সালটা ১৯৯৪,
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় চলছে। গোধুলি বিকেলে দিনের শেষ আলোক রশ্মি চারদিক ছড়িয়ে পড়ছে। গাছের পাতার ফাক দিয়ে মৃদু শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। আকাশে হালকা কমলা রঙের আভা দেখা যাচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রকৃতি যেন নিজেই শীত আগমনের বার্তা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সুন্দর শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে প্রকুতি।
এমনই এর গোধূলি বিকেলে মোহনগঞ্জ সরকারি কলেজের মাঠে বসে আছে আদনান চৌধুরী। হাতে তার একটা ছোট নোট খাতা আর কলম। সেই খাতার পাতায় সে লিখে চলেছে একের পর এক মনোমুগ্ধকর কবিতার লাইন, যেন তার নিজের সব অনুভুতি শব্দ হয়ে কবিতার মাধ্যমে ফুটে উঠছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে লিখছে আদনান। একটু পর পর আকাশের দিকে তাকিয়ে নতুন উদ্যমে লেখা শুরু করে। এরকম এক গোধূলি বিকেল যেন কবিতা লেখার জন্য মোক্ষম সময়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য নিজেই কবিতা হয়ে খাতার পাতায় ফুটে উঠে। আদনানও ঠিক তেমনই হারিয়ে গিয়েছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যে আর লিখে যাচ্ছো তার কবিতার লাইন। এমন সময় কারো পায়ের আওয়াজে তার ধ্যান ভেঙ্গে গেলো। কেউ যেন আদনানের দিকেই এগিয়ে আসছে। তার ভাবনার ধ্যান ভেঙে যাওয়ার কিছু বিরক্তি নিয়ে পিছনে তাকালো দেখলো কৃষ্ণবর্নের একটি মেয়ে অবয়ব তার দিকে এগোচ্ছে। গোধুলির ম্লান আলোয় মৃদু বাতাসে মেয়েটির লম্বা চুল গুলো দুলছে, পড়নে একটি হালকা নীল রংয়ের একটি জামা আর বুকের উপর আড়াআড়ি ভাবে ওড়না রয়েছে। বিকেলের কমলা রংয়ের আভায় মেয়েটার মুখ যেন আরো মায়াবী লাগছিল। কৃষ্ণবর্ণের হওয়া শর্তেও মেয়েটার মুখে যেন আলাদা এক ধরনের কমল মায়া আছে। কিন্তু আদনান আর সে দিকে মন দিলো না সে আবার নিজের কবিতা লেখা মন দিকে যাবে সেই সময় মেয়েটা আদনানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো,
- একি আপনি এখনও এখানে বসে আছেন বাড়িতে যাবেন না? আর কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা নেমে আসবে। তারউপর কলেজের গেট বন্ধ করে দেবে দারোয়ান কাকা। পড়ে বের হবেন কিভাবে আপনি?
মেয়েটার উপর কিছুটা বিরক্তি আসলো আদনানের কিছুটা না বরং অনেকটাই। কি সুন্দর মন দিয়ে কবিতা লিখছিলো মেয়েটা এসে সব নষ্ট করে দিলো৷ কিন্তু মেয়েটা তো ঠিকই বলেছে সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এলো কখন সময় চলে যেছে তার কোনো খোজই নেই আদনানের হয়তো মেয়েটা ডাক না দিলে দারোয়ান গেট বন্ধ করে দিতো আর ভেতর আদনান আটকা পড়ে থাকতো। মেয়েটার উপর বিরক্ত হলেও তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য কিছু বলবে তার আগে মেয়েটা আবার বলা শুরু করলো,
- আরে কি হলো কখন থেকে চুপ করে আছেন কিছু বলছেন না কেন? যান যান বাড়িতে যান পরে গেট বন্ধ করে দিলে রাতে এখানেই থাকতে হবে আপানাকে।
এবার মেয়েটা থামতে আদনান হালকা হাসি দিয়ে বললো,
- আসলে কখন যে সময় চলে গেছে বুজতে পারি নি। আর ধন্যবাদ আপনাকে নয়তো আজকের রাতটা হয়তো এখানেই কাটাতে হতো।
এই বলে আদনান দারিয়ে তার খাতা আর কলমটা পেন্টের পকেটে রেখে দিলো। মেয়ে টাও আর দারালো না হাটা ধরলো বাড়ির পথে৷ মেয়েটার চলে যাওয়ার পানে আদনানের মনে হলো মেয়েটাকে কোথাও দেখেছে তাই মেয়েটাকে পেছন থেকে ডাকলো ,
- এই যে ম্যাডাম শুনছেন!
