★ ঘৃণার নাম তুমি ★
Writer : Noor Islam.
পর্ব - ২ : আপনজনের মুখোশে শত্রু
মুষ্টিবদ্ধ হাত দিয়ে আরহান সজোরে দেয়ালে একটা ঘুষি মারে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত দিয়ে রক্ত বের হয়ে যায়। রাগে বলে, আল্লাহকে ধন্যবাদ দাও, কারণ তুমি একটা মেয়ে। এই বলে সে ফোন বের করে কল দিয়ে বলে –
"আদিল, একবার আমার রুমে এসো তো।"
ইনায়া নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক কিছু বলতে চায়, কিন্তু সে বলে না।
আরহান দরজা খুলে বাইরে আসে। এতক্ষণে আদিলও চলে আসে।
– জি স্যার, বলুন?
– দেখো তো ওর কত টাকা লাগবে, টাকাটা দিয়ে আমার রুম থেকে বের করে দাও।
আদিল বিস্মিত হয়ে – "কাকে স্যার?"
– শোনেন মিস্টার, আপনার টাকা আছে বলে আপনি অহংকারে মাটিতে পা দেবেন না, মানুষকে মানুষ ভাববেন না—এমন স্বভাব বাদ দেন, বুঝেছেন?
– তুমি আমাকে শেখাবে?
– দরকার পড়লে তাই করব।
– একটা বাজারের মেয়ের মুখে এই কথা শোভা পায় না।
এবার ইনায়ার চোখ আবারও পানিতে ভরে গেল। কিছু বলতে যাবে, এর মধ্যেই আরহান রুমে ঢুকে দরজা দিয়ে দেয়। ইনায়া কেবল সেদিকে তাকিয়ে থাকে।
– এত অল্প বয়সে নিজেকে এই পথে নামিয়ে দিয়েছো?
– এই পথ মানে?
– তুমি যে পথে আছো, তার কথা বলছি।
– শুনুন, কারও ব্যাপারে না জেনে কথা বলতে নেই।
এটা বলেই ইনায়া ভুল পথে হাঁটা শুরু করায় আদিল বলে ওঠে—
"এমনভাবে অভিনয় করছো দেখে মনে হচ্ছে, এইসব হোটেলে তুমি নতুন এসেছো!"
বলেই জোরে জোরে হাসতে লাগল। ইনায়া নির্বাক। মনে মনে বলে, "না ইনায়া, এরা একজনও মানুষ না। এরা মানুষ হতে পারে না।"
আদিল জিজ্ঞাসা করল—
– বলো, কত টাকা লাগবে তোমার?
– একটা টাকাও লাগবে না। আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার পথ দেখিয়ে দেন, আমি চলে যেতে পারব।
আদিল ভ্রু কুঁচকে বলল—
"ঠিক আছো? কী বলছো জানো? টাকা লাগবে না, তাহলে স্যারের সাথে কোন উদ্দেশ্যে রাত কাটালে?"
– আপনার স্যার...
এতটুকু বলে ইনায়া থেমে গেল। এতক্ষণে সে বুঝে গেছে, তারা অমানুষ।
বলল—
"দেখুন, আমি এখানে থাকতে চাই না। আমাকে বের হওয়ার রাস্তাটা বলে দিন, দয়া করে।"
আদিল মনে মনে ভাবল, "এখন এত কিসের অভিনয় করে রে বাবা!"
কিন্তু মুখে বলল—
– চলো।
হোটেল থেকে বের হয়ে একটা সিএনজি দাঁড় করায় ইনায়া। সিএনজিচালককে ঠিকানা বলায় সে বলে ওঠে—
– যাব আপা, কিন্তু ৫০ টাকা বেশি দিতে হবে।
ইনায়া বলে—
– কেন?
– তাহলে দুঃখিত আপা, আমি যাব না।
– চলেন ভাইয়া, প্লিজ। আপনাকে অনুরোধ করছি।
– আমি ৩০০ টাকাতেই যাব, আপা।
ইনায়া কিছু বলে না। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখে, আদিল সেখানে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ইতস্তত করে আদিলের কাছে এসে ইনায়া বলে—
"ভাইয়া, আমাকে ৩০০ টাকা দিতে পারবেন? আমার কাছে ভাড়া নেই। আমি আপনাকে পরে শোধ করে দেব, কথা দিচ্ছি।"
আদিল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এরপর পকেট থেকে ৩০০ টাকা বের করে দিল।
– ধন্যবাদ ভাইয়া, ভালো থাকবেন।
এরপর ইনায়া চলে গেল।
আদিল হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। বলে উঠল—
"এমন নিষ্পাপ মেয়ে এই পথে চলতে পারে!"
