~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ৫: ভালোবাসা নাকি প্রতিশোধ?
রহমান বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছে আরিশা। তার হাতে সেই পুরোনো ছবিটা, যেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা আর আদ্রিয়ানের বাবা। ছবিটার দিকে যতবার তাকাচ্ছে, ততবারই মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আদ্রিয়ান মির্জা আসলে কে?
তার বাবার সঙ্গে আদ্রিয়ানের পরিবারের সম্পর্ক কী ছিল?
আর কেনই বা কেউ তাকে আদ্রিয়ানকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করছে?
— আপু, কী হয়েছে তোমার? সেই কখন থেকে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছো!
ছোট কাজিনের কথায় বাস্তবে ফিরল আরিশা।
— কিছু না।
— কিছু না হলে তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
আরিশা মৃদু হাসার চেষ্টা করল।
— তুই যা তো। আমার একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে।
কাজিন চলে যেতেই আরিশা ফোনটা হাতে নিল। অচেনা নম্বর থেকে আসা বার্তাটা আবার পড়ল।
“আদ্রিয়ান মির্জাকে বিশ্বাস কোরো না। কারণ তোমার পরিবারের অতীতের জন্য সে তোমাকে কখনো ক্ষমা করবে না।”
বার্তাটা পড়েই তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।
আদ্রিয়ানের চোখের দিকে তাকালে কেন তার মনে হয়, সেই কঠিন মানুষটার ভেতরেও কোথাও একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে?
কেন তার রাগী কণ্ঠ শুনেও আরিশার মন তাকে এড়িয়ে চলতে পারে না?
— ধুর! কী সব ভাবছি আমি!
নিজের মনেই কথাটা বলে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিল সে।
কিন্তু ফোনটা আবার বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা নাম।
Adrian Mirza.
আরিশা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কলটা রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
— কোথায় তুমি?
— কেন? আমার অবস্থান জানার এত শখ কেন আপনার?
— প্রশ্নের উত্তর দাও, আরিশা।
— নিজের বাড়িতে আছি। এবার বলুন, আর কিছু জানতে চান?
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আদ্রিয়ান বলল,
— তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
আরিশা অবাক হলো।
— কেন?
— তোমার বাবার ব্যাপারে কথা আছে।
কথাটা শুনেই আরিশার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কখন আসবেন?
— বিশ মিনিটের মধ্যে।
— আপনাকে তো আসতে বলিনি!
— জানি।
— তাহলে?
আদ্রিয়ানের কণ্ঠে এবার সামান্য হাসির আভাস পাওয়া গেল।
— তোমার অনুমতি নিয়ে আসতে গেলে হয়তো আগামীকাল হয়ে যাবে।
— অসহ্য একটা মানুষ আপনি!
— সেটা তোমার মুখেই সবচেয়ে বেশি শুনি।
কলটা কেটে গেল।
আরিশা ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা কি সত্যিই সবসময় এমন? নাকি শুধু তার সামনেই এমন অদ্ভুত আচরণ করে?
নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
পরমুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল।
না! আদ্রিয়ান মির্জাকে নিয়ে এত ভাবার কোনো মানে হয় না।
ঠিক বিশ মিনিট পর রহমান বাড়ির সামনে এসে থামল একটি কালো গাড়ি।
গাড়ি থেকে নেমে আদ্রিয়ান চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য।
দরজা খুলে আরিশা সামনে এল।
— আপনি সত্যিই চলে এসেছেন!
আদ্রিয়ান ভ্রু তুলল।
— তোমার কি মনে হয়েছিল আসব না?
— আপনার মতো মানুষের কোনো ঠিক নেই।
— অথচ আমার আসার অপেক্ষায় দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলে।
আরিশা চোখ বড় করে তাকাল।
— কী! আমি আপনার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম না!
— আচ্ছা, বিশ্বাস করলাম।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটল।
আরিশা বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— ভেতরে আসুন।
আদ্রিয়ান ঘরে ঢুকতেই আরিশা তাকে বসতে বলল। কিন্তু সে বসার আগেই টেবিলের ওপর রাখা ছবিটা তার চোখে পড়ল।
ছবিটা হাতে নিয়ে তার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
— এই ছবি তুমি কোথায় পেয়েছ?
আরিশা তার কণ্ঠের পরিবর্তন লক্ষ করল।
— গতকাল একটা খাম এসেছিল। তার ভেতরে ছিল।
— খামটা কোথায়?
