#তোর _আশিকী
পর্ব-দুই
মনেমনে তাচ্ছিল্যের স্বরে কথাটা আওড়ালো প্রিসিলা। তারপর দৃষ্টি তুলে মাদাম দু'টোকে ঝাঁঝিয়ে কিছু বলার প্রস্তুতি নিতেই বাইরে থেকে অন্য একজন এসে সবিনয়ে কুর্নিশ জানালো তাকে,
গুড মর্নিং প্রিসিলা ম্যাম! স্যার আপনাকে ব্রেকফা-স্টের জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন।
মহিলা ভৃত্যটির বিনীত বাক্যে মস্তিষ্ক তেতে উঠলো প্রিসি-লার। মূহুর্তেই রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো,
জুতা মেরে গরুদান করা হচ্ছে?
ঠিক বুঝতে পারিনি ম্যাম। যদি একটু ভেঙে বলতেন?
তোমার স্যারের অতি আদরের সুপুত্র আজকেও আমার ঘরে এসে ভাংচুর করেছে। আগে এর ক্ষতিপূরন দিতে বলো তারপর ব্রেকফাস্ট।
ভদ্রমহিলা মুখ কাচুমাচু করে প্রশ্নটা করতেই রাগত গলায় জবাব দিলো প্রিসিলা। বিপরীতে আবারও ভেসে এলো অতি সংবেদনশীল অনুনয়।
স্যার বলেছেন ব্রেকফাস্টের টেবিলে বিষয়টা দেখবেন।
আমি কোনো দেখাদেখিতে নেই।
মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো প্রিসিলা। অবশ্য তার এহেন অভব্য একগুঁয়ে জবাবে ভড়কালো না রমণী। এ বাড়ির সকল ভৃত্যরাই অভ্যস্ত এসব নিত্যনৈমত্তিক না-টকে। যার দরুন সহাস্যে কৌশলী এক বাক্য ছুড়লো সে,
আপনি না গেলে হয়তো ইয়ং মাস্টার সবার চোখে ধুলো দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমান করে বেড়িয়ে যাবে। তাহলেতো আজকেও আপনার ক্ষতিপূরন নেওয়া হবেনা ম্যাম!
- অসম্ভব! আমি এক্ষুনি আসছি।
নিচে ব্রেকফার্স্টের টেবিল থেকে ভেসে আসছে নাইফ আর কাটা চামচের টুংটাং আওয়াজ। তুষার খুব মন দি-যে প্রাতঃরাশ সারছে। পাশেই দাঁড়িয়ে ফ্লোরা এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে স্বামীকে। খেতে খেতেই একবার হাত ঘড়িতে চোখ বোলালো তুষার, তারপর দৃষ্টি তুলে চাইলো সিঁড়ির দিকে। গোটা করিডোরের এমাথা থেকে ওমাথা চোখ বুলিয়ে প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
ইট'স অলরেডি টেন থার্টি। তোমার ছেলে মেয়েরা এখনো ঘুম থেকেই উঠতে পারেনি। এতোটা কেয়ারলেস হলে চলে?
ফ্লোরা তখনও স্বামীর পাতে অ্যাভোকাডো সার্ভ করছিল। তুষারের কথায় হঠাৎই দোতলার করিডোরে চোখ গেলো তার। দৃষ্টি সীমানায় কারোর আগমনী পদচ্ছাপ ভেসে উঠতেই মৃদু হেসে জবাব দিলো,
ওই তো ইয়াশ আসছে।
তারপর আবারও প্লেটে মনোযোগ দিয়ে বললো,
মাশরুমের স্যুপ করেছি, ব্রেড টোস্টের সঙ্গে ভালো যায়। নেবে একটু?
