~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব – ৯ : ভালোবাসার আড়ালে ষড়যন্ত্র
রাত প্রায় এগারোটা।
মির্জা ভিলার স্টাডি রুমে বসে আছে আদ্রিয়ান। সামনে তার বাবার পুরোনো চিঠি। চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন তাকে পনেরো বছর আগের সেই অন্ধকার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
— স্যার?
রায়ানের ডাকে মাথা তুলল আদ্রিয়ান।
— বলো।
— মাহমুদ রহমানের ব্যাপারে আরও কিছু তথ্য পেয়েছি।
— কী তথ্য?
— পনেরো বছর আগে আপনার বাবার ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন তিনি। কিন্তু আপনার বাবার মৃত্যুর ঠিক কয়েকদিন আগে তিনি হঠাৎ দেশ ছেড়ে চলে যান।
আদ্রিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
— এতদিন কোথায় ছিলেন?
— সেটা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে একটা বিষয় জেনেছি। তিনি কিছুদিন আগে দেশে ফিরেছেন।
— আর আমাকে জানানো হয়নি কেন?
— স্যার, তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন।
আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— রায়ান, আমার বাবার মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল, সেটা আমি জানতে চাই। এবার কোনো তথ্য যেন আমার কাছ থেকে লুকানো না থাকে।
— জি, স্যার।
রায়ান চলে যেতেই আদ্রিয়ান আবার চিঠিটা হাতে নিল।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
"আদ্রিয়ান, কখনো যদি আরিশার সঙ্গে তোমার দেখা হয়, তাকে ঘৃণা করো না।"
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
— বাবা, আরিশা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে ওর পরিবারকে ঘিরে এত রহস্য কেন?
পরদিন সকাল।
আরিশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন আছে।
হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।
Adrian Mirza:
"নিচে আসো।"
আরিশা বিরক্ত হয়ে রিপ্লাই দিল,
"কেন?"
"তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।"
"আমি কি আপনাকে আসতে বলেছি?"
"না। কিন্তু আমি এসেছি।"
আরিশা বিরক্ত মুখে ফোনটা রেখে নিচে নেমে এল।
বাড়ির সামনে কালো গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিয়ান। পরনে কালো শার্ট, চোখে সানগ্লাস।
আরিশাকে দেখেই সানগ্লাস খুলল সে।
— কত সময় লাগে তোমার?
আরিশা ভ্রু উঁচু করে বলল,
— আপনার কি ঘড়ি নেই?
— আছে। কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সময়ের হিসাব ভুলে যাই।
আরিশা কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল।
— আপনি দিন দিন বেশি পাগল হয়ে যাচ্ছেন।
— তোমার জন্য।
— উফ! অসহ্য!
আদ্রিয়ান গাড়ির দরজা খুলে দিল।
— ওঠো, তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিই।
— আমি নিজেই যেতে পারব।
— জানি। তবুও নিয়ে যেতে চাই।
আরিশা আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসল।
দুপুর বারোটা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে আরিশা। হঠাৎ তার সামনে একটি কফির কাপ এসে রাখা হলো।
মাথা তুলে তাকাতেই দেখল আদ্রিয়ান!
— আপনি আবার এখানে?
— কফি খেতে এসেছি।
আরিশা কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে আমার জন্য এনেছেন কেন?
— কারণ তুমি কফি পছন্দ করো।
— আপনি আমার এত কিছু জানেন কীভাবে?
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে বলল,
— তোমার অজান্তেই তোমার অনেক কিছু জেনে ফেলেছি।
আরিশা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন?
— সবাইকে আমার হাসি দেখানোর প্রয়োজন হয় না।
— তাহলে আমাকে দেখান।
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
— এই নাও। শুধু তোমার জন্য।
আরিশা হেসে ফেলল।
দূর থেকে রায়ান দৃশ্যটা দেখে মনে মনে ভাবল, যে মানুষটাকে অফিসের সবাই ভয় পায়, সেই মানুষটাকেই একটা মেয়ে কী সহজে বদলে দিচ্ছে!
