#তোর আশিকি #উপন্যাস
#পর্ব_চার
নোভার কথায় প্রিসিলা ওর দিকে উপহাসের দৃষ্টিপাত করলে মেয়েটা জোর গলায় বললো,
সত্যি বলছি! ক্যাম্পাসে পা রাখা মাত্রই তোমায় দেখে চোখ আঁটকে গেলো আমার। সূর্যের নরম আলোয় ম্যাপল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তুমি জাস্ট ঝলমল করছিলে।
সো সুইট অফ ইউ্য।
প্রসন্ন হেসে নোভাকে অভিবাদন জানালো প্রিসিলা। ওর অভিবাদনে স্বাগত জানিয়ে আবারও প্রশ্ন করলো মেয়েটা,
আই থিংক তোমার প্যারেন্টস এর লাভ স্টোরি অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং।
নোভার কথা শুনে প্রিসিলা একটু আনমনা হয়ে গেলো। ব্যাগের সঙ্গে লাগোয়া হ্যালো কিটির সুন্দর পুতুলটাকে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে উদাসীন গলায় জবাব দিলো,
তা ঠিকই বলছো। তবে আমি শুনেছি ইয়াশের ড্যাড মম এর লাভস্টোরি ইজ ভেরি ট্রাজিক। মম এখনো কাঁদে ওদের জন্য।
ইয়াশ নামটা শোনা মাত্রই নয়ন বিস্ফারিত হলো নোভার। প্রসঙ্গ পাল্টে তৎক্ষনাৎ উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠলো মেয়েটা। চোখে মুখে অত্যাশ্চর্যের ঝিলিক নিয়ে বললো,
- ইয়াশ! তুমি ইয়াশ কে চেনো?
ওকে না চেনার কি আছে?
একটু তাচ্ছিল্য করে ঠোঁট উল্টালো প্রিসিলা। নোভা সে-সবে একবিন্দু পাত্তা না দিয়ে বললো,
- তুমি জানো এই ক্যাম্পাসের বাইরের মেয়েদের ইয়া-শকে নিয়ে ঠিক কি পরিমাণ ফ্যান্টাসী? দে আর লিট-রেলি ক্রেইজি এবাউট হিম। ওর গেইম দেখার জন্য সবার কত মাতামাতি।
ওয়েল, ক্যাম্পাসের ভেতরেও মাতামাতি হয়। একটু বাদেই টের পাবে।
বলেই মুখ মোচড়ালো মেয়েটা। বিপরীতে নোভা উদ্বে-লিত হয়ে আওড়ালো,
আফটার অল হি ইজ আ কলেজ হার্টথ্রোব।
-তুমিও কি ইয়াশের প্রতি ইন্টারেস্টেড?
ত্যাড়া চোখে চেয়ে প্রশ্নটা করলো প্রিসিলা। ওর প্রশ্নে একটু লাল হয়ে উঠলো নোভা। দৃষ্টি নামিয়ে কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে ফের উৎফুল্ল গলায় বললো,
ইয়েস অফকোর্স। ওকে কেউ ইগনোর করতে পারবে নাকি? হি ইজ মাই ড্রিম হিরো, মাই বেস্টএভার ফ্যান্টাসী।
ওই দানবের মতো হাতের একটা থাপ্পড় খেলে সব ফ্যান্টাসী উড়ে যেতো। হুহ্!
কথাটা বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো প্রিসিলা। পরপরই ধ্বনি হলো,
-আজ তো ম্যাচ আছে তোমার হিরোর। দেখতে যাবেনা?
নোভার চোখে উৎকণ্ঠার জোয়ার। চট করেই বলে উঠলো,
রিয়েলি! এডমিশন, এটেনড্যান্স এসব নিয়ে ছোটাছুটি
করতে করতে একদম খোঁজ নিতে ভুলে গিয়েছি। কো-থায় হচ্ছে ম্যাচ?
সম্ভবত অডিটোরিয়ামে। আমি আসলে জানি
ঠিকভাবে।
খুশিতে ঝুমঝুমিয়ে উঠলো নোভা। তৎক্ষনাৎ প্রিসিলাম হাত আঁকড়ে ধরে পা চালিয়ে অডিটোরিয়ামের দিকে যেতে যেতে আওড়ালো,
-তাহলে চলো জেনে আসি।
আরেহ! ক্লাসে যাবেনা?
