অধরা আসক্তি
লেখনীতে: Ohona hossan
পর্ব ৪ — অপরিচিত সেই চোখ
লন্ডন | সন্ধ্যা ৭টা ১৮ মিনিট
“মালিহা! তুই কি হাঁটতে হাঁটতে ঘুমিয়ে পড়েছিস?”
তামিমের ডাকে মালিহা চোখ তুলে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
“আমি গত পাঁচ মিনিট ধরে কথা বলছি। তুই একবারও উত্তর দিসনি।”
“তুই কথা বলছিস, সেটা তো নতুন কিছু না। তাই আলাদা করে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।”
পাশ থেকে রায়ান হেসে উঠল।
“ভাই, তোর অপমানেরও একটা routine হয়ে গেছে।”
“তোরা দুজন চুপ কর,”
তামিম বিরক্ত মুখে বলল।
“একদিন দেখবি, মালিহাকে ছেড়ে আমি অনেক দূরে চলে গেছি।”
মালিহা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“যাওয়ার আগে বিলটা দিয়ে যাস।”
এবার নাফি পর্যন্ত হেসে ফেলল।
তারা শহরের একটা পরিচিত রেস্টুরেন্টে বসেছে। সারা আর ইরা একটু পরেই আসবে বলেছে। মালিহা বসে বসে মেনু দেখছিল, কিন্তু তার মাথার এক কোণে সেই সাদা কার্ডটার কথাও ঘুরছিল।
কেউ একজন তার নাম জানে।
কেন?
প্রশ্নটা তাকে বিরক্ত করছিল, কারণ সে সাধারণত কোনো সমস্যাকে এভাবে মাথার মধ্যে জায়গা দিতে পছন্দ করে না।
রায়ান জিজ্ঞেস করল।
“কী ভাবছিস?”
“কিছু না।”
“তোর কিছু না মানে সাধারণত অনেক কিছু।”
মালিহা মেনু বন্ধ করল।
“আমার মনে হচ্ছে, তোদের সঙ্গে বের হওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল।”
নাফি একটু অ্যাক্টিং করে বলল।
“Late cancellation accepted না,”
ঠিক তখন সারা আর এরা এসে হাজির হলো।
সারা ঢুকেই মালিহার পাশে বসে বলল,
“Sorry, babe! রাস্তায় প্রচণ্ড traffic ছিল।”
ইরা নিজের কোটটা চেয়ারের পেছনে রেখে বলল, “Traffic না থাকলেও Sarah-র ready হতে সময় লাগত।”
সারা তার দিকে ব্রু কুচকে তাকিয়ে বলল।
“Excuse me? তুই নিজে আয়নার সামনে কতক্ষণ থাকিস, সেটা বলব?”
“আমার ক্ষেত্রে সেটা preparation। তোর ক্ষেত্রে historical event।”
মালিহা জরে হেসে ফেলল।
“তোরা দুজন কি কোনো দিন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবি?”
“না!” সারা আর ইরা একসঙ্গে বলল।
রাতের খাবার, হাসি-ঠাট্টা আর নিজেদের জীবনের ছোটখাটো গল্পের মধ্যে সময় কেটে গেল।
তামিম অবশ্য মাঝেমধ্যে মালিহার প্লেট থেকে খাবার চুরি করছিল।
তৃতীয়বার একই কাজ করতে গিয়ে সে মালিহার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই এতটুকু খাবারও share করতে পারিস না?”
মালিহা কাঁটাচামচ নামিয়ে তার দিকে তাকাল।
“তোর সামনে পুরো রেস্টুরেন্ট আছে।”
“কিন্তু তোর প্লেটের খাবার বেশি tasty।”
“তোর এই স্বভাবের জন্যই তোর future wife তোকে বাড়ির বাইরে খেতে পাঠাবে।”
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল, “Future wife কেন? ওকে তো আমি এখনই বাড়ির বাইরে পাঠাতে পারি।”
তামিম বুকের ওপর হাত রাখল।
“আমার নিজের বন্ধুরাই আমাকে বোঝে না।”
মালিহা হেসে আবার খাবারে মন দিল।
এই সময় তার “Sumsung galaxy 25 ultra pro” ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে Daniel-এর নাম দেখে সে কল ধরল।
“Hello?”