সন্ধ্যা ছয়টা।
আরিশা বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকতেই মায়ের ডাক শুনতে পেল।
— আরিশা, একটু এদিকে আয় তো।
— বলো মা।
মা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন,
— তোর চাচা দেশে ফিরেছেন।
আরিশা অবাক হয়ে গেল।
— কোন চাচা?
— মাহমুদ চাচা। তোর ছোটবেলায় যিনি তোকে খুব আদর করতেন।
আরিশার মুখে আনন্দ ফুটে উঠল।
— সত্যি মা? চাচা এসেছেন! এতদিন পর!
মা মৃদু হেসে বললেন,
— হ্যাঁ। কাল হয়তো আমাদের বাড়িতে আসবেন।
কিন্তু আরিশা খেয়াল করল না, কথাটা বলার সময় তার মায়ের মুখে এক অদ্ভুত অস্বস্তি ফুটে উঠেছিল।
রাত নয়টা।
আদ্রিয়ান নিজের ঘরে বসে কাজ করছিল। এমন সময় আরিশার ফোন এল।
— হ্যালো, মিস্টার মির্জা!
— বলো, মিস রহমান।
— জানেন, আমার চাচা দেশে ফিরেছেন!
আদ্রিয়ানের হাত থেমে গেল।
— তোমার কোন চাচা?
— মাহমুদ রহমান। ছোটবেলায় আমাকে খুব আদর করতেন। কাল আমাদের বাসায় আসবেন।
আদ্রিয়ানের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না সে।
— হ্যালো? শুনছেন?
— হ্যাঁ, শুনছি।
— কী হলো? হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন কেন?
আদ্রিয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— কিছু না। কাল কোথাও একা যেও না।
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আবার শুরু হলো আপনার নিষেধাজ্ঞা!
— আরিশা, এবার আমার কথাটা একটু গুরুত্ব দিয়ে শোনো।
কণ্ঠের গাম্ভীর্য শুনে আরিশা আর মজা করল না।
— আচ্ছা। কী হয়েছে বলবেন?
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— সময় হলে সব বলব। এখন শুধু বিশ্বাস করো, আমি তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
আরিশা নরম স্বরে বলল,
— আপনাকে বিশ্বাস করি বলেই তো এত কথা শুনি।
কথাটা শুনে আদ্রিয়ানের মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
— তাহলে একটা কথা শোনো।
— কী?
— শুভরাত্রি, আরিশা।
— শুভরাত্রি, মিস্টার মির্জা।
অন্যদিকে রহমান বাড়ি।
একটি অন্ধকার ঘরে বসে আছেন মাহমুদ রহমান। হাতে পুরোনো একটি ছবি।
ছবিতে দুই তরুণের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। একজন আদ্রিয়ানের বাবা, অন্যজন আরিশার বাবা।
মাহমুদ ছবিটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,
— পনেরো বছর ধরে যে সত্য লুকিয়ে রেখেছি, সেটা কি এবার প্রকাশ পাবে?
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
অপর প্রান্ত থেকে একটি কণ্ঠ বলল,
— মাহমুদ সাহেব, আদ্রিয়ান সবকিছু জানতে শুরু করেছে।
মাহমুদের মুখের রং বদলে গেল।
— অসম্ভব! ওর জানার কথা নয়!
— কিন্তু এবার আর সময় নেই। পুরোনো চুক্তির আসল কাগজটা যদি ওর হাতে পড়ে, তাহলে আমাদের দুজনেরই বিপদ।
মাহমুদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— তাহলে আর দেরি করা যাবে না। আরিশাকে সত্য জানার আগেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।
কথাটা বলেই তিনি ফোন কেটে দিলেন।
কিন্তু তিনি জানতেন না, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ তার শেষ কথাগুলো শুনে ফেলেছে!
চলবে... 🖤🥀
