নিশিপুরের স্টেশনে ট্রেন থামল সন্ধ্যা ছটায়। অথচ নীহার মনে হলো রাত অনেক গভীর।
প্ল্যাটফর্মে একটাই কেরোসিনের বাতি, তার চারপাশে কুয়াশা এমনভাবে জমে আছে যেন কেউ দুধ ঢেলে দিয়েছে। কুলি নেই, চায়ের দোকান বন্ধ, টিকিটঘরের জানালায় পুরনো কাগজ সাঁটা। নীহা তার ভারী ব্যাগটা কাঁধে তুলে চারদিকে তাকাল। গত বারো বছরে সে এই গ্রামে আসেনি। মা আসতে দিতেন না। কারণ জিজ্ঞেস করলে একই উত্তর দিতেন, ওখানে কিছু নেই রে নীহু, শুধু মশা আর অন্ধকার।
আজ মা নেই। এগারো দিন আগে শহরের হাসপাতালে চুপচাপ চলে গেছেন। শেষ রাতে নীহার হাত চেপে ধরে কী একটা বলতে চেয়েছিলেন, গলা দিয়ে শব্দ বেরোয়নি। শুধু ঠোঁট নড়েছিল। নীহা বহুবার সেই ঠোঁটের নড়াচড়া মনে করে শব্দ বানানোর চেষ্টা করেছে। একবার মনে হয়েছে ফিরিস না, আরেকবার মনে হয়েছে ফিরে আয়। কোনোটাই নিশ্চিত নয়।
ওই যে, দিদিমণি নাকি?
পেছন থেকে একটা কর্কশ গলা। নীহা চমকে ঘুরল। বাতির আলোর সীমানায় একটা রোগা, কালো মতো লোক দাঁড়িয়ে, হাতে একটা লণ্ঠন, মাথায় গামছা বাঁধা।
আমি নিতাই। সরযূবালা ঠাকুমা পাঠিয়েছেন। গরুর গাড়ি আছে বাইরে। তাড়াতাড়ি চলুন, আজ অমাবস্যা। সন্ধের পর কেউ বাইরে থাকে না এ গাঁয়ে।
অমাবস্যা? নীহা ভুরু কোঁচকাল। মা সবসময় বলতেন কুসংস্কার। কিন্তু নিতাইয়ের গলায় এমন একটা তাড়া ছিল, যেটা অভিনয় হতে পারে না। লোকটার লণ্ঠন ধরা হাত কাঁপছে।
গরুর গাড়িতে উঠে নীহা প্রথম লক্ষ করল, রাস্তার দুপাশের প্রতিটা বাড়ির দরজা বন্ধ। জানালায় আলো নেই। কোনো কুকুর ডাকছে না, ঝিঁঝিঁ ডাকছে না। সারা গ্রাম যেন দম আটকে শুয়ে আছে।
এত চুপচাপ কেন গ্রামটা?
নিতাই চাবুক নাড়ল না। গলা নামিয়ে বলল, আজকের রাতে কথা কম বলাই ভালো দিদিমণি। আর যদি...
যদি কী?
যদি রাতে কেউ আপনার নাম ধরে ডাকে, সাড়া দেবেন না। যে-ই ডাকুক। বাবা মা ভাই বোন, যে-ই হোক।
নীহার গায়ে কাঁটা দিল। ঠাট্টা করার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু নিতাইয়ের পিঠের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারল না। গাড়ির চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। ডানদিকে কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা বিশাল জলাশয়ের আবছা আভাস দেখা যাচ্ছিল। কালো, স্থির, সীমাহীন।
ওটা কী?
