🖤🌙 নিশির অভিশপ্ত বাড়ি 👻
লেখিক: কাইছার হোসেন
পাঠ ১ — বিয়ে করতে এসে ভূতের প্রেমে পড়ল! 🤣👻
🌹 সকল চরিত্রের পরিচয়
আয়রা রহমান (১৮): গল্পের নায়িকা। ভীষণ দুষ্টু, সাহসী এবং বাচাল। ভূতকে ভয় পায়, কিন্তু মুখে বলে—ভূত দেখলে উল্টো ভূতই ভয় পাবে!
জারিফ ইবনে রায়ান (২৫): রহস্যময় এক যুবক। দেখতে রাজপুত্রের মতো, কিন্তু তার চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক সত্য।
মেহের রহমান (১৭): আয়রার ছোট বোন। ভূতের গল্প শুনে সাহস দেখায়, অথচ রাতে একা বাথরুমে যেতে পারে না।
রাফি রহমান (১২): আয়রার ছোট ভাই। সারাক্ষণ ফাজলামি করে। ভূত দেখলেও প্রথমে জিজ্ঞেস করবে, ভূতের ওয়াইফাই আছে কি না!
নানু আমিনা খাতুন (৬৫): পুরোনো বাড়ির অভিশাপ সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন, কিন্তু কাউকে কিছু বলেন না।
কালো জ্বিন শাহরুখ: বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্যময় সত্তা। তার আসল উদ্দেশ্য কেউ জানে না।
পেত্নী ঝুমুর: সাদা শাড়ি পরা এক রহস্যময় আত্মা। মাঝেমধ্যে ভয় দেখায়, আবার সুযোগ পেলেই মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করে।
বাবলু ভূত: বাড়ির সবচেয়ে হাস্যকর ভূত। ভয় দেখানোর চেয়ে মানুষের সঙ্গে ফাজলামি করতেই বেশি পছন্দ করে।
🌑 রাতের শুরু
রাত তখন ১১টা ৪৫ মিনিট।
আকাশে কালো মেঘ। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক পুরোনো জমিদারবাড়ি। বাড়িটার দেয়ালে শ্যাওলা, জানালায় মরিচা ধরা শিক, আর ছাদের ওপর বসে আছে কয়েকটি কালো কাক।
গ্রামের মানুষ বাড়িটাকে বলে—নিশির বাড়ি।
কথিত আছে, এই বাড়িতে রাত বারোটার পর কেউ প্রবেশ করলে সে আর আগের মানুষটি থাকে না।
আর আয়রা রহমান?
সে ঠিক সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিপস খাচ্ছে!
আয়রা: হায় আল্লাহ! বাড়িটা তো একেবারে আমার পরীক্ষার রেজাল্টের মতো ভয়ংকর!
পেছন থেকে মেহের বলল, আপু, আমরা এখানে এসেছি কেন?
আয়রা বুক ফুলিয়ে বলল, অ্যাডভেঞ্চার করতে!
রাফি চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে বলল, আপু, অ্যাডভেঞ্চার করতে এসে যদি ভূত আমাদের খেয়ে ফেলে?
আয়রা: তাহলে তুই আগে যাবি। তোর শরীরে মাংস কম, ভূতের বদহজম হবে না!
রাফি মুখ বাঁকিয়ে বলল, আম্মু! তোমার মেয়ে আমাকে এতিম করার আগেই আমাকে বাঁচাও!
মেহের হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা।
কিন্তু ঠিক তখনই—
খটাসসস!
বাড়ির বিশাল দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
তিনজনের হাসি মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল।
ভেতর থেকে ভেসে এল এক নারীর কণ্ঠ।
এত দেরি করলে কেন, আয়রা?
আয়রার হাত থেকে চিপসের প্যাকেট পড়ে গেল।
মেহের... তুই কি আমার নাম ধরে ডাকলি?
মেহের মাথা নাড়ল।
রাফি কাঁপতে কাঁপতে বলল, আপু, আমার মনে হয় ভূত আমাদের পরিবারের সদস্য। আমাদের নামও জানে!
আয়রা গলা শক্ত করে বলল, কে ওখানে? সামনে আয়!
কোনো উত্তর নেই।
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা সাদা ছায়া বেরিয়ে এল।
লম্বা চুল। সাদা শাড়ি। মাটিতে পা নেই।
পেত্নী ঝুমুর!
ঝুমুর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, তোমরা আমার বাড়িতে কেন এসেছ?
আয়রা ভয়ে কাঁপছিল, তবুও মুখে বলল, বাড়ি তোমার হলে দলিল দেখাও!
পেত্নী থমকে গেল।
পেছন থেকে রাফি ফিসফিস করে বলল, আপু, পেত্নীর কাছে দলিল চাইছিস কেন? ওর তো জাতীয় পরিচয়পত্রও থাকার কথা না!
ঝুমুর রেগে গিয়ে চিৎকার করল, চুপ! আমি তোমাদের সবাইকে অভিশাপ দেব!
আয়রা এবার আর সাহস ধরে রাখতে পারল না।
দেখো আপা, অভিশাপ দিতে হলে একটু সকালে দিয়ো। রাতে আমার ঘুম পায়!
ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির দোতলার জানালায় একজন যুবককে দেখা গেল।
কালো পোশাক। এলোমেলো চুল। চোখ দুটো অস্বাভাবিক নীল।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, আয়রা রহমান... অবশেষে তুমি ফিরে এসেছ।
আয়রা হতভম্ব।
আমি আবার কখন এখানে এসেছিলাম?
যুবকটির ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটল।
তুমি মনে করতে পারছ না, তাই না?
হঠাৎ বাড়ির সব দরজা-জানালা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম! ধড়াম! ধড়াম!
রাফি চেঁচিয়ে উঠল, আমি বাড়ি যাব! ভূতের বাড়িতে ফ্রি ওয়াইফাইও নেই, খাবারও নেই!
