চিঠির বাক্স - পর্ব ৩ (শেষ পর্ব)
অপারেশনের পর নাফিসা হাঁটতে পারছে, কিন্তু খুব বেশি হাঁটতে পারে না। বেশি হাঁটলে পায়ে ব্যথা করে।
এই জন্য আদনান এখন একটা নতুন কাজ করে। রোজ বিকেলে সে নাফিসার হাত ধরে ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে লাইব্রেরি পর্যন্ত হাঁটায়। একটু একটু করে।
একদিন নাফিসা বলল— "আচ্ছা আদনান, আমি যদি কোনোদিন হাঁটতে না পারতাম, তুমি কি তাও আমাকে ভালোবাসতে?"
আদনান বলল— "আমি তো তোমাকে হাঁটা দেখে ভালোবাসিনি, তোমার চিঠি পড়ে ভালোবেসেছি। তুমি হুইলচেয়ারে থাকলেও আমি বাক্সের পাশে বসে থাকতাম।"
নাফিসা চুপ করে রইল। তার চোখে পানি।
সেদিন ছিল তাদের শেষ সেমিস্টার। ভার্সিটি শেষ। আদনান চাকরির জন্য ঢাকায় চলে যাবে, নাফিসা চট্টগ্রামে থাকবে।
যাওয়ার আগের দিন আদনান লাইব্রেরির পেছনে গেল। সেই পুরোনো কাঠের বাক্সটা এখনো আছে, কিন্তু ভেতরে আর কেউ চিঠি রাখে না।
সে ভেতরে শেষ একটা চিঠি রাখল—
"নাফিসা, এই বাক্সটা এখানেই থাক। যদি কখনো আমাদের মতো কেউ একা বোধ করে, সে যেন এখানে এসে লিখতে পারে। আর হ্যাঁ, আমি ঢাকায় গিয়েও রোজ তোমাকে চিঠি লিখব, কিন্তু খামে করে।"
নাফিসা পেছন থেকে এসে বলল— "খামে কেন?"
আদনান পেছনে তাকিয়ে দেখে নাফিসা দাঁড়িয়ে। হাতে একটা ছোট বাক্স — ঠিক আগের বাক্সটার মতো, কিন্তু নতুন।
নাফিসা বলল— "এটা তোমার জন্য বানিয়েছি। তুমি ঢাকায় নিয়ে যাবে। যখন আমার কথা মনে পড়বে, এটাতে চিঠি লিখবে। আর আমি এখানে পুরোনো বাক্সটাতে তোমার উত্তর লিখে রাখব।"
আদনান বাক্সটা নিল। দুজনেই হাসল।
দুই বছর পর।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পেছনে এখনো সেই পুরোনো বাক্সটা আছে। নতুন জুনিয়ররা সেখানে চিঠি রাখে। কেউ জানে না, এই বাক্স থেকেই একটা প্রেমের গল্প শুরু হয়েছিল।
আর ঢাকার একটা ছোট বাসায়, আদনানের টেবিলে এখনো একটা নতুন কাঠের বাক্স থাকে। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে সে সেখানে একটা করে চিঠি রাখে— "আজও তোমাকে মিস করেছি।"
আর চট্টগ্রামে, নাফিসা তার পুরোনো বাক্স খুলে সেই চিঠির উত্তর লেখে।
তাদের ভালোবাসা এখন আর একটা গাছ বা একটা লাইব্রেরিতে আটকে নেই, দুটো বাক্সের মধ্যে বেঁচে আছে।
শেষ।
