরে কেউ প্রবেশ করে না। দেয়ালে পুরোনো ছবি, কাঠের আলমারি আর একটি বিশাল ডেস্ক। ঘরের প্রতিটি জিনিস যেন অতীতের কোনো না কোনো সাক্ষী।
আদ্রিয়ান ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটি পুরোনো খাম বের করল।
খামের ভেতরে ছিল কয়েকটি চিঠি এবং একটি ছবি।
ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মানুষ—আদ্রিয়ানের বাবা এবং আরিশার বাবা।
তাদের মুখে হাসি।
কিন্তু ছবির পেছনে লাল কালিতে লেখা কয়েকটি শব্দ আজও স্পষ্ট—
“বিশ্বাসঘাতককে কখনো ক্ষমা করো না।”
আদ্রিয়ান ছবিটা শক্ত করে ধরে রইল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
—ভেতরে আসো।
রায়ান ঘরে প্রবেশ করল।
—স্যার, আপনার নির্দেশমতো পুরোনো নথিগুলো খুঁজে পেয়েছি।
আদ্রিয়ান ছবিটা নামিয়ে রাখল।
—কিছু পেয়েছ?
—জি, স্যার। আপনার বাবার মৃত্যুর আগের কয়েক মাসের কিছু নথি পাওয়া গেছে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
—কী সমস্যা?
রায়ান একটি ফাইল এগিয়ে দিল।
—এই নথিগুলোর কয়েকটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর যেসব কাগজ অবশিষ্ট আছে, সেখানে রহমান পরিবারের নাম একাধিকবার এসেছে।
আদ্রিয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।
—কেউ ইচ্ছা করে প্রমাণ মুছে দিয়েছে।
—আমারও তাই মনে হচ্ছে, স্যার।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
—এই ব্যাপারে কেউ যেন কিছু জানতে না পারে। বিশেষ করে আরিশা।
রায়ান দ্বিধা নিয়ে বলল,
—স্যার, আরিশা ম্যাডাম যদি নিজেই সত্যিটা খুঁজতে শুরু করেন?
আদ্রিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
—তাহলে তাকে থামানোর চেষ্টা করবে না।
রায়ান অবাক হয়ে তাকাল।
—কিন্তু স্যার...
—আমি বলেছি, তাকে থামাবে না।
তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যার পরে আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ রইল না।
রায়ান বেরিয়ে গেলে আদ্রিয়ান আবার ছবিটা হাতে তুলে নিল।
—আমি তোমাকে হারাতে পারব না, আরিশা, সে মনে মনে বলল। —কিন্তু তোমাকে সত্যিটা বলার সাহসও আমার নেই।
তার চোখে জমে থাকা কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব।
যে মেয়েটিকে সে বহু বছর ধরে আড়াল থেকে আগলে রেখেছে, একদিন সেই মেয়েটিই হয়তো তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।
আর সেই দিনের কথা ভেবেই আদ্রিয়ানের বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠল।
অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে আরিশা ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করল।
আজকের কথাগুলো তার মাথা থেকে সরছিল না।
“তোমার বাবার ব্যাপারে যা জানো, তার সবটাই সত্যি নয়।”
কথাটার অর্থ কী?
তার বাবা কি কোনো গোপন সত্য লুকিয়ে রেখেছিলেন? আর আদ্রিয়ান কেন সেই সত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“আদ্রিয়ান মির্জাকে বিশ্বাস করবেন না। আপনার বাবার মৃত্যুর রহস্য জানতে চাইলে পুরোনো মির্জা ভিলার বন্ধ ঘরটির খোঁজ করুন।”
আরিশার আঙুল ঠান্ডা হয়ে এল।
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটি বার্তা এল।
“তবে সাবধান। ওই ঘরের দরজা খুললে আপনার জীবন আগের মতো থাকবে না।”
আরিশা ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার চোখে এবার ভয় নয়, দৃঢ়তা।
—যে রহস্যই থাকুক, আমি সত্যিটা জানব।
জানালার বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে।
আর শহরের অন্য প্রান্তে, মির্জা ভিলার বন্ধ ঘরটির সামনে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ানও একই ছবির দিকে তাকিয়ে ছিল।
দুজন মানুষ।
দুটি পরিবার।
আর এমন এক অতীত, যা তাদের একে অপরের কাছে টেনে আনছে—আবার একই সঙ্গে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রও করছে।
কিন্তু তারা কেউই জানত না, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে সেই বন্ধ দরজার ওপাশে।
চলবে...🥀🖤