কিন্তু কেউ আর দরজা খুলতে পারল না।
যুবকটি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। তার পায়ের শব্দ হচ্ছিল না।
সে আয়রার সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, আমার নাম জারিফ।
আয়রা শুকনো ঢোক গিলে বলল, বাহ! নাম তো সুন্দর। এবার আমাদের যেতে দিন।
জারিফ উত্তর দিল, তুমি যেতে পারবে না।
কেন?
কারণ আজ রাত বারোটায় তোমার ভাগ্যের শেষ দরজা খুলবে।
আয়রা চোখ বড় করে বলল, ভাই, আমার ভাগ্যের দরজা খুললে খুলুক, আপনি আগে সামনের দরজাটা খুলে দেন!
জারিফের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ঠিক তখনই বাড়ির দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ঘড়িটি বেজে উঠল।
ঢং... ঢং... ঢং...
রাত বারোটা।
আর দেয়ালে ফুটে উঠল লাল অক্ষরে লেখা একটি বাক্য—
“যে মেয়ের জন্মের রাতে জ্বিনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল, তার বিয়ে হবে মৃত রাজপুত্রের সঙ্গে!”
আয়রা লেখাটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর জারিফের দিকে তাকিয়ে বলল, এক মিনিট! আমি কি ভূতের সঙ্গে বিয়ে করতে এসেছি? বিয়ের কার্ড কোথায়? আর কাবিনের টাকা কে দেবে?
রাফি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
হায় আল্লাহ! আমার বোনের বিয়ের জন্য মানুষ পাওয়া গেল না, এবার ভূত!
কিন্তু কেউ জানত না, জারিফ আসলে মানুষ নয়।
আর বাড়ির নিচে, সাতটি তালাবদ্ধ দরজার ওপারে, জেগে উঠেছে এমন এক জ্বিন—যে আয়রাকে পাওয়ার জন্য একশো বছর ধরে অপেক্ষা করছে।
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল সেই কণ্ঠ—
জারিফ... মেয়েটিকে আমার কাছে নিয়ে আয়। নইলে এবার তোর আত্মাও মুক্তি পাবে না!
জারিফ চোখ বন্ধ করল।
আয়রা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই রহস্যময় যুবকটিও ভয় পাচ্ছে।
কিন্তু কেন?
আর জন্মের রাতে তার সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছিল?
— সাত দরজার অভিশাপ (পরবর্তী অংশ)
ঘরের সব ঘড়ি একসঙ্গে থেমে গেল।
টিক… টিক… টিক…
এতক্ষণ যে ঘড়িগুলো চলছিল, সেগুলোর কাঁটা ঠিক বারোটা এক মিনিটে এসে আটকে গেছে।
আয়রা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
— আচ্ছা, একটা কথা বলো তো! এই বাড়িতে কি ঘড়িরও পরীক্ষা চলে? বারোটা এক মিনিটে এসে সবাই ফেল করেছে নাকি?
রাফি মুখ চেপে হাসল।
— আপু, ঘড়িগুলোও মনে হয় তোর মতো পড়াশোনা করে না।
— এই! তোর সাহস তো কম না! দাঁড়া, বাড়ি থেকে বের হই, তারপর তোর খবর আছে!
মেহের বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোমরা দুজন কি এক মিনিটের জন্যও চুপ থাকতে পারো না? এখানে একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে!
পেছন থেকে পেত্নী ঝুমুরের গলা ভেসে এল।
— হ্যাঁ রে মা, ওদের চুপ করানোর জন্য একটা আলাদা ভূত দরকার। আমি একা পারব না।
আয়রা ঘুরে তাকাল।
— খালাম্মা, আপনি আমাদের সাহায্য করতে এসেছেন, নাকি আমাদের মানসিক শান্তি নষ্ট করতে?
ঝুমুর কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
— আমি তোদের সাহায্য করতে এসেছি। তবে সাহায্য করার আগে একটা কথা বলি—আমার চুলের ক্লিপটা কেউ দেখেছিস?
রাফি অবাক হয়ে বলল,
— ভূত হয়েও ক্লিপ লাগে?
— কেন? ভূত হলেই কি আমি এলোমেলো চুল নিয়ে ঘুরব? সৌন্দর্যবোধ বলে একটা জিনিস আছে!
ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে একটা বিকট শব্দ হলো।
ধড়াম!
সবাই চমকে উঠল।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একটা অদ্ভুত ছায়ামূর্তি। তার গায়ে পুরোনো কোট, মাথায় গোল টুপি আর হাতে একটা লণ্ঠন। লণ্ঠনের আলোয় তার মুখটা কখনো দেখা যাচ্ছে, কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
লোকটা গম্ভীর গলায় বলল,
— এই বাড়ির নিয়ম ভেঙে এত চিৎকার করার সাহস কার?
রাফি সঙ্গে সঙ্গে আয়রার পেছনে লুকিয়ে পড়ল।
— আপু, তুই বড় বোন। আগে তুই কথা বল!
আয়রা দাঁত চেপে বলল,
— তুই যখন ছোট ছিলি, তখন তোকে কোলে নিয়েছি। এখন তোর জন্য ভূতের সামনে দাঁড়াতে হবে?
— কোলে নিয়েছিস বলে তো তোর ওপর ভরসা করি!
মেহের ফিসফিস করে বলল,
— তোমরা কি দুজন একটু থামবে?
লোকটা ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।
— আমার নাম বাবলু। এই বাড়ির পুরোনো দারোয়ান ছিলাম। এখনো রাতের বেলা পাহারা দিই।
আয়রা চোখ ছোট করে তাকাল।
— দারোয়ান ছিলেন? তাহলে আপনার বেতন কে দেয়?
বাবলু থমকে গেল।
— কী?
— মানে, আপনি তো এখন আর জীবিত নন। বেতন না পেলে কাজ করেন কেন?
বাবলু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ঝুমুরের দিকে তাকাল।
— এই মেয়েটাকে কে নিয়ে এসেছে? আমার এত বছরের ভূতজীবনে এমন প্রশ্ন কেউ করেনি!
