#তোর_আশিকি #উপন্যাস
#পর্ব:৫
প্রিসিলার সেই টোল পরা হাসিতে বুকের ভেতর চিনচিনে এক ব্যথার জোয়ার বয়ে গেলো জ্যাকভের। সে নিষ্প্রভচেয়ে দেখলো সেই হাসিটুকু। তার ওই নেশাগ্রস্ত চাহনিতে অস্বস্তিতে কাটা গেলো প্রিসিলা। মুখের ভেতর উদয় হও-য়া তেঁতো একটা ভাব ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। ঠোঁট নাড়ি-য়ে বললো,
আমরা তাহলে আসি?
সে কি? এখানে কেন এসেছিলে সেটাই জানা হলোনা?
-না না তেমন কিছু নয়।
- প্লিজ বলো আমি শুনতে চাই?
জ্যাকভের তোড়জোড় দেখে হঠাৎ করেই একটা শয়তানি বুদ্ধির উদয় হলো প্রিসিলার মনে। ইয়াশের উপর জমানো এতো বছরের ক্ষোভ সব ফুলেফেঁপে উঠলো যেন। যার জন্য ঘরে বাইরে কোথাও শান্তি নেই তাকে তো একটা শি-ক্ষা দিতেই হয়। সেই ভেবেই ভেতর ভেতর পৈশাচিক তৃপ্তি পেলো মেয়েটা। পরক্ষণেই চোখেমুখে অসহায় ভাবাবেগ লেপে আওড়ালো,
- সত্যিই শুনতে চান?
বলে দেখোইনা একবার। রুপাঞ্জেলের আদেশ সর্বদা স্বীয়ধার্য।
জ্যাকভের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের ঢেউ। প্রিসিলা মিনমিনিয়ে বললো,
ইয়াশ আজ আমার সঙ্গে খুব খারাপ করেছে। আমার রুমের সবকিছু ভেঙে ফেলেছে। পাপা মাম্মা কেউ ওকে কিছু বলেনা। সেই সুযোগে আমার সঙ্গে সারাক্ষণ দূর্ব্যব-হার করে। গায়ে ও হাত তোলে জানেন?
প্রিসিলার কথা শুনে রাগে লাল হয়ে গেলো জ্যাকভ।
কন্ঠে ক্ষোভ নিয়ে বললো,
- কিহ! ইয়াশ এমন করে বাড়িতে? তোমার মতো একটা ফুলের গায়ে হাত তোলার অপরাধে ওর তো শাস্তি হওয়া দরকার। ছেলেপেলে নিয়ে একচোট ধোলাই দিবো কিনা বলো?
না না। সেসবের দরকার নেই, ওই লম্বু হনুমানের এক থাপ্পড়েই আপনার মাথা ঘুরে যাবে। চোখে জোনাকি দে-খতে শুরু করবেন। মাঝেমধ্যে খাই তো জানি। এরচেয়ে ভালো হয় ওকে অন্যভাবে শায়েস্তা করলে।
-- কি ভাবে?
- একটু কাছে আসুন কানেকানে বলছি।
প্রিসিলার কথায় খুশিতে গদোগদো হয়ে ওর দিকে কান বাড়িয়ে দিলো জ্যাকভ। প্রিসিলা একটু ইতস্তত হয়েই ফি-সফিসিয়ে প্ল্যান বললো নিজের। তা শুনে শয়তানি হাসি হাসলো ছেলেটা। পরক্ষনেই কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সতর্ক গলায় বললো,
- যদি ধরা পরে যাই?
আমাকে ছাড়বেনা।
জ্যাকভের সিদ্ধান্তহীনতায় বিরক্ত হয়ে প্রিসিলা নিজের ব্রহ্মাস্ত্র কাজে লাগালো এবার। চোখেমুখে মলিন অভিব্য-ক্তি টেনে ঠোঁট দু'টো গোলাকৃতির বানিয়ে নিচু গলায় বললো,
আমিতো ভেবেছিলাম আজকের প্ল্যানটা সাকসেস-ফুল হলে, হলি ডে-তে আপনার সঙ্গে ডেটে যাবো। অথচ আমার জন্য এটুকু করতে পারবেন না আপনি?