বিপরীতে তুষার চামচ আর ছুড়ি দিয়ে অমলেট কাটতে কাটতে বলো,
শুধু এককাপ কফি, আর কিচ্ছু না।
-তাহলে লাঞ্চ বক্সে তুলে দিই? রোহানকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবো।
ঠিক আছে দাও।
স্বামীর স্বীকৃতিতে খুশির ঢেউ খেলে গেলো ফ্লোরার চো-খের তারায়। সে ঝটপট কিচেনে গিয়ে লাঞ্চ বক্স রেডি করতে লাগলো। যা দেখে খাবার মুখে তুলে ঠোঁট চেপে আনমনে হাসলো তুষার। বিয়ের কতগুলো বছর পেরিয়ে গেলো, অথচ আজও এই মিষ্টি মেয়ের মিষ্টি আবদার গুলো কিছুতেই ফেলতে পারেনা সে।
কথায় কথায় ডাইনিং এ চলে এলো ইয়াশ। তার পড়নে অফ হোয়াইট হুডি আর ওভারসাইজড জিন্স কাঁধে ল্যা-পটপ ব্যাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোথাও একটা বের হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে সে। টেবিল থেকে একটা আপেল তুলে হয়তো বেড়িয়েই যেতো, কিন্তু যাওয়ার আগে বাঁধ সাধলো তুষার। আদেশের স্বরে বললো,
ব্রেকফাস্ট করে যেখানে খুশি যাও।
ইয়াশ যতই উগ্র, বেপরোয়া মস্তিষ্কের হোক না কেন। পা-পাকে সে কখনোই উপেক্ষা করেনা। বলতে গেলে সেই সাহসটাই এখনো হয়ে ওঠেনি তার। গোটা দুনিয়ার চোখে ডেয়ারডেভিল হলেও তুষারের চোখে ইয়াশ এখনো নিছক ছেলেমানুষ। বাবা হিসেবে যার প্রতিটি পদক্ষেপে তুষারের থাকে তীক্ষ্ণ নজরদারি। যদিও এসব খবরদারি মোটেও পছন্দ নয় ইয়াশের। রোহানকে তো আরও সহ্য করতে পারেনা সে। গদাইলস্করের মতোই সর্বক্ষণ পে-ছনে পেছনে থাকে। অসহ্যকর! দেখলেই মস্তিষ্ক গরম হয়ে যায়। তাতেও কি তুষারের কিছু যায় আসে? বোধ হয় না। উল্টো ছেলের প্রতিটি কর্মকান্ড থাকে তার সুক্ষ্ম নখদ-র্পনে। একটা অদৃশ্য বলয়ের মতোই ইয়াশের চারিপাশে সবর্দা বিচরণ তার।
পাপার আদেশ পাওয়া মাত্রই চুপচাপ খেতে বসল ইয়াশ। খাবারের প্লেট টেনে একটা পাউরুটি মুখে তুলতে যাবে তখনই বিপরীত প্রান্ত থেকে ভেসে এলো তুষারের তীর্যক কণ্ঠস্বর,
ফাইনাল সেমিস্টার শেষ করেছো ছয় মাস হতে চললো। এখনো ট্রেনিং এর জন্য এপ্লাই করোনি। কেন?
- কারণ আমি ট্রেনিং এ যাবো না।
ইয়াশের একরোখা প্রত্যুত্তর।
হোয়াই?
তুষারের প্রশ্নের তোপে একটু দ্বিধায় পরে গেলো স্বল্প-ভাষী, গম্ভীর ছেলেটা। খানিকক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে খা-বার খেতে খেতে রাশভারি কণ্ঠে গুছিয়ে জবাব দিলো,
- আই ওয়ান্ট টু এনজয় মাই লাইফ, ফলো মাই প্যাশন এ্যান্ড মুভ ফরওয়ার্ড।
তোমার প্যাশন! সেটা কি? ইন্টারনেট ক্যাফেতে বসে গেইমস খেলে বেড়ানো?
পাপার কথায় আচানক দৃষ্টি তুলে চাইলো ইয়াশ।
ভেনিসে নিজের বিজনেস, প্রোপার্টি সবকিছু ছেড়ে মি-লানোতে এসে আমি নিশ্চয়ই গেইমস খেলার জন্য তো-মাকে এ্যারোন্টিক্স পড়াইনি?
তুষারের কণ্ঠে বিদ্রুপ। যা শোনা মাত্রই সুক্ষ্ম এক অপমা-নের আভাসে থমথমে হয়ে উঠলো ইয়াশের ফর্সা সুদর্শন মুখ। বেজায় বিরক্ত হলো সে, যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে বললো,
- এটা জাস্ট সিম্পল গেমিং নয় পাপা। ইট'স ই-স্পো-র্টস। আজকে ভার্সিটিতে ফাইনাল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হবে, যদি আজকের ম্যাচে আমাদের টিম জিতে যায় তাহলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না। আ'ল বিকাম আ ইন্টারন্যাশনাল প্রোগেইমার।
- বাট ইউ্য হ্যাভ টু ফলো ইউওর ড্যাডিস পাথ!