ঝুমুর হেসে গড়িয়ে পড়ল।
— সাবধান, বাবলু! মেয়েটা প্রশ্ন করতে শুরু করলে তোর আত্মাও চাকরি ছেড়ে পালাবে!
কিন্তু পরক্ষণেই বাবলুর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
— হাসাহাসি বন্ধ করো। সাত দরজার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রথম দরজায় যে নাম লেখা হয়েছে, তার অর্থ তোমরা এখনো বুঝতে পারোনি।
আয়রা বলল,
— জারিফ ইবনে রায়ান। নামটা তো জানলাম। এবার কি পরীক্ষার খাতায় লিখতে হবে?
বাবলু মাথা নাড়ল।
— নাম জানা আর নামের সত্য জানা এক কথা নয়। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক রাজবংশ, একটি অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা আর এক শিশুর জন্মরাত।
নানু আমিনা কাঁপা গলায় বললেন,
— আর একটা বিশ্বাসঘাতকতা।
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
— নানু, তুমি কী জানো?—মেহের জিজ্ঞেস করল।
আমিনা খাতুন চোখ নামিয়ে বললেন,
— যতটুকু জানি, ততটুকু বলার সাহস আমার এত বছর হয়নি।
আয়রা এবার সত্যিই রেগে গেল।
— সবাই জানে, সবাই কিছু লুকিয়ে রেখেছে, আর কিছুই আমাকে বলা হবে না! আমি কি এই বাড়ির মানুষ নই?
কেউ উত্তর দিল না।
দূরের একটা দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ক্যাঁচ…
দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এল এক নারীর কান্না।
আয়রার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। কান্নার শব্দটা তার অচেনা মনে হলেও অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগছিল।
যেন বহু বছর আগে ঘুমের মধ্যে এই কান্না সে শুনেছিল।
জারিফ হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
— ওই দরজার কাছে যেও না।
আয়রা তার দিকে তাকাল।
— কেন? ওখানে কি তোমার প্রেমিকা থাকে?
জারিফের চোখে বিরক্তির ছায়া দেখা দিল।
— সবকিছুকে মজা মনে হয় তোমার?
— না। তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি জন্মের পর থেকে হাসতে ভুলে গেছ। তাই পরিবেশটা একটু সুন্দর করার চেষ্টা করছি।
জারিফ কোনো উত্তর দিল না।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আয়রা লক্ষ করল, তার ঠোঁটের কোণে যেন ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠেছিল।
তারপরই মিলিয়ে গেল।
জারিফ নিচু গলায় বলল,
— ওই দরজার ওপাশে এমন একটা স্মৃতি আছে, যা তোমার জীবন বদলে দিতে পারে।
— আমার জীবন তো তোমাদের বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই বদলে যাচ্ছে। এখন আর কত বদলাবে?
— তুমি সত্যটা জানতে চাও?
— অবশ্যই!
— তাহলে মনে রেখো, সত্য জানার পর আগের মতো জীবন আর ফিরে পাবে না।
আয়রা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বুক সোজা করে বলল,
— আমি ছোটবেলা থেকে পরীক্ষার হলে বসে এমন প্রশ্নের উত্তর লিখেছি, যেগুলোর উত্তর বইয়ে ছিল না। আর তুমি আমাকে একটা দরজার ভয় দেখাচ্ছ? খোলো!
রাফি ফিসফিস করে বলল,
— আপু, সাহস দেখানোর দরকার নেই। দরজাটা বন্ধ করে বাড়ি যাই। কাল আমার অঙ্ক পরীক্ষা!
কেউ তার কথায় কান দিল না।
প্রথম দরজার ওপাশে
আয়রা দরজার সামনে দাঁড়াতেই কাঠের ওপর খোদাই করা অক্ষরগুলো জ্বলতে শুরু করল।
“যে স্মৃতি তোমার নয়, সেই স্মৃতিই তোমার পরিচয়।”
দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে কোনো ঘর নেই।
আছে একটা বিশাল বাগান। চারদিকে সাদা ফুল, মাঝখানে পাথরের ঝরনা। আকাশে চাঁদ, অথচ বাড়ির বাইরে তখন ঘন কালো রাত।
বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণী। তাঁর কোলে নবজাতক শিশু।
তরুণীর চোখে জল।
তিনি শিশুটির কপালে চুমু খেয়ে বলছেন,
— আমার মেয়েকে আমি কারও হাতে তুলে দেব না। রাজবংশের নিয়ম, জিনের চুক্তি কিংবা মৃত্যুর ভয়—কিছুই আমাকে থামাতে পারবে না।
আয়রার নিশ্বাস আটকে এল।
তরুণীর মুখটা তার মায়ের মতো!
সে কাঁপা গলায় বলল,
— মা?
দৃশ্যের ভেতরের তরুণী যেন তার কথা শুনতে পেলেন। তিনি ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালেন।
— আয়রা… আমার মেয়ে…
আয়রা এক পা এগিয়ে গেল।
— মা, তুমি কোথায়? তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছ না কেন? সবাই আমাকে এত বছর অন্ধকারে রেখেছে কেন?
তরুণীর চোখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
— সময় খুব কম। মন দিয়ে শোনো। তোমার জন্মের রাতে আমি একটা ভুল করেছিলাম। কিন্তু সেই ভুল তোমার জন্ম নয়। ভুল ছিল এমন একজনকে বিশ্বাস করা, যে নিজের সত্য পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল।
হঠাৎ বাগানের চারদিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল।
ধোঁয়ার মধ্য থেকে শাহরোখের কণ্ঠ ভেসে এল।
— শিশুটিকে আমার হাতে দাও!
তরুণী শিশুটিকে বুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
— কখনো না!
— তুমি চুক্তি করেছ!
— আমি চুক্তি করিনি। আমাকে বাধ্য করা হয়েছিল!