“Miss Chowdhury, about the delivery from this morning—we checked the available records. Unfortunately, we haven't been able to identify the sender yet.”
মালিহার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
“Any CCTV footage?”
“We're checking that as well.”
“Okay. Keep me updated.”
কল শেষ করে সে ফোনটা টেবিলে রাখল।
সারা তার মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না। একটা ছোট business issue।”
সারা আর প্রশ্ন করল না। সে জানে, মালিহা যখন নিজে থেকে কিছু বলতে চায় না, তখন জোর করে বলানো যায় না।
তবে ইরা একবার মালিহার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই sure তো সব ঠিক আছে?”
মালিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। আমি handle করতে পারব।”
সে কথাটা নিজের জন্যও বলল।
কারণ অজানা কোনো মানুষের কারণে নিজের স্বাভাবিক জীবন বদলে ফেলতে সে রাজি নয়।
একই রাত | প্রাইভেট হাসপাতাল
“Doctor Rahman, patient's family is asking if they can see him now.”
আয়ান রোগীর রিপোর্ট থেকে চোখ তুলল।
“Give them five minutes. Let the nurse finish the assessment first.”
“Alright, doctor.”
নার্স চলে গেলে আয়ান আবার রিপোর্টের দিকে তাকাল। কয়েক ঘণ্টা আগের জটিল অপারেশন সফল হয়েছে, কিন্তু তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। অপারেশনের পর রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, রিপোর্ট যাচাই করা, পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা—সবকিছুর জন্যই তার মনোযোগ প্রয়োজন।
চিকিৎসা পেশায় একটা ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
আয়ান সেটা অন্য কারও চেয়ে কম বোঝে না।
রাত প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে অবশেষে সে হাসপাতালের কেবিন থেকে বের হলো।
ফোনে মায়ের কয়েকটা মেসেজ জমে আছে।
Mom: Dinner kore nio, baba.
Mom: You have been working since morning.
Mom: At least reply to me.
আয়ানের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটল।
সে লিখল—
Ayan: I'm fine, Ma. I'll eat now.
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর এল।
Mom: Fine bollei shob thik hoye jay na.
আয়ান মাথা নাড়ল।
মায়ের সামনে তার সমস্ত গাম্ভীর্য খুব একটা কাজে আসে না।
ফোন পকেটে রেখে সে পার্কিংয়ের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে তার কালো বাইকটা দাঁড়িয়ে ছিল। আজ বাড়ি যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে নেওয়ার কথা ভাবছিল সে।
ঠিক তখন রাফির কল এল।
“কোথায় তুই?”
“হাসপাতালে ছিলাম। এখন বের হচ্ছি।”
“খেয়েছিস?”
“না।”
“অবিশ্বাস্য। তুই মানুষ না, একটা চলন্ত হাসপাতাল।”
আয়ান হেলমেট হাতে নিয়ে বলল, “তুই ফোন করেছিস কেন?”
“একটা খবর দেওয়ার জন্য।”
“বল।”
“আগামীকাল CR Corporation-এর medical partnership meeting আছে, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“তাদের Co-CEO নাকি খুব young, but business-এ বেশ sharp।”
আয়ান বাইকের পাশে দাঁড়াল।
“তুই আমাকে এই খবর দেওয়ার জন্য ফোন করেছিস?”
“না, আমি তোকে বিনোদন দেওয়ার জন্য ফোন করেছি।”
“তাহলে বিনোদন শেষ?”
“একদমই না। আমি শুনেছি, মেয়েটা নাকি বেশ intimidating।”
আয়ান হালকা বিরক্তিতে বলল, “একটা business meeting-এ যাচ্ছি, blind date-এ না।”
রাফি এত জোরে হেসে উঠল যে আয়ান ফোনটা কান থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিল।
“Okay, Doctor Rahman. কাল দেখা হবে।”
কল কেটে আয়ান বাইকে উঠল।
CR Corporation-এর Co-CEO তার কাছে এখনো একটা নামমাত্র।
Maliha Chowdhury.
