৳মাফিয়া কিংয়ের পাগল করা ভালোবাসা
#লেখিকা: হুমাইরা জান্নাত
#পর্ব: ০২
পর্বের নাম: প্রতিশোধের প্রথম চাল 🥀
সকালের আলো জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেই নীলার ঘুম ভাঙল। বিছানা থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে সে দেখল, তার ভাই নাহিয়ানের বারোটা মিসড কল!
নীলা চোখ বড় বড় করে বলল,
“হায় আল্লাহ! ভাইয়া আমাকে এতগুলো কল দিয়েছে! আজকে মনে হয় আমার কপালে দুঃখ আছে!”
তাড়াতাড়ি ফোন করতেই ওপাশ থেকে নাহিয়ানের রাগী কণ্ঠ ভেসে এল।
“মহামান্য রাজকন্যার ঘুম কি শেষ হয়েছে?”
নীলা হেসে বলল, “আরে ভাইয়া, এত রাগ করছ কেন? আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম!”
“কাল রাতে বাসায় ফিরে বলেছিলি, সকালে তাড়াতাড়ি উঠবি। এখন বাজে দশটা!”
“তো কী হয়েছে? সূর্য কি আমার জন্য অপেক্ষা করছিল?”
“নীলা!”
“আচ্ছা, আচ্ছা! আর বকবক করতে হবে না। নিচে আসছি।”
ফোন রেখে নীলা দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল।
ডাইনিং টেবিলে বসে ছিলেন তার বাবা মাহবুব রহমান। বাবাকে দেখেই নীলা হাসিমুখে কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
“গুড মর্নিং, বাবা!”
মাহবুব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “গুড মর্নিং, মা। কালকের অনুষ্ঠান কেমন লাগল?”
নীলা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “অনুষ্ঠান ভালোই ছিল। কিন্তু একটা অসহ্য লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে সব মাটি!”
নাহিয়ান হেসে বলল, “ওহ! আমাদের রাজকন্যার আবার কার সঙ্গে দেখা হলো?”
নীলা রাগী চোখে তাকিয়ে বলল, “ভাইয়া, তুমি হাসছ কেন? লোকটা নিজেকে কী মনে করে কে জানে! একটু জুস পড়েছিল তার শার্টে, আর এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন আমি তার পুরো হোটেল কিনে নিয়েছি!”
মাহবুব রহমানের হাতের চায়ের কাপ কেঁপে উঠল।
“লোকটার নাম কী, নীলা?”
নীলা একটু ভেবে বলল, “আরহান খান।”
নামটা শুনেই মাহবুবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
নাহিয়ান বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, কী হয়েছে তোমার?”
মাহবুব নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “কিছু না। তোমরা নাশতা করো।”
কিন্তু তাঁর মনের ভেতর তখন বহু বছর আগের এক ভয়ংকর রাতের স্মৃতি ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে—
আরহান খানের বিশাল অফিস।
কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে আছে আরহান। তার হাতে নীলার একটি ছবি।
রায়ান সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার, নীলাঞ্জনা রহমান সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে, সব এই ফাইলে আছে।”
আরহান ছবিটির দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল, “মেয়েটা দেখতে যতটা সরল, তার পরিবারের ইতিহাস ততটাই জটিল।”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “স্যার, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আপনি কি নিশ্চিত, মাহবুব রহমানই আপনার পরিবারের সঙ্গে যা ঘটেছে তার জন্য দায়ী?”
আরহান ধীরে ধীরে রায়ানের দিকে ফিরে তাকাল।
“তুমি কি আমাকে শেখাবে কাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
রায়ান মাথা নিচু করল।
“না, স্যার। আমি শুধু চাই না, পুরোনো কোনো ভুলের জন্য আপনি নতুন করে ভুল সিদ্ধান্ত নিন।”
আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ছবিটি হাতে তুলে নিল।
“আমার বাবাকে হারানোর পর এই মানুষটা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। আমার পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে, আর সে নিজের জীবন নিয়ে সুখে আছে। এবার আমার পালা।”
“কী করতে চান, স্যার?”
আরহানের ঠোঁটে শীতল হাসি ফুটে উঠল।
“মাহবুব রহমানের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা কী, রায়ান?”
“তার মেয়ে নীলাঞ্জনা।”
“ঠিক ধরেছ।”
রায়ান অবাক হয়ে তাকাল।
আরহান ধীর কণ্ঠে বলল, “আমি মেয়েটার ক্ষতি করতে চাই না। অন্তত এখনই নয়। আমি চাই, মাহবুব নিজের অতীতের মুখোমুখি হোক। আর তার জন্য নীলাঞ্জনাকে আমার জীবনে আনতেই হবে।”
বিকেল ৪টা।
নীলা নিজের ঘরে বসে গান শুনছিল। হঠাৎ নিচ থেকে কাজের মেয়ের ডাক এল।
“আপু, আপনার জন্য একজন ভদ্রলোক এসেছেন!”
