★ ঘৃণার নাম তুমি ★
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ৩ : ঠাঁই কোথায়?
আরহান নিতান্তই চিন্তায় পড়ে গেল। এটা কী হলো? এখনো কোনো নিউজ বের হচ্ছে না কেন? খান-হাওলাদাররা এবার কী করতে চাইছে? চিন্তায় চিন্তায় আরহানের মাথাটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
এর মানে, ওই মেয়েটা যা বলেছে... না, না! আমি কী করে ওইসব করতে পারি? আমার পরিবার আমাকে মেয়েদের সম্মান দিতে শিখিয়েছে। মেয়েটার কথা সত্যি হলে সে আমার কাছ থেকে টাকা নেবে কেন? মেয়েটা কি কোনো...
ভাবনার মাঝেই আদিল চিন্তিত মুখে রুমে এসে বলল—
– স্যার!
আরহান চমকে উঠে বলল—
– কী হয়েছে?
আদিল নিজের হাতে থাকা ট্যাবটা আরহানের হাতে দিয়ে বলল—
– দেখুন আপনি।
স্ক্রিনে বড় বড় করে লেখা—
"ভালো মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক জানোয়ারের পর্দা ফাঁস! রাতে জোরপূর্বক একটি মেয়ের সম্মানহানিতে মেতে উঠেছেন সকলের হিরো, নামকরা সফল ব্যবসায়ী মিস্টার আরহান চৌধুরী!"
– ছিঃ! এত জঘন্য ফন্দি এঁটেছিল সবাই!
– স্যার, এবার উপায়?
আরহান কিছু বলতে যাবে, এর মধ্যেই নিজের বাবার কল দেখতে পেল। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিস্টার চৌধুরী বলে উঠলেন—
– আরহান, এটা কী?
– আপনি কি বুঝতে পারছেন না, কী হতে পারে এটা?
– তোমার কাছ থেকেই জানতে চেয়েছি আমি। শিগগিরই বাড়ি আসো। আমরা এটা নিয়ে কথা বলব।
আরহান ফোন কেটে আদিলকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। তার মাথা রাগে আগুন হয়ে আছে। তার সামনে শুধু ভেসে আসছে ইনায়ার মুখটি।
একটু আগেও এই মেয়েটার জন্য নিজের চরিত্রে দাগ লাগার কথা ভাবছিল সে। যে মেয়েরা নিজের শরীর নিয়ে ব্যবসা করে, তাদের কি বেঁচে থাকার অধিকার আছে? ওই মেয়েটার সঙ্গে কী করা উচিত তার? ওকে সত্যিই কি...
ভাবনার মধ্যেই আদিল বলে উঠল—
– স্যার, স্যার?
– হ্যাঁ, বলো?
– আমরা এখন কী করব? সবাই তো ফোন দিচ্ছেন।
– কে কে দিয়েছে?
– আমাদের সঙ্গে নতুন চুক্তি করা বিশ্বাস পরিবার কল দিয়ে যাচ্ছেন।
ফোনটা দেখিয়ে আদিল আবার বলল—
– এই দেখুন, আবার দিচ্ছে! কী করব স্যার?
– ধরার দরকার নেই। আমার ভালো লাগছে না।
আরহান বাড়িতে পৌঁছে গেল। গাড়ি থেকে নেমে সোজা ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। সামনেই বসে আছেন মিস্টার এবং মিসেস চৌধুরী।
আরহানকে দেখে মিসেস চৌধুরী বলে উঠলেন—
– আমরা তোমাকে এই শিক্ষা দিয়েছি?
– আমি তো কিছু করিনি।
– কিছু করোনি? এই ভিডিও তুমি দেখোনি?
– মা, তুমি কি খান আর হাওলাদার পরিবারকে চেনো না? তারা কতবার আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে, বলো? তুমি কি জানো না মা?
– আমি জানি না, জানতেও চাই না। তুমি একটা মেয়ের সঙ্গে... ছিঃ!