এর বেশি কিছু নয়।
অন্তত এই মুহূর্তে।
পরদিন সকাল | লন্ডন
মালিহার অ্যালার্ম বাজার আগেই সে ঘুম থেকে উঠে গেল।
জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাতেই সকালের আলো ঘরে ঢুকে পড়ল। সে দ্রুত গোসল সেরে নিজের পছন্দের পোশাক বেছে নিল—একটি Ash colour baggy butcut jeans, black offshoulder full sleeve fitted top আর white chunky snakars গলায় একটা সিমপোল silver “tandar” shape এর নেকলেস হাতের আঙ্গুলে একটা silver colour ring। দেখতে comfortable, কিন্তু প্রতিটি জিনিসের মধ্যে একটা refined, expensive touch।
তার গোল্ডেন-ব্রাউন চুলগুলো প্রায় হাঁটু পর্যন্ত লম্বা। এত লম্বা চুল খোলা রেখে কাজ করা তার পছন্দ নয়, তাই সে পরিচিত hair clip দিয়ে সুন্দর করে বেঁধে নিল। তারপর square box-frame glasses পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে মাথা নাড়ল।
“Perfect.”
ফোনে সময় দেখে সে তার black “Dior”এর ব্যাগ তুলে নিল।
আজকের মিটিংটা গুরুত্বপূর্ণ। medical partnership-এর শর্তগুলো তার নিজের যাচাই করা দরকার।
নিচে নামতেই জেসমিন চৌধুরী বললেন, “Breakfast না করে কোথাও যাওয়া যাবে না।”
“Mom, I'm getting late.”
“পাঁচ মিনিট আগে উঠতে পারতে।”
“তাহলে তো পৃথিবী থেকে পাঁচ মিনিটের ঘুম কমে যেত।”
জেসমিন মেয়ের দিকে কড়া চোখে তাকালেন।
“মালিহা!”
মালিহা হেসে মায়ের গালে চুমু দিয়ে টেবিল থেকে একটা টোস্ট তুলে নিল।
“Love you, Mom. Bye!”
“আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুক। আর গাড়িতে বসে ঠিকমতো খেয়ো!”
“Okay!”
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে তার “SUV” গাড়িতে উঠল।
আজকের দিনটা যে অন্যরকম হতে যাচ্ছে, তার কোনো ধারণাই ছিল না।
সকাল ১০টা ৩৫ মিনিট | CR CORPORATION
কনফারেন্স রুমে ঢোকার আগে মালিহা ফাইলগুলো আরেকবার দেখে নিল।
তার সহকারী জানালেন, হাসপাতালের প্রতিনিধি পথে আছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবেন।
মালিহা মাথা নাড়ল।
“Alright. Let me know when he's here.”
সে নিজের জায়গায় বসে ল্যাপটপ খুলল।
অন্যদিকে আয়ান হাসপাতালের সকালের দায়িত্ব শেষ করে রওনা দিয়েছিল। একটি জরুরি কনসালটেশনের কারণে বের হতে একটু দেরি হয়েছে, তবে সে গাড়িতে না গিয়ে বাইকেই এসেছে।
বিল্ডিংয়ের সামনে বাইক থামিয়ে হেলমেট খুলল সে।
কালো overcoat-এর নিচে black turtleneck, সঙ্গে dark trousers। গলায় charcoal scarf। ice-blond চুল বাতাসে সামান্য এলোমেলো হয়ে আছে।
রিসেপশনে নিজের পরিচয় দিয়ে সে visitor pass নিল।
“Dr. Ayan Rahman?”
“That's me.”
“Conference room is on the eighteenth floor, Mr.Ayan.”
“Thank you.”