নীলা বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আবার? ভাইয়াকে বলো, আমি এখন কারও সঙ্গে দেখা করব না!”
কিন্তু নিচে নেমে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার চোখ কপালে উঠে গেল।
সোফায় বসে আছে সেই অসহ্য লোকটা!
কালো শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, মুখে সেই একই গম্ভীর অভিব্যক্তি।
আরহান খান!
নীলা অবিশ্বাসের সুরে বলল, “আপনি এখানে কী করছেন?”
আরহান ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“তোমার বাবার সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
“তাহলে বাবার সঙ্গে কথা বলুন। আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
আরহান মৃদু হেসে বলল, “তোমার কথা বলার ধরনটা বেশ সাহসী।”
নীলা ভ্রু কুঁচকে বলল, “আর আপনার ব্যবহারটা বেশ অসহ্য!”
ঠিক তখনই মাহবুব রহমান ঘরে প্রবেশ করলেন। আরহানকে দেখেই তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
“তুমি এখানে কেন এসেছ, আরহান?”
আরহান ধীরে ধীরে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।
“আপনার সঙ্গে পুরোনো কিছু হিসাব মেলাতে এসেছি, মিস্টার রহমান।”
মাহবুব কঠিন কণ্ঠে বললেন, “যা হয়েছে, তা বহু বছর আগের কথা। সেই অধ্যায় আবার খুলতে এসো না।”
“অধ্যায়টা আপনি বন্ধ করেছেন। আমি তো এখনো শেষ পৃষ্ঠাটাও পড়িনি!”
নীলা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকাল।
“বাবা, তোমরা একে অপরকে চেনো?”
কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না।
আরহান পকেট থেকে একটি খাম বের করে টেবিলে রাখল।
“আগামীকাল সন্ধ্যা সাতটায় আমার অফিসে আসবেন। না এলে, আপনার অতীতের সেই গোপন কথাগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে।”
মাহবুব রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “আমাকে হুমকি দিচ্ছ?”
আরহান শান্তভাবে উত্তর দিল, “এটাকে হুমকি নয়, শেষ সুযোগ ভাবুন।”
কথাটা বলে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে নীলার দিকে ফিরে তাকাল।
“আবার দেখা হবে, নীলাঞ্জনা রহমান।”
নীলা মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আশা করি, আর দেখা হবে না!”
আরহান মৃদু হাসল।
“সেটা তোমার হাতে নেই, সুন্দরী।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
নীলা বাবার কাছে ছুটে এসে বলল, “বাবা, লোকটা কে? তোমাদের মধ্যে কী হয়েছে?”
মাহবুব মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর চোখে তখন গভীর আতঙ্ক।
“নীলা, একটা কথা মনে রাখিস। আরহান খানের কাছ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকবি।”
“কিন্তু কেন, বাবা?”
মাহবুব কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু মনে মনে বললেন, যে সত্যিটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছি, সেটা যদি আরহান জানতে পারে, তাহলে দুই পরিবারের জীবন আবারও ধ্বংস হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, গাড়িতে বসে আরহান নীলার কথা ভাবছিল।
মেয়েটার সাহসী চোখ, রাগী মুখ আর অদ্ভুত হাসিটা বারবার তার মনে ভেসে উঠছিল।
সে বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করল।
“কী হচ্ছে আমার? একটা মেয়ের কথা এত ভাবছি কেন?”
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
বার্তায় লেখা—
“মাহবুবকে শাস্তি দেওয়ার আগে নিজের বাবার মৃত্যুর সত্যিটা জেনে নাও। নীলাঞ্জনা তোমার শত্রু নয়, আরহান। সে তোমার অতীতের সবচেয়ে বড় রহস্যের অংশ!”
বার্তাটি পড়ে আরহানের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“রায়ান! এই নম্বরের মালিককে খুঁজে বের করো। এখনই!”
ফোনটা হাতে নিয়ে সে আবার বার্তাটির দিকে তাকাল।
প্রথমবারের মতো তার মনে প্রতিশোধের পাশাপাশি একটা প্রশ্ন জেগে উঠল—
নীলাঞ্জনা রহমান কি সত্যিই তার শত্রুর মেয়ে, নাকি তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া কোনো সত্যের চাবিকাঠি?
চলবে… 🖤🥀