হি ওয়াজ আ মাফিয়া বস। নট আ পাইলট!
ইয়াশের কণ্ঠস্বর চড়াও হয়ে উঠলো। বিপরীতে প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো তুষার। তৎপর হয়ে ছেলেকে কিছু বলবে, তক্ষুনি সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো প্রিসিলা। সকালের লেগিংস আর ট্যাংটপ বদলে একটা সুন্দর বেগুনি রঙের ঝালরওয়ালা ফ্রক পড়েছে সে, মাথায় চড়িয়েছে একই রঙের হেয়ারব্যান্ড। রেশমের মতো লম্বা সোনালী চুল গুলো ছড়িয়ে দিয়েছে পিঠের উপর। সিঁড়ি ভেঙে একপ্র-কার দৌড়ে দৌড়ে নামলো সে। মেয়ের এহেন উড়নচণ্ডী স্বভাব মোটেই পছন্দ নয় ফ্লোলার। সহসা ডাইনিংএ আসা মাত্রই মেয়েকে কড়া কণ্ঠে শাসালো সে,
এভাবে শব্দ করে হাঁটছো কেন? ম্যানার শেখোনি? আর চুল এভাবে খোলা রেখেছো কেন? এক্ষুনি বাঁধো।
মায়ের কথা গায়ে মাখালো না প্রিসিলা। পাপার আদরের একমাত্র শেহজাদী সে, এতো কথা শোনার সময় কো-থায়? উল্টো ধাপ ধাপ করে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালো সে ইয়া-শের নিকট। মেয়েটা কাছাকাছি আসতেই চোখ মুখ শক্ত করে ফেললো ইয়াশ। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রিসি-লাকে একদমই সহ্য করতে পারেনা ইয়াশ। প্রথম প্রথম ছেলেমানুষী, বাচ্চামী এসব ভেবে এড়িয়ে গেলেও ধীরে ধীরে তুষার আর ফ্লোরার আস্কারায় বিগড়ে যেতে থাকে সে। যত বড় হচ্ছিল ততই যেন বাড়ছিল তার ক্ষোভ, রাগ সবকিছু।
মেয়েটা যেন ওর দু'চোখের বিষ। তিল থেকে তাল খস-লেই ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দেয় ওর গালে। এই জীবনে প্রি-সিলা বাবা-মায়ের হাতেও এতো মার খায়নি যত মা'র ইয়াশের হাতে খেয়েছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্রমশ জটিল হয়েছে তাদের সম্পর্ক। এখন ভুল করেও যদি দু'জন একসঙ্গে বাড়িতে থাক, সেদিন ছোটখাটো এক রণক্ষেত্রে পরিনত হয় স্নোফ্লেক্স ম্যানর।
প্রিসিলার শরীর থেকে ভেসে আসা বডি ওয়াশের মিষ্টি সুঘ্রাণটা নাকে লাগতেই হাতে থাকা কাটা চামচটা সশব্দে স্যান্ডউইজের উপর গেঁথে ফেললো ইয়াশ। চোয়ালের পেশী শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
- কি চাই?
ইয়াশের কণ্ঠে ক্রোধের উষ্মা। সেই স্ফুলিঙ্গের মতো চড়াও মস্তিষ্কে খানিকটা ঘি ঢেলে দিতেই তার প্লেটের পাশে বাজারের ফর্দের মতো একটা লম্বা কাগজ রাখলো প্রিসিলা। মুখে বললো,
এতে আমার গত একসপ্তাহের সকল ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক বিবরণী দেওয়া আছে, দয়া করে ক্ষতিপূরণটা দিয়ে যাবেন।
বাড়ির স্বঘোষিত ইয়ং মাস্টারকে অতি সুক্ষ্ম এক খোঁচা দিয়ে সরে দাঁড়ালো সে। বিপরীতে ইয়াশ ওর কথায় পাত্তা তো দিলোই না উল্টো কাগজের ফর্দটাকে আঙুলের টো-কায় সীমানা ছাড়িয়ে বাইরে ছুড়ে মারলো। তার এহেন কান্ডে প্রিসিলা দাঁত খিচিয়ে উঠলো। বিরক্তিতে চিড়বিড়করতে করতে তুষারকে উদ্দেশ্য করে বললো,
দেখলে পাপা? তোমার ছেলের কাণ্ড দেখলে? কতটা উগ্র হয়েছে সে।
প্রিসিলার কথা শেষ হতেই ফ্লোরা চোখ পাকালো মে-য়েকে। শাসিয়ে উঠে বললো,
কতবার শিখিয়েছি ভাইয়াকে রেসপেক্ট করবে?