--- উই আর অলরেডি লেট ডিউড। এখন আর যেয়ে লাভনেই। চলোতো।
বলেই প্রিসিলাকে একপ্রকার বগলদাবা করে টানতে টা-নতে অডিটোরিয়ামের দিকে নিয়ে গেলো নোভা।
ম্যাচ পূর্ববর্তী মূহুর্তে একটা উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছে সমগ্র অডিটোরিয়াম জুড়ে। চারিদিকে পুরো দমে চলছে টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি। সকলের মাঝে চাপা উত্তে-জনা। গ্যালারী থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য মেয়েদের ফিসফাস। ফ্রেশার, সিনিয়র, জুনিয়র এমনকি আউটসা-ইডার স্টুডেন্টস সবাই আছে এখানে। দলেদলে জড়ো হয়েছে তারা ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে। মানুষের ভিড়ভাট্টা ঠেলেই অবশেষে ব্যাকস্টেজে পৌঁছালো ওরা। এখানে তেমন ভীড় নেই। আইটি ম্যানেজমেন্ট টিম আপাতত টে-কনিক্যাল সিস্টেমগুলো ঠিকঠাক করছে। তাদের মধ্যে দুএকজন সিনিয়রও রয়েছে। ওরা দু'জন হঠাৎ ভেতরে ঢুকতেই কক্ষে উপস্থিত সবগুলো চোখ গিয়ে স্থির হলো ওদের দিকে। একযোগে এতোগুলো দৃষ্টির মুখে পড়ে সং-কিত হলো প্রিসিলা। আড়ষ্টতায় জড়োসড়ো হয়ে চারি-দিকে চোখ বোলালো কাউকে খোঁজার উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই পাশ থেকে প্রশ্ন ছুড়লো নোভা,
- কাউকে খুঁজছো?
সাবধানে মাথা নাড়ালো প্রিসিলা। ফিসফিস করে বললো,
হ্যা। আমার পরিচিত একজন কে?
ওহ, কে সে?
নিকো, ইয়াশের টিমের সবচেয়ে দূর্দান্ত প্লেয়ার।
ইয়াশের থেকেও বেশি?
নোভার প্রশ্নটা শুনে অচিরেই চোখমুখ কুঁচকে গেলো প্রি-সিলার। এরা ইয়াশ ছাড়া আর কিছু বোঝেনা নাকি? সহসা বিরক্তির স্বরে জবাব দিলো,
- হ্যা, ইয়াশের থেকেও বেশি। নেহাৎ ওই হনুমানের তো-মাদের মতো একটা উত্তেজিত ফ্যানবেজ রয়েছে, নয়তো নিকো কবেই ক্যাপ্টেন হয়ে যেতো।
গর্বের সঙ্গে কথাগুলো বলেই সামনে পা বাড়ালো প্রি-সিলা। তৎক্ষনাৎ ওর সামনে এসে দাঁড়ালো একটা অদ্ভুত লাল চুলের মেয়ে। চেহারায় ফুল কভারেজ মেকআপ, চোখে বড়বড় আইল্যাস, আর রঙচটা লিপস্টিকে ভারী বেমানান লাগছে তাকে। ফর্সা গায়ে মিনিস্কার্ট আর ট্যাংটপ পরে আছে মেয়েটা। দেখতে মন্দ নয়, তবে তার অদ্ভুত সাজসজ্জা আর টমবয় সেজে থাকার বৃথা চেষ্টা সেই সৌন্দর্যের অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। উপর দিক থেকে চুড়ো করে বাঁধা গুলোকে ক্রমাগত এদিক সেদিক নাড়াচ্ছে সে। চেহারার মাঝে একটা অহংকারী ভাব। মে-য়েটাকে দেখেই প্রিসিলার কানের কাছে গিয়ে স্বভাবসিদ্ধ গলায় হিসহিসালো নোভা,
ডিড সি জাস্ট ডাই হার হেয়ার রেড? আই মিন লাল চুল। হাউ ক্রিঞ্জ ডিউড!
---শুউউউ!
নোভার উদ্দেশ্যে নীরব সতর্কবানী ছুড়লো প্রিসিলা। সঙ্গে সঙ্গে একটা কর্কষ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো বিপরীত প্রান্ত থেকে,
- কি ফিসফিস করছো তোমরা দু'জন? আমাকে গসিব করছো নাতো?