ডেটের প্রসঙ্গটা ছিল জ্যাকভের কাছে মেঘ না চাইতে বৃ-ষ্টি মতো। যে মেয়ে কখনো ভালো করে ফিরেও দেখেনি, সে নাকি ডেটে যাবে ওর সঙ্গে। অধরা জিনিস হাতে পাও-য়ার আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো অন্তর। উচ্ছ্বাসিত হয়ে বললো,
-সত্যি বলছো ডেটে যাবে? আমার সঙ্গে?
যদি প্ল্যান সাকসেসফুল হয়।
বিপরীতে কঠিন এক শর্তজুড়ে দিলো প্রিসিলা।
জ্যাকভ গমগমে আওয়াজে জবাব দিলো,
-- ঠিক আছে ডিল ফাইনাল। এ্যামিউজমেন্ট পার্কে দেখা হচ্ছে নেক্সট সানডে।
এতো কনফিডেন্স?
-ওভার কনফিডেন্স!
বলেই প্ল্যান মাফিক নিজের কাজে ফিরে গেলো জ্যাকভ।
ওদিকে পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে পাতলা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেলো নোভার মুখ। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ শঙ্কিত হয়ে সতর্ক করলো প্রিসিলাকে,
আই থিংক এটা খুব খারাপ হবে প্রিসি! একেবারে জঘন্য একটা প্ল্যান।
- হোক। কাটা দিয়েই কাটা তুলবো আমি।
প্রিসিলার কন্ঠে আত্মবিশ্বাস। নোভা আবারও অস্থির হয়ে বললো,
এই কাজের ফল তোমার জন্য খারাপ কিছু বয়ে আনতে পারে। কেন বুঝতে চাইছো না?
প্রিসিলা আর কথা বাড়ালো না মনে মনে খুব জিদ নিয়ে আওড়ালো,
- রিভেঞ্জ নেওয়ার সময় হয়েছে এতোদিনে। ইয়াশ ইউ-ভান উইল বি পেইড ফর ইট।
বাক্যকটা শেষ করে লম্বা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে চট করেই ঘুরলো চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে সঙ্গে চুল-গুলো আঁচড়ে পড়লো ওদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আগ-ন্তুকের মুখের উপর। চিরচেনা একটা সুঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে পৌঁছাতেই চোখমুখ কুঁচকে ফেললো ইয়াশ। পরপরই সোনালু চুলগুলো এসে পড়লো তার মুখের উপর।
ঝোরো হাওয়ার মতো চুলের ঝাপটায় চোখটা একটু বুঁজে যেতেই পাশ থেকে জার্সি পরিহিত আরেকজন সুদর্শন যুবক এসে বললো,
- আর ইউ ওকে ব্রো?
সে কথার জবাব দিলো না ইয়াশ। উল্টো চোয়ালের পেশী শক্ত করে নিষ্প্রাণ ধারালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো প্রিসি-লার পানে। এ যেন ইয়াশ নয়, স্বয়ং মাফিয়া বস এরীশ ইউভান। মুখ ফিরিয়ে অকস্মাৎ এই শীতল চোখ দু'টো দেখে ভড়কে গিয়েছে প্রিসিলা। ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে ও নিজেও স্তম্বিত হয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। একটুবাদেই দু'জনার মাঝে বিরাজমান থমথমে নৈঃশব্দ ভাঙলো পাশে থাকা সেই সুদর্শন।
প্রিসিলা তুমি এখানে?
নমিত মস্তক খানিকটা উঁচু করলো প্রিসিলা। আড় চোখে একপল ইয়াশকে পরখ করে দৃষ্টি ঘোরালো সে। পাশের ছেলেটার দিকে চেয়ে জোরপূর্বক হেসে বললো,
আসলে.... আসলে আপনাদের কেই চিয়ার আপ করতে এসেছিলাম নিকো।
স্বভাবসুলভ হাসলো নিকো। প্রিসির মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের স্বরে বললো,
- সু সুইট অফ ইউ্য বেবী।
নিকোর মুখে বেবী সম্মোধনটা খুব অপছন্দ করে প্রি-সিলা। শুনলেই মনে হয় নিকো তাকে স্রেফ একটা বাচ্চা ভাবে। বন্ধুর ছোট বোন হিসেবে স্নেহ করে সবসময়। কিন্তু প্রিসিলার মনগহীনে চলমান অনুভূতির জলস্রোত তো বি-পরীতমুখী। নিকো সামনে থাকলে সবকিছু এলোমেলো লাগে তার, কথাও গুলিয়ে যায়। ভুলভাল কাজগুলো সবসময় নিকোর সামনেই কেন হয় কে জানে?
