★ ঘৃণার নাম তুমি ★
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ৪ : নিয়তির অদ্ভুত খেলা
ইনায়াকে অজ্ঞান হতে দেখে আরহান গাড়ি থেকে দ্রুত বের হয়ে তার মাথাটা নিজের হাতের ওপর তুলে ধরে ডাকতে থাকে। কিন্তু ইনায়ার কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।
– আদিল, তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খোলো!
আদিল দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিল। আরহান ইনায়াকে কোলে তুলে গাড়ির ভেতরে বসাল। এরপর ইনায়াকে নিজের বুকের সঙ্গে আগলে ধরে ডাকতে লাগল—
– এই মেয়ে? উঠো! মিস রহমান!
কিন্তু ইনায়া তখনো কোনো সাড়া দিল না।
গাড়ি এসে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাল। আরহান আবারও ইনায়াকে ডাকতে থাকল, কিন্তু এবারও কোনো সাড়া মিলল না। এরপর ইনায়াকে কোলে করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল সে।
ইনায়ার এমন অবস্থা দেখে মিসেস ফাতেমা চৌধুরী ছুটে এসে বললেন—
– কী হয়েছে, অর?
– সেন্সলেস হয়ে গেছে।
– কীভাবে?
– বলতে পারি না। রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল।
– ডাক্তারকে কল করো।
এরপর আরহান আদিলকে ডাক্তারকে কল করতে বলে নিজেই ইনায়াকে উপরের ঘরে নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পারসোনাল ডাক্তার চলে এলেন। তিনি ইনায়াকে পরীক্ষা করে জিজ্ঞাসা করলেন—
– কে ও?
মিসেস চৌধুরী বললেন—
– ওই মেয়েটা!
– আচ্ছা, মেয়েটার অবস্থা কিন্তু খুব একটা ভালো নয়। ওর বিশেষ যত্ন নিতে হবে, ভাবী।
– কী হয়েছে ওর?
– মেয়েটা অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে।
এ কথা শুনে আরহানের মাথা গরম হয়ে গেল। সে আর সেখানে দাঁড়াল না। রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মনে মনে বলতে লাগল—
"আমার মায়ের মাথা গেছে! একটা জঘন্য বাজারের মেয়ের সঙ্গে তার একমাত্র ছেলের বিয়ে দেবে! যে কিনা নিজের পিরিয়ডের সময়েও ওইসব করতে পিছপা হয় না। ছিঃ! আল্লাহ, তুমি আমার কপালে এমন কাউকে লিখে রেখেছিলে? না, এই মেয়েকে আমি কখনোই আমার স্ত্রীর মর্যাদা দেব না। নেভার!"
এদিকে ডাক্তার আর মিসেস চৌধুরী ইনায়ার ব্যাপারে অনেক কথা বলছিলেন, যা আমাদের শোনানো হয় না। আরহানও সেসব কিছু শোনতে পায়নি।
অনেক রাতের দিকে ইনায়ার জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই অপরিচিত জায়গা দেখে চিৎকার করে উঠল সে।
পাশের সোফাতেই বসে ছিলেন মিসেস চৌধুরী। তিনি শান্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন—
– ভয় পেয়ো না, মা। তুমি নিরাপদ জায়গাতেই আছো।
ইনায়া একবার তাঁর দিকে তাকাল, তারপর আশপাশে চোখ বুলিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল—
– আপনি কে? আমি কোথায়? এখানে কীভাবে এলাম? কী হয়েছে আমার?
– আরে মা, থামো! এত প্রশ্ন একসঙ্গে করলে কোনটার আগে উত্তর দেব বলো?
– দুঃখিত।
– অসুবিধা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, তুমি এখন নিরাপদে আছো। আর তুমি এটাকে নিজের বাড়ি মনে করতে পারো।
এ কথা শুনে ইনায়া ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল—
– কেন?
– কারণ, একটু পরেই এটা তোমার বাড়ি হয়ে যাবে।
– আপনি কী বলছেন? আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনি কে?
– শোনো আমার কথা, মা। আমি মিসেস ফাতেমা চৌধুরী। মিস্টার আব্রাহাম চৌধুরী আমার স্বামী এবং আরহা...
কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন মিসেস চৌধুরী। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন—
– দেখো মা, আমার মতে একটা মেয়ের কাছে তার সম্মানই সবকিছু।
এ কথা শুনতেই ইনায়ার চোখে পানি জমে উঠল। তার কাছে তো শেষ সম্মানটুকুও অবশিষ্ট নেই! দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল তার। এসব কিছুই মিসেস চৌধুরীর চোখ এড়াল না।
– শোনো মা, আমরা তোমার খারাপ চাই না। আমি চাই তুমি ভালো থাকো, সম্মানের সঙ্গে বাঁচো।
এতক্ষণ ইনায়া সবকিছু চুপচাপ শুনলেও এবার প্রশ্ন করল—
– কীভাবে?
মিসেস চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন—
– আমার ছেলেকে বিয়ে করে।
– কিন্তু...
– আমি জানি তুমি কী বলতে চাও। আমার ছেলে আর কেউ নয়, সেই আরহান চৌধুরীই।
কথাটা শুনেই ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই রাতের নরপিশাচটার মুখ, যে কিনা কেড়ে নিয়েছিল তার সবকিছু—তার ঘরবাড়ি, সম্মান, শান্তি সব।
ইনায়া চিৎকার করে বলে উঠল—
– তার মতো নরপিশাচকে আমি কখনোই বিয়ে করব না! তিনি একজন অমানুষ!
কথাগুলো বলেই কাঁদতে লাগল সে।
মিসেস চৌধুরী তাকে শান্ত করতে এগিয়ে আসতেই ইনায়া অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আর ঠিক তখনই ঘটনাটি দেখে ফেলল রাগী আরহান চৌধুরী।
এক মুহূর্তও দেরি না করে এগিয়ে এসে ইনায়ার গালে সজোরে চড় বসিয়ে দিল সে। চড়ের ধাক্কায় নিজেকে সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল ইনায়া।
– বাজারের মেয়ে! সাহস হয় কীভাবে আমার মাকে...
কথা শেষ হওয়ার আগেই মিসেস চৌধুরী এসে ছেলের গালে একটা চড় মারলেন।
– তোমাকে এসবের মাঝে ঢুকতে বলেছি?
– মা?
মিসেস চৌধুরী কোনো উত্তর না দিয়ে মেঝে থেকে ইনায়াকে উঠিয়ে বললেন—
– তুমি ঠিক আছো, মা?
ইনায়া কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে বলতে লাগল—
"এত ভালো একজন মানুষের সঙ্গে আমি এমন আচরণ করলাম!"
ইনায়ার চোখে পানি দেখে ফাতেমা চৌধুরী বললেন—
– কেঁদো না, মা।
এরপর আরহানের দিকে তাকিয়ে বললেন—
– আমার চোখের সামনে থেকে সর তুই!
– মা?
– যা!
এরপর আরহান সেখান থেকে চলে গেল। রাগে তখন তার মাথায় আগুন জ্বলছে।
– আমি দুঃখিত, মিসেস চৌধুরী। প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
– আহ! কী বলছো তুমি? এসো, এখানে বসো।
ইনায়া বসতেই ফাতেমা চৌধুরীও তার পাশে বসলেন।
– আমি জানি, আমার কিছু বলার মুখ নেই। কিন্তু মা, আমি আমার ছেলেকে এমন শিক্ষা দিইনি। ও এভাবে একটা মেয়ের সঙ্গে অমানুষের মতো আচরণ কর... ছিঃ! বলতেও ঘৃণা লাগছে।
কিছুক্ষণ থেমে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন—
– মা, আমি কি তোমার পরিচয় জানতে পারি?
অন্যদিকে, চৌধুরী বাড়িতে একজনের আগমন ঘটল। বাড়ির বাইরে থেকেই সে চিৎকার করতে করতে বলতে লাগল—
– বুবু! বুবু! কোথায় তুমি?
তাকে দেখে মিস্টার আব্রাহাম চৌধুরী বলে উঠলেন—
– আরে, শালাবাবু! কী হয়েছে? বুবুকে ডাকছো কেন?