আতনানের ডাকে মেয়েটা পেছন ফিরে তাকালো দেখলো। মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,
- আপনি কি আমাকে ডাকছেন?
আদনান মাথার মাধ্যমে হ্যাঁ জানালো।মেয়েটা সেখানেই দারালো আদনান মেয়েটার সামনে এসে কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- আপনাকে হয়তো আমি কোথাও দেখেছি?
তারপড় আদনান কিছু একটা মনে করে নিজেই বলা শুরু করলো,
- তুমি এই কলেজেই ইন্টার প্রথম বর্ষের ছাত্রী তাই না?
মেয়েটা কিছু না বলে শুধু উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। আদনান ঠিকই ধরেছে মেয়েটা এই কলেজেই পড়ে। কিছুক্ষন পর মেয়েটাই আদনানকে কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
- এই আপনি আমাকে কিভাবে চিনেন? আমি কোন ক্লাসে পড়ি সেটাও জানেন দেখছি। তা আমার বিষয়ে এতকিছু কিভাবে জানলেন?
মেয়েটার কথা শুনে আদনান বিরক্ত স্বরে বললো,
- না আপনাকে এই কলেজের ক্যামপাসে দেখেছি তাই জিজ্ঞেস করলাম। আমিও এই কলেজেই পড়ি অনার্স ৩য় বর্ষে। চেনা চেনা লাগলো তাই ডেকেছিলাম। আপনার যদি খারাপ লেগে থাকে তাহলে মাফ করবেন!
মেয়েটা কিছুক্ষন আদনানকে পরখ করে শান্ত স্বরে বলা শুরু করলো,
- না না খারাপ লাগবে কেন! তারউপড় আপনি তো আমার সিনিয়র। আচ্ছা যাই হোক, আমি নীলাঞ্জনা রহমান। আর আপনি?
আদনানও সাবলীলভাবে জবাব দিলো,
- আমি আদনান চৌধুরী।
আদনান বা নিলাঞ্জনা তখনও জানত না, এই সাধারণ পরিচয়টাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গল্প হয়ে উঠবে।
ধরনীতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে বহুক্ষন হলো। মাগরিবের আজান এখনও শোনা যাচ্ছে কিছু মসজিদের মাইকে। ঝোপঝাড় থেকে ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। নভেম্বর মাস হওয়ায় এই সময়টাতে ভালোই ঠান্ডা পড়া শুরু হয়ে গিয়েছে৷ হালকা শীতল হাওয়ায় যেন শরীরে কম্পন বয়ে যায়। পাখীরা তাদের নিজ নিজ ঘরে ফিরেছে গিয়েছে। গ্রামের মানুষজন তাদের দৈনন্দিনের কাজ শেষ করে বাড়ির পথে হাটা ধরেছে। চায়ের দোকান গুলোতে মুরুব্বিরা মিলে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রেডিওতে দেশের খবর শুনছেন আর নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করছেন।
- সন্ধ্যা হয়ে রাত হতে চললো তাও মেয়েটার কোনো খোজ নেই। কে জানে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে? আমার কি কোনো কথা শুনবে! শুনবে না তো।
রান্না ঘর থেকে নিলার মা সালনা বেগমের রাগান্বিত কন্ঠ শোনা যাচ্ছে৷ অন্দর মহলেই বসে চা আর বিস্কুট খাচ্ছেন সাথে রেডিওতে খবর শুনছেন জমিদার মাহবুবুর রহমান। সালমা বেগমের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে রেডিওটা বন্ধ করলেন। আর মাহবুবুর আর মনে মনে বিরবির করে বললেন
- সত্যিই তো মেয়েটা তো এত দেরি করে না কখনও। আজ হঠাৎ এত দেরি হচ্ছে কেন? ওর প্রাইভেট তো শেষ হয়েছে আরো ১ ঘন্টা আগে তাহলে কোথায় গেলো মেয়েটা।
