~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ১: অচেনা অন্ধকার
কিছু মানুষের আগমন জীবনে বসন্ত নিয়ে আসে। আর কিছু মানুষের চোখে জমে থাকে এমন অন্ধকার, যেখানে আলো পৌঁছাতেও দুবার ভাবতে হয়।
আরিশা রহমান জানত না, প্রথম দেখায় যে মানুষটিকে তার অসহ্য মনে হবে, একদিন সেই মানুষটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে উঠবে।
আর সেই রহস্যের শুরুটা হয়েছিল এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।
১. মির্জা গ্রুপের উত্তরাধিকারী
ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এলাকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কাচঘেরা ভবনটির নাম—মির্জা টাওয়ার।
শহরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে এই নামের অর্থ ক্ষমতা। আর সাধারণ মানুষের কাছে এর অর্থ—আদ্রিয়ান মির্জা।
মাত্র তেইশ বছর বয়সেই দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে সে। তার সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। নিখুঁত চেহারা, গম্ভীর চোখ, দামি কালো স্যুট আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা চিরস্থায়ী শীতলতা—সব মিলিয়ে তাকে দেখলে দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হয় মানুষ।
বিশেষ করে মেয়েরা।
কেউ তার সঙ্গে একবার কথা বলার সুযোগ খোঁজে, কেউ দূর থেকে ছবি তোলে, আবার কেউ সরাসরি নিজের ভালো লাগার কথা জানিয়ে দেয়।
কিন্তু আদ্রিয়ান মির্জার কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই।
তার ব্যক্তিগত সহকারী রায়ান ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে বলল,
— স্যার, আজকের পার্টিতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি আসবেন। মিসেস সায়রা কবিরও আসছেন। উনি আপনার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চেয়েছেন।
ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই আদ্রিয়ান বলল,
— ব্যবসার কথা হলে সময় দাও। অন্য কিছু হলে প্রয়োজন নেই।
— স্যার, উনি কিন্তু আপনার সঙ্গে কফি খেতে চেয়েছেন।
এবার আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
— রায়ান, আমি কি তোমাকে আমার ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্ব দিয়েছি?
— না, স্যার।
— তাহলে আমার কফির হিসাব রাখার দরকার নেই।
রায়ান চুপ করে গেল।
আদ্রিয়ান আবার কাজে মন দিল। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটি—মির্জা পরিবারের পতনের পেছনে থাকা মানুষটিকে খুঁজে বের করা।
পাঁচ বছর আগে এক রাতেই সবকিছু বদলে গিয়েছিল। তার পরিবার হারিয়েছিল সম্মান, সম্পদ, আর এমন একজন মানুষকে—যাকে আদ্রিয়ান নিজের পৃথিবী বলে জানত।
সেদিনের পর থেকে সে আর আগের মানুষটি ছিল না।
তার কাছে ভালোবাসা ছিল দুর্বলতা। বিশ্বাস ছিল বিপজ্জনক। আর ক্ষমা?
ক্ষমা করার মতো উদারতা সে নিজের ভেতরে বহু আগেই মেরে ফেলেছিল।
অন্তত সে নিজেকে তা-ই বোঝাত।
ডেস্কের ডান পাশের ড্রয়ার খুলে সে একটি পুরোনো কালো ফাইল বের করল।
ফাইলের প্রথম পাতায় লেখা—
রহমান পরিবার।
নামটির দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল আদ্রিয়ান। তারপর পাতাটি উল্টাতেই একটি মেয়ের ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিতে মেয়েটির চোখে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। ঠোঁটে হালকা হাসি। যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে ভয় দেখাতে পারে না।
ছবিটির নিচে লেখা—
আরিশা রহমান।
আদ্রিয়ানের আঙুল ছবিটির ওপর স্থির হয়ে গেল।
তার চোখে ফুটে উঠল এমন এক দৃষ্টি, যার অর্থ বোঝার সাধ্য সাধারণ মানুষের নেই।
— অবশেষে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি, আরিশা রহমান।
কণ্ঠটা এতটাই নিচু ছিল যে কথাগুলো যেন ঘরের অন্ধকারেই হারিয়ে গেল।
তারপর সে ফাইলটি বন্ধ করে দিল।
কিন্তু ছবির মেয়েটি যে তার জীবনে ঝড় হয়ে আসতে চলেছে, সেটা কি আদ্রিয়ান জানত?
নাকি সে নিজেই সেই ঝড়কে ডেকে আনছিল?
২. বেপরোয়া মেয়েটি
— আরিশাআআ! তুই কি ঘুমের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবি নাকি? ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে দেখ!
বন্ধু নীলার চিৎকারে আরিশা রহমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলল,
— চিৎকার করিস না। আমার কানের পর্দা এখনো বেঁচে আছে।
— তোর জন্য আমার মাথার পর্দা বেঁচে থাকবে কি না, সেটাই চিন্তা!
