— তাসদ্রীক ভাই বললাম তো, আপনাকে বিয়ে করব না। তাহলে বারবার আমাকে বিরক্ত করছেন কেন? আপনার কি আর কোনো কাজ নেই? আপনাকে কীভাবে বোঝাবো যে আপনার উপস্থিতিতে আমার দম বন্ধ লাগে? আমি আপনাকে পছন্দ করি না ঘৃণা করি। আই জাস্ট হেট ইউ। আপনাদের বংশের ছেলেদের দিকে তাকাতেও ঘেন্না লাগে। কেন বুঝতে পারছেন না আপনি মিস্টার
তাসদ্রীক মির্জা?
কথাগুলো শেষ করেই স্নেহা দ্রুত রিক্সায় উঠে গেল। তাসদ্রিক মির্জা ওর যাওয়ার পথে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মতো একজনের সঙ্গে এই পুঁচকে মেয়ে এভাবে কথা বলতে পারলো।এই স্পর্ধা কে দিলো ওকে? এই মেয়ে এত সাহস পেল কোথায়? আমাকে এমনভাবে কথা শুনিয়ে চলে গেল? এর প্রতিশোধ কীভাবে নিতে হয়, তা তার ভালো করে জানা আছে।
ফ্ল্যাশব্যাক
প্রায় পাঁচ বছর আগে...
আমার নাম সাবিহা মির্জা স্নেহা ,আমরা ছোট একটি গ্রামে থাকি। আমাদের গ্রামটার নাম —ছায়াপুর ছোট্ট একটা গ্রাম। এখানে আমার পরিবার থাকে। আমার আব্বু মাহতাব মির্জা, একজন শিক্ষক। তারা দুই ভাই বড় চাচু ব্যবসায়ের কারণে শহরে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তারা পরিবারের সাথে থাকে ওখানেই তাদের বিশাল বাড়ি, একেবারে রাজপ্রাসাদ বলা যায়। দেশে আমাদের আরেকটা ইট-পাথরের বাড়ি আছে, তবে সেটা বহু বছর ধরে তালাবদ্ধ। চাচু যখন প্রথমবার ঢাকায় ট্রান্সফার হলেন, তখন থেকে প্রায় আট-নয় বছর সেই বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে।
চাচু যখন দেশ ছেড়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে গিয়েছিল তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে। তবে আমার স্মৃতিতে ওসব ধোঁয়াশা—আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম, হয়তো ছয়-সাত বছর বয়স হবে।
আমি আমার বংশ কে ঘৃণা করি, আমার বড় চাচু তাকদির মির্জা চাচি যাকে আমি মামনি বলে দাকি রাবিয়া মির্জা বড় ছেলে তাসদ্রীক মির্জা আস্ত একটা শয়তান। সে একজন কুখ্যাত মাফিয়া। প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে মানুষ খুন করে, আর সেটা খবরের শিরোনাম হয়। ছোট ছেলে একজন প্লেবয় তার নেশা মেয়ে মানুষ।তাদের জন্য আমাদের ‘ মির্জা বাড়ি’ বদনাম, যদি না আব্বু নিজের সততা আর পরিশ্রম দিয়ে সেটা টিকিয়ে রাখতেন।
আমার আব্বুর সরলতার জন্য এখনো আমাদের পরিবারকে সম্মান করা হয়। নাহলে এতদিনে আমাদের ‘মাফিয়ার বংশধর’ বলা হতো!
আমি এখন ক্লাস টেনে পড়ি। আমাদের গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করি। চাচু পায় বলেন ,শহরে গিয়ে পড়াশোনা করতে, কিন্তু আমি কি বোকা না কি? আমি ওই মাঙ্গের বাড়িতে যাব, যেখানে ওই মাদারবোর্ড লোক থাকে?
আমি আব্বু আম্মুর এক মেয়ে খুব আদরের আইক প্রিন্সেস আমার মা, সিমরান রায় , পুরো পরিবারের মাথা। যেকোনো সমস্যা হওয়ার আগেই আম্মু সেটাকে সামলে নেন, অনেক রাগী।
আমাদের পরিবার গ্রামের সবাই চেনে। আশপাশের একচালা-দোচালা ঘরের মাঝে আমাদের বাড়িটা আলাদা, কারণ এটা ইট-পাথরের তৈরি।
______________বর্তমান সময়...
মাএ আমি স্কুল থেকে ফিরি হঠাৎ আম্মু আমাকে একটা অদ্ভুত কথা বললেন।
"স্নেহা কাল তোর চাচা আসবে সাথে তোকে শহরে নিয়ে যাবে!
আমি অবাক হয়ে বললাম। আমি ওই বাড়িতে গিয়ে করবটা কী ঘাস কাটবো? আমি পাগল নাকি?
আমি যাবো না আম্মু আমার মরার সখ নাই!
সিমরান রায় ধমক দিয়ে বললেন—
— কেন যাবি না? ওরা কি তোর তোর খারাপ চাই? শহরে গিয়ে পড়াশোনা করলে ভালো হবি, মাথায় তো সুধু গোবর ভরা তাই বলছি যা।
— মা, আমি জানি চাচু ভালো মানুষ। কিন্তু তার ছেলেরা? আমি ওই সব মাফিয়া মাস্তানের আর লুচচা দের বাড়িতে থাকতে পারবো না!
— তোকে কি বলছে, তাসদ্রীক আর তাসিনের কাছে থাকতে ? তুই জানিস ঐ বাড়িতে কোনো আপন মানুষ নেই? তোর চাচী তো অনেক আগেই মারা গেছেন। ভাইজান আর তোর চাচির বোনের মেয়ে নেহা থাকে, তাদের ছেলেরা থাকে না তোকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন। তুই ভুলে গেছিস, ছোটবেলায় ভাইজান তোর জন্য কত কি করেছেন?
স্নেহা রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
— জানি বলেই তো বলছি, ঐ বাড়ি আমার জন্য নিরাপদ না মা! তুমি ভুলে যেতে পারো, কিন্তু আমি পারবো না!
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাবা ঘরে ঢুকলেন।
— তোর অনুমতি নিতে বলেছি নাকি? তর্ক বন্ধ কর! আমার কথা যদি মানতে না পারিস, তাহলে নিজের ব্যবস্থা নিজে কর!বের হয়ে যা বাসা থেকে।
এ কথা বলেই বাবা নিজের ঘরে চলে গেলেন। আম্মু কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু বাবার গম্ভীর চেহারা দেখে থেমে গেলেন।
স্নেহা কিছু খন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আব্বুর রুমের দিকে ,চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পরলো। ধিরে ধিরে রুমের ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে চোখ মুছতে লাগল।
তার মাথায় সুধু একটা কথা ঘুরছে আব্বু কিভাবে পারলো এভাবে বলতে।
স্নেহা মনে মনে বললো আমাকে কেউ বুঝতে চায় না। আমি জানি, এই রাক্ষস টা আমাকে দেখলেই মারবে।
কিন্তু এটা তো কেউ জানে না। সেদিন সবাইকে মিথ্যা বললেও আমি জানি, কেন আমি এই হাতিকে ভয় পাই। সেদিন তো হাতিটা আমাকে শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিল কিন্তু আমি...
আর ভাবতে পারলো না স্নেহা। চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। হাত পা কাঁপছে।