কালদহ বিল, নিতাই এমনভাবে বলল যেন নামটা উচ্চারণ করাই পাপ। ওদিকে তাকাবেন না দিদিমণি।
কিন্তু নীহা তাকিয়ে রইল। আর তখনই তার মনে হলো বিলের ওপারে, দূরে কুয়াশার মধ্যে, একটা আলো দুলছে। ছোট, হলুদ, একা। একটা লণ্ঠনের মতো। আলোটা এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে, যেন কেউ তাদের গাড়িটাকেই দেখছে।
সে চোখ কচলে আবার তাকাল। আলোটা নেই।
◆
সরযূবালার বাড়িটা পুরনো, দোতলা, উঠোনের মাঝখানে একটা তুলসীমঞ্চ। গাড়ি থেকে নামতেই দরজা খুলে গেল। ঠাকুমা দাঁড়িয়ে আছেন, সাদা থান, রুপোলি চুল পেছনে টানা বাঁধা, ছোট্ট শরীরটা যেন ঝড়ে বেঁকে যাওয়া শুকনো ডাল। কিন্তু চোখদুটো তীক্ষ্ণ, জ্বলজ্বলে।
নীহা এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে গেল। ঠাকুমা তাকে থামিয়ে দুই হাতে মুখটা তুলে ধরলেন। অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর তাঁর চোখ ভরে উঠল।
তুই অবিকল ওর মতো হয়েছিস, ফিসফিস করে বললেন তিনি। ঠিক ওর মতো।
নীহা জানত ঠাকুমা মায়ের কথাই বলছেন। সে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরল। বুড়ির শরীর এত হালকা যে মনে হলো বাতাসও তাঁকে উড়িয়ে নিতে পারে। অনেকদিন পর কেউ তাকে এত শক্ত করে ধরে রাখল।
ভেতরে আয়। দরজায় খিল দিয়ে দে। নিতাই, তুই বাড়ি যা, আর রাস্তায় থামবি না।
নিতাই কোনো কথা না বলে প্রায় ছুটে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল। ঠাকুমা নিজের হাতে দরজা বন্ধ করলেন। একটা নয়, তিনটে খিল। তারপর দরজার চৌকাঠের ওপর কী একটা শুকনো পাতার গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলেন, আর বিড়বিড় করে কিছু বললেন।
ঠাকুমা, নীহা আস্তে বলল, আপনিও এসব মানেন? মা বলতেন...
তোর মা অনেক কিছু বলত, ঠাকুমা কেটে দিলেন। তার গলায় কঠিনতা। তোর মা এ গ্রাম থেকে পালিয়েছিল বলেই বেঁচেছিল। আর আজ সে নেই। আজ রাত থেকে তুই এ বাড়ির বাইরে এক পা দিবি না।
কেন?
আগে খেয়ে নে। পরে বলব।
কিন্তু খাওয়ার পরেও ঠাকুমা কিছু বললেন না। শুধু নীহাকে দোতলার একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। জানালায় লোহার গরাদ, আর গরাদের গায়ে লাল সুতো বাঁধা। বিছানার চারপাশে একটা সাদা গোলাকার দাগ, লবণ দিয়ে টানা।
রাতে যা-ই শুনিস, ঘুমের ভান করে পড়ে থাকবি। আমি তোর পাশের ঘরে থাকব।
ঠাকুমা...
তোর মা শেষ সময়ে কিছু বলেছিল?
প্রশ্নটা এত আচমকা যে নীহা থতমত খেয়ে গেল। সে মাথা নাড়ল। কিছু বলতে পারেননি। শুধু ঠোঁট নড়ছিল।
ঠাকুমার মুখ এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি কিছু না বলে দরজার দিকে এগোলেন। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালেন।
শহরের অভ্যাসে হুট করে জানালা খুলে দেখিস না, নীহু। অমাবস্যার রাত অন্যরকম।
নীহু। মা ছাড়া এই ডাকনামে কেউ ডাকত না তাকে। ঠাকুমা কী করে জানলেন? অবশ্য হয়তো মা চিঠিতে লিখেছিলেন। নীহা নিজেকে বোঝাল।
ঠাকুমা চলে গেলেন। নীহা বিছানায় বসে রইল। সুটকেস খোলার ইচ্ছে হলো না। ব্যাগ থেকে মায়ের ছবিটা বের করে বালিশের পাশে রাখল। ছবির মা হাসছেন। পুরনো ছবি, যেদিন মায়ের বয়স ছিল তার বয়সী। পেছনে কালো একটা জলাশয়, আর জলের ওপারে একটা ভাঙা বাড়ির ছায়া।
নীহা ছবিটা অনেকক্ষণ দেখল। এই ছবি সে আগে বহুবার দেখেছে, কিন্তু কখনো ভেবে দেখেনি পেছনের জলাশয়টা কোথাকার। আজ বুঝল, এটা কালদহ বিল।
◆
রাত গভীর হলো। ঘড়িতে বারোটা পেরোল, একটা বাজল। নীহার ঘুম আসছিল না। শহরের শব্দের অভ্যাস, এখানকার নৈঃশব্দ্য যেন কানের পর্দা চেপে ধরছে। কোথাও একটা টিকটিকি ডেকে উঠল, তারপর আবার সব স্থির।
আর তখন সে শুনল।
প্রথমে মনে হলো বাতাসের শব্দ। তারপর শব্দটা স্পষ্ট হলো। দূর থেকে ভেসে আসছে। কেউ ডাকছে। অনেক দূরে, বিলের দিক থেকে। লম্বা, টানা সুরে, যেমন কোনো মা সন্ধ্যায় খেলতে যাওয়া ছেলেকে ডাকে।
নী...হা...
