★ ঘৃণার নাম তুমি ★
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ৫ : ভাগ্যের পরিণতি
মিসেস চৌধুরী ইনায়াকে খুবই সুন্দর একটা শাড়ি পরিয়ে দিলেন। দেখে যেন মনে হচ্ছে—কোনো এক রাজ্যের রাজকন্যা আজ রূপকথার পাতা থেকে বাস্তবে নেমে এসেছে। শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে যেন ফুটে উঠেছে তার অপরূপ সৌন্দর্য। লম্বা ঘন কালো চুলগুলো খোলা অবস্থায় পিঠ ছুঁয়ে আছে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে মিষ্টি গোলাপি আভা। তার মায়াবী চোখ দুটো যেন একবার তাকালেই যে কাউকে মুগ্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মুখের নিষ্পাপ হাসিটা তার সৌন্দর্যে যোগ করেছে অন্যরকম এক মায়া।
ইনায়াকে আজ এতটাই সুন্দর লাগছে যে, তার দিকে তাকালে চোখ ফেরানো সত্যিই কঠিন। মিসেস চৌধুরী মুগ্ধ হয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— মাশাআল্লাহ! আমার মেয়েটাকে আজ একদম পরীর মতো লাগছে!
ইনায়া লজ্জা পেয়ে মৃদু হাসল।
— হয়েছে মা, আর লজ্জা পেতে হবে না। নিচে চল এবার।
ইনায়ার মুখটা মলিন হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মুখে হাসির আভা ছিল, মুহূর্তেই সেখানে বিষণ্ণতা নেমে এলো। মেয়েটা জানে, নিচে গেলেই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
মিসেস চৌধুরী নিজের বৌমাকে নিয়ে নিচে নামতে লাগলেন।
নিচে বসে ছিল ইমরান হাওলাদার। ভাইকে দেখে হাসিমুখে মিসেস চৌধুরী বললেন,
— ভাই! এসেছিস তুই?
— আপা, এগুলো কী?
ইমরান হাওলাদারের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। বোনের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল সে।
ফাতেমা চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন,
— কেন? তুই জানিস না? তোকে তো আমি সবটা বলেছি।
— কিন্তু আপা! তুমি কি একবারও আমার মতামত নেবে না? আমার মত ছাড়ো, তুমি একবারও আরহান বাবার মত নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করোনি?
— তুই কী বোঝাতে চাচ্ছিস? আমার মতের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে আমার ছেলের কাছে।
— কিন্তু আরহান কি সত্যিই এই বিয়েতে রাজি? আর এই বাজারের মেয়ের সঙ্গে বংশের একমাত্র ছেলের বিয়ে দেবে কোন বিবেকে তুমি?
ফাতেমা চৌধুরীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি এবার একটু কঠিন স্বরে বললেন,
— ইমরান, তুই কি ভুলে যাচ্ছিস, কার সঙ্গে কথা বলছিস? আরহান আমার ছেলে। ওর ভালো-মন্দ আমি তোর চেয়ে ভালো বুঝি। আর ইনায়ার দায়িত্বও আমি নিয়েছি। ও মোটেও বাজারের মেয়ে নয়। দোষ শুধু এই মেয়েটার নয়, আমার ছেলেও সমান দোষী। তাই আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন না তুলে চুপচাপ এখানে থাক, নয়তো দরজা খোলা আছে—যেতে পারিস।
ইমরান কিছুটা থমকে গেল।
— আপা, এই মেয়েটার জন্য তুমি আমাকে এগুলো বললে? পারলে তুমি?
মিসেস চৌধুরী এবার ইমরানকে আর কোনো পাত্তা না দিয়ে কাজী সাহেবকে বললেন,
— আপনি আপনার কাজ শুরু করুন, কাজী সাহেব।
ইমরান আর কিছু বলল না। তবে তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বোনের সিদ্ধান্তে সে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। রাগে, ক্ষোভে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল সে। মনে মনে বলল,
'তোকে আমি দেখে নেব। তুই আমার স্বপ্নে এভাবে বাধা দিলি! দেখে নেব তোকে।'
এরপর ইমরান সেখান থেকে চলে গেল। তাকে কেউ আটকানোর প্রয়োজনও বোধ করল না।
সবটাই আরহান দেখছিল। তারও মাথা রাগে টগবগ করে ফুটছিল।
এরপর মিসেস চৌধুরী ইনায়াকে সোফায় বসিয়ে দিলেন। আর নিজে গিয়ে তার স্বামীর পাশে বসলেন। তার স্বামী তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনিও স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
মিস্টার চৌধুরী বললেন,
— কাজী সাহেব, আপনি আপনার কাজ শুরু করুন।
কাজী সাহেব নিজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বের করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন।
— পাত্র কোথায়?
