অধরা আসক্তি
লেখনীতে: Ohona hossan
পর্ব ২ — দুটি আলাদা পৃথিবী
লন্ডন, সকাল ৮টা ০৫ মিনিট
বাথরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল মালিহা চৌধুরী।
ভেজা মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে নিজের চুলের দিকে তাকাল। হাঁটু পর্যন্ত নেমে যাওয়া ঘন গোল্ডেন-ব্রাউন চুলগুলো যত্ন করে শুকানো সহজ কাজ নয়। তার ওপর আজ সকাল থেকেই মেজাজ খারাপ।
“এই চুলের জন্য একদিন আলাদা একটা রুম বানাতে হবে আমার।”
নিজের মনেই কথাটা বলে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসল।
চুলগুলো কয়েক ভাগে গুছিয়ে পেছনে তুলল। তারপর একটা সুন্দর হেয়ার স্টিক দিয়ে এমনভাবে বাঁধল, যাতে লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর ভারী হয়ে না থাকে। কয়েকটি নরম গোছা কানের পাশে রেখে দিল। এরপর বেছে নিল তার পছন্দের স্কয়ার বক্স-ফ্রেমের চশমাটা।
আজকের পোশাক—হালকা ধূসর ফিটেড টপ, ঢিলেঢালা চারকোল-গ্রে ট্রাউজার, সাদা chunky sneakers আর একটা ক্যাপ।
পোশাকটা সাধারণ, কিন্তু মালিহার গায়ে সেটাও আলাদা দেখায়।
ফোন, ওয়ালেট আর গাড়ির চাবি নিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই রান্নাঘরের দিক থেকে মিনহাজের আওয়াজ এল—
“আম্মু! আপু আবার ছেলেদের মতো কাপড় পরেছে!”
মালিহা সিঁড়ির মাঝখানে থামল।
তারপর একটু ভাবলিসিন ভাবে বললো।
“মিনহাজ”
“জি, আপু?”
“তোর স্কুলের ব্যাগে কী আয়না আছে?”
মিনহাজ একটু ভেবে বললো।
“না।”
“থাকলে নিজের মুখটা দেখতিস। এত সুন্দর বোন পেয়েও কীভাবে এমন কথা বলিস!”
মিনহাজ মুখ বাঁকাল।
“নিজের প্রশংসা নিজেই করিস!”
“অবশ্যই। অন্যরা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়।”
ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা সিনতিহা হেসে প্রায় কফি ফেলে দিল।
“মালিহা আপু, তোমার আত্মবিশ্বাসের জন্য আলাদা একটা পুরস্কার দেওয়া উচিত।”
“ধন্যবাদ। পুরস্কার হিসেবে আজকের নাশতার বিলটা তুই দিবি।”
“আমি তো এখনো কলেজে পড়ি!”
“তাহলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে পড়াশোনা কর।”
“আপু!”
মালিহা হেসে নিজের চেয়ার টেনে বসল।
জেসমিন চৌধুরী তার সামনে প্লেট রাখলেন।
“এত কথা না বলে খাও। আজ তোমার ক্যাফেতে যাওয়ার কথা, না অফিসে?”
“আগে ক্যাফে। তারপর অফিসে একটা মিটিং আছে।”
শোহাগ চৌধুরী খবরের কাগজ থেকে চোখ তুললেন।
“আজ বিকেলে আমার সঙ্গে CR Corporation-এ বসতে হবে। একটা নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কথা আছে।”
মালিহা মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে, বাবা। ডকুমেন্টগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিও।”
“গত রাতেই পাঠিয়েছি।”
“ওহ।”
শোহাগ চোখ সরু করলেন।
“তুমি কি দেখেছ?”
মালিহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।
তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “বাবা, আমি স্বপ্নে দেখেছি।”
মিনহাজ হেসে উঠল।
শোহাগ কপাল চাপড়ে বললেন, “এই মেয়েকে কোম্পানির দায়িত্ব দিয়েছি কী ভেবে আল্লাহ ভালো জানেন!”
“because,আমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় মেয়ে।”
“because you are my only one little daughter।”
“Exactly. Unique piece.”
জেসমিন মুখে বিরক্তি রাখলেও মেয়ের প্লেটে আরেকটা প্যানকেক তুলে দিলেন।
“খাও। সারাদিন শুধু কফি খেয়ে থেকো না।”
মালিহা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“Okay and Thank you, Mom।”
জেসমিন উত্তর দিলেন না। শুধু চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিলেন।
মালিহা জানে, তার মা সবসময় ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করেন না। কিন্তু মেয়ের প্লেটে খাবার বাড়িয়ে দেওয়া, বেরোনোর আগে ফোন করে খোঁজ নেওয়া—এসবের মধ্যে তাঁর যত্নটা লুকিয়ে থাকে।
নাশতা শেষ করে মালিহা উঠে দাঁড়াল।
“আমি যাচ্ছি!”