– মা, আমাকে ভুল বুঝছো। এটা এডিট করা, আমি শিওর। আমাকে ফাঁসাতে এবার এত মজবুত প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে।
এবার মিস্টার চৌধুরী বলে উঠলেন—
– যাই হোক, তোমার সতর্ক থাকা উচিত ছিল। তুমি এই ভুল করলে কীভাবে?
আরহান নিজের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে নিল।
মিস্টার চৌধুরী আবার বললেন—
– এত বদনাম কীভাবে সরাব?
– আমি সরিয়ে ফেলব।
মিসেস চৌধুরী বলে উঠলেন—
– না, ক্ষমতার বলে আর কিছু করবে না কেউ। আরহান, এটা তোমার ভুল। এর মাশুল তোমাকে দিতে হবে।
আরহান অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। কিছু বলবে, এর মধ্যেই মিসেস চৌধুরী বলে উঠলেন—
– আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে আমাদের সম্মানও ঠিক হবে আর মেয়েটার সম্মানটাও পুনরায় ফিরে আসবে।
– মানে মা?
– মানে এটাই, তুমি ওই মেয়েটাকে বিয়ে করবে।
– কী? ইম্পসিবল! আমি কখনোই ওই বাজারের মেয়েটাকে বিয়ে করব না।
– ঠিকমতো কথা বলো! কী বলছো? আমি ভিডিও দেখে কথা বলছি।
– মা, ওইটা এডিট করা। তুমি কেন বুঝছো না?
– তুই কেন বুঝছিস না? নয়তো তোর রেপুটেশন কীভাবে ঠিক করবি বল? বিয়ে করে ওকে স্ত্রীর মর্যাদা দিবি সবার সামনে। সবাইকে জানাবি, তুই মেয়েটির হাসব্যান্ড।
আরহান আর কিছু বলল না।
মিসেস চৌধুরী কড়া নির্দেশ দিলেন—
– মেয়েটিকে আমাদের উত্তরার বাড়িতে নিয়ে আসবি। আমরা এখন সেখানে যাচ্ছি।
আরহান কারও কথা না শুনলেও তার মায়ের একটা আদেশও সে অমান্য করে না। কেননা, মাকে সে পৃথিবীর সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসে।
– আদিল, গাড়ি বের করো।
– জি, স্যার।
ইনায়ার সৎ মা নিজের মনে মনে বলছে—
"এই লোকটা টিভিটা কেন চালু করছে না? এতক্ষণে ইনায়া তো হেডলাইনে থাকার কথা। উফ! কী যে করি, কী যে করি!"
হঠাৎ প্রীতি চিৎকার দিয়ে উঠল—
– ও আল্লাহ! এটা কী দেখছি!
সবাই প্রীতির দিকে তাকাল। প্রীতি কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা তার মায়ের কাছে দিল এবং নিজের চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা পানি বিসর্জন দিল। মিস্টার ফারুক শিকদার তাকিয়ে আছেন মেয়ের পানে।
মিসেস শিকদার হাতে ফোনটা নিয়ে এমন ভান করলেন, যেন কিছুই হয়নি! কিন্তু মনে মনে তিনি খুবই খুশি। তাঁর মনের আশা যে এবার পূরণ হবে!
ফারুক শিকদার এবার উঠে এলেন। বললেন—
– ফোনটা আমার কাছে দাও।
– কি... কী... কিছু না তো। তুমি খবরের কাগজ পড়ো গো।
– তোমাকে কী বলেছি আমি?
এরপর ফোনটা তাঁর হাতে দিলেন। স্ক্রিনে তাকাতেই চোখ লাল বর্ণ ধারণ করল। তিনি ছুটে চললেন ওই অন্ধকার নরকখানাটার দিকে।
– তুমি কি ওর ঠিকানা জানো, আদিল?
– না স্যার, আমি শুনতে পারিনি অতটা।
– আমরা এখন এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে ওই মেয়েটাকে খুঁজে বের করব?
– স্যার, আপনার অফিস থেকে ওর বাসায় যেতে ভাড়া লাগে ৩০০ টাকা।
– আচ্ছা, তাহলে ৩০০ টাকার দূরত্বের মধ্যেই তো ওর বাসা হবে!