— আমার ঘরে।
— কে দিয়েছিল?
— জানি না। কেন? কী হয়েছে?
আদ্রিয়ান কোনো উত্তর দিল না। ছবির পেছনে চোখ পড়তেই তার আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।
সেখানে লাল কালিতে লেখা কথাগুলো সে আগেই জানত।
কিন্তু যে মানুষটা এই ছবিটা আরিশার কাছে পাঠিয়েছে, সে যে আবার ফিরে এসেছে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
— আদ্রিয়ান সাহেব?
আরিশার ডাকে সে বাস্তবে ফিরল।
— তোমাকে কেউ ফোন করেছে?
আরিশা একটু থেমে বলল,
— হ্যাঁ। একটা অচেনা নম্বর থেকে।
— কী বলেছে?
— আপনাকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছে।
কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের চোখে মুহূর্তের জন্য তীব্র রাগ ফুটে উঠল।
— নম্বরটা আমাকে দাও।
— আগে বলুন, ব্যাপারটা কী?
— আরিশা, এখন প্রশ্ন করার সময় নয়।
— আমার পরিবারকে নিয়ে কেউ আমাকে হুমকি দিচ্ছে, আর আপনি বলছেন প্রশ্ন করার সময় নয়? আপনি কি ভাবেন, আমি আপনার কথায় সবকিছু মেনে নেব?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেয়েটার চোখে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়ের চেয়েও বেশি আছে জেদ।
— ঠিক আছে। জানতে চাও?
— হ্যাঁ!
— তাহলে একটা কথা মনে রেখো। যা-ই জানো না কেন, আমাকে শোনার আগে নিজের সিদ্ধান্ত নিও না।
আরিশা ঠান্ডা গলায় বলল,
— আর আপনি মনে রাখবেন, আমি কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না।
আদ্রিয়ান ধীরে মাথা নাড়ল।
— সেটাই ভালো।
তারপর ছবিটা টেবিলে রেখে বলল,
— এই ছবির দুই পরিবার একসময় খুব কাছের ছিল। কিন্তু একটা ঘটনার পর সবকিছু বদলে যায়। আমার পরিবার যা হারিয়েছে, তার পেছনে তোমার পরিবারের ভূমিকা আছে বলে আমি বিশ্বাস করতাম।
আরিশার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
— করতেন মানে? এখন করেন না?
আদ্রিয়ান তার চোখের দিকে তাকাল।
— এখন আমি সত্যিটা জানতে চাই।
— আর যদি সত্যিই আমার পরিবার দোষী হয়?
প্রশ্নটা শুনে আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— তাহলে সত্যের মুখোমুখি হব। কিন্তু তোমাকে কোনো অপরাধের জন্য দোষী করব না, যেটা তুমি নিজে করোনি।
আরিশা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম আদ্রিয়ানকে তার কাছে একটু অন্যরকম মনে হলো।
এত রাগ, এত কঠিন আচরণের আড়ালে কি সত্যিই এমন একজন মানুষ লুকিয়ে আছে, যে অন্যায়ের দায় নিরপরাধ কারও ওপর চাপাতে চায় না?
— আপনি কি আমাকে ঘৃণা করেন, আদ্রিয়ান?
প্রশ্নটা নিজের অজান্তেই বেরিয়ে গেল।
আদ্রিয়ান স্থির হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— তোমাকে ঘৃণা করা আমার জন্য অনেক সহজ হতো, আরিশা।
— তার মানে?
আদ্রিয়ান একটু এগিয়ে এল।
— তার মানে, তোমার সামনে দাঁড়ালে আমার সব হিসাব কেন এলোমেলো হয়ে যায়, সেটা এখনো বুঝতে পারিনি।
আরিশার গাল লাল হয়ে উঠল।
— আপনি সবসময় এমন অদ্ভুত কথা বলেন কেন?
— তোমার সঙ্গে কথা বললে এমন হয়ে যায়।
— আমি কিন্তু একটুও হাসছি না!
— অথচ তোমার চোখ দুটো অন্য কথা বলছে।
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— আপনি যান তো!
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে ফেলল।
এই মেয়েটার সামনে দাঁড়ালে সে নিজের অজান্তেই এমন কিছু করে ফেলে, যা অন্য কারও সামনে কখনো করে না।
কিন্তু নিজের মনের এই পরিবর্তনকে সে এখনো কোনো নাম দিতে প্রস্তুত নয়।
রাত বাড়তে লাগল।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আদ্রিয়ান আরিশাকে বলল,
— আগামীকাল বিকেলে আমার অফিসে আসবে।
— কেন?
