~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ২: যে রহস্যের শুরু তোমাকে দিয়ে
কিছু মানুষকে প্রথমবার দেখেই অচেনা মনে হয়। অথচ তাদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়তো বহু বছর আগেই হয়ে গেছে—কোনো এক অন্ধকার অধ্যায়ে, যার কথা আমাদের মনে নেই।
আরিশা রহমান জানত না, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টা ইতিমধ্যেই তার দিকে এগিয়ে আসছে।
আর সেই ঝড়ের নাম—আদ্রিয়ান মির্জা।
১. মির্জা ভিলার অন্ধকার ঘর
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। অথচ মির্জা ভিলার তৃতীয় তলার একটি ঘরে তখনও আলো জ্বলছে।
ঘরটির চারপাশে কালো কাঠের আসবাব, দেয়ালজুড়ে বইয়ের তাক আর বিশাল জানালার ওপাশে বৃষ্টিভেজা শহর। ঘরের মাঝখানে বসে থাকা মানুষটির মুখে কোনো অনুভূতি নেই।
আদ্রিয়ান মির্জা।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। এক হাতে কফির কাপ, অন্য হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
ফাইলটির ওপরে লাল কালিতে লেখা—
ARISHA RAHMAN.
নামটির দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
পৃথিবীর কাছে সে একজন নির্দয় ব্যবসায়ী। যার একটি সিদ্ধান্তে শত কোটি টাকার চুক্তি হয়, আবার একটি কথায় বহু মানুষের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এই মেয়েটির নাম সামনে এলেই তার বহু বছরের সাজানো হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।
আদ্রিয়ান ফাইলটি খুলল।
ভেতরে আরিশার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রের একটি কপি, তার পরিবারের কিছু তথ্য এবং একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটিতে দুজন পুরুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
একজন আদ্রিয়ানের বাবা, আর অন্যজন আরিশার বাবা।
দুজনের মুখেই হাসি।
কিন্তু ছবিটির পেছনে কালো কালিতে লেখা একটি বাক্য আদ্রিয়ানের চোখ আটকে দিল।
“যে সত্য প্রকাশ পাবে, সে সত্যই দুই পরিবারকে ধ্বংস করবে।”
আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— এত বছর পরেও তুমি আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছ, বাবা?
তার কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ যেন ঘরের বাতাসকেও ভারী করে তুলল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— স্যার, ভেতরে আসতে পারি?
আদ্রিয়ানের বিশ্বস্ত সহকারী রায়ান।
— এসো।
রায়ান ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর রাখা ছবিটির দিকে তাকাল। তারপর সতর্ক কণ্ঠে বলল,
— স্যার, মেয়েটার ব্যাপারে আরেকটা তথ্য পেয়েছি।
আদ্রিয়ান চোখ তুলল।
— বলো।
— আরিশা রহমানের বাবা আগামী সপ্তাহে ঢাকায় ফিরছেন। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গত কয়েক দিন ধরে কেউ একজন তাদের পরিবারের পুরোনো বাড়ির খোঁজ করছে।
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— কে?
— এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আদ্রিয়ান বলল,
— খুঁজে বের করো। আমার আগে কেউ যেন ওই সত্যের কাছে পৌঁছাতে না পারে।
রায়ান চলে যাওয়ার আগে থেমে গেল।
— স্যার, একটা কথা বলব?
— বলো।
— আপনি কি নিশ্চিত, আরিশা ম্যাডামকে এই ব্যাপারে জড়ানো ঠিক হবে?
আদ্রিয়ানের চোখে এবার এমন এক শীতলতা ফুটে উঠল, যা দেখে রায়ানও চুপ হয়ে গেল।
— ওকে আমি এই গল্পে জড়াইনি, রায়ান। ওর পরিবার অনেক আগেই ওকে এর মধ্যে নিয়ে এসেছে।
একটু থেমে সে আবার বলল,
— আর ওর কোনো ক্ষতি হলে, তার জবাব আমি নিজে দেব।
২. যে মেয়েটি ভয় পেতে জানে না
পরদিন সকাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে।
কারণ একটাই—গতকাল যে রহস্যময় পুরুষটিকে ক্যাম্পাসের সামনে দেখা গিয়েছিল, আজ তার কালো গাড়িটা আবারও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আরিশা বান্ধবী মেহরার সঙ্গে গেট দিয়ে ঢুকছিল। হাতে কয়েকটা বই, কাঁধে ব্যাগ। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল গাড়িটার দিকে।
মেহরা ফিসফিস করে বলল,
— ওই যে! কালকের সেই হ্যান্ডসাম লোকটা আবার এসেছে!