শোহাগ বললেন, “সাবধানে গাড়ি চালাবে।”
“ok boss।”
“আর আমাকে বস বলবে না।”
“okey dad-boss।”
“মালিহা!”
মারিসা হাসতে হাসতে সে দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
সকাল ৯টা ১০ মিনিট — মালিহার ক্যাফে
ক্যাফেটার নাম MOCHI CAFÉ।
লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তার এক পাশে কাচঘেরা সুন্দর জায়গাটা। ভেতরে ঢুকলেই কফির গন্ধ, নরম আলো, কাঠের টেবিল আর শান্ত সঙ্গীত—সব মিলিয়ে একটা আরামদায়ক পরিবেশ।
মালিহা নিজেই ক্যাফেটার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করিয়েছিল। জায়গাটা তার কাছে শুধু ব্যবসা নয়; এটা তার নিজের পছন্দে তৈরি একটা ছোট্ট পৃথিবী।
দরজা খুলতেই ম্যানেজার এগিয়ে এলেন।
“Good morning, Miss Chowdhury.”
“Good morning, Daniel. How is today's booking?”
“For lunch, all the tables are often booked and a courier has arrived for you.”
মালিহা ব্যাগটা কাউন্টারের পাশে রেখে খামটা হাতে নিল।
সাধারণ বাদামি খাম। প্রেরকের নাম নেই।
“Who gave it?”
“A delivery rider. Your name has been confirmed.”
মালিহা খামটা উল্টেপাল্টে দেখল।
ভেতরে কিছু আছে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো লেখা নেই।
সে খামটা খুলল।
ভেতরে একটা ছোট্ট সাদা কার্ড।
কার্ডের ওপর কালো অক্ষরে লেখা—
“Some people remember you before you remember them.”
মালিহার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এটা আবার কী?”
ড্যানিয়েল জিজ্ঞেস করলেন, “Is there a problem, Miss Chowdhury?”
“No, Someone probably sent it by mistake.”
কথাটা বললেও কার্ডটা সে ফেলে দিল না।
বরং নিজের ওয়ালেটের ভেতর রেখে দিল।
কেন রেখেছে, সেটা সে নিজেও জানে না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা গেল—
“ওহ, ম্যাডাম! সকাল সকাল কী এমন রহস্যময় চিঠি পেলেন?”
মালিহা ঘুরে তাকাল।
তামিম।
হাতে দুটো কফির কাপ, মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসি।
“তুই এখানে কী করছিস?”
“বন্ধুর ক্যাফেতে কফি খেতে এসেছি। নাকি তোর ক্যাফেতে ঢুকতে appointment লাগে?”
“তোর মতো বিরক্তিকর মানুষের জন্য লাগে।”
“আহা! এত ভালোবাসা!”
তামিম একটা কফি তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“তোর জন্য।”
মালিহা কাপটা নিল।
“কত টাকা?”
তামিমের মুখটা মুহূর্তে বদলে গেল।
“বন্ধুত্বের কোনো দাম নেই।”
“ঠিক আছে, তাহলে ফ্রি।”
“এই মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আমি শেষ!”
মালিহা হেসে বলল, “এখন বুঝলি?”
তামিম কাউন্টারের পাশে হেলান দিল।
“আচ্ছা, আজ সন্ধ্যায় সবাই মিলে দেখা করছি। Sarah, Era, Rayan, Nafi—সবাই আসবে। তুই আসবি।”
“কোথায়?”
“ওটা পরে বলব।”
“আগে জায়গা বল।”
“তুই এত প্রশ্ন করিস কেন?”
“কারণ আমি তোর মতো বুদ্ধি ছাড়া চলি না।”
তামিম বুকের ওপর হাত রাখল।
“আমার হৃদয় ভেঙে গেল।”
“ভালো। এবার সরে দাঁড়া, customer আসছে।”
তামিম হাসতে হাসতে সরে গেল।
মালিহা কফিতে চুমুক দিল।
কিন্তু তার মন বারবার সেই সাদা কার্ডটার দিকে ফিরে যাচ্ছিল।
Some people remember you before you remember them.
কথাটার মানে কী?
আর কারই-বা তাকে মনে রাখার কথা, যাকে সে নিজেই চেনে না?
একই সকাল — লন্ডনের একটি প্রাইভেট হাসপাতাল
অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে।
ভিতর থেকে একজন ডাক্তার বেরিয়ে আসলো—
“আয়ান রহমান”
পরনে সার্জিক্যাল স্ক্রাবস, মাথার ক্যাপ খুলতেই। বরফের মতো সিলভার-প্ল্যাটিনাম ব্লান্ড চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর নেমে এসেছে। চোখে তার স্কয়ার-ফ্রেমের চশমা।
টানা কয়েক ঘণ্টার জটিল নিউরোসার্জারির পরও তার মুখে খুব বেশি ক্লান্তির ছাপ নেই। শুধু চোখের নিচে সামান্য ক্লান্তি জমেছে।
সহকারী চিকিৎসক এগিয়ে এলেন।
"Dr. Rahman, the patient's vitals are stable. The ICU team has taken charge."