— ছবির ব্যাপারে আরও কিছু জানতে পারবে।
— আমি না গেলে?
আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত ভেবে বলল,
— তাহলে তোমার বাড়িতে এসে নিয়ে যাব।
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনি কি সবসময় মানুষকে বিরক্ত করেন?
— না। শুধু তোমাকে।
কথাটা বলে আদ্রিয়ান গাড়িতে উঠে পড়ল।
আরিশা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটার কথায় বিরক্ত হওয়ার কথা, অথচ তার মনটা অদ্ভুতভাবে ভালো হয়ে আছে।
সে নিজের মনকে বোঝাল, এটা কেবল কৌতূহল।
এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু সে জানত না, গাড়িতে বসে আদ্রিয়ানও একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
কেন আরিশার চোখে কষ্ট দেখলে তার নিজের বুক ভারী হয়ে আসে?
কেন মেয়েটাকে বিপদ থেকে দূরে রাখতে গিয়ে সে নিজের সব নিয়ম ভেঙে ফেলছে?
আর কেন অতীতের প্রতিশোধ নেওয়ার যে শপথ সে একদিন করেছিল, আজ সেই শপথের সামনে দাঁড়িয়েও আরিশার ক্ষতি করার কথা ভাবতে পারছে না?
মির্জা ম্যানশনে ফিরে আদ্রিয়ান সোজা নিজের অফিসকক্ষে গেল।
রায়ান আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল।
— স্যার, একটা খবর পেয়েছি।
— বলো।
— যে নম্বর থেকে ম্যাডাম আরিশাকে মেসেজ পাঠানো হয়েছে, সেটা একটা অস্থায়ী নম্বর। তবে নম্বরটা ব্যবহার করার আগে যে জায়গা থেকে সক্রিয় করা হয়েছিল, সেই জায়গার তথ্য পেয়েছি।
আদ্রিয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।
— কোথায়?
রায়ান একটা কাগজ এগিয়ে দিল।
আদ্রিয়ান ঠিকানাটা পড়ল। পরমুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে গেল।
— অসম্ভব!
— কী হয়েছে, স্যার?
আদ্রিয়ান কাগজটা মুঠোয় চেপে ধরল।
ঠিকানাটা এমন একজনের বাড়ির, যাকে সে বহু বছর ধরে মৃত বলে জানে।
এমন একজন মানুষ, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার পরিবারের ধ্বংসের ইতিহাস।
আদ্রিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তাহলে কি অতীতের সেই অধ্যায় এখনো শেষ হয়নি?
আর যদি সেই মানুষটা সত্যিই ফিরে এসে থাকে, তাহলে আরিশা কতটা বিপদের মধ্যে রয়েছে?
সে ধীর অথচ কঠিন কণ্ঠে বলল,
— রায়ান, আগামীকাল থেকে আরিশার নিরাপত্তা দ্বিগুণ করবে। তবে ও যেন কিছু বুঝতে না পারে।
— জি, স্যার।
রায়ান চলে যাওয়ার পর আদ্রিয়ান ড্রয়ার থেকে সেই পুরোনো ছবিটা বের করল।
ছবির পেছনে লেখা নামটার ওপর আঙুল রেখে সে ফিসফিস করে বলল,
— তুমি যদি সত্যিই ফিরে এসে থাকো, তাহলে এবার তোমার মুখোশ আমি নিজেই খুলব।
তারপর কয়েক মুহূর্ত থেমে আরিশার কথা মনে পড়তেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
— আরিশা, তোমার অতীতের সঙ্গে আমার অতীত জড়িয়ে আছে। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
বাইরে তখন রাতের আকাশে মেঘ জমেছে।
একদিকে অতীতের প্রতিশোধ, অন্যদিকে অজান্তেই জন্ম নেওয়া এক অনুভূতি।
আদ্রিয়ান কি পারবে নিজের প্রতিশোধের শপথের চেয়েও আরিশার নিরাপত্তাকে বড় করে দেখতে?
আরিশা কি পারবে এমন একজন মানুষকে বিশ্বাস করতে, যার অতীতের সঙ্গে তার পরিবারের অজানা রহস্য জড়িয়ে আছে?
উত্তর লুকিয়ে আছে সেই সত্যের আড়ালে, যা এখনো কেউ জানে না।
চলবে...🥀🖤