টানা ৩০ মিনিট গোসল করে আরহান বের হলো। তার মাথায় আগুন আর সঙ্গে একশো প্রশ্ন। কার কাজ এটা? এত জঘন্য কাজ! নিজের সবটা শেষ করে দিলো সে। ওই মেয়েটা, কে ওই মেয়েটা? কী পরিচয়? মেয়েটার ব্যাপারে জানা কি তার ঠিক হবে? মেয়েটা কি আর কখনো তার সামনে আসবে? সে তো দুই পক্ষ থেকেই টাকা পেয়েছে। আচ্ছা, মেয়েটাকে টাকাটা দেওয়া ঠিক হয়েছে?
এরপর তার চোখ যায় বিছানার ওপর। বিছানায় লাল কিছু একটা লেগে আছে।
– এটা কী?
কাছে গিয়ে দেখে—রক্ত।
– রক্ত? কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? বাজারের মেয়েরা ভার্জিন হয় কীভাবে? এর মানে মেয়েটা কি তাকে... না, না, কী ভাবছি আমি? মেয়েটার কথা সত্যি হলে দাঁড়ায়, আমি মেয়েটার সঙ্গে জোরজবরদস্তি করেছি। কিন্তু আমি এমনটা কীভাবে করতে পারি? আমার কেন রাতের কথা কিছু মনে পড়ছে না? কেন?
বলেই আদিলকে কল করল।
– মেয়েটা চলে গেছে?
– জি স্যার।
– কোনো টাকা নিয়েছে?
– হ্যাঁ স্যার, তবে...
কলটা কেটে গেল।
– কী হলো, স্যার কল কেটে দিলেন কেন?
আরহান ফোনটা ছুড়ে মেরে বলল—
"ছি! আরহান, জানিস না ওরা বাজারের মেয়ে। ওদের কাছে টাকাটাই সব। এই রক্ত মেবি অন্য কিছুর... বাজারের মেয়ে।"
ইনায়া তার বাড়িতে ফিরে আসে। ভয়ে তার হাত-পা জমে যাচ্ছে। সে যেন জানে, এখন তার সঙ্গে কী হবে।
ভিতরে ঢুকতেই সবাইকে তার সামনে দেখতে পেল। তার বাবার চোখ রাগে আগুন। মেয়েকে দেখেই তেড়ে এসে পরপর চড় মারতে থাকেন। ইনায়া কান্না করতে থাকে।
– বাবা...
– চুপ! ওই মুখে বাবা বলে ডাকবি না তুই। কীভাবে সারারাত বাড়ির বাইরে থাকতে পারলি?
– বাবা...
আবার চড় পড়ল ইনায়ার গালে।
– আমাকে বাবা ডাকবি না।
ইনায়া বলল—
"আমি প্রীতির সঙ্গে..."
কথা শেষ করার আগেই প্রীতি কান্নার সুরে বলে উঠল—
"দেখেছো ড্যাডি, আমি জানতাম আপা আমাকেই দোষারোপ করবে। তাই তো আমি এসে সত্যিটা আগেই বলেছি।"
ইনায়ার বুঝতে বাকি নেই, এটা তার সৎ মা-বোনের কাজ।
এবার মিস্টার ফারুক শিকদার মেয়েকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যান সেই নরকখানায়। সেই অভিশাপের জায়গাটিতে, সেই দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘরটিতে।
– বাবা, দোহাই লাগে, এমন করো না বাবা। আমি বাঁচব না, প্লিজ।
– মরে যা তুই। এমন অসভ্য মেয়েকে আমি পরিচয় দিতে পারব না।
এই বলে মিস্টার ফারুক দরজা আটকে দেন।
ইনায়া কান্না করতে থাকে আর দরজা ধাক্কাতে থাকে।
– বাবা, প্লিজ খোলো। বাবা, আমার পুরো কথা শোনো। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাবা। বাবা, বাবা, দয়া করো। বাবা, আমি শ্বাস নিতে পারছি না, বাবা।
এরপর সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যায় ইনায়া...
চলবে...! 🌸✨