আরিশা হেসে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল।
বিশ বছর বয়সী মেয়েটিকে দেখে কেউ সহজে বুঝতে পারবে না, তার ভেতরে কতটা জেদ লুকিয়ে আছে। হাসিখুশি, দুষ্টু, কথায় কথায় তর্ক করা আর অন্যায়ের সামনে একচুলও পিছিয়ে না আসা—এই ছিল তার স্বভাব।
কেউ তাকে ভয় দেখালে সে ভয় পাওয়ার বদলে উল্টো প্রশ্ন করে বসে।
আর কেউ তার আত্মসম্মানে আঘাত করলে, সেই মানুষকে সহজে ক্ষমা করার অভ্যাস তার নেই।
— শোন, আজ কিন্তু তুই আমার সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবি, নীলা বলল।
— কেন?
— একটা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে।
— নিজের অ্যাসাইনমেন্ট নিজে কর। আমি কি তোর ব্যক্তিগত কর্মচারী?
— আল্লাহ, এই মেয়েকে কে যে সহ্য করবে!
আরিশা ব্যাগের চেইন বন্ধ করে মুচকি হাসল।
— যে আমাকে সহ্য করতে পারবে, সে নিশ্চয়ই অনেক ধৈর্যশীল হবে।
— তোর ভবিষ্যৎ স্বামীকে আমার জন্য আগেই সমবেদনা জানিয়ে রাখিস।
আরিশা হেসে বলল,
— আগে তাকে খুঁজে বের কর। তারপর সমবেদনা জানাস।
দুজনের হাসিতে ঘরটা ভরে উঠল।
সেই মুহূর্তে আরিশার ধারণাও ছিল না, তার নাম লেখা একটি ফাইল ঢাকার অন্য প্রান্তে কোনো এক মানুষের প্রতিশোধের অপেক্ষায় পড়ে আছে।
৩. প্রথম মুখোমুখি
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে আরিশা দেখল, বৃষ্টির কারণে রাস্তায় ভিড় জমেছে। নীলা আগেই চলে গেছে। আরিশা ফোনে রাইড খুঁজছিল, ঠিক তখনই তার সামনে এসে থামল একটি কালো গাড়ি।
গাড়ির কাচ ধীরে ধীরে নেমে গেল।
ভেতরে বসে থাকা মানুষটিকে দেখে আরিশা কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
কালো শার্ট, হাতঘড়ি, গম্ভীর মুখ আর এমন এক জোড়া চোখ—যেন সেই চোখের সামনে মিথ্যা বলার সাহস কারও নেই।
লোকটি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— গাড়িতে ওঠো।
আরিশা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— জি? আপনাকে কি আমি চিনি?
— না।
— তাহলে অপরিচিত মানুষকে এভাবে গাড়িতে উঠতে বলেন কীভাবে?
লোকটির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— বৃষ্টি বাড়ছে। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
— ধন্যবাদ। কিন্তু আমি নিজেই যেতে পারব।
কথাটা বলেই আরিশা অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল।
সাধারণত তার একটি কথাতেই মানুষ থেমে যায়। অথচ এই মেয়েটি তাকে দ্বিতীয়বার তাকানোরও প্রয়োজন মনে করল না!
আদ্রিয়ানের চোখ সরু হয়ে এল।
— আরিশা রহমান!
নিজের নাম শুনে আরিশা থেমে গেল।
ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
— আমার নাম জানেন কীভাবে?
আদ্রিয়ান গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামল। তার উপস্থিতিতে আশপাশের কয়েকজনের কথাবার্তাও যেন থেমে গেল।
সে আরিশার সামনে এসে দাঁড়াল।
— তোমার সম্পর্কে জানার মতো অনেক কিছুই আমি জানি।
আরিশা এবার বিরক্ত হলো।
— দেখুন, আপনি কে আমি জানি না। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত আগ্রহ দেখানোর প্রয়োজন নেই।
— তোমার ব্যক্তিগত জীবন?
আদ্রিয়ানের ঠোঁটে ক্ষীণ, অর্থহীন হাসি ফুটল।
— তুমি জানোই না, তোমার জীবন কতটা অন্যের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
— ধাঁধা না বলে পরিষ্কার করে কথা বলুন।
— সব কথা সবার জানার প্রয়োজন হয় না।
আরিশা এবার এক পা এগিয়ে গেল।
— আর সবাইকে ভয় দেখানোর অধিকারও আপনার নেই!
কথাটা শুনে আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে। কেউ তার ক্ষমতা দেখে মাথা নত করেছে, কেউ তার অর্থের জন্য কাছে এসেছে, কেউ তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নিজের আত্মসম্মানটুকুও ভুলে গেছে।
কিন্তু এই মেয়েটি?
সে ভয় পাচ্ছে না।
বরং চোখে চোখ রেখে তর্ক করছে!
আদ্রিয়ান নিচু স্বরে বলল,
— নিজের সাহসটা একটু কমাও, আরিশা। সব মানুষের সঙ্গে তর্ক করা যায় না।
আরিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— আর সব মানুষকে নিজের ইচ্ছামতো চালানোও যায় না, মিস্টার!
