সকাল থেকেই মায়ার মনটা অস্থির।
গত রাতে তিথির পাঠানো মেসেজটা বারবার মনে পড়ছে তার।
“আরিশকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার আগে ওর অতীতটা তোমার জানা উচিত।”
কথাটা কি শুধু সতর্ক করার জন্য বলা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
মায়া নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, আরিশ তার বন্ধু। তার অতীতে যা-ই থাকুক, সেটা জানার অধিকার তার হয়তো নেই। কিন্তু মনের ভেতর জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলোকে সে কিছুতেই থামাতে পারছিল না।
সকালে কলেজে যাওয়ার সময় মা জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে রে? আজ তোকে এত চিন্তিত লাগছে কেন?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
“কিছু হয়নি মা। একটু মাথা ধরেছে।”
মা স্নেহভরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“নিজের যত্ন নিবি। সবকিছু নিয়ে এত ভাবতে নেই।”
মায়া মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। কিন্তু নিজের মনকে কীভাবে বোঝাবে, সেই উত্তর তার জানা ছিল না।
কলেজে পৌঁছানোর পর নীলাকে দেখতে পেল সে। নীলা তাকে দেখেই কাছে এসে বলল,
“কী রে, তোর মুখ এমন শুকনো কেন?”
মায়া বলল,
“তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।”
নীলা গম্ভীর হয়ে গেল।
“কী হয়েছে?”
মায়া চারপাশে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“তিথি আমাকে একটা মেসেজ দিয়েছে।”
“কী মেসেজ?”
“বলেছে, আরিশের অতীত সম্পর্কে আমার কিছু জানা উচিত।”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“তুই কী ভাবছিস?”
মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“জানি না। আরিশের সঙ্গে কথা বললে আমার ভালো লাগে। ওকে দেখলে অকারণেই হাসি পায়। কিন্তু আমি এটাও জানি না, ও আমাকে শুধু বন্ধু ভাবে, নাকি অন্য কিছু।”
নীলা মায়ার হাত ধরে বলল,
“একটা কথা মনে রাখিস, মায়া। কারও অতীত জানার আগে তাকে নিজের মুখে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত। তিথি কী বলবে, সেটা শোনার পাশাপাশি আরিশের কথাটাও শুনবি।”
মায়া মাথা নাড়ল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
“কী নিয়ে এত গোপন আলোচনা হচ্ছে?”
দুজন ফিরে তাকাল।
আরিশ দাঁড়িয়ে আছে।
নীলা হেসে বলল,
“মেয়েদের গোপন কথা। তোমাকে বলা যাবে না।”
আরিশ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনিও কি আমাকে কিছু বলবেন না?”
মায়া চোখ নামিয়ে বলল,
“সব কথা কি আপনাকে বলতে হবে?”
আরিশ একটু হেসে বলল,
“না। তবে আপনি কিছু লুকালে আমার কেমন যেন লাগে।”
কথাটা শুনে মায়া তার দিকে তাকাল।
আরিশের চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল শুধু একরাশ আন্তরিকতা।
মায়ার হঠাৎ ইচ্ছে হলো, সবকিছু খুলে জিজ্ঞেস করে।
কিন্তু সে কিছুই বলল না।
শুধু বলল,
“ক্লাসে যাবেন না?”
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
“যাব। তবে আজ আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।”
“কী কথা?”
“ক্লাস শেষে বলব।”
এই বলে আরিশ চলে গেল।
মায়া তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ যেন প্রতিটি কথার আড়ালেই লুকিয়ে আছে আরও অনেক কথা।
দুপুরে ক্লাস শেষ হওয়ার পর তিথি মায়ার কাছে এল।
“তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?”
মায়া মাথা নাড়ল।
দুজন কলেজের পেছনের বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে একটা বেঞ্চে বসে তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“মায়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? তুমি কি আরিশকে পছন্দ করো?”
প্রশ্নটা শুনে মায়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?”