আরিশা একবার তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
— তো?
— তো মানে? মানুষটা দেখতে কেমন দেখেছিস? একেবারে সিনেমার নায়ক!
আরিশা চোখ ঘুরিয়ে বলল,
— দেখতে ভালো হলেই কি মানুষ ভালো হয়? মুখ দেখে কাউকে বিচার করা আমার কাজ না।
মেহরা হেসে ফেলল।
— তোর জীবনে যদি কোনোদিন প্রেম আসে, আমি সবার আগে অবাক হব।
— আমার জীবনে প্রেম আসার আগে তুই বিয়ে করে সংসার শুরু করে ফেলবি। এবার চল।
কথাটা বলেই আরিশা এগিয়ে গেল।
কিন্তু সে জানত না, গাড়ির কালো কাচের ওপাশ থেকে একজোড়া চোখ তার প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করছে।
আদ্রিয়ান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
— রায়ান।
— জি, স্যার?
— মেয়েটার ক্লাস কখন শেষ হয়?
রায়ান একটু থেমে বলল,
— বিকেল তিনটায়।
— ভালো।
— আপনি কি ওনার সঙ্গে দেখা করবেন?
আদ্রিয়ান জানালার ওপাশে তাকাল।
— দেখা তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। এবার ওকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
৩. প্রথম সংঘর্ষ
বিকেল তিনটা পনেরো।
ক্লাস শেষ করে আরিশা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে বের হলো, তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আকাশের অবস্থা দেখে সে বিরক্ত হয়ে বলল,
— বাহ! ছাতা আনিনি, আর আজই বৃষ্টি হতে হলো!
মেহরা ইতিমধ্যে তার ভাইয়ের গাড়িতে উঠে পড়েছে। আরিশা একা দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর ছাতা খুঁজছিল।
ঠিক তখনই তার সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
দরজা খুলে নেমে এল সেই মানুষটি।
কালো শার্ট, গম্ভীর মুখ, চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা।
আদ্রিয়ান মির্জা।
আরিশা একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের ব্যাগে মন দিল।
আদ্রিয়ান সামনে এসে দাঁড়াতেই সে বিরক্ত হয়ে বলল,
— এক্সকিউজ মি, একটু সাইড দেবেন?
আদ্রিয়ান নড়ল না।
— তোমার সঙ্গে কথা আছে।
আরিশা এবার পুরোপুরি তার দিকে তাকাল।
— আমার?
— হ্যাঁ।
— কিন্তু আমার আপনার সঙ্গে কোনো কথা নেই।
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
— কথা না থাকলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে হবে।
আরিশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আপনি কি সবসময় এভাবেই মানুষের সঙ্গে কথা বলেন?
— কেমনভাবে?
— এমনভাবে, যেন পৃথিবীর সবাই আপনার কর্মচারী!
আদ্রিয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটা সত্যিই জানে না সে কার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
অথবা জানলেও ভয় পাওয়ার অভ্যাস তার নেই।
— তোমার নাম আরিশা রহমান, তাই না?
আরিশার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
— আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?
— তোমার নাম জানাটা কি অপরাধ?
— না। কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষ আমার নাম জানে, আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে, আর আমাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে বলছে—ব্যাপারটা স্বাভাবিক না।
আদ্রিয়ান এবার একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল,
— তাহলে অপরিচিত মানুষটার পরিচয় জেনে নাও।
সে পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে আরিশার দিকে বাড়িয়ে দিল।
কার্ডটিতে লেখা—
ADRIAN MIRZA
CHAIRMAN & CEO, MIRZA GROUP.
নামটা পড়েই আরিশার চোখ বড় হয়ে গেল।
আদ্রিয়ান মির্জা!
যে মানুষটির নাম সে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংবাদে দেখেছে। যার সম্পর্কে শোনা যায়, তিনি নাকি নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কখনো আপস করেন না।
আর সেই মানুষটি আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে!
তবুও আরিশা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— পরিচয় জানলাম। এবার বলুন, আমার সঙ্গে কী কথা?
আদ্রিয়ান সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
— তোমার বাবা কোথায়?
প্রশ্নটা শুনে আরিশার মুখের ভাব বদলে গেল।
— কেন?
— একটা পুরোনো ব্যাপারে কথা বলতে চাই।
— কী ব্যাপার?
