প্রথম পর্ব
রাত অনেক গভীর।
ঢাকার অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ‘মাহমুদ ভিলা’ আজ আলোয় ঝলমল করছে। বাড়ির প্রতিটি কোণায় বিয়ের সাজসজ্জা।
অথচ দোতলার একটি ঘরে বসে থাকা রুহি কাউসারের মনে কোনো আনন্দ নেই।
বিয়েটা হয়ে গেছে।
কিন্তু যাকে বিয়ে করেছে, তাকে সে এর আগে কখনো দেখেনি।
এমনকি তার নামটাও জানত না।
খালার সিদ্ধান্তেই আজ তাকে এই বাড়িতে আসতে হয়েছে।ছোটবেলা থেকে খালার বাড়িতে বড় হয়েছে। তাই আর খালার মুখের উপর কিছু বলতে পারেনি।
রুহি বিছানার একপাশে বসে নিজের মেহেদি দেওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে ভাবছে,, এবার কি তাহলে তার জীবনে আনন্দ আসবে? নাকি সবসময়ের মত এবার এসেও চলে যাবে?
কিছুক্ষণ পর নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,
— মানুষটার নামটাও জানি না! কেমন দেখতে সেটাও জানি না!
ঠিক তখনই—
দরজা খুলে গেল।
রুহি একটু নড়েচড়ে বসলো।
দরজা দিয়ে একজন পুরুষ ঘরে প্রবেশ করল।
রুহি প্রথমবার তাকে দেখল।
লম্বা, গম্ভীর মুখ। চোখেমুখে কোনো আবেগ নেই। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। হাঁটার মধ্যেও এক ধরনের কঠোরতা।
লোকটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
রুহি চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এটাই তাহলে তার স্বামী?
লোকটি বিছানার দিকে তাকাল না পর্যন্ত।
সাজ্জাদ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— তোমার সঙ্গে আমার বেশি কথা বলার কিছু নেই।
রুহি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সাজ্জাদের মুখের ভাব একটুও বদলাল না।
— শুধু একটা কথা জানিয়ে দিতে এসেছি।
একটু থেমে সে বলল,
— আমি এই বিয়ে মানি না।
রুহির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সাজ্জাদ শান্ত, কিন্তু কঠিন গলায় বলল,
— এই বিয়েতে আমার কোনো সম্মতি ছিল না। আমার মা আমাকে জোর করে এই বিয়েতে রাজি করিয়েছেন।
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।
সাজ্জাদ নিচু গলায় বলল,
— আমার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি আর বিয়ে করতে চাইনি। তাই তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
রুহি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সাজ্জাদ আর কিছু বলল না।
কয়েক মুহূর্ত পর সে ঘরের একপাশে রাখা সোফার দিকে এগিয়ে গেল।
রুহি তখনও নিশ্চুপ।
সাজ্জাদ সোফায় বসে পড়ল।
রুহি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
লোকটার কথাগুলো বারবার কানে বাজছে।
“এই বিয়েটা আমি মানি না।”
কথাটা যতবার মনে পড়ছে, বুকের ভেতরটা ততবার কেমন করে উঠছে।
রুহি জানালার দিকে তাকাল।
ছোটবেলা থেকেই সে বাবা-মা ছাড়া বড় হয়েছে। খালাই ছিল তার আপনজন। সবসময় মনে হতো, একদিন তারও একটা নিজের মানুষ হবে।
যে তাকে নিয়ে চিন্তা করবে।
তার অভিমান বুঝবে।
মন খারাপ হলে পাশে বসবে।
কিন্তু আজ?
বিয়ের রাতেই সে বুঝে গেল—এই মানুষটার কাছে তার কোনো মূল্য নেই।
রুহি নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল।
চোখের কোণে পানি জমে উঠেছে।
সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল।
না।
সে কাঁদবে না।
কাউকে দেখাবে না যে কথাগুলো তাকে কষ্ট দিয়েছে।
নিজের মনে মনে বলল।
—কোনো একদিন হয়তো আমাকেও ভালোবাসবে কেউ,,কিন্তু এখন সেই আসাটাও আর নেই!
কথাটা বলতে গিয়েই গলাটা কেঁপে উঠল।
রুহি মাথা নিচু করে বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে করে বলল,
— আমারও তো ইচ্ছে ছিল... কেউ একজন আমাকে নিজের মানুষ বলে ডাকুক।
তারপর নিজেই থেমে গেল।
চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়তে চাইছিল।
রুহি হাতের মেহেদির দিকে তাকাল।
এই মেহেদি, এই বিয়ের সাজ—সবকিছু আজ হঠাৎ অর্থহীন মনে হচ্ছে।
তারপরও নিজের চোখ মুছে একটা ছোট্ট হাসি দিল।
— থাক... এত কষ্ট পাওয়ার কী আছে? মানুষটা তো আমাকে চিনেই না।
কিন্তু কথাটা বলার পরও বুকের ভেতরের কষ্টটা কমল না।
কারণ রুহি জানে—
আজ থেকে সে এমন একজন মানুষের সঙ্গে থাকবে, যে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণই করতে চায় না।
আর সবচেয়ে বেশি কষ্টের বিষয়—
“ ”রুহির নিজের বলে ভালোবাসার মতো মানুষ বলতে ” সত্যিই কেউ নেই।“ ”
