- “তোর স্বামী কি আজকেও....”
- “আজকেও আমার গায়ে হাত তুলেছে।”
- “তুই চলে আসছিস না কেনো? বিয়ের পরের দিন থেকে তোর গায়ে হাত তোলে। তুই কষ্ট সহ্য করছিস কেনো?”
- “ভাইয়ার সম্মান নষ্ট করতে চায়না।”
- “মিষ্টি তোর ভাইয়া কোনদিনও চাইবে না তুই কষ্ট পা। তুই একবার তোর ভাইয়াকে সত্যি কথা বলে দে।”
- “কেউ একজন আমার ভাইয়ের জন্য আমায় ছেড়েছিল। তার ত্যাগকে মিথ্যা করতে পারবো না।”
- “ভালোবাসিস এখনো? ভুলতে পারবি না ওকে?”
- “নিজের জীবনের একমাত্র অপরাধী কে ভোলা কী এত সহজ?”
- “সে যদি অপরাধী হয় তবে তার খারাপ চাস না কেন?”
- “আমায় অপরাধী বানিয়ে সে যদি অন্য একজনকে বুকে নিয়ে ভালো থাকে তবে ‘ভালো থাকুক ভালোবাসা, অন্য কাউকে ভালোবেসে’। আমি তার আর খারাপ চাইবো না।”
এটা বলে মিষ্টি স্মিত হাসলো। তবে তা ছিল তাচ্ছিল্যের হাসি। এরপর সে উঠে রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে এসে আবার অন্তরার কাছে বসে।
এরপর অন্তরা আবার জিজ্ঞেস করে-
- “শাড়িটা কোথায়?”
- “ওই বাড়ি থেকে আনা অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো যে সুটকেসে রেখেছি ওখানে।”
- “আমায় একবার দেখাবি না?”
- “ছূঁতে চায় না ওটা কে। যেদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব সেদিন ওটাকে ছোঁবো। আমার মৃত্যু ওই শাড়ি পড়েই হবে।”
- “এসব কি বলছিস তুই। তার মানে কি তুই সুইসা....”
- “ভয় নেই আমার ধৈর্যের বাঁধ এখনো ভাঙেনি। তবে ভাঙতে আর বেশি দেরি নেই। ওয়েল তোর ফ্লাইট এর সময় হয়ে যাচ্ছে তোর বেরোনো উচিত।”
অন্তরা অবাক হলেও সে কিছু বলে না।কিছুক্ষণের মধ্যে অন্তরা নিজের গন্তব্যস্থলে চলে যায়। মিষ্টি আবারো একা থেকে যায় এই অন্ধ কুঠিরে। হ্যাঁ তার শ্বশুরবাড়ি তার জন্য অন্ধ কুঠিরের থেকে বড়ো কিছু না। যেদিন বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল ঠিক তার পরের দিন থেকেই তার স্বামী তার গায়ে হাত তোলে। যতদিন তার শ্বশুর শাশুড়ি বাড়িতে ছিল ততদিন অত্যাচার কম হলেও তারা গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ায় অত্যাচার বেড়ে যায়। এমন কোনো নেশা নেই যা তার স্বামী করে না। গত এক সপ্তাহ হল মিষ্টি জানতে পেরেছে তার স্বামীর নাকি একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। কিন্তু এতসব ঘটনার মধ্যেও মিষ্টির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ তার মনে তার স্বামীর জন্য কোনো জায়গা নেই। তার সবটা জুড়ে শুধুমাত্র একজন মানুষেরই বাস অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব সেই মানুষটারই দখলে।
অন্তরা চলে যাওয়ার পরে মিষ্টি তার ঘরে গেল। না এই ঘরে সে থাকলেও তার স্বামী তার সাথে থাকে না সে আলাদা থাকে। মিষ্টি ঘরের একটা কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে এরপর চোখ বুজে ছয় মাস আগের কথা মনে করতে থাকে-
- “আপনি ভাইয়াকে কিছু বলবেন না? ওরা কাল আমায় দেখতে আসবে।”
- “বিয়েটা করে নাও মিষ্টি।”
- “মানেটা কি, বিয়ে করে নেবো মানে? ফারাজ আমি আপনাকে ভালোবাসি। তাহলে অন্য কাউকে বিয়ে আমি কেনো করবো?”
- “কিন্তু আমি তোমার ভাইকে কিছু বলতে পারবো না। আমি কোনো কিছুর জন্যই ওর আমার বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারবো না। ”
- “আচ্ছা, যদি বলতেই না পারেন তাহলে ভালোবাসলেন কেনো? বন্ধুর বোনকে এতগুলো স্বপ্ন দেখানোর কি মানে?”
