এক বুক শূন্যতা
দ্বিতীয় পর্ব: শৈশবের রঙিন দিন আর বদলে যাওয়া গল্প
একটি মেয়ের জীবনে শৈশব হলো এমন এক সময়, যখন ছোট ছোট আনন্দেই পৃথিবীটা সুন্দর মনে হয়। মাহিয়া মাহির জীবনেও এমন কিছু দিন ছিল, যেগুলো আজও তার স্মৃতির পাতায় রঙিন হয়ে আছে। তবে সেই রঙিন দিনগুলোর আড়ালেও লুকিয়ে ছিল কিছু কষ্ট, কিছু অভিমান আর কিছু না বলা গল্প।
মাহিয়ার পরিবার খুব ধনী ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন তার বাবা ইমন খান। পরিবারের সদস্যসংখ্যাও কম ছিল না। বাবার সঙ্গে আরও পাঁচ ভাই, অর্থাৎ সব মিলিয়ে ছয় ভাই। দুই ফুফু এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বিশাল পরিবার। বাবার দিকের চার ভাইয়ের ঘরে মোট দশটি সন্তান। অন্যদিকে মায়ের পরিবারেও ছিল অনেক সদস্য—পাঁচ মামা, দুই খালা এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে বড় এক পরিবার।
মাহিয়ার মায়ের নাম মেঘলা আক্তার। তিনি নিজেও মেয়ে সন্তান পছন্দ করতেন। দ্বিতীয়বার মা হওয়ার সময়ও তাঁর মনে আশা ছিল, এবার হয়তো একটি মেয়ে হবে। কিন্তু তাঁর কোলজুড়ে আসে একটি ছেলে।
মাহিয়ার পরিবারে ছেলেদের গুরুত্ব ছিল একটু বেশি। পরিবারের অনেকের ধারণা ছিল, ছেলেরা বড় হয়ে কাজ করবে, পরিবারের দায়িত্ব নেবে; আর মেয়েদের একদিন বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। তাই ছোটবেলা থেকেই মাহিয়া বুঝতে শুরু করেছিল, একই পরিবারের সন্তান হয়েও সবার গুরুত্ব সমান হয় না।
মাহিয়ার জন্মের সময় সবাই খুব খুশি হয়েছিল। বিশেষ করে তার বাবা তাকে ভীষণ আদর করতেন। কিন্তু সংসারে অশান্তি ছিল। বাবার সঙ্গে মায়ের প্রায়ই ঝগড়া হতো, আর সেই ঝগড়ার মধ্যে মায়ের ওপর নির্যাতনও চলত। ছোট্ট মাহিয়াকেও অনেকবার মারার চেষ্টা করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তার জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর কেটে যায়।
এরপর মাহিয়ার জীবনে আসে তার ছোট ভাই আরিয়ান। মাহিয়ার জন্মের চার বছর পর তার ভাইয়ের জন্ম হয়। ভাই আসার পর সংসারের ভালোবাসার হিসাবটাও যেন বদলে যেতে থাকে। মা ছেলেকে একটু বেশি ভালোবাসতেন, যদিও মেয়েকেও ভালোবাসতেন। কিন্তু মাহিয়া অনেক সময় বুঝতে পারত, ভাইয়ের জন্য যা সহজে পাওয়া যায়, তার জন্য তা সবসময় সমানভাবে পাওয়া যায় না।
তবুও মাহিয়ার পড়াশোনা ভালোই চলছিল। ছোটবেলা থেকে সে স্বাভাবিকভাবেই স্কুলে যেত, পড়াশোনা করত। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় তার জীবনে নেমে আসে প্রথম বড় শোক।
২০১৬ কিংবা ২০১৭ সালের কোনো এক সময়ে মাহিয়ার নানা মারা যান। নানা আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন, একসময় স্ট্রোকও করেছিলেন। নানার মৃত্যুর খবর মাহিয়াকে ভীষণভাবে ভেঙে দিয়েছিল। সে অনেক কেঁদেছিল। নানার বাড়ির সঙ্গে তার মায়ের অনেক দায়িত্ব ও সম্পর্ক জড়িয়ে ছিল। দুই খালার বিয়ে দূরে হলেও মায়ের বিয়ে হয়েছিল গ্রামেই। তাই নানাবাড়ির নানা ঝামেলা ও দায়িত্ব মাকেই সামলাতে হতো।
নানার মৃত্যুর কয়েক মাস পর আরেকটি দুঃসংবাদ আসে। মাহিয়ার মেজ ফুফুর স্বামী বিদেশে এক দুর্ঘটনায় মারা যান। একের পর এক মৃত্যু আর দুঃখের খবর ছোট্ট মাহিয়ার জীবনের স্মৃতিতে জায়গা করে নেয়।
তবে সব দিন যে কষ্টের ছিল, তা নয়। মাহিয়ার পঞ্চম শ্রেণির দিনগুলো ছিল খুব সুন্দর। তার পাঁচজন বান্ধবী ছিল। তারা সবাই তুলনামূলক ভালো পরিবারের মেয়ে হলেও মাহিয়াকে কখনো ছোট করে দেখেনি। মাহিয়ার পরিবার একটু ছোট অবস্থার হলেও বন্ধুরা তাকে নিজেদের মতো করেই গ্রহণ করেছিল। একসঙ্গে কত হাসি, কত মজা, কত গল্প—সেই দিনগুলো ছিল সত্যিই আনন্দের।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্বেও পরিবর্তন আসে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। সপ্তম শ্রেণিতে রুনাকে কেন্দ্র করে সেই দূরত্ব আরও বাড়ে। একসময় আগের মতো একসঙ্গে থাকা বা কথা বলা আর হয়ে ওঠে না।
