এক বুক শূন্যতা
পর্ব ১: এক বুক শূন্যতা
রাত তখন অনেক গভীর। চারপাশের পৃথিবী যখন ঘুমের দেশে হারিয়ে গেছে, তখনও জানালার পাশে বসে আছে একটি মেয়ে। বাইরে নিস্তব্ধতা, অথচ তার বুকের ভেতর যেন হাজারো শব্দের কান্না।
মেয়েটির নামটা আজ না-ই বললাম। কারণ কিছু গল্পে নামের চেয়ে অনুভূতিগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজ তার জীবনে সংসার আছে, আপনজন আছে, হাসি-আনন্দে ভরা একটা পরিচিত পৃথিবী আছে। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, এই মেয়েটির বুকের ভেতর কতটা শূন্যতা জমে আছে।
সে এখন আর আগের মতো নেই। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করে না, কাউকে নিজের কষ্টের কথা বলতেও ভয় পায়। কারণ সে জানে, সব আপন মানুষ আপন হয় না। কিছু মানুষ ভালোবাসার অভিনয় করে, কিছু মানুষ বিশ্বাসের সুযোগ নেয়, আবার কিছু মানুষ খুব কাছের হয়েও সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়ে যায়।
একসময় মেয়েটি ভালোবাসতে জানত। কাউকে নিজের পৃথিবী ভাবতে জানত। একটা মানুষের সামান্য অবহেলাতেও তার মন খারাপ হতো, আবার সেই মানুষটির একটু ভালোবাসাতেই তার পুরো পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠত।
কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, যাকে সে মন দিয়ে ভালোবেসেছিল, সেই মানুষটি হয়তো তার মনকে কখনো ভালোবাসেইনি। ভালোবাসার নামে সে শুধু মেয়েটির শরীরটাকেই চেয়েছিল।
মেয়েটি তখনও বুঝতে পারেনি। বিশ্বাস করেছিল, ভালোবাসা মানেই বিশ্বাস, ভালোবাসা মানেই সম্মান। কিন্তু একদিন তার সেই বিশ্বাসের আকাশে কালো মেঘ জমে গেল। ব্যক্তিগত কিছু ছবি, কিছু গোপন কথা আর কিছু আপন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা তাকে সবার সামনে ছোট করে দিল।
যাদের সে বোনের মতো ভেবেছিল, তারাই তাকে অপমান করল। যাদের কাছে নিজের মনের কথা বলেছিল, তারাই সেই কথাগুলো অন্যদের কাছে পৌঁছে দিল।
তবুও মেয়েটি ভালোবেসেছিল। এত অপমানের পরেও সেই মানুষটির জন্য তার মনে একটা জায়গা রয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
একসময় মেয়েটির বিয়ে হলো। নতুন মানুষ, নতুন সংসার, নতুন জীবনের শুরু। সে চেষ্টা করেছিল পুরোনো সবকিছু ভুলে নতুন করে বাঁচতে। নিজের সংসারকে ভালোবাসতে, নিজের ভবিষ্যৎ সাজাতে।
তারপর একদিন তার জীবনে এলো মাতৃত্বের খবর।
একজন নারী যখন প্রথমবার মা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন তার পৃথিবীটা যেন অন্যরকম হয়ে যায়। মেয়েটিও স্বপ্ন দেখেছিল। নিজের ছোট্ট সন্তানকে কোলে নেবে, তাকে আদর করবে, তার ছোট ছোট হাত ধরে হাঁটতে শেখাবে।
কিন্তু সব স্বপ্ন কি সত্যি হয়?
১৮ অক্টোবর—একটি দিন, যে দিনটি তার জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। তার গর্ভে থাকা ছোট্ট সন্তানের হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল। পৃথিবীতে আসার আগেই হারিয়ে গিয়েছিল তার ছোট্ট রাজপুত্র।
২২ অক্টোবর সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে সে তার সন্তানকে জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সেই জন্মের সঙ্গে ছিল না কোনো শিশুর কান্না, ছিল না মায়ের কোলে প্রথমবার সন্তানকে পাওয়ার আঝনন্দ।
ছিল শুধু নীরবতা।
ছেলেটির জন্য সে একটি নাম ভেবেছিল—মাহির ইসলাম মুসা।
নামটি আজও তার হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল জায়গায় লেখা আছে। পৃথিবীর মানুষ হয়তো তাকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু একজন মায়ের কাছে তার সন্তান কখনো হারিয়ে যায় না।
এরপরও মেয়েটি হাল ছাড়েনি। আবারও মা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারও তিন মাসের মাথায় তার মাতৃত্বের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছিল।
দুটি হারানো স্বপ্ন, দুটি না-পাওয়া সন্তান। অথচ একজন মা হিসেবে তার ভালোবাসা একটুও কমেনি।
আজও কখনো কখনো সে একা বসে ভাবে, তার সন্তানরা যদি বেঁচে থাকত, তাহলে আজ তার জীবনটা কেমন হতো? ঘরজুড়ে ছোট ছোট পায়ের শব্দ থাকত, মায়ের ডাক শুনে কেউ ছুটে আসত।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নিষ্ঠুর। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, কিছু শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না।
মেয়েটি এখনো হাসে। মানুষের সঙ্গে কথা বলে, সংসারের কাজ করে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু কেউ জানে না, তার হাসির আড়ালে কতগুলো না বলা গল্প লুকিয়ে আছে।
হাজারো মানুষের মাঝেও সে একা।
কারণ তার জীবনে কিছু মানুষ এসেছিল, যারা ভালোবাসার কথা বলে তাকে কাঁদিয়েছে। কিছু মানুষ আপন হওয়ার কথা বলে তার বিশ্বাস ভেঙেছে। আর কিছু স্বপ্ন এসেছিল, যেগুলো পূর্ণ হওয়ার আগেই হারিয়ে গেছে।
তবুও সে বেঁচে আছে।
হয়তো একদিন সে নিজের সব কষ্টের কথা লিখে রাখবে। কেউ পড়বে, কেউ বুঝবে, আবার কেউ হয়তো না বুঝেই পাতা উল্টে চলে যাবে।
কিন্তু তার কিছু যায় আসে না।
কারণ এই গল্প কারও মনোরঞ্জনের জন্য নয়। এই গল্প সেই মেয়েটির, যে জীবনে অনেক কিছু হারিয়েও নিজের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
কিছু মানুষ জীবনে আসে গল্প হয়ে, কিছু মানুষ চলে যায় স্মৃতি হয়ে। আর কিছু মানুষ সারাজীবন বুকের ভেতর এক আকাশ শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকে।
চলবে...