— এই তো আমার ছেলে।
তখনও আরহান একটি কথাও বলল না। চুপচাপ বসে আছে সে।
কাজী সাহেব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সামনে রেখে আরহানের দিকে তাকালেন।
— বাবা, আপনার নাম বলুন।
— আরহান চৌধুরী।
কাজী সাহেব নাম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য কাগজে লিখে নিলেন। এরপর ইনায়ার পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্যও জেনে নিলেন।
সবকিছু লেখা শেষ হলে কাজী সাহেব বিয়ের দেনমোহর নিয়ে কথা তুললেন।
— আচ্ছা, দেনমোহর কত নির্ধারণ করা হয়েছে?
মিস্টার চৌধুরী এবার ছেলের দিকে তাকালেন। কিন্তু আরহানের মুখে কোনো কথা নেই। সে যেন এই বিয়ের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে চায়।
ফাতেমা চৌধুরী স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আমরা দেনমোহর হিসেবে পঞ্চাশ লাখ টাকা নির্ধারণ করতে চাই।
কাজী সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
— ঠিক আছে। তবে দেনমোহরের কতটুকু তাৎক্ষণিক এবং কতটুকু বাকি থাকবে, সেটাও স্পষ্ট করে নির্ধারণ করতে হবে।
মিস্টার চৌধুরী এবার বললেন,
— পঞ্চাশ লাখ টাকার মধ্যে দশ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে এবং বাকি চল্লিশ লাখ টাকা বকেয়া থাকবে। সবকিছু কাবিননামায় স্পষ্টভাবে লিখে দিন।
কাজী সাহেব সম্মতি জানিয়ে কাগজে বিষয়গুলো লিখতে শুরু করলেন।
ঠিক তখনই আরহান বলে উঠল,
— বিয়েটা আমি করছি, দেনমোহরও আমি ঠিক করব।
কাজী সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বলুন বাবা, কত ঠিক করব?
আরহান এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
— তালাক!
কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই আরহানের দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ঘরে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা।
আরহান শান্ত গলায় আবারও বলল,
— দেনমোহর হিসেবে তালাক লিখুন। এটাই আমার দেনমোহর, নয়তো এই বিয়েতে আমার মত নেই।
মিসেস চৌধুরী বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন। বিস্ময় আর রাগে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
— কী সব বলছিস এগুলো? এমন কথা কীভাবে বলিস তুই? তুই কি বিয়ের মতো একটা পবিত্র সম্পর্ককে নিয়ে তামাশা করছিস?
আরহান এবার মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত কঠোরতা।
— তামাশা আমার সাথে তুমি করছো, মা। কিভাবে পারছো করতে?
মিস্টার চৌধুরী এবার ছেলেকে বললেন,
— মার সাথে কিভাবে কথা বলছো তুমি? কাজী সাহেব আমরা যা বলেছি তাই হবে, দেখি ও কি করতে পারে।
আরহান কিছু বললো না শুধু চোখ বড় বড় করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইলো।
অন্যদিকে সোফায় বসে থাকা ইনায়ার চোখ দুটো ধীরে ধীরে ছলছল করে উঠল। এত বড় অপমান, এমন অপমান সে কখনো কল্পনাও করেনি, একবার তার সর্বনাশ করলো এই নরপিশাচটা আর এবার, এবার এতো জঘন্য ভাবে অপমান করলো। তবুও মুখ ফুটে কিছু বলল না মেয়েটি। শুধু নীরবে নিজের হাত দুটো মুঠো করে বসে রইল।
ইনায়ার এমন অবস্থা দেখে ফাতেমা চৌধুরীর বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি মেয়েটার পাশে গিয়ে বসলেন। ইনায়ার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে মমতাভরা কণ্ঠে বললেন,
— মা, তুই মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি তো তোর পাশে।
ইনায়া কোনো কথা বলল না। শুধু মৃদু মাথা নাড়ল।
এদিকে মিস্টার চৌধুরী এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বললেন,
— আরহান, অনেক হয়েছে। এবার চুপচাপ বিয়েটা সম্পন্ন করো। আমাদের সম্মানের কথা অন্তত একবার ভাবো।
আরহান বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদিলও পুরো পরিস্থিতি নীরবে পর্যবেক্ষণ করছে। সে জানে, আরহানের রাগ এখন কোন পর্যায়ে আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে কিছু বলার সাহস তারও হচ্ছে না।
কাজী সাহেব কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বললেন,
— বাবা, বিয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুজনেরই সম্মতি থাকা প্রয়োজন। আমি আগে কনের মতামতটা জানতে চাই।
কথাটা শুনে আরহান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
কাজী সাহেব এবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন,
— মা, তুমি কি এই বিয়েতে রাজি আছো?