শাহরোখের হাসি শোনা গেল।
— চুক্তির সাক্ষী আছে। সাতটি দরজা আছে। আর আছে সেই রাজপুত্র, যার মৃত্যু কখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
তরুণী হঠাৎ শিশুটির হাতে একটা ছোট্ট রুপালি লকেট পরিয়ে দিলেন।
— আয়রা, যদি কখনো জারিফকে দেখো, তার চোখের দিকে তাকিয়ে সব বিশ্বাস কোরো না। তার ছায়া দেখবে। তার স্মৃতি খুঁজবে। আর মনে রাখবে, মৃত মানুষ সব সময় মিথ্যা বলে না, কিন্তু জীবিত মানুষও সব সময় সত্য বলে না।
দৃশ্যটা কেঁপে উঠল।
আয়রা চিৎকার করে বলল,
— মা! লকেটটা কোথায়? আমার কাছে তো এমন কিছু নেই!
তরুণী উত্তর দেওয়ার আগেই কালো ধোঁয়া তাঁকে ঢেকে ফেলল।
দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।
ধাম!
আয়রা পিছিয়ে পড়ছিল। জারিফ দ্রুত তার হাত ধরে ফেলল।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো।
আয়রা তার হাত সরিয়ে নিল।
— তুমি আমার মাকে চেনো?
জারিফ নীরব।
— আমি তোমাকে প্রশ্ন করছি!
— চিনি।
— তাহলে তুমি এতক্ষণ কিছু বলোনি কেন?
— কারণ তোমার মা আমাকে বিশ্বাস করতেন না।
আয়রা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
— তাহলে আমিও তোমাকে বিশ্বাস করি না।
জারিফ ধীরে মাথা নাড়ল।
— সেটাই হয়তো তোমার বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত।
নানুর লুকানো লকেট
আমিনা খাতুন হঠাৎ নিজের বুকের আঁচল শক্ত করে চেপে ধরলেন।
আয়রার চোখ এড়াল না ব্যাপারটা।
— নানু, তোমার আঁচলের নিচে কী আছে?
— কিছু না।
— আমার অভিজ্ঞতা বলছে, বড়রা যখন বলে ‘কিছু না’, তখনই আসল কিছু লুকিয়ে থাকে।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ঠিক বলেছিস, আপু! মা যখন বলে রান্নাঘরে মিষ্টি নেই, তখনও কিছু একটা থাকে!
মেহের তার মাথায় টোকা দিল।
— সব জায়গায় খাবারের উদাহরণ দিতে হবে?
রাফি মাথা চুলকে বলল,
— ভয়ের সময় পেটের কথাই বেশি মনে পড়ে!
নানু আর লুকাতে পারলেন না। আঁচলের ভেতর থেকে বের করলেন একটি পুরোনো রুপালি লকেট।
লকেটটির মাঝখানে অদ্ভুত চিহ্ন। সাতটি ছোট বৃত্তের মধ্যে একটি নীল পাথর বসানো।
আয়রা লকেটটা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল।
— এটা… এটা তো সেই শিশুটির হাতে ছিল!
নানু কাঁপা হাতে লকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
— তোমার জন্মের রাতের পর থেকে এটা আমার কাছে রাখা। তোমার মা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সঠিক সময় না আসা পর্যন্ত যেন তোমাকে না দিই।
আয়রা লকেটটা হাতে নিতেই নীল পাথরটা আলো ছড়াতে শুরু করল।
বাড়ির দেয়ালে একের পর এক শব্দ ফুটে উঠল।
প্রথম দরজা—স্মৃতি।
দ্বিতীয় দরজা—রক্ত।
তৃতীয় দরজা—বিশ্বাস।
চতুর্থ দরজা—মৃত্যু।
পঞ্চম দরজা—প্রেম।
ষষ্ঠ দরজা—বিশ্বাসঘাতকতা।
সপ্তম দরজা—নির্বাচন।
মেহের ফিসফিস করে বলল,
— আপু, আমার মনে হচ্ছে এই বাড়িতে থাকার চেয়ে পরীক্ষার হলে বসা সহজ।
আয়রা মাথা নাড়ল।
— আমারও তাই মনে হচ্ছে। অন্তত পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র থাকে, এখানে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে জিনও ফ্রি!
কিন্তু কেউ হাসল না।
কারণ দেয়ালের লেখাগুলো আবার বদলে গেল।
“সাত দরজা খুলবে সেই মেয়ে, যার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই জগতের ঋণ। শেষ দরজা খুললে একজন ফিরে পাবে তার জীবন, আর একজন হারাবে নিজের পরিচয়।”
শাহরোখের কণ্ঠ চারদিক থেকে ভেসে এল।
— আয়রা রহমান, দ্বিতীয় দরজার সামনে এসো।
জারিফ তৎক্ষণাৎ বলল,
— না! এখনই নয়।
শাহরোখের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— তুমি কি আবার আমার আদেশ অমান্য করবে, রাজপুত্র?
রাজপুত্র!
শব্দটা শুনে সবাই জারিফের দিকে তাকাল।
আয়রা ধীরে ধীরে বলল,
— তাহলে কথাটা সত্যি? তুমি একজন রাজপুত্র?
জারিফ চোখ বন্ধ করল।
— আমার পরিচয় জানার আগে তোমার নিজের পরিচয় জানা দরকার।
— আমার নাম আয়রা রহমান। আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমার অঙ্কে দুর্বলতা আছে, ইংরেজি পরীক্ষার আগে মাথা গরম হয়, আর তোমাদের মতো রহস্যময় লোকজনকে আমি একদম সহ্য করতে পারি না!
রাফি হাততালি দিয়ে উঠল।
— বাহ, আপু! নিজের পরিচয় একদম পরিষ্কার!
ঝুমুরও মাথা নাড়ল।
— মেয়েটা ঠিকই বলেছে। তবে অঙ্কে দুর্বল হলে জিনের সঙ্গে হিসাব মেলাতে সমস্যা হবে!
আয়রা বিরক্ত হয়ে বলল,
— আপনারা সবাই মিলে আমার জীবনটাকে কমেডি শো বানিয়ে ফেলেছেন!