অষ্টম শ্রেণির শেষ দিকে অ্যাসাইনমেন্টের সময় মাহিয়া অনলাইনে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে। সেখানে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের মধ্যেই একজন ছেলের সঙ্গে তার নিয়মিত কথা হতে থাকে। প্রতিদিনের কথাবার্তা কখন যে মনের টান হয়ে গেল, মাহিয়া নিজেও বুঝতে পারেনি। অল্প দিনের পরিচয়েই ছেলেটি তার মনে জায়গা করে নেয়।
কয়েক দিনের মধ্যেই মাহিয়া মায়ের কাছে ধরা পড়ে যায়। কিন্তু তত দিনে ছেলেটি তার মনে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে যে, কথা বন্ধ করা তার পক্ষে সহজ ছিল না। মায়ের কাছে বারবার ধরা পড়েছে, বকুনি ও মারও খেয়েছে, কসমও কাটতে হয়েছে। তবুও ছেলেটির সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই সময় কাজিনদের সঙ্গেও মাহিয়ার সম্পর্কের নানা পরিবর্তন আসে। একসময় তাদের সঙ্গে কথা বলা ও মেশা কমে যায়। পরে নানুবাড়িতে গিয়ে নানুর মোবাইল দিয়ে ছেলেটির সঙ্গে অনেক কথা ও মেসেজ আদান-প্রদান করে সে। সেসব কথাও একসময় পরিবারের মানুষের সামনে চলে আসে।
এরই মধ্যে মাহিয়ার জীবনে কয়েকজন নতুন বন্ধু আসে। অষ্টম শ্রেণির সামিয়া, যে তার মামাতো বোন, আর পাশের বাড়ির মেয়ে তানজু। তানজু ছিল মাহিয়ার সবচেয়ে কাছের বন্ধু—তার বেস্ট ফ্রেন্ড। অন্যদিকে নবম শ্রেণিতে তার আরও তিনজন ভালো বন্ধু হয়—নুসরাত, মারিয়া ও শুভা জাহান। এই মানুষগুলোও ধীরে ধীরে মাহিয়ার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
নবম শ্রেণিতে মাহিয়ার চার নম্বর মামার বড় ছেলে তাকে পছন্দ করতে শুরু করে। মাহিয়া বিষয়টি বুঝতে পারলেও কিছু বলেনি। তার মা-ও ব্যাপারটি বুঝতে পেরেছিলেন। পরে কাজিনদের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হওয়ার পর পরিবারের কাছে মাহিয়ার অনেক ব্যক্তিগত কথা প্রকাশ পেতে থাকে।
এত কিছুর মধ্যেও ছেলেটির প্রতি মাহিয়ার টান কমেনি। একসময় ছেলেটি তার বিশ্বাস ভেঙে দেয়। কিন্তু পরে ক্ষমা চায়। মাহিয়া তাকে ক্ষমা করে দেয়। কারণ সে তখনও ছেলেটিকে ভালোবাসত, বিশ্বাস করতে চাইত। সে হয়তো ভেবেছিল, ভুল সবাই করে; ভালোবাসা থাকলে সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যেতে পারে।
দশম শ্রেণিতে উঠে মাহিয়া কাজিনদের সঙ্গে আগের মতো মিশত না। নিজের মতো থাকত। তবে তার পাশে ছিল কিছু বন্ধু, যারা তাকে একা হতে দেয়নি। পড়াশোনাও চালিয়ে যায় সে। অবশেষে আসে এসএসসি পরীক্ষার সময়। মাহিয়া পরীক্ষা দেয় এবং পাসও করে।
এসএসসি পরীক্ষার সময়ও ছেলেটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ঠিক ছিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, সবকিছু স্বাভাবিক। মাহিয়ার জীবন যেন আবার নিজের গতিতে চলছিল।
কিন্তু জীবনের গল্প তো এখানেই শেষ নয়।
শৈশবের সেই ছোট্ট মেয়েটি তখনও জানত না, সামনে তার জন্য আরও কত পরিবর্তন অপেক্ষা করছে। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, বিশ্বাস আর পরিবারের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সে ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল।
একটি অধ্যায়ের শেষ হলো এসএসসি পাসের মধ্য দিয়ে। সামনে অপেক্ষা করছে জীবনের আরেকটি নতুন অধ্যায়—বিয়ে।
চলবে...
