#তোর আশিকি#
#পর্ব-তিন
ছেলের সুরক্ষার ব্যাপারে সর্বদা সচেষ্ট থাকা তুষারের কপালে জড়ো হলো চিন্তার বলিরেখা। গত কয়েকমাস ধরেই ইয়াশ বাড়ি থেকে মুভ করতে চাইছে। ছেলেমেয়ে বড় হলে প্রয়োজনের তাগিদে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকবে এটা খুব স্বাভাবিক। তবুও এই সিদ্ধান্তের বেলায় বরাবরই হীনমন্যতায় ভোগে যন্ত্রমানব। তার পেছনে যথোপযুক্ত কারণ রয়েছে অবশ্য। সেই কারণটাই এবার ইয়াশের সা-মনে তুলে ধরলো তুষার,
তুমি ভাবছো তুমি একা থাকতে পারবে, কারণ তুমি এডাল্ট। অথচ প্রত্যেকবার তোমার ঘটানো ক্রিমিন্যাল রেকর্ডগুলো গায়েব করতে যত ধরনের হ্যাসেলে পড়তে হয় সব আমার।
করোনা গায়েব।
কথাটা শোনা মাত্রই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালো তুষার। ইয়াশও তাকিয়ে আছে একই ভাবে। তার চোখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো তেজ।
আই ক্যান ক্যারী মাই ওউন পার্সনালিটি, পাপা। কি দরকার শুধু শুধু রেকর্ড গুলো গায়েব করার?
- আর ইউ্য সিওর?
তুষারের শীতল কণ্ঠে নীরব হুশিয়ার। তাতেও বিন্দুমাত্র পরোয়া করলো না ইয়াশ। উল্টো পাপার দিকে খানিকটা ঝুঁকে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে জবাব দিলো,
- হান্ড্রেড পার্সেন্ট!
রুক্ষস্বরে কথাটা বলেই সশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁ-ড়ালো ইয়াশ। ফ্লোরার পানে নিভে আসা দৃষ্টিদিয়ে বললো,
আ'ম ডান মাম্মা।
তড়িঘড়ি করে ছেলেকে বাঁধ সাধলো ফ্লোরা। উতলা হয়ে বললো,
- সেকি বেটা?কিছুই তো খাওনি তুমি।
মায়ের কথা শুনে নিঃশব্দে ঠোঁট বাকালো প্রিসিলা। বির-ক্তির স্বরে বিড়বিড়ালো,
আদিখ্যেতা।
ইয়াশ সেসব দেখেও দেখলো না। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে
হাতে থাকা ব্ল্যাকবেল্ট ঘড়িটায় একপল চোখ বোলালো সে। তারপর খুব তাড়া দেখিয়ে বললো,
- ইট'স অলরেডি টাইম, আই হ্যাভ টু লিভ মাম্মা।
বলেই আর কোনোদিকে তাকালো না সে। কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে সোজা চলে গেলো গেইট ধরে।
ইয়াশ বেড়িয়ে যেতেই ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো ফ্লোরা। তুষারের দিকে তাকিয়ে মনমরা হয়ে বললো,
- প্রিসির জন্যই বোধ হয় বাড়ি থেকে চলে যেতে চায় ছেলেটা। এখন কি করা যায় বলোতো?
মায়ের কথা শোনা মাত্রই ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁস করে উঠলো প্রিসিলা। ঝাঁঝালো গলায় বললো,
তোমার ছেলের মুড সুইংয়ের জন্য সবসময় আমাকে দায়ী করা বন্ধ করো মাম্মা। নয়তো আমিও বাড়ি থেকে চলে যাবো।
রেখেমেগে হয়তো মাকে আরও কিছু বলতো প্রিসিলা। তার আগেই ওকে থামিয়ে দিলো তুষার। প্রসিদ্ধ গলায় বললো,
মায়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলোনা। শী ইজ মাই ফরএ-ভার লাভ।
পাপার নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা সংযত হলো প্রিসিলা। অভি-মানে ঠোঁট ফুলে আছে তার। নাকের ডগা টুকটুকে লাল। মেয়ের অভিমানী মুখের দিকে চেয়ে প্রলম্বিত শ্বাস ফে-ললো তুষার। এমনিতে খুব একটা হাসে না সে, তবে নি-জের আদরের শেহজাদীর বেলায় সদা হাস্যোজ্জল তার মুখ। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না, মেয়েকে উদ্দেশ্য করে একটা আদর মাখা হাসি উপহার দিলো সে। দু'চোখের তারায় পৃথিবীর সবটুকু আহ্লাদ নিয়ে বললো,
- ইউ্য আর রাইট প্রিন্সেস। প্রিসি ইজ অলওয়েজ রাইট।
তাহলে ইয়াশ কেন সবসময় এমন করে আমার সঙ্গে?