এবারও পরিস্থিতি জটিল। প্রিসিলার চিবুক গিয়ে গলায় ঠেকেছে। ফলস্বরূপ তাল গাছের মতো সটান দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের চওড়া বক্ষদেশ ব্যতিত আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না আপাতত। একটু আগের বলা কথাগুলো ইয়া-শের কর্ণগোচর হয়েছে কিনা সেই ভেবেই আপাতত বুক ধুকপুক করছে তার।
ক্ষণিকের মাঝেই ভয়ে ভয়ে দৃষ্টি তুলে আবারও তাকালো ইয়াশের দিকে। চোখ তুলতেই প্রখর জলন্ত দৃষ্টির সঙ্গে মিলন ঘটে গেলো ভীত চাহনির। সঙ্গে সঙ্গে আবারও চোখ নামিয়ে দিলো প্রিসিলা।
এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো, ছেলেটার চোখ দু'টো ভারী মনোহর। তবে দৃষ্টির প্রখরতা অতিশয় রুক্ষ আর তে-জালো। তাকালেই বুকের পাঁজর বিদ্ধ হয়।
- গেট আউট!
অবশেষে নিস্তব্ধতা ভেঙে মুখ খুললো ইয়াশ। আর খো-লার সাথে সাথেই বিস্ফোরণ। ইয়াশের হঠাৎ ছোড়া বা-কো অসর্তকতায় ধড়ফড়িয়ে উঠলো প্রিসিলা। অপ্রস্তুত দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো তার ঠোঁটের নিচের তিলের উপর। সঙ্গে সঙ্গে আবারও কথার পুনরাবৃত্তি করলো ইয়াশ। এবার একটু কঠিন গলায়,
-গেট আউটটট!
অন্য সময় হলে হয়তো সেভাবে গ্রাহ্য করতো না, কিন্তু এই মূহুর্তে নিকোর সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা যেন সমগ্র মস্তিষ্কজুড়ে আলোড়ন তুললো প্রিসিলার। মূহুর্তেই অপ-মানে থমথমে হয়ে গেলো তার মুখ। ইয়াশের রুক্ষ আও-য়াজের বিপরীতে ঝাঁঝিয়ে উঠে কিছু বলবে, তার আগেই বাঁধ সাধলো নিকো। ইয়াশকে একপ্রকার শাসিয়ে উঠে কড়া গলায় বললো,
- আর ইউ্য ইনসেইন ব্রো? বোনের সঙ্গে কেউ এভাবে
কথা বলে?
- ও আমার বোন নয়।
- আচ্ছা, তাহলে ও কি?
নিকোর প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল। ইয়াশ কি না কি বলে ফেলবে সেই ভেবেই কুঁকড়ে গিয়েছিলো প্রিসিলা। ছেলে-টার মুখে লাগাম নেই একদম। না জানি আবার নিকোর সামনেই অপমান করে বসে। ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে গুম হয়ে রইলো প্রিসিলা। ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো পু-রুষালি রুক্ষ আওয়াজ,
হাউসমেট বলতে পারিস। আমরা এক বাড়িতেই থাকি। বাট উই আর নট দ্যাট ক্লৌজ।
ডাঁটিয়াল স্বরে জবাব দিয়ে হনহনিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো ইয়াশ।
-ঘাড়ত্যাড়া একটা।
ইয়াশকে উদ্দেশ্য করে স্বগোতক্তিতে কথাটা বলেই প্রি-সিলা আর নোভার দিকে মনোনিবেশ করলো নিকো। তরল গলায় জানতে চাইলো,
-- আর ইউ্য ওকে?
এখন ঠিকঠাক।
মৃদু হেসে বাধ্য মেয়ের মতো দু'দিকে মাথা নাড়ালো প্রি-সিলা। নিকো সামনে আছে মানেই চারিদিকে লক্ষ্য তারার মেলা। জরাজীর্ণ এই পৃথিবী যেন রঙধনুর মতো রঙিন। চারিদিকে একটা সুখ সুখ হাওয়া। ঠিক না হয়ে যাবে কো-থায় ও?