তিথি মৃদু হেসে বলল,
“তোমার চোখে দেখেছি। আরিশের দিকে তাকালে তোমার চোখের ভাষা বদলে যায়।”
মায়া কিছু বলল না।
তিথি আবার বলল,
“আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। আরিশকে পছন্দ করার অনেক কারণ আছে। ও ভীষণ ভালো একটা মানুষ।”
মায়া এবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে তুমি আমাকে ওর অতীত সম্পর্কে জানতে বলছ কেন?”
তিথির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল,
“কারণ, আমি চাই না তুমি এমন কোনো স্বপ্ন দেখো, যেটা একদিন তোমাকে কষ্ট দেবে।”
মায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আরিশের কী হয়েছে?”
তিথি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“কয়েক বছর আগে আরিশের জীবনে একজন মানুষ ছিল। মেয়েটার নাম ছিল নওরিন।”
মায়া স্থির হয়ে বসে রইল।
তিথি বলল,
“ওরা একে অপরকে খুব ভালোবাসত। আরিশ তখন একেবারে অন্য রকম ছিল। সব সময় হাসত, সবার সঙ্গে মিশত। ওর জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিল।”
একটু থেমে তিথি আবার বলল,
“কিন্তু একসময় তাদের সম্পর্কটা ভেঙে যায়। নওরিন হঠাৎ করেই আরিশের জীবন থেকে চলে যায়। কেন চলে গিয়েছিল, সেটা আরিশ কখনো কাউকে ঠিকমতো বলেনি।”
মায়া নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তারপর?”
“তারপর থেকে আরিশ অনেক বদলে যায়। আগের মতো কাউকে সহজে বিশ্বাস করে না। নিজের মনের কথা কাউকে বলে না। বাইরে থেকে হাসিখুশি থাকলেও ভেতরে অনেক কিছু চেপে রাখে।”
মায়া কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু এসব তো ওর অতীত। অতীতে কারও ভালোবাসা ছিল বলে কি সে আবার নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে পারবে না?”
তিথি অবাক হয়ে মায়ার দিকে তাকাল।
“তুমি কি সত্যিই এমনটা ভাবো?”
মায়া শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ। প্রত্যেক মানুষেরই একটা অতীত থাকে। অতীতের জন্য কাউকে সারাজীবন একা থাকতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই।”
তিথির চোখে অদ্ভুত একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল।
সে মৃদু হেসে বলল,
“তুমি আর দশজনের মতো নও, মায়া।”
মায়া জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
তিথি উত্তর দিল না।
শুধু বলল,
“আমি চাই, আরিশ আবার আগের মতো হাসুক। ওর জীবনে এমন কেউ আসুক, যে ওকে বুঝবে। তবে একটা কথা মনে রেখো—আরিশ নিজের অতীত নিয়ে এখনো কষ্ট পায়। ওকে সময় দিও।”
মায়া মাথা নাড়ল।
কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন তখনো রয়ে গেল।
তিথি কি শুধু আরিশের বন্ধু?
নাকি তার নিজের মনেও আরিশের জন্য কোনো অনুভূতি লুকিয়ে আছে?
মায়া প্রশ্নটা করতে চেয়েও করল না।
কারণ, সব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া যায় না।
কিছু উত্তর সময়ের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।
বাগান থেকে বেরিয়ে মায়া কলেজের গেটের দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ দেখতে পেল, আরিশ একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
তাকে দেখেই আরিশ এগিয়ে এল।
“কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?”
মায়া বলল,
“তিথির সঙ্গে কথা বলছিলাম।”
আরিশের মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেল।
“তিথি আপনাকে কিছু বলেছে?”
মায়া তার চোখের দিকে তাকাল।
“হ্যাঁ।”
আরিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“কী বলেছে?”
মায়া ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“আপনার অতীতের কথা।”
আরিশের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
সে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে নিশ্চয়ই অনেক কিছু জেনেছেন।”
মায়া শান্ত গলায় বলল,
“কিছুটা জেনেছি। কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।”
আরিশ তার দিকে তাকাল।
“কেন?”