বাবার আদরমাখা সম্মোধনে মেকি আত্মবিশ্বাসের দেও-য়ালটা ঝরঝরিয়ে ভেঙে গেলো প্রিসিলার। অভিমানে এবার কেঁদেই ফেললো মেয়েটা।
ইয়াসের প্রসঙ্গ আসতেই ফের গম্ভীর হয়ে গেলো তুষারের মুখ। ছেলের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে তরল গলায় মেয়েকে বললো,
আজ কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে প্রিন্সেস। রো-হান তোমাকে পিক করবে।
- কিন্তু আজকে কি আছে? স্পেশাল কিছু নাকি?
প্রশ্নটা করতে গিয়ে প্রিসিলার চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের ঢেউ খেলে গেলো। তুষার আর কিছুই বললো না। প্রশ্নের জবা-বটা ফ্লোরাই দিলো তাকে,
তোমার পাপার অ্যামেরিকান ক্লায়েন্ট মি.হেনরি এবং তার ছেলে রিকার্ডো মিলানে এসেছেন। আজ সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে ভিজিস করতে আসবেন ওনারা। ওই-জন্য ছোটখাটো একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে।
মায়ের কথার বিপরীতে প্রিসিলা একটু অপ্রসন্ন গলায় বললো,
- ওনারা আসবেন ভালো কথা। কিন্তু আমাকে কেন থা-কতে বলছো?
- অফকোর্স ইউ্য হ্যাভ টু কো-অপারেট দেম।
পাপার কথায় প্রিসিলার খুশিতে আত্মহারা চেহারাখানি মূহুর্তেই ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করলো। আষাঢ়ের মতো আঁ-ধার ঘনালো দুচোখে। মায়ের পানে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিপাত করে বললো,
- মাম্মা আবারও?
মেয়েকে আশ্বস্ত করে ফ্লোরা বেশ নমনীয় গলায় বললো,
অনেকদিন ধরেই তো কথা চলছে। তাছাড়া ওনারা কতদূর থেকে আসবেন, এতটুকু কনসিডার তো তোমাকে করতেই হবে। কোনোকিছু হওয়া না হওয়াটা তো পরের ব্যাপার।
এবারে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো প্রিসিলা। ফর্সা গো-লাপ তুলতুলে গালের উপর মুক্তোদানার মতো টুপটুপ গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুজল। সেটুকু হাতের পিঠে মুছতে মুছ-তেই বাইরের দিকে পা বাড়ালো মেয়েটা। যেতে যেতেই মা বাবাকে শুনিয়ে স্বগোতক্তি করলো সে,
ইট'স অল এবাউট ইয়াশ ইউভান। শুধুমাত্র ইয়াশের জন্যই আমাকে এতো দূরে পাঠিয়ে দিতে চাও তোমরা।
প্রিসিলা কাঁদতে কাঁদতে বেড়িয়ে গেলে রোহানের নাম্বারে ডায়াল করলো তুষার। ওপাশ থেকে কল রিসিভ করতেই ধ্বনিত হলো তার রাশভারি কণ্ঠের আদেশ,
মাই প্রিন্সেস ইজ অন হার ওয়ে, অলওয়েজ কিপ হার সেইফ।
ওদিকে মেয়ের যাওয়ার পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তপ্তজলে ভরে উঠলো ফ্লোরার চোখের কোটর। অতর্কিতে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। ফ্লোরাকে কাঁদতে দেখে ভেতর ভেতর হকচকালো তুষার। অথচ নিরুত্তাপ স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
তুমি কেন কাঁদছো? তোমাকে তো আর কোথাও পাঠাচ্ছিনা।
স্বামীর কথার পাছে ঝেঁঝে উঠলো ফ্লোরা। অশ্রুরুদ্ধ স্বরে আওড়ালো,
চুপ করো তুমি পাষাণ লোক। মেয়েটা আমার সবে উনিশে পা দিয়েছে। এখনই এভাবে বিয়ে দিলে ওর ভবি-ষ্যত কি হবে?