আয়ান মাথা নাড়ল।
“I will be regularly checking neurological response over the next few hours. Let me know if there are any changes.”
“Yas, doctor”
সে হাত ধুয়ে নিজের কেবিনে ঢুকল।
টেবিলে রাখা ফোনে বারোটা মিসড কল।
তার মধ্যে তিনটা মায়ের, দুটো রাফির, বাকিগুলো হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে।
আয়ান প্রথমে তার মা “সামিরা রহমান ”ফোন করল।
“আসসালামু আলাইকুম, Mom।”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, “ওয়ালাইকুমুস সালাম। বাবা, তুমি কি সকাল থেকে কিছু খাওনি?”
আয়ান চোখ বন্ধ করে চেয়ারে বসল।
“খেয়েছি।”
“কী খেয়েছ?”
“কফি।”
“আয়ান রহমান!”
“আম্মু, অপারেশন ছিল।”
“তোমার অপারেশন থাকলে কি খাবার খাওয়া বন্ধ থাকবে? নাকি খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়? তুমি নিজে ডাক্তার হয়ে নিজের যত্ন নিতে পারো না?”
আয়ানের ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটল।
“আচ্ছা, এখনই খাব।”
“শুধু বললে হবে না খাবো। এখনি খাবে!”
“জি, ম্যাডাম।”
মা আরও কিছুক্ষণ বকাঝকা করলেন। আয়ান চুপচাপ শুনল।
মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় তার কণ্ঠের কঠোরতা অনেকটাই নরম হয়ে যায়। হাসপাতালের সবাই তাকে ভয় পায়, কিন্তু মায়ের সামনে সে এখনো সেই ছেলেটাই, যে ছোটবেলায় অসুস্থ হলে মায়ের হাত ধরে ঘুমাত।
কল শেষ করে সে খাবার অর্ডার দিল।
তারপর রাফিকে ফোন করল।
“কী হয়েছে?”
ওপাশ থেকে রাফি বলল, “মানুষ ফোন ধরলে আগে সালাম দেয়, তারপর কথা বলে।”
“তুই মানুষ হলে সালামও দিতাম।”
“বাহ! সকাল সকাল অপমান!”
“কাজের কথা বল।”
রাফি হেসে বলল, “আজ সন্ধ্যায় ফ্রি আছিস?”
“না।”
“আমি তোকে কিছু বলার আগেই না?”
“তোর কথা শুনে বুঝেছি।”
“ভাই, তোর জীবনে একটু আনন্দ দরকার।”
“আমার জীবনে রোগী আছে।”
“আর তোর জীবনে বন্ধু আছে, যারা তোকে মাঝে মাঝে হাসপাতাল থেকে বের করতে চায়।”
আয়ান চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল।
“রাফি, আমার আরও একটা অপারেশন আছে। পরে কথা বলব।”
“ঠিক আছে। তবে একটা কথা—আজকের মিটিংটা ভুলিস না।”
“কোন মিটিং?”
“তুই সত্যিই ভুলে গেছিস?”
আয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “মেসেজ কর।”
রাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোর স্মৃতিশক্তি রোগীদের জন্য রেখে দিস,। ভাই নিজের জীবনের জন্যও একটু ব্যবহার কর।”
কল কেটে গেল।
আয়ান ফোনটা নামিয়ে খাবারের দিকে তাকাল।
ঠিক তখন হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগ থেকে একটি ইমেইল এল।
Subject: Emergency Consultation — CR Corporation Representative
আয়ান ইমেইল খুলল।
একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত ও করপোরেট স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে তার কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া হলো না।
CR CORPORATION.
তার কাছে এটি আপাতত আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতোই একটি নাম।
ইমেইলের নিচে বৈঠকের সম্ভাব্য প্রতিনিধির নাম লেখা ছিল—
Maliha Chowdhury — Co-CEO.
আয়ান নামটার দিকে একবার তাকাল।
তারপর ইমেইল বন্ধ করে দিল।
“Another meeting,” সে নিচু গলায় বলল।
সে তখনো জানে না, এই নামটাই খুব শিগগির তার ব্যস্ত জীবনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত অংশ হয়ে উঠবে।
আর মালিহা?
সে তখন ক্যাফের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তামিমের সঙ্গে তর্ক করছে—কে কফির টাকা দেবে, তা নিয়ে।
দুটি আলাদা পৃথিবী।
একজনের পৃথিবী হাসপাতালের সাদা আলোয়, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে।
অন্যজনের পৃথিবী ব্যস্ত শহর, ব্যবসা, বন্ধুত্ব আর নিজের স্বাধীনতায় ভরা।
তবু কোথাও, অদৃশ্যভাবে, তাদের পথ দুটি একই দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আর সেই পথের শেষ কোথায়—তা এখনো কেউ জানে না।