মাহবুবুর দুশ্চিন্তা করতে লাগলেন মেয়ের জন্য। আর ওইদিকে রান্না ঘর থেকে সালমা বেগমের চিৎকার চেঁচামেচি যেন থামছেই না। সব মিলিয়ে মাহবুবুল রহমানের মাথা ধরে এলো। শেষে তিনি সালমা বেগমেকে বিরক্ত স্বরে বললেন,
- আহ সালমা থামো এবার! দেখছো মেয়েটা এখনও বাড়ি ফেরে নি। মেয়েটার জন্য চিন্তা না করে চিৎকার চেচামেচি শুরু করে দিয়েছো।
মাহবুবুর রহমানের কথা শুনে যেন আরো তেঁতে উঠলেন। সালমা এবার রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে মাহবুবুর রহমানের উপর রাগ দেখিয়ে বলতে লাগলেন,
- চিৎকার চেচামেচি করবো না তো কি করবো? সময় দেখেছেন একবার? রাত হতে চললো। অথচ বাড়ির মেয়ে এখন বাড়ির বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। গ্রামের লোক দেখলে তো আপনারই সম্মান যাবে। বলবে- জমিদার বাড়ির মেয়েদের ভালো শিক্ষা দেন নি। এত রাতেও জমিদারের মেয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন তো সবাই আপনাকে কথা শোনাবে। এজন্যই বলি মেয়েকে একটু শাসন করুন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? মেয়েকে আশকারা দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলছেন। তাই এখন আর কোনো কথা শোনে না আমার।
এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে দম নিলেন সালমা। এদিকে মাহবুবুর রহমান চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন। কারন এখন তিনি যাই বলবেন সালমা তত বেশি কথা বাড়াবে। তাই মাহবুবুর কিছু না বলে চুপচাপ বসে রয়েছেন। এরইমধ্যে সালমার কথা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নীলার দাদি জোহরা বেগম৷ বয়স ৬৯ পেরিয়েছে। বয়সের ভারে মেরুদণ্ডের বাঁকা হয়ে গিয়েছে যার ফলে লাঠি দিয়ে হাটা ছাড়া উপায় নেই। লাঠির উপর ভর দিয়ে অন্দরের দিকে আসচ্ছেন জোহরা। এসে সালমা কে বিরক্ত হয়ে বললেন,
- কিগো বউ কি হইছে? ভর সন্ধ্যা বেলা এত চিৎকার চেচামেচি করতাছো কে? শান্তি মতো ঘরে বইসাও থাকতে পারতাছি না তুমাগো লাইগা।
জোহরা বেগম আসতেই তার কাছেও নীলাঞ্জনার কথা বলতে শুরু করলেন৷ সালমার কথা শুনে তো জোহরা বেগম রাগে দাতে দাত পিষে মাহবুবরকে বললেন,
- কিরে মাহবুব তোর মাইয়া কি কোনোদিন আমাগো কথা হুনবো না? মাইয়া মানুষ হইয়া রাত বিরাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাছে এইডা কি ঠিক? গ্রামের মানুষ দেখলে কি কইবো ভাবছোস একবার।
জোহরার কথায় সায় দিয়ে সালমাও বললেন,
- আমিও সেটাইই বলছি মা। গ্রামের মানুষ কেমন সেটা সবার জানা। একটা ছোট কথাকে তারা টেনে কত বড় বানায়! তার উপর জমিদার বাড়ির নিয়ে কথা হলে তো আর কথাই নেই। পুরো গ্রাম জুরে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায় ।
মাহবুবুর রহমান এখনও নিশ্চুপ। কোনো কথা বলছেন না তিনি। এমন সময় সদর দরজায় কেউ কড়া দিলো। কেউ এসেছে ভেবে জোহরা আর সালমা দুজনে চুপ হয়ে গেল। মাহবুবুর রহমান উঠে বসলেন। সালমা বেগম গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।
চলবে....