- ভ্যাইয়ায়ায়া!
মুখ ভেঙিয়ে শব্দটা উচ্চারণ করলো প্রিসিলা। ওদিকে সবার মাঝে থেকেও নিশ্চুপ যন্ত্রমানব। হাজারটা অন্যায় করলেও ছেলের ভুলত্রুটির ব্যাপারে বড্ড উদাসীন সে। অবশ্য বিষয়টা বরাবরই জ্ঞাত প্রিসিলা, ছোট বেলা থে-কেই দেখে এসেছে ইয়াশের কোনো ভুলই কখনো চোখে পড়েনা তার পাপার। উল্টো ইয়াশ কোনোকিছুতে অসন্তুষ্ট হলে প্রিসিলাকে দিয়েই বারবার স্যরি বলানো হয়। ভাব-খানা এমন যে সে এখানকার মুকুট বিহীন যুবরাজ। ওয়েল, ইয়াশ যদি যুবরাজ হয়ে থাকে তাহলে প্রিসিলাও তো এই বাড়ির একমাত্র শেহজাদী, কই তাকে নিয়ে তো এমন আহামরী আহ্লাদ করেনা কেউ।
সামনাসামনি খুব আত্মবিশ্বাসী ভাব ধরে থাকলেও, এসব আকাশ কুসুম ভাবনায় বুকের ভেতরটা ভার হয়ে আসে প্রিসিলার। অব্যক্ত অভিমানে চোখের কোলে চিকচিক করে ওঠে একফোঁটা টলমলে নোনাজল। মনগহীনে বাবা মাকে ঘিরে জন্ম নেয় শত সহস্র অভিযোগ।
- পাপা, গ্রাজুয়েশন শেষ এবার আমি মুভ করতে চাই।
ডাইনিং টেবিলে কিছুক্ষণ ধরে বিরাজমান থমথমে নৈঃশ-ব্দ্যটা আচমকা ভেঙে গেলো। ইয়াশের কথায় চোখ তুলে চাইলো তুষার। কফির কাপে ধীরে সুস্থে সিপ নিয়ে বললো,
- আমি শুনেছি তুমি আলপাইন এরিয়াতে একটি লাক্সা-রিয়াস ট্রি হাউজ কিনেছো?
- ইয়েস পাপা।
তুষারের তীর্যক প্রশ্নের জবাবটা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিলো ইয়াশ। বিপরীতে সাবলীল গলায় প্রত্যুত্তর করলো যন্ত্রমানব,
বেশ তো, ভ্যাকেশনে গিয়ে বেড়িয়ে এসো। দরকার পড়লে আমরাও যাবো। আজকাল একটা ভ্যাকেশনের খুব প্রয়োজন অনুভব করছি।
ওটা কোনো ট্যুরিস্ট স্পট নয়, পাপা। দ্যাট ইজ আ আলপাইন ফরেস্ট। আর আমি সেখানে পার্মানেন্টলি শিফট করতে চাই।
ইয়াশের কথা শেষ কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপে বসে রইলো তুষার। পরমূহুর্তেই ভেসে এলো তার অসন্তোষ বিজড়িত কণ্ঠস্বর,
- হঠাৎ এমন বনেবাদাড়ে থাকার শখ হলো কেন তোমার?
শখ হবেনা আবার? ওটাই তো তার আসল জায়গা। গেছো হনুমান একটা।
পাশ থেকে মিনমিনে গলায় রসিয়ে রসিয়ে কথাগুলো বললো প্রিসিলা। তৎক্ষনাৎ ওর দিনে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইয়াশ। তুষার সামনে না থাকলে হয়তো এতো-ক্ষণে চড়িয়ে লাল করে দিতো ওর ফর্সা গালদুটো, অন্তত চোখের দৃষ্টি তো তাই বলছে। ইয়াশের রক্তিম চোখের দিকে চেয়ে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলো প্রিসিলা, তড়িঘড়ি করে মন দিলো সে খাবার প্লেটে। পরপরই কানে ভেসে এলো ইয়াশের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
- আ'ম এডাল্ট পাপা। আই ক্যান লিভ হোয়ারেভার আই ওয়ান্ট।