হঠাৎ দ্বিতীয় দরজার ওপাশ থেকে একটা শিশুর কান্না শোনা গেল।
কান্নাটা এত করুণ যে আয়রার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
শাহরোখ বলল,
— ওই দরজার ওপাশে তোমার রক্তের উত্তর আছে। খুলে দেখো, তোমার পরিবারের কে তোমাকে সত্য থেকে দূরে রেখেছে।
আমিনা খাতুন কেঁদে উঠলেন।
— না! এই দরজা খোলা যাবে না!
আয়রা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল।
— নানু, কেন?
নানু কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
— কারণ ওই দরজার ওপাশে এমন একজন আছে, যাকে আমরা বহু বছর ধরে মৃত বলে জানি।
জারিফের মুখের রং বদলে গেল।
— অসম্ভব!
দরজার নিচ দিয়ে ধীরে ধীরে লালচে আলো বেরিয়ে এল। ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ বলল,
— জারিফ… তুমি ফিরে এসেছ?
জারিফ এক পা পিছিয়ে গেল।
আয়রা প্রথমবারের মতো তার চোখে স্পষ্ট ভয় দেখতে পেল।
— জারিফ, কে আছে ওখানে?
সে কোনো উত্তর দিল না।
দরজার ওপাশের কণ্ঠ আবার বলল,
— আমার ছেলে… এত বছর পরও কি তুমি তোমার বাবাকে চিনতে পারছ না?
জারিফ ফিসফিস করে বলল,
— আমার বাবা তো বহু বছর আগে মারা গেছেন।
ঠিক তখনই দরজার ওপর ভেসে উঠল একটি নাম—
রায়ান ইবনে ভলকভ।
আমিনা খাতুন মেঝেতে বসে পড়লেন।
ঝুমুরের মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। বাবলু তার লণ্ঠনটা নামিয়ে ফেলল। মেহের আয়রার হাত চেপে ধরল, আর রাফি কোনো কথা না বলে নানুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
আয়রা বুঝতে পারল, এবার আর কোনো মজা করার সময় নেই।
দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।
— জারিফ, দরজাটা খোলো। তোমার মা এখনো বেঁচে আছে।
জারিফের চোখে অবিশ্বাস।
— আমার মা-ও মারা গেছেন।
কণ্ঠটা এবার ফিসফিস করে বলল,
— তাহলে এই বাড়ির উত্তর দিকের বন্ধ ঘরে প্রতি রাতে কে তোমার নাম ধরে কাঁদে?
সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির উত্তর দিক থেকে তিনবার ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঢং!
ঢং!
ঢং!
আয়রা লকেটটা শক্ত করে ধরল।
লকেটের নীল পাথর নিভে গেল, আর তার জায়গায় ফুটে উঠল একটি ছোট্ট কালো চিহ্ন—একটি মুকুটের ওপর সাতটি বিন্দু।
জারিফ চিহ্নটা দেখেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
— না… এই চিহ্ন তো রাজপরিবারের শেষ অভিশাপের!
আয়রা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— এবার সব সত্যি বলতে হবে। তুমি কে, তোমার বাবা কে, আর আমার জন্মের রাতে কী ঘটেছিল—সব!
জারিফ মাথা তুলে তাকাল।
— সব সত্যি জানলে তুমি হয়তো আমাকে তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু ভাববে।
আয়রা চোখের জল আটকে বলল,
— সত্যি লুকিয়ে রাখলে আমি তোমাকে তার চেয়েও বেশি ঘৃণা করব।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
তারপর জারিফ উঠে দাঁড়াল। দ্বিতীয় দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ঠিক আছে। দরজাটা খোলার আগে তোমাদের একটা কথা জানা দরকার। এই বাড়ির অভিশাপ আয়রাকে বন্দি করার জন্য তৈরি হয়নি।
সে থামল।
— এই অভিশাপ তৈরি হয়েছিল তাকে বাঁচানোর জন্য।
আয়রা হতভম্ব হয়ে গেল।
— আমাকে বাঁচানোর জন্য?
জারিফ উত্তর দেওয়ার আগেই দ্বিতীয় দরজার হাতল নিজে থেকে ঘুরে গেল।
দরজার ফাঁক দিয়ে একটি ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল। সেই বাতাসের সঙ্গে ভেসে এল পরিচিত এক নারীর কণ্ঠ—
— আয়রা… মা… আমার কাছে এসো।
আয়রার চোখ বড় হয়ে গেল।
কারণ কণ্ঠটা তার মায়ের।
আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটির পায়ের কাছে কোনো ছায়া ছিল না।
ঠিক জারিফের মতো।
দ
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তিটির দিকে আয়রা তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের চেনা কেউ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সেই মানুষটির মুখ সে দেখতে পাচ্ছে না।
— মা… তুমি কি সত্যিই আমার মা?
ছায়ামূর্তিটি ধীরে ধীরে হাত বাড়াল।
— আয়রা, আমার কাছে এসো মা।
আয়রা এক পা এগিয়ে যেতেই জারিফ তার পথ আটকে দাঁড়াল।
— থামো!
— আবার কী হলো?
— তুমি কি ভুলে গেছ, তোমার মা তোমাকে কী বলেছিলেন? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সব বিশ্বাস করবে না। তার ছায়া দেখবে। তার স্মৃতি খুঁজবে।
আয়রা বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুমি কি সব সময় এমন ধাঁধার মতো কথা বলো? সোজা করে কিছু বলতে পারো না?
জারিফ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ওই নারী তোমার মা হলে তাঁর হাতে জন্মের সময়কার কোনো চিহ্ন থাকার কথা।
আয়রা আবার দরজার দিকে তাকাল।
— কী চিহ্ন?