মায়া একটু থেমে বলল,
“কারণ, আমি চাই না অন্য কারও কথার ওপর ভিত্তি করে আপনাকে বিচার করতে।”
আরিশ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“মায়া, আপনি জানেন না, আমার অতীতটা কতটা জটিল।”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
“আপনার অতীত যতই জটিল হোক, আপনি আজ যে মানুষ, আমি সেই মানুষটাকেই জানতে চাই।”
কথাটা শুনে আরিশের চোখে যেন এক মুহূর্তের জন্য অন্য রকম আলো ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল,
“সবাই এমন কথা বলে না।”
মায়া উত্তর দিল,
“সবাই তো এক রকম হয় না।”
আরিশ কিছুক্ষণ মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“একদিন আপনাকে সব বলব। তবে আজ নয়।”
মায়া মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে। আমি অপেক্ষা করব।”
আরিশ অবাক হয়ে বলল,
“আপনি অপেক্ষা করবেন?”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
“বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করা যায় না?”
আরিশও হাসল।
“যায়। অবশ্যই যায়।”
কিন্তু দুজনের কেউই মুখে স্বীকার করল না, এই অপেক্ষাটা আর শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়া নিজের ঘরে বসে ছিল।
তিথির বলা কথাগুলো তার মনে ঘুরছিল।
আরিশ একসময় কাউকে ভালোবাসত।
সেই ভালোবাসা ভেঙে যাওয়ার পর সে বদলে গিয়েছিল।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মায়ার মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।
আরিশের অতীতের জন্য তার মন খারাপ হচ্ছিল। অথচ সেই অতীতের একটি অংশ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না।
ঠিক তখনই ফোনে আরিশের মেসেজ এল।
“কী করছেন?”
মায়া উত্তর দিল,
“আপনার কথা ভাবছি।”
মেসেজটা পাঠিয়েই সে থমকে গেল।
এটা কি সত্যিই লিখে ফেলল সে?
কয়েক সেকেন্ড পর আরিশের উত্তর এল।
“সত্যি?”
মায়া তাড়াতাড়ি লিখল,
“মানে, আজকের কথাগুলো ভাবছি।”
আরিশ লিখল,
“বুঝলাম। তাহলে আমিও একটা কথা বলি?”
“বলুন।”
“আজ আপনি যখন বললেন, আমার অতীত দিয়ে আমাকে বিচার করবেন না, তখন কেন জানি মনে হলো, হয়তো আমি আবার কাউকে বিশ্বাস করতে পারব।”
মায়ার চোখের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
সে লিখল,
“বিশ্বাস করতে শিখুন। সবাই আপনার অতীতের মানুষটির মতো হবে না।”
আরিশের উত্তর এল,
“সবাইকে বিশ্বাস করতে পারি না। তবে আপনাকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে।”
মায়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে লিখল,
“আমি আপনার বিশ্বাস ভাঙব না, আরিশ।”
বার্তাটা পাঠিয়ে সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।
মায়ার মনে হচ্ছিল, তাদের গল্পটা হয়তো সত্যিই অন্য রকম হতে চলেছে।
কিন্তু সে জানত না, ঠিক সেই সময় আরিশের ফোনেও একটি বার্তা এসেছে।
একটি অপরিচিত নম্বর থেকে।
বার্তায় লেখা—
“আরিশ, অনেক দিন তো হলো। এবার কি আমাদের আবার দেখা হতে পারে?”
বার্তাটার নিচে লেখা নামটি দেখে আরিশের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
নওরিন।
তার অতীতের সেই মানুষটি, যাকে সে এত বছরেও পুরোপুরি ভুলতে পারেনি।
আরিশ অনেকক্ষণ ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এত দিন পর আবার কেন ফিরে এলে, নওরিন?”
অন্যদিকে মায়া তখনো জানত না, তার জীবনে প্রথমবারের মতো ভালোবাসার অনুভূতি জন্ম নেওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তে আরিশের অতীত ফিরে আসার দরজায় কড়া নাড়ছে।
এই ফিরে আসা কি তাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে?
নাকি এমন এক দূরত্ব তৈরি করবে, যেখান থেকে ফিরে আসা আর সহজ হবে না?
তা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পর্বের জন্য।
চলবে...
পরবর্তী পর্ব: নওরিনের ফিরে আসা। আরিশ কি তার অতীতকে নতুন করে সুযোগ দেবে, নাকি মায়ার উপস্থিতি তাকে জীবনের অন্য এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে?
