#Murderer_in_the_dark_of_night
#writer_SumaiyaSultana
[ কপি করা নিষেধ 🚫]
সিএনজি ভাড়া মিটিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল নেহা। মেন গেটের ভিতরে ছোট চেয়ারের উপর বসে আছে এক জন মধ্যবয়স্ক লোক, গেটে কড়া নাড়ায় পকেট গেটটা খুলে দিলেন। আজকে তার কাজের প্রথম দিন তাই এই চার জন মেয়েকে তিনি চিনতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলে,
— কে তোমরা, কী চাই এখানে?
নেহা কিছুটা অবাক হলো প্রথমে কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো গত রাতে মুনকে একজন দারোয়ান ঠিক করে দিতে বলেছিল। তবুও নিশ্চিত হতে লোকটাকে তার নাম জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনার নাম কি চাচা?
— রহমান,
নামটা শুনে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো লোকটাকে মুন পাঠিয়েছে কারণ মুন সকালে তাকে মেসেজ করে বলেছে রহমান নামে একজন লোক পাঠিয়েছে। নেহাকে চুপ থাকতে দেখে লোকটা আবার প্রশ্ন করলো,
— কি হলো, বললেন না আপনার কে?
নেহা তার মুখের মাস্ক খুলে হাতে নিল। নেহার মুখে দেখেই লোকটার আর চিনতে দেরি হলো না। কারণ মুন নেহার ছবি দেখিয়েছে তাকে~
— চাচা, এবার চিনতে পেরেছেন।
এক গাল হাসি নিয়ে বললো লোকটা,
— হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। ক্ষমা করে দিবেন মামুনি আপনার মুখে মাস্ক থাকায় চিনতে পারিনি।
— আরে নাহ, এখানে ক্ষমা চাওয়ার কি আছে। আমি আপনার মেয়ের মতো। আচ্ছা চাচা আপনার সাথে আমি পরে কথা বলব।
— ঠিক আছে মামুনি।
নেহা লোকটার ব্যবহারে মুগ্ধ হলো। তবে আর কিছু বললো না, সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো।
মেন গেট পার হতেই মাইরা আর আরু দুজনেই কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। জাহিয়া অবশ্য নেহার সঙ্গে আগেই এগিয়ে গেছে। নেহা তাদের দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
— তোরা এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? চল। এখন থেকে এখানেই তো থাকবি। তখন মান ভরে দেখে নিস।
— দাঁড়া, আগে বল... এটা সত্যিই তোর বাসা? — মাইরা সন্দেহভরা চোখে বলল।
নেহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— কেন? সন্দেহ হচ্ছে?
— না, তা না। কিন্তু...
— কিন্তু কী?
মাইরা আর কিছু বলল না। শুধু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় যে কতগুলো প্রশ্ন ঘুরছে, সেটা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে।
আরু মাইরার হাত টেনে বলল—
— চল তো আগে ভিতরে যাই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়িটা গুনে শেষ করবি নাকি?
রহমান তাদের কথা শুনে হাসলেন। তিনি আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন।
নেহা তিনজনকে নিয়ে বাড়ির মূল দরজার দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সবুজ বাগান আর বিশাল বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মাইরা আর আরু বিস্ময়ভরা চোখে চারপাশটা দেখছিল।
কলিংবেলের শব্দে ভেতর থেকে রাহি দৌড়ে এলো। দরজা খুলে নেহার সঙ্গে তিনজন মেয়েকে দেখে তার মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল।
— আপামনি, ওনারা কারা?
রাহির মুখে যেন সবসময়ই হাসি লেগে থাকে। শ্যামলা গায়ের বর্ণ, গোল মায়াবী মুখ, টানা টানা চোখ আর লম্বা কালো চুলগুলো সুন্দর করে বেণি করা। পরনে সাদামাটা কামিজ-সালোয়ার। মেয়েটা এমনই মিশুক প্রকৃতির যে, তার সঙ্গে এক মিনিট কথা বললেই মনে হবে কত দিনের পরিচয়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রাহিকে দেখলেই নেহার মনটা কেমন যেন ভালো হয়ে যায়। যতই খারাপ থাকুক, মেয়েটার মুখের হাসিটা দেখলেই বুকের ভেতরের ভারটা একটু হলেও কমে আসে।
নেহা জুতোর ফিতা খুলতে খুলতে শান্ত স্বরে বলল—
— আমার ফ্রেন্ড। আজ থেকে ওরা আমার সঙ্গে এখানেই থাকবে। ওপরের রুমগুলো পরিষ্কার করে দাও।
— আমি এখনই পরিষ্কার করে দিচ্ছি, আপামনি।
বলেই রাহি মাইরা আর আরুর দিকে তাকাল। দুজন তখনো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখছে।
— আপনারা ভিতরে আসেন।
বলতে বলতেই রাহি তাদের ব্যাগ দুটো হাতে নিয়ে নিল।
রাহির কথায় যেন তাদের ধ্যান ভাঙল। দুজন তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে পড়ল। রাহি দরজাটা লক করে ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
নেহা আর জাহিয়া গিয়ে সোফায় বসল। মাইরা আর আরুও তাদের পাশে বসে পড়ল।
মাইরা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর আবার নেহার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাল।
— দোস্ত...