কথাটা বলে সে চলে গেল।
আদ্রিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ অনুসরণ করল মেয়েটিকে, যতক্ষণ না সে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
রায়ান গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল,
— স্যার, মেয়েটা আপনার সঙ্গে এভাবে কথা বলল!
আদ্রিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি—রাগ, বিস্ময়, নাকি এমন কিছু, যার নাম সে নিজেও জানে না।
কয়েক সেকেন্ড পর সে বলল,
— ওর ওপর নজর রাখবে। তবে এমন কিছু করবে না, যাতে ওর কোনো ক্ষতি হয়।
রায়ান অবাক হয়ে তাকাল।
— জি, স্যার?
আদ্রিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।
— কথা কি দুবার বলতে হবে?
— না, স্যার।
রায়ান দ্রুত সরে গেল।
আদ্রিয়ান আবার গাড়িতে উঠে বসল। জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে পড়ল সেই পুরোনো রাতের কথা, যেদিন তার বাবার জীবনের সবকিছু ভেঙে পড়েছিল।
আর সেই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি নাম।
রহমান।
৪. পুরোনো ফাইলের নতুন রহস্য
রাত সাড়ে দশটা।
মির্জা ম্যানশনের দোতলার ঘরটিতে কোনো আলো জ্বলছিল না। শুধু জানালার পাশের টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় ঘরের একাংশ দৃশ্যমান।
আদ্রিয়ান একা বসে ছিল।
সামনে সেই কালো ফাইল। পাশে একটি পুরোনো ছবি, যার প্রান্তগুলো সময়ের সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে গেছে।
ছবিতে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে—একজন আদ্রিয়ানের বাবা, আর অন্যজন আরিশার বাবা, মাহমুদ রহমান।
দুজনের মুখেই হাসি।
অথচ আজ তাদের পরিবারের মধ্যে এমন এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, যার ওপাশে রয়েছে অপমান, ক্ষতি আর বহু বছরের জমে থাকা প্রশ্ন।
আদ্রিয়ান ছবিটা হাতে তুলে নিল।
— আপনি যদি সত্যিই নির্দোষ হয়ে থাকেন, বাবা, তাহলে সেদিন আমাদের সঙ্গে এমনটা হলো কেন?
কোনো উত্তর এল না।
শুধু জানালার কাচে বৃষ্টির শব্দ।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অপরিচিত নম্বর।
আদ্রিয়ান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চাপা, অপরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
— মির্জা পরিবারের পুরোনো হিসাব ঘাঁটাঘাঁটি করা বন্ধ করো।
আদ্রিয়ানের চোখ মুহূর্তে কঠিন হয়ে উঠল।
— কে বলছেন?
— যাদের খুঁজছ, তারা তোমার ধারণার চেয়েও কাছে আছে।
— নাম বলো।
ওপাশের মানুষটি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বলল,
— রহমান পরিবারের মেয়েটার কাছ থেকে দূরে থাকো। মেয়েটা কিছুই জানে না। কিন্তু ওর নামের সঙ্গে যে সত্যিটা জড়িয়ে আছে, সেটা জানলে তুমিও আর আগের মানুষ থাকবে না।
কলটি কেটে গেল।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে কালো ফাইলটি খুলল।
আরিশার ছবির পেছনে একটি কাগজ রাখা ছিল, যা সে আগে খেয়াল করেনি।
কাগজটিতে কয়েকটি লাইন লেখা—
“যদি কখনো মির্জা পরিবারের সত্য প্রকাশ করতে চাও, তাহলে আরিশা রহমানকে বিশ্বাস কোরো না। কারণ এই মেয়েটিই তোমার সব প্রশ্নের উত্তর—আবার তোমার ধ্বংসের কারণও হতে পারে।”
আদ্রিয়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছে।
সে কাগজটি মুঠোয় চেপে ধরল।
তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
— দেখা যাক, আরিশা রহমান। তুমি আমার শত্রুর মেয়ে, নাকি এমন এক সত্যের চাবি, যা থেকে সবাই আমাকে দূরে রাখতে চায়?
সেই রাতেই আদ্রিয়ান একটি সিদ্ধান্ত নিল।
আরিশা রহমানের জীবনে তাকে প্রবেশ করতেই হবে।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।
সত্য জানার জন্য।
কিন্তু সে জানত না, যে মেয়েটিকে সে নিজের শত্রু বলে মনে করছে, একদিন সেই মেয়েটির কাছেই তার সবচেয়ে গোপন দুর্বলতা হয়ে উঠবে তার নিজের হৃদয়।
আরিশাও জানত না, অচেনা সেই মানুষটির সঙ্গে তার দেখা হওয়া নিছক কাকতালীয় ছিল না।
কারণ তাদের গল্প শুরু হয়েছিল আজ থেকে নয়।
শুরু হয়েছিল পাঁচ বছর আগে—একটি রাতের অন্ধকারে।
আর সেই রাতের সত্য এখনো মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
চলবে... 🥀🖤