নিকোর হাতে দু'টো কোল্ড ড্রিংকের ক্যান ছিল, যার একটা ইয়াশের। সেটাই আপাতত এগিয়ে দিলো প্রিসি-লাকে। অন্য হাতে যেটা ছিল সেটার ক্যানটা খোলা। সহসা একটু ইতস্তত ভাবেই এগিয়ে ধরলো নোভার দিকে। মেয়েটার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে প্রসিদ্ধ গলায় বললো
জাস্ট ক্যানটাই খুলেছি, এখনো চুমুক দিইনি। নিঃস-ন্দেহে নিতে পারেন।
প্রসন্ন হাসলো নোভা। খুব সাবলীল ভাবেই কোল্ড ড্রিংক-সটা গ্রহন করে নমনীয় স্বরে জবাব দিলো,
সমস্যা নেই দিন।
চুমুক দিলেও সমস্যা নেই?
নিকোর মুখ ফস্কে কথাটা বেরোতেই চোখ তুলে চাইলো নোভা। লম্বা চওড়া সৌম্যকান্ত চেহারা ছেলেটার। ঝিলের জলের মতোই স্বচ্ছ তার দৃষ্টি।
অথচ চাহনিতে ভর করেছে অপার মুগ্ধতা।
আচ্ছা, কিসের সৌন্দর্যে এমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছে তার দু'নয়ন?
মোহাচ্ছন্ন ওই টলটলে জলের মতো চোখ দু'টোতে চেয়ে থাকতে থাকতেই অকস্মাৎ প্রশ্নটা জাগলো নোভার মনে।
অডিটোরিয়ামের বিস্তৃত গ্যালারী জুড়ে মানুষের গিজ-গিজ। সবাই বসে আছে প্লেকার্ড আর লাইটস্টিক হাতে নিয়ে। আজকে ফাইনাল ম্যাচ। পরপর ২০০ এর অধিক দলকে হারিয়ে সর্বশেষ যে দু'টো দল টিকে থেকেছে তা-রাই খেলবে আজ।
ডেয়ারডেভিল ভার্সেস ওশেনহার্ট। প্রতিটি দলে ছয়জন করে মেম্বার আর একজন ক্যাপ্টেন রয়েছে। এরা তুখোড় প্রোগেইমার। রোবোটের চেয়েও দ্রুত চলে তাদের আঙুল। একেকজনের দক্ষতায় রীতিমতো ঝড় বয়ে যায় কিবোর্ডের উপর। যদিও সবটাই দীর্ঘ তপস্যার ফল।
চারিদিকে উৎসুক জনতার প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একে একে স্টেজে এসে উপস্থিত হলো দুই দলের গেইমাররা।
তারা আসতেই গ্যালারীর ঝকঝকে বাতিটা একটু ফিকে হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে বিশাল স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠলো ম্যাপের ইমেজ। উচ্চ পাহাড়, ঘন জঙ্গল, আর খোলা আকাশ। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত সকলে নড়চড়ে বসলো এবার। মনোযোগ বিশাল পর্দায় নিবদ্ধ।
খেলোয়াড়রা এগিয়ে গিয়ে নিজেদের স্টেশনে বসলো। ডেয়ারডেভিল টিমের লম্বা, সুদর্শন কলেজ হার্টথ্রোব ক্যা-প্টেন এগিয়ে এসে নিজের আসন নিতেই সবার মাঝে একটা হইরই পরে গেলো। আবারও শোনা গেলো ফিস-ফাস। ইয়াশ সেদিকে ঘুরেও তাকালো না। এই মূহুর্ত খুবই মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সে। স্ট্রেস কমানোর জন্য মাত্রই ব্যকস্টেজে দাঁড়িয়ে পরপর তিনটা সিগারেট শেষ দিয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি।
দেখতে দেখতেই কানে হেডসেট, চোখে রিমলেস রিডিং গ্লাস আর হাতে একটা টাইমার ঘড়ি চড়িয়ে প্রস্তুত হয়ে নিলো ইয়াশ। আপাতত হাতের কন্ট্রোলার বা কীবোর্ড- মাউস চেক করছে সে।