- “তুমি আমার অপরাধী মিষ্টি। আমি যখন ভালোবেসে ছিলাম আমি তো জানতাম না তুমি আয়ানের বোন। কিন্তু এখন যখন জানতে পেরেছি আমি কিছুতেই আয়ানকে বলতে পারবো না।”
- “বেশ আমি আপনার অপরাধী তো। সমস্যা নাই, সারা জীবন এটাই সহ্য করবো।”
এই বলে মিষ্টি পুকুর ঘাট থেকে চলে আসতে চাই। ঠিক তখনই ফারাজ তাকে আটকাই। তারপর তার হাতে একটা প্যাকেট তুলে দেয়।
- “এটা রাখো মিষ্টি। তোমায় বিয়ে করার পর এটা প্রথম উপহার দেবো ভেবেছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব না। আর যেহেতু শাড়িটা তোমার জন্য কিনেছি তাই অন্য কাউকে দিতেও পারবোনা। আমি তোমার বিয়েতে থাকছি না এটা তোমার বিয়ের উপহার। প্রাক্তন হিসেবে না তোমার ভাইয়ার বন্ধু হিসেবে দিলাম।”
এই বলে ফারাজ সেখান থেকে চলে যায়। মিষ্টি প্যাকেট টা খুলে দেখে তাতে একটা লাল রঙের বেনারসী শাড়ি। এরপরে মিষ্টির বিয়ে ঠিক হয়। যথারীতি বিয়েও হয়, মিষ্টি সেই শাড়িটা পড়েই বিয়ে করেছিল যেটা তাকে ফারাজ দিয়েছিল। বিয়ের পর মিষ্টিকে যখন শ্বশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ঠিক তখনই পালকিতে ওঠার সময় মিষ্টির দূরে গাছের আড়ালে কারোর একটা ছায়া দেখতে পায়। তার একবারও বুঝতে অসুবিধা হয় না এটা ফারাজ। সে তাছ্যিল্যের একটা হাসি দেয় আর গেয়ে ওঠে-
“ তোমার দেওয়া লাল শাড়িটা
পইরা আমি বিদায় নিলাম,
একবারও দেখলা না আমারে।
তোমার নামে আলতা পরে
বসেছিলাম অপেক্ষাতে,
তবু দোষী বানাইলা আমারে......।”
আগের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মিষ্টির চোখে জল চলে আসে। সে তৎক্ষণাৎ সেই জল মুছে নিয়ে হাসতে শুরু করে। আর ঠিক তখনই তার ঘরে মাতাল অবস্থায় প্রবেশ করে তার স্বামী।
- “পাগলের মতো হাসছিস কেনো? নতুন ভা*** পাইছোস? লজ্জা করে না জামাই থাকতে অন্যের দিকে নজর দিতে? কিরে মুখ খোল?”
এইটা বলে প্যান্ট থেকে বেল্ট খুলে মিষ্টিকে মারতে শুরু করে। না মিষ্টি একটাও চিৎকার করেনি, এই মার তার সহ্য হয়ে গেছে।
দীর্ঘ আধঘন্টা মিষ্টির উপর অত্যাচার করার পর তার স্বামী ঘর থেকে চলে যায় নিজের ঘরে। আর মিষ্টি বিনা আওয়াজে নিজের অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে। তখনই তার চোখ যায় মাথার উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে, আর সেই ফ্যানের দিকে তাকিয়ে সে হাসতে শুরু করে। মিষ্টি বাঙ্কার থেকে নিজের সুটকেস গুলো নামায় আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসে একটা লাল বেনারসী।
- “হ্যালো হ্যা..হ্যালো ফারাজ তুই কোথায়?”
- “আমি তো অফিসে। তোর গলা এরকম লাগছে কেনো, কি হয়েছে?”
- “ফা..ফারাজ আমার বোন”
‘আমার বোন’ শব্দ টা শুনতে ফারাজের বুকটা কেমন হু হু করে ওঠে। সে আয়ানকে শান্ত হতে বলে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে। আর আয়ান বলে-
- “আমার মিষ্টি আর এই দুনিয়াতে নেই ফারাজ। নিজের স্বামীর নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আমার বোন সুইসাইড করেছে। তুই আমার সাথে যাবি ফারাজ।”
ফারাজের দুনিয়া যেন থমকে যায়। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। তার কানে শুধু একটাই কথা বাজতে থাকে-
- “নিজের স্বামীর নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে আমার বোন সুইসাইড করেছে।”
ফারাজ না থাকতে পেরে তখনই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাই। প্রায় ১৫ মিনিট পর ফারাজ আর আয়ান পৌঁছায় মিষ্টির শ্বশুরবাড়ি। মিষ্টির দেহটা পড়ে আছে নিথর অবস্থাই। আয়ান ছুটে যায় তার বোনের কাছে। তোর বোনকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। ফারাজ এগিয়ে যেতে পারে না। এরপর আয়ান উঠে গিয়ে মিষ্টির স্বামীর কলার ধরে চিৎকার করতে শুরু করে। আর উল্টো দিকে ফারাজ মিষ্টির কাছে যায়।
- “কেনো করলি এরকম আমার বোনটাকে কেনো কেড়ে নিলি। তোর পছন্দ না হলে বলে দিতি পাঠাতাম না আমার বোনকে। আমার বোনকে রাখার মতো ক্ষমতা আমার ছিল। কেনো করলি এমন স্কাউন্ড্রেল।”
- “ওকে ছেড়ে দে আয়ান। দোষ ওর না আমার।”
- “তুই এইসব কি বলছিস ফারাজ?”
ফারাজ উত্তর দিল না সে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। মিষ্টি পড়নে আজকে সেই লাল শাড়িটা। কত সুন্দর করে সেজেছে মেয়েটা। কার জন্য সেজেছে ফারাজের জন্য? হয়তো। ফারাজ তো দেখেনি এই শাড়িটা পড়ে মিষ্টি কে। সেদিন গাছের ফাঁক থেকে কিছু দেখতে পায়নি সে। তাই হয়তো দেখিয়ে দিল। তার এই রুপ যার আগুনে ফারাজ কবেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই মিষ্টির হাতে ফারাজ একটা চিরকুট দেখতে পাই। আর তাতে লেখা ছিল-
“চার বেহারার পালকি কইরা
যাব আবার কাধে চইরা
শেষ দেখা দেখো দাঁড়িয়ে
চাইলেও তুমি পাবেনা আর
ফিরে এই আমাকে
ফুল দিয়ে দিও গো সাজিয়ে....”