জারিফ উত্তর দেওয়ার আগেই নানু আমিনা বলে উঠলেন,
— তোমার মায়ের ডান হাতের কবজিতে একটা ছোট্ট চাঁদের মতো জন্মদাগ ছিল।
দরজার ওপাশের নারী ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে আনলেন।
আয়রা দেখল, তাঁর ডান কবজিতে কোনো জন্মদাগ নেই।
তার চোখে সন্দেহ জেগে উঠল।
— তুমি আমার মা নও!
নারীটির মুখ মুহূর্তেই অন্ধকারে ঢেকে গেল।
— এত বড় হয়ে গেছ, মা? নিজের মাকেও চিনতে পারছ না?
আয়রা এবার সাহস করে বলল,
— আমার মা হলে আমার ছোটবেলার একটা কথা বলো। আমি ছোটবেলায় ঘুমানোর আগে কী চাইতাম?
নারীটি চুপ।
আয়রা বলল,
— আমি প্রতিদিন গল্প শুনতে চাইতাম। মা গল্প শেষ না করলে ঘুমাতাম না। আর গল্পের শেষে বলতাম, কাল আবার নতুন গল্প বলবে। আমার মা সেটা মনে রেখেছেন। তুমি জানো না, কারণ তুমি আমার মা নও।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে বিকট হাসি ভেসে এল।
— বুদ্ধিমান মেয়ে! কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে সব অভিশাপ ভাঙা যায় না!
নারীটির অবয়ব ধোঁয়ার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল।
আয়রা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
— উফ! আর একটু হলেই ভুল করে ভূতের সঙ্গে পারিবারিক পুনর্মিলনী করে ফেলতাম!
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— আপু, তুই যদি ওকে মা বলে ডাকতিস, আমি কিন্তু ওকে খালা ডাকতাম!
মেহের চোখ রাঙাল।
— তুই কি একটুও ভয় পাস না?
— পাই তো! কিন্তু ভয় পেলে কি ভূত চলে যাবে? বরং হাসালে হয়তো চলে যাবে!
ঝুমুর হেসে বলল,
— ছেলেটার মাথায় বুদ্ধি আছে। তবে বেশি কথা বললে বাবলুর মতো দারোয়ানের চাকরি পেয়ে যাবে!
বাবলু গম্ভীর মুখে বলল,
— আমার চাকরি নিয়ে কেউ মজা করবে না। আমি এই বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো কর্মচারী!
আয়রা ভ্রু তুলে বলল,
— তাহলে আপনার পদোন্নতি হয়নি কেন?
বাবলু লণ্ঠন উঁচু করে ধরল।
— এই মেয়েকে কেউ থামাও!
সবাই কিছুক্ষণ হেসে নিল। কিন্তু নানু আমিনার মুখে হাসি নেই।
তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
— ওরা এখনো আমাদের পরীক্ষা করছে।
আয়রা তাঁর পাশে বসে পড়ল।
— নানু, তুমি আমাকে একটা কথা বলবে?
— কী কথা, মা?
— আমার মা কি সত্যিই বেঁচে আছেন?
আমিনা খাতুন চোখ বন্ধ করলেন।
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।
তারপর বললেন,
— আমি জানি না।
আয়রা নানুর হাত ধরে বলল,
— তুমি কি তাঁকে শেষবার দেখেছিলে?
নানু মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। তোমার জন্মের রাতেই।
— তারপর?
— তারপর এই বাড়ির উত্তর দিকের ঘর থেকে একটা আলো বেরিয়েছিল। সেই আলোয় পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল। যখন সবকিছু শান্ত হলো, তোমার মা আর সেখানে ছিলেন না।
আয়রা ধীরে বলল,
— আর আমি?
— তুমি ছিলে আমার কোলে। তোমার হাতে ছিল একটা ছোট্ট লকেট। তোমার মা আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে যেন কখনো এই বাড়িতে ফিরতে না দিই।
— তাহলে আমাকে এখানে আনা হলো কেন?
নানু উত্তর দেওয়ার আগেই জারিফ বলল,
— কারণ এবার বাড়িটা নিজেই তোমাকে ডেকে এনেছে।
আয়রা তার দিকে তাকাল।
— বাড়ি আবার মানুষকে ডাকে নাকি?
জারিফ বলল,
— এই বাড়ি সাধারণ বাড়ি নয়। এখানে যে একবার নিজের ভাগ্য রেখে যায়, সে যত দূরেই যাক, একদিন তাকে ফিরতে হয়।
রাফি চারদিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে বাড়িটাকে বিক্রি করে দিলে হয় না?
ঝুমুর সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— বিক্রি করতে গেলে ক্রেতা কোথায় পাবি?
রাফি গম্ভীরভাবে বলল,
— অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেব। লিখব, পুরোনো জমিদারবাড়ি, সঙ্গে ফ্রি ভূত!
বাবলু মাথায় হাত দিল।
— আমার চাকরিজীবনে এমন অপমান আর কখনো হয়নি!
ঠিক তখনই বাড়ির ওপরের তলা থেকে কারও দৌড়ে আসার শব্দ শোনা গেল।
ধুপ… ধুপ… ধুপ…
সবাই মাথা তুলে তাকাল।
সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী।
তার পরনে গাঢ় নীল পোশাক, লম্বা কালো চুল পিঠের ওপর ছড়ানো। হাতে একটা পুরোনো বই।
তরুণীটি ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল।
জারিফ তাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
— নায়রা?
তরুণীটি থেমে গেল।
— এত বছর পরও আমার নাম মনে আছে, রাজপুত্র?
আয়রা জারিফের দিকে তাকাল।
— ও কে?
জারিফ কোনো উত্তর দিল না।
তরুণীটি এবার আয়রার দিকে তাকাল।
— তুমি নিশ্চয়ই আয়রা?
আয়রা মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন কীভাবে?
তরুণীটি বইটা বুকের কাছে ধরে বলল,
— তোমার জন্মের রাত থেকে তোমার অপেক্ষায় আছি।
নানু আমিনা আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন।
— নায়রা! তুমি এখানে কেন?