কথাটা বলেই প্রিসিলা আর নোভার দিকে তীর্যক দৃষ্টি-পাত করে একনাগাড়ে চুইংগাম চিবিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তৎক্ষনাৎ না সূচক মাথা নাড়ালো ওরা দু'জন। ঠোঁট টেনে হেসে প্রিসিলা বললো,
মোটেই না। আমরাতো একটা ইনফরমেশন জানার জন্য এখানে এসেছি। দেখি পরিচিতি কাউকে খুঁজে পাও-য়া যায় কিনা।
বলেই নোভা সমেত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল ও, তখনই ফের পেছন থেকে ডেকে উঠলো মেয়েটা। জলদি পায়ে এগিয়ে এসে আবারও ওদের পথরোধ করে বললো,
আরে এতো সংকোচ কিসের মেয়ে?
তোমার সিস্টার ইন ল আছে তো এখানে। বলো কি ইনফ-রমেশন লাগবে?
ওর কথায় মুখে একটা অহেতুক বিরক্তি ভাব ফুটে উঠলো প্রিসিলার। দাঁত কিড়মিড়িয়ে স্বগোতক্তি করে আওড়ালো,
ধ্যাত্তেরি! এটারই ভয় পেয়েছিলাম এতোক্ষণ।
প্রিসিলার পানসে মুখের দিকে ক্ষীণ দৃষ্টিতে চেয়ে আবারও খুব আহ্লাদ করে ডেকে উঠলো মেয়েটা,
- কি হয়েছে সিস্টার ইন ল? তুমি কি কোনো কারণে আপসেট?
বিপরীতে প্রিসিলা কিছু বলতে যাবে তার আগেই দুঃখের স্বরে প্রলাপ আওড়াতে লাগলো মেয়েটা,
জানো, আমিও না আপসেট খুব। সকাল থেকে দে-খিনা ওকে। জানোইতো ক্যাম্পাসে এসে ওকে না দেখলে একদমই মুড ভালো থাকেনা আমার। একটু আগেও দুই টাকে পিটিয়ে হসপিটালে পাঠিয়েছি। এখনো সারাটাদিন পরে আছে, ওকে না দেখা অবধি আমার মুড সম্ভবত ভালো হবেনা। তাই ঝামেলা হইহট্টগোল থেকে দূরে দূরেই আছি। নয়তো দেখা যাবে বিরক্ত হয়ে একটা মার্ডার ফা-র্ডার করে ফেলবো।তার কথা শুনে মুখখানি চুপসে এইটুকুনি হয়ে গেলো নো-ভার। শুষ্ক ঢোক গিললো সে। প্রিসিলার কাছে গিয়ে বিড়বিড়ালো,
- বলে কি এই মেয়েটা?
সে কথার উত্তর না দিয়েই, সামনে দাঁড়িয়ে এক নাগাড়ে চুইংগাম চিবোতে থাকা মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে শক্ত বা-ক্য ছুড়লো প্রিসিলা,
দেখো রোজ, ইয়াশ আর আমি এক বাড়িতে থাকলেও ইয়াশ আমার ভাই নয়। তাই দয়া করে আমার কাছ থেকে ওর খবরাখবর নিতে এসোনা। আর হ্যা, সিস্টার ইন ল ডেকে ডেকে আমাকে এভাবে এক্সট্রা কেয়ার দেখানোর ও কিছুও নেই। আ'ম এনাফ কনফিডেন্ট এবাউট মাই ওউন পার্সনালিটি, কারোর অযথা হেল্প আসলে আমার খুব একটা প্রয়োজন নেই।
কড়া গলায় কথাগুলো বলে সামনে পা বাড়াতেই ওর কাঁ-ধের উপর জোরালো হাত রেখে বাঁধাগ্রস্ত করলো কেউ। হঠাৎ গতিরোধ হওয়ায় থমকে গেলো প্রিসিলা। পাশ ফিরে আগুন চোখে তাকাতেই, ওর জ্বলন্ত চোখে দৃষ্টি ফেললো রোজ। ঠোঁটে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
তুমি স্বীকার করো কিংবা না করো। ইয়াশ যেহেতু আমার জানেমন, তুমি আমার বিলাভড সিস্টার ইন ল। সো, আমার দেওয়া এক্সট্রা কেয়ারটুকু তোমাকে সবসম-য়ই নিতে হবে।
কথাগুলো হেসে হেসে বললেও, প্রতিটি শব্দে ছিল নীরব হুশিয়ার। ওদিকে রোজের কান্ডে ভড়কে গেলো নোভা। নিচু গলায় প্রিসিলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-চলো এখান থেকে। ম্যাচ দেখতে হবে না।
কোনোরূপ প্রত্যুত্তর করলো না প্রিসিলা। একটা জোরালো ঝটকায় নিজের বাহু ছাড়িয়ে নিলো রোজের হাত থেকে। তারপর ওর মুখের সামনে মধ্যমা আঙুল তুলে তাচ্ছি-ল্যের স্বরে বললো,
- ফাক ইউ্য!