— সেটা তোমার বাবাকেই বলব।
আরিশা কার্ডটা তার দিকে ফিরিয়ে দিল।
— তাহলে আমার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমাকে মাঝখানে টানছেন কেন?
আদ্রিয়ান কার্ডটা নিল না।
— কারণ তোমার বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
আরিশার বুকের ভেতর অস্বস্তি জমল।
— আপনি কী বলতে চাইছেন?
— আমি যা বলছি, সেটাই।
— দেখুন, মিস্টার মির্জা। আপনার টাকা আছে, ক্ষমতা আছে, আপনি যা ইচ্ছা করতে পারেন। কিন্তু তাই বলে সবাইকে নিজের মতো চালাতে পারবেন না।
কথাটা বলে সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।
আদ্রিয়ান এবার তার পথ আটকায়নি।
শুধু পেছন থেকে বলল,
— তোমার বাবা যদি তোমাকে এমন কোনো সত্যের সামনে দাঁড় করান, যেটা তুমি সহ্য করতে পারবে না, তখনও কি তুমি এভাবেই কথা বলবে?
আরিশা থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
— আমার বাবাকে নিয়ে আর একটা কথাও বলবেন না।
প্রথমবারের মতো তার চোখে রাগের পাশাপাশি ভয়ও দেখা গেল।
আদ্রিয়ান সেটা লক্ষ করল।
আর সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, এই মেয়েটিকে সত্য জানানো যতটা কঠিন, সত্য থেকে দূরে রাখাও ততটাই অসম্ভব।
৪. একটি ফোনকল, একটি অজানা বিপদ
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরিশা দেখল, তার মা ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
— মা, কী হয়েছে?
তার মা তাড়াতাড়ি মুখ তুলে তাকালেন।
— তোর বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে?
— না তো। কেন?
— সকাল থেকে ফোন বন্ধ। কোথায় আছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।
আরিশা মায়ের পাশে বসে তাঁর হাত ধরল।
— চিন্তা কোরো না, মা। হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত আছেন।
কথাটা বললেও নিজের মনের অস্বস্তিটা সে লুকাতে পারল না।
তার ফোনে হঠাৎ একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“তোমার বাবাকে খুঁজতে চাইলে আজ রাত দশটায় পুরোনো রহমান বাড়িতে এসো। একা।”
আরিশার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে নম্বরটিতে কল করল।
ফোন বন্ধ।
ঠিক তখনই আরেকটি মেসেজ এল।
“আদ্রিয়ান মির্জাকে বিশ্বাস কোরো না। তোমার পরিবারের ধ্বংসের পেছনে তার পরিবারের হাত রয়েছে।”
আরিশা স্থির হয়ে বসে রইল।
আদ্রিয়ান মির্জা!
তার বাবার নিখোঁজ হওয়া, অচেনা নম্বরের মেসেজ আর সেই রহস্যময় মানুষটির প্রশ্ন—সবকিছু কি কোনোভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িত?
সে জানত না।
কিন্তু একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানত—তার বাবার কিছু একটা হয়েছে।
আর সে চুপ করে বসে থাকবে না।
৫. রাত দশটার প্রতিশ্রুতি
রাত নয়টা পঞ্চান্ন।
পুরোনো রহমান বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল আরিশা।
বাড়িটা বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। চারপাশে বড় বড় গাছ, দেয়ালে শ্যাওলা আর জানালার কাচে ধুলোর স্তর। ছোটবেলায় একবার বাবার সঙ্গে এখানে এসেছিল সে। তারপর আর কখনো নয়।
বাড়িটার দিকে তাকাতেই তার মনে পড়ল বাবার বলা একটি কথা—
“আরিশা, পৃথিবীতে এমন কিছু দরজা থাকে, যেগুলো বন্ধ থাকাই ভালো। কারণ সব সত্য মানুষের জীবন সুন্দর করে না।”
তখন কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি সে।
আজ কেন যেন মনে হচ্ছে, বাবা এই বাড়ির কথাই বলেছিলেন।
সে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
দরজাটা সামান্য খোলা।
ভেতর থেকে ক্ষীণ আলো আসছে।
— কেউ আছেন?
কোনো উত্তর এল না।
আরিশা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল। তার ওপর ধুলোমাখা কিছু কাগজ আর একটি পুরোনো কাঠের বাক্স।
বাক্সটার ওপরে রাখা একটি ছবি দেখে আরিশা থমকে গেল।
ছবিতে তার বাবা, আদ্রিয়ানের বাবা এবং আরও একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন।
নারীটির মুখে গভীর বিষণ্ণতা।
ছবির পেছনে লেখা—
“আমাদের সন্তানদের যেন আমাদের পাপের মূল্য দিতে না হয়।”
আরিশার বুক কেঁপে উঠল।
আমাদের সন্তানদের?