নীহার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
নী...হু... সোনা...
সে বিছানায় উঠে বসল। বুক এমনভাবে ধকধক করছে যে পাঁজরে ব্যথা। গলাটা। এই গলাটা সে চেনে। আজীবন চিনে এসেছে। প্রতিদিন সকালে যে গলা তাকে ঘুম থেকে তুলেছে, রাতে গল্প শুনিয়েছে, অসুখে মাথায় হাত বুলিয়েছে।
মা।
ডাকটা আরও কাছে এল। এখন আর বিলের দিক থেকে নয়। উঠোনের দিক থেকে।
নীহু... দরজাটা খোল রে। বড্ড ঠান্ডা লাগছে।
নীহার হাত পা অবশ হয়ে গেল। মা মারা গেছেন। সে নিজের হাতে চিতায় আগুন দিয়েছে। নিজের চোখে দেখেছে। তবু এই গলা, এই সুর, এই কথা বলার ভঙ্গি, এক চুল ভুল নেই।
নীহু, আমি তোর মা। ভয় পাচ্ছিস কেন? জানালাটা খোল। একবার শুধু মুখটা দেখি।
নীহা বিছানা থেকে নামল। সে নিজেই বুঝল না কখন পা মেঝেতে পড়েছে। লবণের দাগ পেরিয়ে গেল, পায়ের তলায় কড়কড় করে শব্দ হলো। জানালার দিকে এগোল, এক পা, দুই পা। হাত বাড়াল গরাদের দিকে।
মা, সে ফিসফিস করল। মা, তুমি...
খবরদার!
একটা শক্ত হাত পেছন থেকে এসে তার মুখ চেপে ধরল। আরেকটা হাত কোমর জড়িয়ে টেনে নিল পেছনে। নীহা চিৎকার করতে গিয়ে বুঝল ঠাকুমা। বুড়ির এত শক্তি কোথা থেকে এল কে জানে।
একটা শব্দ নয়, একটা অক্ষরও নয়, ঠাকুমা তার কানের কাছে হিসহিস করে বললেন। সাড়া দিলেই শেষ। ও ডাক আমার মেয়ের না, ও ডাক আমার মেয়ের গলা চুরি করেছে।
নীহার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে ঠাকুমার হাত ভিজিয়ে দিচ্ছিল। বাইরের গলা তখন বদলে গেছে। আর মায়ের মতো মিষ্টি নেই। কেমন একটা ফাটা, কর্কশ, হাসির সুর।
নীহু... সাড়া দে সোনা... আমি তো তোর জন্যই এসেছি...
ঠাকুমা নীহাকে মেঝেতে বসিয়ে দিলেন। নিজে জানালার সামনে দাঁড়ালেন। হাতে একমুঠো কালো সরষে আর একটা শুকনো পাতা। তিনি জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে বাইরে ছুড়ে দিলেন, আর বজ্রগম্ভীর গলায় বললেন, ফিরে যা! এ মেয়ে তোর নয়!
বাইরে সব চুপ হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর, খুব আস্তে, একটা হাসির শব্দ ভেসে এল। কান্নার মতো, কিন্তু কান্না নয়।
তুই আটকাতে পারবি না সরযূ, গলাটা বলল। এবার মায়ের নয়, কোনো পুরুষের নয়, কোনো নারীরও নয়। যেন বহু কণ্ঠ একসঙ্গে মিশে গেছে। আগের বার তুই আটকেছিলি। এবার ও নিজেই আসবে।
তারপর বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে সব মিলিয়ে গেল।
নীহা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ঠাকুমা... আগের বার মানে কী? আপনি কাকে আটকেছিলেন?