— হুম?
— এটা কি সত্যিই তোর বাসা?
নেহা ভ্রু তুলে তাকাল।
— আবার?
— আরে না, মানে... এত বড় বাড়ি দেখে একটু অবাক হয়েছি।
— অবাক হওয়ার কী আছে?
— কিছু না।
মাইরা মুখ বন্ধ করলেও তার চোখ-মুখ বলছে, মাথার ভেতর এখনো অনেক প্রশ্ন ঘুরছে।
জাহিয়া সেটা বুঝতে পেরে হঠাৎ পেটের ওপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল—
— এই রোজ, আমার কিন্তু প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে!
নেহা হেসে ফেলল।
— তোর খিদের কোনো শেষ আছে?
— না। আর সেটা তুই জানিসও।
— ঠিক আছে, আগে ফ্রেশ হয়ে নে। তারপর খাবি।
নেহা রাহিকে ডাকল—
— রাহি!
উপর থেকে রাহির কণ্ঠ ভেসে এলো—
— জি, আপামনি!
— রুম পরিষ্কার হয়েছে?
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে রাহি বলল—
— জি, আপামনি। হয়ে গেছে।
নেহা জিহুর দিকে তাকিয়ে বলল—
— জিহু, তুই আমার সঙ্গে চল। আর মাইরা, আরু তোরা রাহির সঙ্গে যা। ফ্রেশ হয়ে নে।
— আচ্ছা।
রাহি তাদের নিয়ে দোতালার ডান দিকে চলে গেল। নেহাও জাহিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বাম দিকে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে পৌঁছাতেই পেছন থেকে জাহিয়ার কণ্ঠ ভেসে এলো—
— রোজ...
নেহা থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
— হুমম?
জাহিয়া ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর কোনো কথা না বলে নেহার দুটো হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে তাকে টেনে রুমের ভেতর নিয়ে গেল। সোফায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসে পড়ল।
নেহা ভ্রু কুঁচকে ইশারায় জানতে চাইল, কী হয়েছে।
জাহিয়া মুচকি হাসল।
— আমার তো কিছু হয়নি। তবে তোকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়ে যাবে।
নেহা অবাক হয়ে তাকাল।
— আমি আবার কী করলাম?
জাহিয়া উওর দিলো না। সোজা নেহার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,—
— কী হয়েছে তোর?
— কিছু হয়নি।
— আমার সঙ্গে মিথ্যা বলবি না, রোজ।
নেহা চুপ করে গেল।
জাহিয়া তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল—
— তোর কী মনে হয়? আমি কিছু বুঝি না? তুই যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করিস, আমি ঠিক বুঝতে পারি কখন তোর ভেতরটা ভালো নেই।
নেহা এবারও কোনো উত্তর দিল না। শান্ত মুখে বসে রইল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর জাহিয়া ধীর স্বরে বলল—
— রোজ... তুই এই বাড়িতে ফিরেছিস মানে মামা-মামী সব জেনে গেছে?
নেহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ছোট্ট করে বলল—
— হুম।
শুধু একটা শব্দ।
কিন্তু সেই একটা শব্দের মধ্যেই যেন অনেক কথা লুকিয়ে ছিল।
জাহিয়া আর কিছু বলল না।
নেহা ধীরে ধীরে তার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলমারি খুলে একটা গেঞ্জি আর পাজামা বের করল। তারপর কোনো কথা না বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর বেরিয়ে এলো। পরনে গেঞ্জি আর পাজামা। মুখটা আগের মতোই শান্ত, অথচ চোখের গভীরে অদৃশ্য একটা ক্লান্তি।
জাহিয়া তখনো সোফায় বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
নেহা সেটা দেখে আলমারি থেকে আরেকটা গেঞ্জি আর পাজামা বের করে জাহিয়ার হাতে দিয়ে বলল—
— চেঞ্জ করে আয়। আমি নিচে যাচ্ছি।
জাহিয়া কাপড় দুটো হাতে নিল। কিছু বলতে চেয়েও বলল না।
শুধু নেহার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
কারণ সে জানে, নেহা মুখে যতই বলুক ‘কিছু হয়নি’—আসলে কিছু একটা হয়েছে।
——————————————————
#চলবে