নায়রা মৃদু হাসল।
— কারণ দ্বিতীয় দরজার উত্তর আমার কাছে আছে।
জারিফ কঠিন গলায় বলল,
— তুমি এখানে আসতে পারো না।
নায়রা তার দিকে তাকাল।
— কেন? এখনো কি আমাকে বিশ্বাস করো না?
— বিশ্বাসের কথা তুলো না।
আয়রা দুজনের দিকে তাকিয়ে বুঝল, তাদের মধ্যে পুরোনো কোনো ঘটনা আছে।
সে হাত তুলে বলল,
— দাঁড়ান! আগে পরিচয় দিন। তারপর ঝগড়া করবেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
নায়রা হেসে বলল,
— আমি নায়রা। এই বাড়ির শেষ রাজপরিবারের একজন সদস্য।
আয়রা অবাক হয়ে বলল,
— আরেকজন রাজপরিবারের সদস্য! এই বাড়িতে কি সাধারণ মানুষ ছিল না?
নায়রা বইটা এগিয়ে দিল।
— এই বইয়ের মধ্যে তোমার জন্মের রাতের কিছু কথা লেখা আছে। তবে পুরো সত্য নয়।
আয়রা বইটা নিতে হাত বাড়াল।
কিন্তু বইয়ের মলাট স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে লকেটের নীল পাথর জ্বলে উঠল।
বইয়ের পাতা নিজে থেকেই খুলে গেল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যে শিশুকে বাঁচাতে সাত দরজার অভিশাপ তৈরি হয়েছিল, সে একদিন নিজের হাতে অভিশাপের শেষ চাবি খুলবে।”
তার নিচে একটি নাম।
আয়রা রহমান।
আয়রা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
— আমার নাম এখানে কে লিখেছে?
নায়রা উত্তর দিল না।
বরং বইয়ের পরের পাতায় আঙুল রাখল।
সেখানে লেখা ছিল—
“দ্বিতীয় দরজার উত্তর পেতে হলে জানতে হবে, আয়রার জন্মের রাতে হারিয়ে যাওয়া শিশুটি কোথায় গিয়েছিল।”
আয়রা অবাক হয়ে বলল,
— হারিয়ে যাওয়া শিশু? কে সেই শিশু?
নায়রা বই বন্ধ করে ফেলল।
— সেই উত্তর জানার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
— কী সিদ্ধান্ত?
নায়রা জারিফের দিকে তাকাল।
— তুমি কি জারিফকে বিশ্বাস করবে, নাকি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে?
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
জারিফ আয়রার দিকে তাকিয়ে রইল।
আয়রা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমি কাউকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না। আগে সত্য জানব, তারপর সিদ্ধান্ত নেব।
নায়রা মৃদু হাসল।
— তাহলে তোমার পরীক্ষা শুরু হলো।
হঠাৎ বইয়ের শেষ পাতায় নিজে থেকেই কয়েকটি শব্দ ফুটে উঠল।
“যে হারিয়ে গেছে, সে ফিরে এসেছে। কিন্তু সে নিজের পরিচয় ভুলে গেছে।”
এরপর পাতার নিচে একটি ছোট্ট ছবি দেখা গেল।
ছবিতে একটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে। শিশুটির গলায় রুপালি লকেট।
আয়রা ছবিটার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল।
কারণ ছবির শিশুটির মুখ তার ছোটবেলার ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
সে ফিসফিস করে বলল,
— এটা… আমি?
নায়রা মাথা নাড়ল।
— না, আয়রা। এই শিশুটি তোমার হারিয়ে যাওয়া ভাই।
ঠিক তখনই ওপরতলার বন্ধ ঘর থেকে একটি শিশুর কণ্ঠ ভেসে এল—
— আপু… আমি এখানে!
দ্বিতীয় দরজার রহস্য — পর্ব ২: বন্ধ ঘরের ওপাশে! 🌙
“আপু… আমি এখানে!”
শিশুটির কণ্ঠ শোনামাত্র আয়রার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
কণ্ঠটা অচেনা, অথচ আশ্চর্যভাবে পরিচিত। যেন বহু বছর আগে কোনো এক রাতে এই ডাক শুনেছিল সে। কিন্তু স্মৃতির দরজায় হাত রাখতেই মাথার ভেতর অসহ্য এক শূন্যতা অনুভব করল।
— আরিয়ান! তুমি কি সত্যিই আমার ভাই?
আয়রা সিঁড়ির দিকে ছুটতে গেল।
কিন্তু জারিফ তার হাতের সামনে এসে দাঁড়াল।
— এক পা-ও এগোবে না!
আয়রা রেগে আগুন হয়ে গেল।
— কী সমস্যা তোমার? আমার ভাই ওপরে আটকে আছে, আর তুমি আমাকে যেতে দিচ্ছ না!
— কারণ যে কণ্ঠ তোমাকে ডাকছে, সে তোমার ভাইও হতে পারে, আবার এই বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর ফাঁদও হতে পারে।
— তোমার কাছে সবকিছুই ফাঁদ! একদিন দেখব, তুমি নিজেও একটা ফাঁদ!
রাফি পেছন থেকে মাথা বের করে বলল,
— আপু, ফাঁদ হলে কিন্তু আগে পরীক্ষা করে নিস। পড়ে গেলে আমাকেও উদ্ধার করতে হবে!
মেহের তার কানের কাছে ফিসফিস করল,
— চুপ কর! এমন সময়েও তোর হাসির কথা মনে পড়ে?
— ভয় পেলে আমার মস্তিষ্ক হাসির রাস্তা দিয়ে পালায়!
ঝুমুর হেসে উঠল।
— ছেলেটাকে আমার ভালো লাগে। ভূতের বাড়িতে এসে ভূতদেরই মানসিক শান্তি নষ্ট করছে!
বাবলু লণ্ঠনটা উঁচু করে বলল,
— যথেষ্ট হয়েছে! এই বাড়িতে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ কোথাও যেতে পারবে না!
আয়রা তার দিকে তাকাল।
— আপনি তো নিজেই ভূত। আপনাকে আবার কে অনুমতি দিয়েছে?