– বুবু! এটা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দুলাভাই?
– আমার মিসেস সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তই নেয়। কেন, কোন সিদ্ধান্তটা আবার ভুল মনে হলো তোমার?
– সঠিক? একটা পতিতা মেয়ের সঙ্গে আমার একমাত্র ভাগ্নির বিয়ে দিচ্ছে! এটা সঠিক সিদ্ধান্ত?
– তোমার ভাগ্নিও তো মহান নয়, শালা।
– ওটা একটা ফাঁদ ছিল!
– ফাঁদ হোক কিংবা যা-ই হোক, জঘন্য কাজটা তো আমার ছেলেই করেছে। এবার তাকে এর মাশুল দিতে হবে।
– তোমরা পাগল হয়ে গেছো! নিজের ছেলের জীবন শেষ করে দিচ্ছো?
আব্রাহাম চৌধুরী কোনো উত্তর দিলেন না।
– বুবু কোথায়?
– সময় হলে দেখতে পাবে। তোমার বুবুর কাছে এখন যাওয়া মানা।
ইমরান হাওলাদার চুপ হয়ে গেলেন। কারণ, তিনি জানেন, তাঁর বোনের সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার সাহস কারও নেই।
– আমার নাম ইনায়া রহমান। আমার একটা সুন্দর পরিবার ছিল। আমি, আমার মা আর আমার বাবা। কিন্তু সেই রাতে সবকিছু বদলে গেল। আমাকে বাঁচাতে আমার...
কথাটা বলতে গিয়েই থেমে গেল ইনায়া। নিজের চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করল—
– আমার মা চলে গেলেন। সেই থেকে আমার বাবা আমাকেই এর জন্য দায়ী করেন। আমি জানি, আমিই অপরাধী। আমার জন্যই আজ আমার মা নেই। আমি আমার মাকে অনেক ভালোবাসি।
এরপর আমি সম্পূর্ণ একা হয়ে যাই। বাবা আমার সঙ্গে কথা বলতেন না। আমার বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। আমি একা একাই সময় কাটাতে শুরু করি।
একদিন বাবা একটা মহিলাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে অনেক ভালোবাসতেন। আমি ভাবতাম, হয়তো মা তাঁকে পাঠিয়েছেন আমার সঙ্গে থাকার জন্য।
আমি যখন সাত বছরে পা দিই, তখন বাবা তাঁকে বিয়ে করে নেন। আমি তখন অনেক খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এবার হয়তো আমাকে ভালোবাসার মতো একজন মানুষ পেয়েছি।
এরপর একদিন আমার সৎমা ইরিনা খাতুন একটি ছেলেকে বাসায় নিয়ে আসেন। তিনি বলেছিলেন, ছেলেটি নাকি আমার সৎভাই।
এরপর তারা দুজন মিলে আমার ওপর অত্যাচার শুরু করে দেয়। আমাকে দিয়ে ঘরের সব কাজ করাতেন, মারধর করতেন, ঠিকমতো খেতেও দিতেন না। আবার বাবা বাড়িতে ফিরলে তাঁর সামনে ভালো মানুষের নাটক করতেন। উল্টো বাবার হাতেও আমাকে মার খাওয়াতেন।
আমার তো এসব বিশ্বাসই হতো না! আমি একদম একা হয়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে কোন উদ্দেশ্যে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন, তা আমি জানি না। তবে আমি মহান আল্লাহকে বিশ্বাস করি।
কথাগুলো বলতে বলতে ইনায়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।
মিসেস চৌধুরী ইনায়ার চোখের পানি মুছে দিলেন। এরপর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন—
– মা, শেষবারের মতো তোর এই অপরাধী মাকে বিশ্বাস কর। আমার ছেলেটাকে ওর পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দে। একটা বার ওকে সুযোগ দে, মা। আমার ছেলে এতটাও খারাপ নয়। আমি জানি না, ও কীভাবে এমন কাজ করল! একটা বার বিশ্বাস কর আমাকে।
ইনায়া মিসেস চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলল—
– মা, কাঁদবেন না। আমি আপনার কথা শুনব।
মিসেস চৌধুরীও ইনায়াকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
চলবে...! 🌸✨