ঠাকুমা উত্তর দিলেন না। তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, মুখ পাথরের মতো। নীহা সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে তাকাল।
উঠোনের ওপারে, বাড়ির পাঁচিলের গা ঘেঁষে, একটা বটগাছের নিচে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা, কালো চাদর গায়ে। হাতে একটা লণ্ঠন, যার আলোয় তার মুখ আবছা দেখা যাচ্ছে। যুবক, কঠিন মুখ, ছুরির মতো ধারালো চোয়াল। সে সরাসরি নীহার জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
গাড়িতে আসার সময় বিলের ওপারে যে আলোটা দেখেছিল, ঠিক সেটাই।
লোকটা ধীরে ধীরে এক আঙুল ঠোঁটে ঠেকাল। চুপ থাকার ইশারা। তারপর মাথা নেড়ে হালকা ইঙ্গিত করল, যেন বলছে, ও চলে গেছে, আর ভয় নেই। কিন্তু তার চোখে এমন একটা অস্থিরতা, যা নিশ্চিন্ত মানুষের চোখে থাকে না।
ঠাকুমা চট করে পর্দা টেনে দিলেন।
ওকে চিনেন আপনি? নীহা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
রায়চৌধুরীদের ছেলে। ঠাকুমার গলায় এমন এক ঘৃণা আর ভয় মেশানো ছিল যে নীহা চমকে গেল। ওর কাছ থেকে দূরে থাকবি। ও রাতে বেরোয়, আর যেদিন ও বেরোয়, সেদিনই ডাক আসে।
নীহার মনে প্রশ্ন গিজগিজ করছিল। কিন্তু ঠাকুমা তাকে আর কিছু বলতে দিলেন না। তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন, নিজে মেঝেতে মাদুর পেতে বসে রইলেন দরজার সামনে। ভোর পর্যন্ত নীহা চোখ বুজে পড়ে রইল, কিন্তু একটুও ঘুমাল না।
◆
সকাল হলো ধূসর কুয়াশা নিয়ে। নীহা নিচে নামতেই দেখল ঠাকুমা উঠোনে দাঁড়িয়ে, মুখ ফ্যাকাশে, চোখ এক জায়গায় আটকে।
নীহা তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল। আর তার রক্ত হিম হয়ে গেল।
উঠোনের ভেজা মাটিতে পায়ের ছাপ। বিলের দিক থেকে এসেছে, সোজা বাড়ির দরজা পর্যন্ত। ছোট ছোট খালি পায়ের ছাপ, নারীর পায়ের। প্রতিটা ছাপ জলে ভেজা, এখনো ভিজে।
কিন্তু ছাপগুলো উল্টো। আঙুল বাড়ির দিকে নয়, বিলের দিকে ফেরানো। যেন কেউ পেছন দিকে হেঁটে এসেছে। আর গোড়ালির দাগ দরজার দিক ঘেঁষা।
ঠাকুমা কাঁপা গলায় বললেন, ও এসেছিল। ও দরজা পর্যন্ত এসেছিল।
নীহা পা বাড়িয়ে দরজার কাছে গেল। দরজার কড়ায় একটা জিনিস বাঁধা ছিল। লাল সুতোর ফাঁস, আর তাতে ঝুলছে একটা ছোট্ট সোনার নাকছাবি।
নীহার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে হাত বাড়িয়ে সেটা তুলে নিল। উল্টে দেখল, ভেতরে ছোট অক্ষরে খোদাই করা দুটো অক্ষর। ন আর সে।
নন্দিতা সেন। তার মায়ের নাম।
মায়ের নাকছাবি। যেটা চিতায় ওঠার আগে নীহা নিজের হাতে খুলে নিয়ে শহরের বাড়ির আলমারিতে তালা দিয়ে রেখে এসেছিল।
চলবে...
( নতুন লেখিকা যদি লেখাই ভুল থাকে তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ। )