লিফটে উঠে আয়ান ফোনে মিটিংয়ের নোটগুলো খুলল।
তার মনোযোগ সম্পূর্ণ কাজের দিকে।
কোনো বিশেষ প্রত্যাশা নেই, অকারণ কৌতূহলও নেই।
শুধু একটা meeting, তারপর আবার hospital।
লিফটের দরজা খুলতেই সে বেরিয়ে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে কনফারেন্স রুমের দরজা খুলে মালিহা বাইরে বের হচ্ছিল। হাতে একটা ফাইল, অন্য হাতে ফোন। সহকারী তাকে কিছু একটা বোঝাচ্ছিলেন, আর মালিহা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে করিডোরের বাঁক ঘুরল।
দুজনের দেখা হলো একেবারে সামনে।
মালিহা শেষ মুহূর্তে থামল।
তার হাতে থাকা ফাইলের কয়েকটা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
“Sorry—”
একই সঙ্গে দুজনের কণ্ঠ শোনা গেল।
আয়ান নিচু হয়ে কাগজগুলো তুলে নিল। মালিহাও ঝুঁকে পড়েছিল, কিন্তু দুজনের হাত প্রায় একসঙ্গে একই কাগজের কাছে পৌঁছে গেল।
মালিহা হাত সরিয়ে নিল।
“Thank you.”
আয়ান কাগজগুলো গুছিয়ে তার দিকে এগিয়ে দিল।
“No problem.”
মালিহা মাথা তুলে তাকাল।
প্রথমে চোখে পড়ল কালো পোশাক, তারপর অস্বাভাবিক লম্বা গড়ন, আর সবশেষে সেই সাদা-সিলভার চুলের মানুষটার চোখ। লাল বর্ণের
লোকটা তার চেয়ে অনেক লম্বা। মুখে কোনো বাড়তি অভিব্যক্তি নেই। চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে, যার কারণে মালিহা অকারণেই আরেকবার তাকাল।
আয়ানও এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
মেয়েটির গোল্ডেন-ব্রাউন চুলগুলো যত্ন করে hair clip দিয়ে বাঁধা। চোখে square-frame glasses। পোশাকটা সাধারণ, অথচ তার মধ্যে এমন একটা আত্মবিশ্বাস আছে, যা আলাদা করে চোখে পড়ে।
কিন্তু আয়ানের দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আটকে গেল তার চোখে।
চশমার আড়ালে থাকা সেই চোখ দুটো,চোখগুলো ধূসর বর্ণের একেবারেই নির্বিকার নয়।
বরং মেয়েটা তাকে এমনভাবে দেখছে, যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে ইতিমধ্যেই বিচার করে ফেলেছে।
মালিহা প্রথমে চোখ সরাল।
“আপনি কি medical partnership meeting-এর জন্য এসেছেন?”
“Yas।”
“Dr. Ayan Rahman?”
“Yas।”
মালিহা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নিজের পরিচয় দিল।
“I'm Maliha Chowdhury. Co-CEO of CR Corporation.”
আয়ান তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
“Nice to meet you, Miss Chowdhury.”
মালিহার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটল।
“Likewise, Doctor.Rahman”
তারপর সে পাশের দরজার দিকে ইশারা করল।
“Please, come in. We're waiting for you.”
আয়ান তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একবার চোখ তুলল।
মালিহাও ঠিক সেই মুহূর্তে তার দিকে তাকিয়েছিল।
এক সেকেন্ড।
হয়তো তারও কম।
কিন্তু দুজনের কেউই জানত না, এই ছোট্ট পরিচয়টা তাদের মনে এত সহজে মিলিয়ে যাবে না।
মালিহা আবার নিজের কাজে মন দিল।
আয়ান কনফারেন্স রুমে ঢুকে নির্ধারিত আসনে বসল।
তার সামনে ফাইল খুলে রাখা হলো।
Maliha Chowdhury — Co-CEO.
এবার নামটার পাশে একটা মুখও আছে।
আর আয়ান রহমান, যে মানুষটাকে নিজের জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় সবকিছু দূরে রাখতে অভ্যস্ত, সে বুঝতেই পারল না কেন মিটিং শুরু হওয়ার আগেই তার চোখ একবার দরজার দিকে চলে গেল।