ইনায়া একবার ফাতেমা চৌধুরীর দিকে তাকাল। এরপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে বলল,
— জি।
তার কণ্ঠটা এতটাই ক্ষীণ ছিল যে, কথাটা শুনতে সবাইকে মনোযোগ দিতে হলো।
কাজী সাহেব আবার আরহানের দিকে তাকালেন।
— বাবা, এবার আপনার সম্মতিটা জানতে চাই। আপনি কি এই বিয়েতে রাজি?
আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একবার ইনায়ার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু তার দৃষ্টি এড়াল না। কিন্তু পরক্ষণেই সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
— জি, রাজি।
কথাটা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না। যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো একটা সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে সে।
ফাতেমা চৌধুরী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
কাজী সাহেব এবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এগিয়ে নিতে লাগলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে দুজনের সম্মতি ও স্বাক্ষর নেওয়া হলো। এরপর নিয়ম অনুযায়ী বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হলো।
সবশেষে কাজী সাহেব আরহানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কবুল বলুন, বাবা।
আরহান একবার চোখ বন্ধ করল। তারপর বিরক্তি মিশ্রিত গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— কবুল।
কাজী সাহেব এবার ইনায়ার দিকে তাকালেন।
— মা, তুমি কবুল বলো।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখলেও এবার তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে ধীরে বলল,
— কবুল।
কাজী সাহেব আবারও জিজ্ঞেস করলেন। ইনায়া দ্বিতীয়বারও কবুল বলল। তৃতীয়বার প্রশ্ন করা হলে মেয়েটি চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো বলল,
— কবুল।
অতঃপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কাজী সাহেব বিয়েটি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেন।
— আলহামদুলিল্লাহ! আপনাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আজ থেকে আপনারা স্বামী-স্ত্রী।
কথাটা শুনে ফাতেমা চৌধুরীর মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। তিনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। মিস্টার চৌধুরীও স্বস্তি পেলেন।
কিন্তু দুজন মানুষের মনের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
একজনের কাছে এই বিয়ে ছিল নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেনে নেওয়া একটা সিদ্ধান্ত, আর অন্যজনের কাছে ছিল ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস।
আরহান নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াল। একবারও ইনায়ার দিকে না তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল।
— আদিল, গাড়ি বের কর।
আদিল কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
— স্যার, এখন?
— আমি কি তোকে সময় জিজ্ঞেস করেছি?
আরহানের ধমকে আদিল আর কোনো কথা বলল না।
অন্যদিকে ফাতেমা চৌধুরী ছেলের এমন আচরণে বিরক্ত হয়ে বললেন,
— আরহান! এইমাত্র তোর বিয়ে হলো। আর তুই এখনই কোথায় যাচ্ছিস?
আরহান মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
— মা, তোমার ইচ্ছায় বিয়েটা করেছি। এবার অন্তত আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
কথাটা বলেই সে সেখান থেকে চলে গেল।
ফাতেমা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর ইনায়ার কাছে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— মন খারাপ করিস না মা। ও একটু এমনই। সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ইনায়া মৃদু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেবও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিদায় নিলেন।
চৌধুরী বাড়ির সেই ঘরটায় তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
আজ একই ছাদের নিচে দুটি মানুষের নতুন সম্পর্ক তৈরি হলো। অথচ সেই সম্পর্কের শুরুতেই একজনের মনে জমে আছে একরাশ ঘৃণা, আর অন্যজনের চোখে অজস্র অভিমান।
ভাগ্য কি সত্যিই তাদের এক করেছে, নাকি নতুন কোনো ঝড়ের সূচনা হলো?
তা সময়ই বলে দেবে...
চলবে...!🌸✨