- আমার মেয়ের ভবিষ্যত আমাকেই ভাবতে দাও।
তুষারের একরোখা প্রত্যুত্তর।
তাই বলে এভাবে?
- তুমি ভালো করেই জানো ইয়াশ প্রিসিলাকে আমাদের সঙ্গে মানতে পারেনা। মানতে না পারার সেই ক্ষুদ্র ছেলে-মানুষী ঈর্ষাটুকু এখন বড়সড় ক্ষোভে পরিনত হয়েছে।
আর আমি কখনোই চাইবো না সেটা ব্রাস্ট হোক।
তাহলে ইয়াশকে দূরে সরিয়ে দাও। ও তো যথেষ্ট ম্যাচিউর।
সম্ভব নয়।
তুষারের কাটকাট জবাব। বিপরীতে ফ্লোরা বললো,
ঠিক আছে তবে প্রিসিকে ডর্মে পাঠিয়ে দাও।
- তুষারের জাওয়াদের মেয়ে কখনো ডর্মে থাকবেনা।
তুষারের উত্তর শুনে পুরোপুরি ভেঙে পড়লো ফ্লোরা। ত্য-ক্ত গলায় বললো,
-- এই সমস্যার আর কি কোনো সমাধান নেই?
এবারে চেয়ার ছেড়ে ফ্লোরার নিকট এগিয়ে এলো তুষার। আলতো হাতে ওর সর্পিল সোনালী চুলগুলো কানের পে-ছনে গুঁজে দিয়ে চোখের কোলে জমে থাকা সবটুকু জল ঠোঁট দিয়ে শুষে নিলো সে। মূহুর্তেই শিউরে উঠলো রুশর-মণী। কান্নাকাটি থেমে গেলো তার। এদিকওদিক চোখ বু-লিয়ে লাজুকলতার ন্যায় মিয়িয়ে যাওয়া গলায় বললো,
- কি করছো? আশেপাশে মাদামরা আছেন।
থাকুক।
কয়েকমূহুর্ত অতিবাহিত গাঢ় নৈঃশব্দ্যে। তারপর ফ্লোরা একটু ঠিকঠাক হলে তুষার নিজে থেকেই বললো,
- হি ইজ আ পপুলার আর্টিস্ট ফ্রম আমেরিকা। ভ্যানিসে আমার কিছু আর্কিটেকের কাজের জন্য হায়ার করেছি-লাম ছেলেটাকে। এ্যান্ড ইউ নো হোয়াট? হি ইজ বেস্ট। আর তুমি তো জানোই তোমার মেয়ে ড্রিম জব হলো আর্টওয়ার্ক। ও যদি জানতে পারে ওর ফেবরেট আর্টিস্ট ওর লাইফপার্টনার হতে চলেছে তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে বুঝতে পারছো?