কোন পাপ?
ঠিক তখনই পেছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম!
আরিশা চমকে পেছনে ফিরল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
— বলেছিলাম না, একা আসতে?
আরিশা আতঙ্কিত হলেও নিজেকে সামলে বলল,
— আপনি কে? সামনে আসুন!
কোনো উত্তর এল না।
তারপর হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে আরিশা কারও পায়ের শব্দ শুনতে পেল।
এক পা।
দুই পা।
তারপর খুব কাছে এসে কেউ বলল,
— তোমার বাবাকে বাঁচাতে চাইলে আদ্রিয়ান মির্জার কাছ থেকে দূরে থাকো।
আরিশা কিছু বলার আগেই একটি হাত তার হাতের মুঠোয় ছোট্ট কাগজ গুঁজে দিল।
পরের মুহূর্তেই সামনের দরজায় জোরে আঘাত পড়ল।
— আরিশা!
কণ্ঠটা চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
আদ্রিয়ান!
দরজাটা খুলে গেল। বাইরে থেকে আসা আলোয় ঘরটা আবার কিছুটা দৃশ্যমান হলো।
আদ্রিয়ান দ্রুত ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকাল। তারপর আরিশার সামনে এসে দাঁড়াল।
— তুমি এখানে কী করছ?
আরিশা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— সেটা আপনাকে বলতে হবে না!
— তুমি কি বুঝতে পারছ, এখানে কী হতে পারত?
— আমার বাবাকে খুঁজতে এসেছি!
— আর তার জন্য নিজের বিপদ ডেকে এনেছ?
— আমার বাবার কী হয়েছে, আপনি জানেন?
প্রশ্নটা শুনে আদ্রিয়ান চুপ হয়ে গেল।
সেই নীরবতাই আরিশার সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল।
সে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
— আপনি আমার বাবাকে চেনেন, তাই না? আমাদের পরিবারের ব্যাপারে কিছু জানেন?
আদ্রিয়ান তার চোখের দিকে তাকাল।
— হ্যাঁ।
একটি মাত্র শব্দ।
কিন্তু সেই শব্দে যেন আরিশার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
— তাহলে এতক্ষণ আমাকে বলেননি কেন?
— কারণ সত্যিটা তুমি যত সহজে শুনতে চাইছ, তত সহজে মেনে নিতে পারবে না।
আরিশার চোখ ভিজে উঠল।
— সেটা আমার ব্যাপার। সত্য জানার অধিকার আমার আছে!
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের কোট খুলে তার কাঁধের ওপর দিয়ে দিল।
— চলো। এখানে থাকা নিরাপদ নয়।
আরিশা কোটটা সরিয়ে দিতে গিয়েও থেমে গেল।
— আমি আপনার সঙ্গে কোথাও যাব না।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আরিশা রহমান—আজ রাতে যে মানুষটা তোমাকে এখানে ডেকেছে, সে তোমার বাবার শুভাকাঙ্ক্ষী নয়।
— আর আপনি?
প্রশ্নটা শুনে আদ্রিয়ানের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত কষ্ট ফুটে উঠল।
— আমি কে, সেটা জানার পর হয়তো তুমিও আমাকে ঘৃণা করবে।
সে ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আরিশা তার পেছনে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ নিজের মুঠোয় ধরা কাগজটার কথা মনে পড়ল।
কাগজটা খুলতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
সেখানে মাত্র একটি লাইন লেখা—
“আদ্রিয়ান মির্জার জন্মের সত্য জানো, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ো—সে তোমার শত্রু, নাকি তোমার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।”
আরিশা ধীরে ধীরে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল।
আদ্রিয়ান তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।
যেন সে জানে, আরিশা ঠিক কী পড়েছে।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
আদ্রিয়ান শান্ত কণ্ঠে বলল,
— এবার বুঝতে পারছ, আরিশা? আমাদের গল্পটা তোমার ধারণার চেয়েও অনেক পুরোনো।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো।
আর সেই বৃষ্টির শব্দের আড়ালে চাপা পড়ে গেল এমন এক সত্যের প্রথম পদধ্বনি, যা একদিন বদলে দেবে দুটি পরিবারের ভাগ্য।
চলবে...🥀🖤
