~ তোমার অন্ধকারে আমার বসন্ত ~
Writer : Noor Islam.
পর্ব ৬: অভিমানের আড়ালে ভালোবাসা
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে আরিশা। গতকালের ঘটনাগুলো বারবার মনে পড়ছে তার। আদ্রিয়ান মির্জার অদ্ভুত আচরণটা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না।
লোকটা কখনো ভীষণ রাগী, কখনো অদ্ভুত রকমের যত্নশীল। আবার কখনো এমনভাবে তাকায়, যেন আরিশার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিটি অনুভূতি সে পড়ে ফেলতে পারে।
— উফফ! অসহ্য একটা মানুষ!
নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে বলল আরিশা।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
— নিচে আসো।
আরিশা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— কে বলছেন?
— আদ্রিয়ান মির্জা।
নামটা শুনেই আরিশার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
— তো?
— পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে আসবে।
— কেন? আপনার বাড়ির চাকরি করি নাকি যে ডাকলেই হাজির হতে হবে?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আদ্রিয়ান শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে, আরিশা।
— আমার আপনার সঙ্গে কোনো কথা নেই।
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল সে।
নিচে কালো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আদ্রিয়ান। পাশে তার বিশ্বস্ত সহকারী রায়ান।
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
— স্যার, মেয়েটা কিন্তু আপনাকে বেশ ভালোই নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে।
আদ্রিয়ান চোখ সরু করে তাকাল।
— নিজের কাজ করো, রায়ান।
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আরিশা। পরনে হালকা নীল রঙের পোশাক, চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধা। মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
আদ্রিয়ানের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য তার ওপর স্থির হয়ে রইল।
মেয়েটাকে দেখলেই কেন যেন তার চারপাশের সবকিছু থেমে যায়!
আরিশা সামনে এসে বলল,
— এবার বলুন, কী এমন জরুরি কথা?
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— গাড়িতে উঠো।
— আমি কোথাও যাব না।
— আরিশা!
— নাম ধরে চিৎকার করবেন না। আমি কানে কম শুনি না।
রায়ান পাশ ফিরে নিজের হাসি আড়াল করার চেষ্টা করল।
আদ্রিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কথাটা শুনে আরিশার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
— আমার বাবার সঙ্গে? কেন?
— কিছু পুরোনো হিসাব মেলাতে হবে।
— কিসের হিসাব?
আদ্রিয়ান আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু বলল,
— সময় হলে সব জানতে পারবে।
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনার এই ধাঁধার ভাষা আমার একদম পছন্দ নয়।
অন্যদিকে মির্জা ম্যানশনের পুরোনো একটি ঘরে বসে কয়েকটি নথি দেখছিলেন আদ্রিয়ানের চাচা।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
— আসব?
রায়ানকে দেখে তিনি নথিগুলো দ্রুত ড্রয়ারে রেখে দিলেন।
— কী ব্যাপার?
— স্যার জানতে চেয়েছেন, পুরোনো রহমান পরিবারের ফাইলটা কোথায় রাখা আছে।
কথাটা শুনে লোকটির মুখের রং বদলে গেল।
— আদ্রিয়ান কি আবার সেই বিষয় নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে?
— জি।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— ওকে বলবে, অতীত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করতে। কিছু সত্য সামনে এলে ওর নিজের জীবনটাই বদলে যাবে।
রায়ান কথাটা শুনে সন্দেহের চোখে তাকাল।
রহমান পরিবার আর মির্জা পরিবারের মধ্যে এমন কী সম্পর্ক, যা আজও সবাই লুকিয়ে রাখতে চায়?
বিকেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল আরিশা। হঠাৎ একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলো আদ্রিয়ান।
তাকে দেখেই আরিশার বন্ধুরা ফিসফিস করতে শুরু করল।
— আরিশা! উনি কে রে? কী হ্যান্ডসাম!
আরিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
— হ্যান্ডসাম হলেই মানুষ ভালো হয় না।
কথাটা আদ্রিয়ানের কানেও গেল। সে মৃদু ভ্রু তুলল।
আরিশার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
— আমার সম্পর্কে এত আলোচনা হচ্ছে?
— নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকলে সেটা ভাঙিয়ে নেওয়া উচিত।
— আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, ম্যাম?
আরিশা চোখে চোখ রেখে বলল,
— অহংকারী, রাগী, অসভ্য এবং বিরক্তিকর!
আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— আর কিছু?
— আপাতত এতটুকুই যথেষ্ট।
— তাহলে আপনার ধারণা বদলানোর দায়িত্বটা আমার।
আরিশা কিছু বলার আগেই আদ্রিয়ান তার হাতে একটি ছোট্ট প্যাকেট ধরিয়ে দিল।
— এটা কী?
— দুপুরে খেয়েছেন?
— সেটা আপনাকে বলতে হবে কেন?
— কারণ আপনার দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে।
আরিশা অবাক হয়ে তাকাল।
— আপনি কীভাবে জানলেন?
আদ্রিয়ান উত্তর না দিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
যাওয়ার আগে শুধু বলল,
— ঠিকমতো খাবেন। নিজের যত্ন নিতে শিখুন।
আরিশা প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ভেতরে তার পছন্দের খাবার!
মেয়েটার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
রাত ১১টা।
আদ্রিয়ান নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল।
— রায়ান, আমি চাই রহমান পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের পুরোনো সম্পর্কের প্রতিটি তথ্য আমার টেবিলে থাকুক।
ওপাশ থেকে রায়ান বলল,
— স্যার, একটা বিষয় পেয়েছি। প্রায় বিশ বছর আগের একটি চুক্তির কাগজ। সেখানে রহমান সাহেবের বাবার স্বাক্ষর রয়েছে।
আদ্রিয়ানের চোখ দুটো কঠিন হয়ে উঠল।
— কী বলছো?
— জি স্যার। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই চুক্তির পর থেকেই আপনার পরিবারের দুর্দশা শুরু হয়েছিল।
আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ নীরব রইল।
তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
— কাগজটা আমার কাছে নিয়ে আসো।
ফোন রেখে সে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো একটি ছবির দিকে তাকাল।
ছবিতে ছোট্ট আদ্রিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা। ছবির পেছনে লেখা একটি নাম—
রহমান।
আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করল।
এত বছর ধরে যে সত্যের সন্ধান সে করে এসেছে, সেই সত্যের সঙ্গে কি তবে আরিশার পরিবারের সম্পর্ক রয়েছে?
কিন্তু আরিশা?
মেয়েটা কি কিছু জানে?
নাকি সেও অন্ধকারে থাকা আরেকজন নির্দোষ মানুষ?
অন্যদিকে নিজের ঘরে বসে প্যাকেটের ভেতর রাখা ছোট্ট কাগজটা পড়ছিল আরিশা।
সেখানে মাত্র একটি লাইন লেখা—
“অভিমান করতে পারেন, রাগও করতে পারেন। কিন্তু নিজের যত্ন নিতে ভুলবেন না। — আদ্রিয়ান”
আরিশা কাগজটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।
— লোকটা আসলে কী চায় বলো তো?
ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ এলো।
অপরিচিত নম্বর থেকে পাঠানো একটি ছবি।
ছবিটা দেখে আরিশার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেখানে তার বাবা এবং আদ্রিয়ানের বাবাকে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।
ছবির নিচে লেখা—
“যাকে তুমি নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ ভাবো, তার অতীতই হয়তো তোমার সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর।”
আরিশার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
এটা কীভাবে সম্ভব?
তার বাবা আর আদ্রিয়ানের পরিবারের মধ্যে এমন কী সম্পর্ক?
আর এই ছবিটাই বা তাকে কে পাঠাল?
অন্যদিকে, নিজের ঘরে বসে আদ্রিয়ানও একটি অজানা নম্বর থেকে মেসেজ পেল।
“যাকে ভালোবাসতে শুরু করেছো, সেই মেয়ের পরিবারই তোমার অতীতের সবচেয়ে বড় রহস্য।”
মেসেজটা পড়ে আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর নিজের মনেই বলল,
— আরিশা, তুমি কি সত্যিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে উঠবে?
চলবে...🥀🖤