– জি স্যার, এটাই।
এরপর সেই অনুযায়ী গাড়ি সামনের দিকে এগোতে লাগল।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। চারপাশ পুরো অন্ধকার হয়ে গেছে। আশপাশে কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। এত বৃষ্টি পড়ছে যে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য।
এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলছে আরহান চৌধুরীর দামি নীল রঙের গাড়িটি।
ইনায়া একটু একটু করে চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু ঠিক তখনই কেউ একজন তার হাত ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে একের পর এক চড় মারতে লাগল।
ইনায়া কিছুই বুঝতে পারছিল না। ভালোভাবে চোখ মেলে তাকাতেই দেখল, তার বাবা প্রচণ্ড ক্ষেপে আছেন।
– অলক্ষ্মী! বেশ্যা! তুই সারারাত নিজের সর্বনাশ করে বাসায় এসেছিস। তুই এতটা নিচে নেমে গেছিস! আমি আজ তোকে মেরেই ফেলব!
এটা বলেই মিস্টার শিকদার নিজের মেয়ের গলা চেপে ধরলেন। ইনায়া শ্বাস নিতে পারছিল না। ঠিক তখনই তার সৎ ভাই বাবাকে থামিয়ে বলল—
– মেরে ফেললে আপনাকে জেল খাটতে হবে।
– দরকার হলে তাই হবে, কিন্তু ওকে মেরে ফেলব!
– থামুন! আপনি রুমে যান, আমি ওকে দেখে নিচ্ছি।
– না, আমি ওকে এই বাড়িতে রাখব না।
ইনায়া কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে সরল মনেই জিজ্ঞাসা করল—
– বাবা, কী হয়েছে? এমন করছো কেন?
এটা শুনতেই ইনায়ার সৎ ভাই রিফাত একটা চড় মারল।
– খুব নাটক করছিস?
এটা বলেই চুলের মুঠি ধরে সিঁড়ি থেকে টানতে টানতে ইনায়াকে নিচে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল। এরপর বেল্ট বের করে ইনায়াকে একের পর এক আঘাত করতে লাগল।
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল—
– ভাইয়া, আর মারবেন না! কী করেছি আমি? থামুন!
এবার মিসেস শিকদার বলে উঠলেন—
– ওরে থাম! মরে যাবে। তারপর তো জেলে যাবি তুই। থাম বাবা!
– না, ওর জায়গা এই ঘরে নেই।
এই বলে এত ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে একা মেয়েটাকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়ির বাইরে ফেলে দেওয়া হলো।
এত কিছুর পরেও ইনায়া তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল—
– বাবা?
– খবরদার! আমাকে বাবা ডাকবি না তুই। আমার সামনে আর আসবি না। আমার সামনে আসলে আমার মরা মুখ দেখবি! তুই আমার মেয়ে না। চলে যা!
মিস্টার শিকদার ঘরে চলে গেলেন।
তিনি চলে যেতেই শয়তানি হাসি দিল ইনায়ার সৎ মা, ভাই ও বোন। এরপর দরজা আটকে দিল।
ইনায়া যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল। বিশ্বাসই হচ্ছে না তার বাবা...
কোথায় যাবে সে? কী করবে? কোথায় মিলবে তার ঠাঁই? এই ঝড়ের মধ্যে কোথায় আশ্রয় নেবে? কে তাকে আশ্রয় দেবে?
এসব ভাবতে ভাবতেই হাঁটছিল সে। সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। সবাই তার সঙ্গে এভাবে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করল! যেন সে মানুষ না, একটা মেয়ে না, একটা কুকুর!
হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার সর্বনাশের কথা। সে বাসায় এসে গোসলও করতে পারেনি। তার সামনে সেই ভয়ংকর রাতের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠতে থাকল।
এরপর পাগলের মতো নিজের শরীর থেকে সেই অসহ্য স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল। জোরে জোরে কাঁদতে লাগল সে।
এমন সময় দূর থেকে তার চোখে একটা গাড়ির আলো এসে পড়ল। ইনায়া তা দেখে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে গেল...
চলবে...! 🌸✨
