চিঠির বাক্স - পর্ব ২: আর্কাইভ রুমের পর
আর্কাইভ রুমে সেদিনের পর থেকে সব বদলে গেল।
আদনান এখন আর চিঠির বাক্সে চিঠি রাখে না। সে রোজ আর্কাইভ রুমে আসে। নাফিসা জানালার পাশে বই পড়ে।
একদিন আদনান জিজ্ঞেস করল— "তুমি রোজ এখানে কেন আসো?"
নাফিসা হাসল— "এই রুমে কেউ আসে না। সবাই ভাবে এটা ভূতের ঘর। তাই এখানে আমার কেউ ডিস্টার্ব করে না। আমি একা থাকতে ভালোবাসি।"
আদনান বলল— "আর এখন? আমি তো ডিস্টার্ব করি।"
নাফিসা বলল— "তুমি ডিস্টার্ব না, তুমি অভ্যাস হয়ে গেছো।"
এরপর থেকে তাদের নতুন নিয়ম হলো। রোজ একজন একটা করে শব্দ বলবে, আরেকজন সেটা দিয়ে একটা বাক্য বানাবে।
আদনান বলল— "কৃষ্ণচূড়া"
নাফিসা বলল— "কৃষ্ণচূড়ার নিচে তোমার নীল পাঞ্জাবিটা এখনো আমার চোখে ভাসে।"
নাফিসা বলল— "অপেক্ষা"
আদনান বলল— "তোমার জন্য অপেক্ষা করতে আমার একটুও কষ্ট হয় না।"
এভাবে চলতে চলতে বর্ষাকাল এলো।
একদিন খুব বৃষ্টি। ভার্সিটি প্রায় ফাঁকা। আদনান আর্কাইভ রুমে এসে দেখে নাফিসা নেই। তার হুইলচেয়ারটা খালি পড়ে আছে, টেবিলের ওপর একটা ভেজা চিঠি।
"আদনান, আজ আমার অপারেশন। ডাক্তার বলেছে, যদি অপারেশন সফল হয়, আমি হাঁটতে পারব। যদি না হয়, আর কখনো... যাই হোক, যদি আমি ফিরে না আসি, চিঠির বাক্সটা তুমি রেখে দিও। আর যদি ফিরে আসি, তাহলে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আমি দাঁড়িয়ে থাকব, হুইলচেয়ার ছাড়া। — নাফিসা"
আদনান চিঠি হাতে নিয়ে দৌড়ে বাইরে এলো। বৃষ্টিতে ভিজে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
তিন দিন পর।
বৃষ্টি থেমেছে। আদনান গাছের নিচে এসে দেখে, দূর থেকে একটা মেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে আসছে। নীল শাড়ি, হাতে সেই কাঠের বাক্সটা।
নাফিসা। হুইলচেয়ার ছাড়া।
আদনান কিছু বলতে পারল না। শুধু গিয়ে বাক্সটা ধরল।
নাফিসা কাঁদতে কাঁদতে বলল— "বলেছিলাম না, একদিন দাঁড়িয়ে থাকব? এখন বলো, আমাকে কেমন লাগছে?"
আদনান বলল— "তোমাকে আজ প্রথমবারের মতো পূর্ণ লাগছে।"
নাফিসা বলল— "তাহলে এখন থেকে এই বাক্সে আর কষ্টের চিঠি রাখব না, শুধু সুখের চিঠি রাখব, রাজি?"
আদনান বলল— "রাজি। প্রথম সুখের চিঠিটা আমিই রাখব— 'আজ থেকে নাফিসা আর একা নয়'।"
