~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব – ৮ : অজানা অধিকার
রাত প্রায় আটটা।
মির্জা গ্রুপের অফিসের কাচঘেরা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিয়ান। হাতে কফির কাপ, চোখে গভীর চিন্তার ছাপ।
রায়ানের দেওয়া মেসেজটা বারবার মাথায় ঘুরছে তার।
রহমান পরিবারের সেই সদস্য এখন আরিশার কাছের মানুষ!
কিন্তু কে সে?
— স্যার, কিছু বলবেন?
রায়ানের কথায় আদ্রিয়ান পেছনে ফিরে তাকাল।
— লোকটার পরিচয় বের করো। আমি চাই, আগামীকালের মধ্যে তার সম্পর্কে সব তথ্য আমার সামনে থাকবে।
— জি স্যার। তবে একটা কথা ছিল।
— বলো।
— আরিশা ম্যাডামকে কি এসব জানানো উচিত নয়?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
— না। ওকে এসবের মধ্যে জড়াতে চাই না।
রায়ান মৃদু স্বরে বলল,
— কিন্তু স্যার, ওনার পরিবারই তো এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
— আমি জানি, রায়ান। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আরিশার কোনো ক্ষতি যেন না হয়। ওর দিকে কেউ আঙুল তুললে আমি চুপ করে থাকব না।
অন্যদিকে রহমান বাড়ি।
নিজের ঘরে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে আরিশা। অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজটা এখনো ডিলিট করেনি।
হঠাৎ ফোনে একটি কল এল।
স্ক্রিনে নাম দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠল তার।
Adrian Mirza Calling...
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল।
— কোথায় তুমি?
আরিশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কেন? আপনার মাথাব্যথা হচ্ছে?
— প্রশ্নের উত্তর দাও, আরিশা।
— নিজের ঘরে। এবার কি শান্তি হয়েছে?
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আদ্রিয়ান বলল,
— খেয়েছ?
আরিশা একটু অবাক হলো।
— আপনি ফোন করেছেন আমার খাওয়ার খবর নিতে?
— হ্যাঁ। কোনো সমস্যা?
— না, সমস্যা নেই। কিন্তু আপনি কি সবার খোঁজ এভাবেই নেন?
আদ্রিয়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— না। শুধু একজনের।
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ইচ্ছা করেই বলল,
— কে সে? আপনার গার্লফ্রেন্ড?
আদ্রিয়ানের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।
— হতে চেয়েছিলাম যার, সে এখনো আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি।
আরিশার গাল লাল হয়ে উঠল।
— আপনি না একদম অসহ্য!
— জানি। তবুও ফোনটা কেটে দিচ্ছ না কেন?
— আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় নষ্ট করছি। রাখছি!
— আরিশা?
— কী?
— রাতে একা বাইরে যেও না। আর কোনো অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এলে আমাকে জানাবে।
আরিশার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
— আপনি কীভাবে জানলেন?
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— কারণ তোমার ব্যাপারে আমি একটু বেশিই খোঁজ রাখি।
পরদিন সকাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বান্ধবীদের সঙ্গে বসে গল্প করছিল আরিশা। এমন সময় সামনে এসে দাঁড়াল একটি পরিচিত মুখ।
— আরিশা!
মাথা তুলে তাকাতেই দেখতে পেল তার পুরোনো পরিচিত নিলয়কে।
নিলয় হাসিমুখে বলল,
— কতদিন পর দেখা! কেমন আছো?
— ভালো। তুমি?
— তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আরও ভালো।
কথাটা শুনে আরিশা হেসে ফেলল।
ঠিক সেই সময় ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে কালো গাড়ি ঢুকল।
গাড়ির ভেতর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আদ্রিয়ান।
তার পাশে বসে থাকা রায়ান মৃদু স্বরে বলল,
— স্যার, আমাদের কি এখানে আসার কথা ছিল?
আদ্রিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
তার দৃষ্টি আটকে আছে আরিশার দিকে।
নিলয়কে আরিশার এত হাসিমুখে কথা বলতে দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থেকে নেমে সোজা তাদের দিকে এগিয়ে গেল সে।
— আরিশা!
পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ শুনে আরিশা পেছনে তাকাল।
— আপনি এখানে?
আদ্রিয়ান নিলয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার আরিশার দিকে চোখ ফেরাল।
— তোমাকে নিতে এসেছি।
আরিশা অবাক হয়ে বলল,
— কিন্তু আমি তো আপনাকে আসতে বলিনি!
— সবকিছু কি তোমার বলে দিতে হবে?
নিলয় এবার কথা বলল।
— আপনি কি আরিশার পরিচিত?
আদ্রিয়ান ধীর পায়ে আরিশার পাশে এসে দাঁড়াল।
— পরিচয়টা সময় হলে জানতে পারবে।
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— মিস্টার মির্জা, আপনি একটু কম রহস্যময় হতে পারেন না?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— তোমার সামনে এসে নিজেকে সামলানোই কঠিন, রহস্যময় হওয়া তো দূরের কথা।
কথাটা শুনে আরিশা একদম চুপ!
সন্ধ্যা সাতটা।
আদ্রিয়ানের গাড়ি রহমান বাড়ির সামনে এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামার আগে আরিশা বলল,
— একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— করো।
— আপনি কি আমাকে নিয়ে জেলাস হচ্ছিলেন?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— হলে সমস্যা?
আরিশা মুচকি হেসে বলল,
— তাহলে তো বুঝলাম, মিস্টার মির্জারও অনুভূতি আছে!
আদ্রিয়ান একটু ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকাল।
— অনুভূতি আছে বলেই তো এতদিন তোমার সব পাগলামি সহ্য করছি।
আরিশা হাসতে হাসতে গাড়ি থেকে নেমে গেল।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামার আগে আদ্রিয়ানকে একবার পেছনে ফিরে তাকাতে দেখে তার মনটা অদ্ভুতভাবে ভালো হয়ে গেল।
রাত দশটা।
মির্জা ভিলায় নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটি ডায়েরি খুলল আদ্রিয়ান।
ডায়েরির প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখা।
"যদি কখনো রহমান পরিবারের মেয়েটির সঙ্গে তোমার দেখা হয়, মনে রেখো—এই পরিবারের সবাই অপরাধী নয়।"
আদ্রিয়ানের হাত থেমে গেল।
আরিশা!
তাহলে কি এতদিন সে ভুল মানুষকে নিজের শত্রু ভেবে এসেছে?
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল রায়ান।
— স্যার, লোকটার সন্ধান পাওয়া গেছে।
আদ্রিয়ান ডায়েরি বন্ধ করে তাকাল।
— কে সে?
রায়ান ধীরে ধীরে বলল,
— তিনি হলেন আরিশা ম্যাডামের আপন চাচা। মিস্টার মাহমুদ রহমান।
আদ্রিয়ানের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
কারণ এই মানুষটির নামই তার বাবার মৃত্যুর আগের শেষ চিঠিতে লেখা ছিল!
চলবে...🖤🥀