বিপরীতে রোজ কিছু বলার ফুরসত পেলোনা আর। তার আগেই সিনিয়রদের মধ্যে থেকে এগিয়ে এলো একজন। ছেলেটার মাথা ভর্তি একঝাড় ক্যাটকেটে লাল চুল। হ্যাতে গলায় হিজিবিজি সব ট্যাটু, কানে দুল, চেহারায় একটা অদ্ভুত শুষ্কতা। লালাভ চোখ দু'টো দেখলেই বোঝা যায় খুব বাজেভাবে নেশাগ্রস্ত সে। আগন্তুক ছেলেটাও রোজের মতোই মুখ নাড়িয়ে চুইংগাম চিবুচ্ছে একনাগা-ড়ে। ছেলেটাকে আপাদমস্তক পরখ করে নোভা আবারও নিচু গলায় প্রশ্ন করলো প্রিসিলাকে,
- এই মাল টা আবার কে?
রোজের ভাই জ্যাকভ। এই ক্যাম্পাসের পাতি মাস্তান। ওর দাপটেই রোজ এতো উগ্র।
ওমাইগড! তাহলে তো আমাদের এক্ষুণি কেটে পড়া উচিত প্রিসি?
এতোক্ষণ দু'জনেই আকারে-ইঙ্গিতে কথা বলছিল ওরা দু'জন। নোভার বিচলিত চেহারা দেখে এবার একটু ঠোঁট টিপে হাসলো প্রিসিলা। চোখ মে'রে বললো,
- চিইইল নোভা। এই গর্দভটা এমনিতেও আমাকে কিছুই
করবে না, বিকজ হি ইজ ইন লাভ উইথ মি।
- কি বলছো কি!
নোভার দু'টো চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। এক্ষুণি না আবার চিল্লিয়ে ওঠে, সহসা চোখের ইশারায় ওকে রিল্যা-ক্স হতে বললো প্রিসিলা। জানালো,
- ইয়েস ইট'স ট্রু।
তক্ষুণি চমৎকার সম্মোধনে পাশ থেকে ডেকে উঠলো
জ্যাকভ,
- হেই রুপাঞ্জেল। এ্যানি প্রবলেম?
দিঘল সোনালী চুলের অধিকারীনি প্রিসিলাকে অনেকেই এই নামে সম্মোধন করে থাকে। নতুন কিছু নয়। সহসা কানে লাগলো না ওর। ওদিকে প্রিসিলা কিছু বলার আগেই ক্ষ্যাপাটে বাঘিনীর মতো গর্জে উঠলো রোজ।
- রুপাঞ্জেল মাই ফুট, শী ইজ আ বিচ!
তৎক্ষনাৎ বোনের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো জ্যাকভ। ভাইয়ের সামান্য চাহনিতে নিমেষেই নিভে গেলো রোজ। ভীতিগ্রস্ত হয়ে জলদি প্রস্থান করলো সে-খান থেকে। রোজ চলে যেতেই প্রিসিলার দিকে চেয়ে বি-গলিত হাসলো জ্যাকভ
ঠান্ডা গলায় বললো,
- ও একটু উগ্র জানোইতো। ডোন্ট টেক হার ওয়ার্ড টু হার্ট।
তপ্তশ্বাস ফেললো প্রিসিলা। চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিলো,
তোমাদের দু ভাইবোনের কারোর কথাই আমি কেয়ার করিনা। সাচ এ্যান ইডিয়ট!
কিছু বললে?
জ্যাকভের প্রশ্নে সংবিৎ ফিরলো প্রিসিলার। জোরপূর্বক হেসে জবাব দিলো,
-- কই না তো।