- বুঝেছি।
আনত স্বরে শব্দটা উচ্চারণ করলো ফ্লোরা। বিপরীতে ওকে বুক এনে ফেললো তুষার। প্রেয়সীর সোনালী চুলের ভাঁজে আবেশিত আঙুল বুলিয়ে দিয়ে বললো,
- একটু ভরসা রাখো জান। আ'ল মেইক দ্যা বেস্ট ডি-সিশন ফর মাই গার্ল।
শীতের ঘ্রান বুকে নিয়ে ধরনীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অক্টোবর। ক্যালেন্ডারের পাতায় বিশুদ্ধতম মাস। বাং-লায় মাস দিন হিসেব করলে এখন মধ্য শরৎ কাল। পুরো বছর ঘুরে এই অক্টোবরে এসে অদ্ভুত রঙিন হয়ে ওঠে পৃ-থিবী। একপ্রকার ঈষদুষ্ণ হিমেল স্নিগ্ধ হাওয়া সর্বক্ষণ আদর বুলিয়ে যায় শরীরে। সূর্যতেজ ম্লান হয়ে আসে। শীতাকাঙ্খায় উন্মুখ হয়ে থাকা প্রকৃতি তখন আরও রঙিন আরও অপরূপ রূপে সাজে।
প্রকৃতির অম্লান রূপে বিভোর হয়ে কলেজের ক্যাম্পাস ধরে নিঃশব্দে হাঁটছিল প্রিসিলা। পায়ের তলায় কোমল গালিচার মতো বিছিয়ে আছে লাল, কমলা আর হলুদাভরঙের শুকনো ম্যাপল পাতার বহর। ঈশ্বর প্রদত্ত এই অপরূপ সুন্দর চিত্রকর্মকে পায়ে মাড়াতে বড্ড কষ্টই হচ্ছিল
তাইতো ক্লাসের সময় শেষ হয়ে যাওয়া সত্বেও পা টিপেটিপে অতি সন্তোর্পনে এগুচ্ছে সে। প্রি-সিলা শৈল্পিক মনের মানুষ। শিল্পের অবমাননা সে কখ-নোই করেনা। হোক তা মানুষের তৈরি কিংবা ঈশ্বরের।
ঠিক তখনই পিছন থেকে কারোর ছুটে আসার শব্দে বি-ভ্রম কেটে গেলো প্রিসিলার। সংবিৎ ফিরে পেতেই ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো সমবয়সী একটা অচেনা কোঁকড়া চুলের শ্যামবরণ মেয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে ওর দিকে। প্রিসিলা থেমে যেতেই হাত নাড়িয়ে ইশারা করলো মেয়েটা,
- হেই দেয়ার।
এবারে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ালো প্রিসিলা। স্পষ্ট ইংরে-জিতে একসেন্টে বললো,
- হাই।
মেয়েটা কাছাকাছি এসেই থমকে গেলো। ছুটতে গিয়ে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে তার। প্রিসিলার চোখে কৌতুহ-লের জোয়ার। মেয়েটাকে দেখা মাত্রই বলে সে উঠলো,
- আর ইউ্য ফ্রেশার?
প্রিসিলার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে জোরে মাথা নাড়ালো সেই ভিনদেশি আগন্তুক। একগাল হেসে জবাব দিলো,
হোলা, আ'ম নোভা। ফ্রম জুয়োলজি ডিপার্টমেন্ট। লা-স্ট উইকে এই কলেজে ট্রান্সফার হয়েছি। এ্যান্ড ইউ্য?
- আর ইউ্য স্প্যানিস?
নোভার প্রশ্নের পিঠে উল্টো প্রশ্ন করে বসলো প্রিসিলা। এবারও হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো মেয়েটা। বিপরীতে এক চিলতে তরল হাসি ফেরত দিলো প্রিসিলা। সেই হাসির ঢেউয়ে ফর্সা গালের মধ্যিখানে মিষ্টি দুটো টোল উদয় হলো তার। যার সৌন্দর্যে বিমত্ত হয়ে আনমনেই একটা মন্ত্রমুগ্ধকর শব্দ ছিটকে বেড়িয়ে এলো নোভার মুখ থেকে,
- ওয়াও!
-মাই সেলফ প্রিসিলা। প্রিসিলা জাওয়াদ। ফ্রম ফাইন আর্টস।
এতোক্ষণে নিজের সম্মন্ধে মুখ খুললো প্রিসিলা। নোভা হেসে ফেলে বললো,
আর ইউ্য রাশান?
-, নো আ'ম নট।
- তাহলে?
এবার দু'জনেই পায়ে পা মিলিয়ে ক্যাম্পাস ধরে মূল ভব-নের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো ওরা। হাটতে হাটতেই উদাসীন গলায় বলতে লাগলো প্রিসিলা,
এ্যাক্সুয়ালী আ'ম আ মিক্সড মিক্সড বেবি। আমার পা-পারও সেম কন্ডিশন। ড্যাড ফ্রম রাশিয়া আর মম বাংলা-দেশ। আর আমার মম রাশিয়ান আর পাপা ওয়াজ মি-ক্সড। দ্যাটস হোয়াই আ'ম মিক্সড মিক্সিড।
প্রিসিলার জন্ম ইতিহাস শুনে না হেসে পারলো না নোভা। সপ্রশংস গলায় বললো,
- সো ইন্টারেস্টিং। এই জন্যই তুমি এতো অদ্ভুত সুন্দর।