বাবলু মুখ খুলে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।
— এই মেয়ের সঙ্গে তর্ক করা মানে নিজের চাকরি নিজে খাওয়া!
কিন্তু তাদের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ওপরের ঘর থেকে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল।
— আপু… তাড়াতাড়ি এসো। ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে!
এবার আয়রা স্পষ্ট শুনতে পেল, শিশুটি কাঁদছে।
তার চোখ ভিজে উঠল।
— আমি আসছি, ভাই। তুমি ভয় পেয়ো না!
নায়রা তাড়াতাড়ি বইটা খুলে একটি পাতা খুঁজতে লাগল।
— না! এখনই ওপরে যাওয়া যাবে না।
আয়রা তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
— আপনিও কি আমাকে থামাবেন? সবাই কি মিলে ঠিক করেছেন, আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন?
নায়রা শান্ত গলায় বলল,
— তোমাকে থামানোর জন্য নয়, তোমাকে বাঁচানোর জন্য বলছি। ওই ঘরের দরজায় এমন একটি তালা আছে, যা বাইরের চাবিতে খোলে না। সেটি খুলতে হলে তোমার লকেটের আলো আর একটি সত্যিকারের স্মৃতি দরকার।
— স্মৃতি আবার চাবি হয় কীভাবে?
— এই বাড়িতে কিছু তালা লোহা দিয়ে তৈরি হয়নি, আয়রা। কিছু তালা তৈরি হয়েছে মানুষের ভুলে যাওয়া স্মৃতি দিয়ে।
আয়রা নিজের লকেটটা মুঠোর মধ্যে ধরল।
— তাহলে বলুন, কী করতে হবে?
নায়রা উত্তর দেওয়ার আগেই জারিফ বলল,
— প্রথমে জানতে হবে, আরিয়ানকে কে আটকে রেখেছে।
নায়রা তার দিকে তাকাল।
— তুমি জানো না?
— জানলে তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম না।
— মিথ্যা বলার অভ্যাসটা তোমার এখনো যায়নি, রাজপুত্র।
জারিফের নীল চোখ দুটো কঠিন হয়ে উঠল।
— আমার অতীত নিয়ে কথা বলার অধিকার তুমি হারিয়েছ, নায়রা।
— আর তুমি কি নিজের অতীত মনে রেখেছ?
প্রশ্নটা শুনে জারিফ নীরব হয়ে গেল।
আয়রা দুজনের মাঝখানে দাঁড়াল।
— থামুন! আপনাদের পুরোনো প্রেমের ঝগড়া পরে হবে। এখন আমার ভাইকে উদ্ধার করতে হবে!
নায়রা অবাক হয়ে বলল,
— প্রেমের ঝগড়া?
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আপু, তুই তো একেবারে গোয়েন্দা! দুজনের চোখাচোখি দেখেই বুঝে গেছিস!
জারিফ গম্ভীর গলায় বলল,
— তোমাদের পরিবারের সবাই কি এমন?
মেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— দুর্ভাগ্যবশত, হ্যাঁ।
হঠাৎ ওপরতলার করিডরে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঢং!
তারপর দ্বিতীয়বার।
ঢং!
তৃতীয়বার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে নায়রার বইয়ের পাতায় কালো অক্ষর ফুটে উঠল।
“যে শিশুকে লুকানো হয়েছে, সে রক্তের উত্তরাধিকারী। যে রাজপুত্রকে মৃত বলা হয়েছে, সে নিজের মৃত্যুর সাক্ষী।”
আয়রা লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
— জারিফ, এর মানে কী?
জারিফ মুখ ফিরিয়ে নিল।
— আমি জানি না।
নায়রা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
— তুমি আবার মিথ্যা বলছ!
— চুপ করো!
জারিফের কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে রাফিও এবার চুপ হয়ে গেল।
ঠিক তখন নানু আমিনা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখ ফ্যাকাশে, চোখে বহু বছরের জমে থাকা ভয়।
— আর লুকিয়ে লাভ নেই। আজ সবকিছু বলতে হবে।
আয়রা নানুর হাত ধরল।
— কী বলতে হবে, নানু?
আমিনা খাতুন কাঁপা গলায় বললেন,
— তোমার ভাই হারিয়ে যায়নি, মা। জন্মের রাতেই তাকে এই বাড়ির উত্তরাধিকার থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তোমার মা তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু…
— কিন্তু কী?
— কিন্তু তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে রাখা নিরাপদ ছিল না। তোমাকে আমার কোলে দেওয়া হয়েছিল। আরিয়ানকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল উত্তর দিকের ঘরে।
আয়রার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
— তুমি এত বছর আমাকে কিছু বলোনি কেন?
— কারণ তোমার মা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, সত্য জানার সময় না আসা পর্যন্ত তোমাকে কিছু বলব না।
— আর এখন সময় এসেছে?
আমিনা মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। সাত দরজার প্রথম অভিশাপ জেগে উঠেছে। দ্বিতীয় দরজা তোমার ভাইয়ের পথ দেখিয়েছে। আর তৃতীয় দরজা খুললেই তোমার জন্মের রাতের আসল ঘটনা প্রকাশ পাবে।
হঠাৎ জারিফ ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
— তাহলে আর দেরি করা যাবে না।
আয়রা তার পিছু নিল।
— দাঁড়াও! এবার আমাকে আটকাবে না তো?
জারিফ তার দিকে তাকাল।
— তুমি যদি আমার সঙ্গে যাও, তবে একটা কথা মনে রাখবে। ওপরে যা-ই দেখো, নিজের চোখকে পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।
আয়রা চোখ মুছে বলল,
— আর তুমি যা-ই বলো, তোমাকেও অন্ধভাবে বিশ্বাস করব না।
জারিফের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
— সেটাই ভালো।
সবাই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। প্রতিটি ধাপে কাঠের মেঝে কেঁপে উঠছিল। দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরোনো ছবিগুলোর চোখ যেন তাদের অনুসরণ করছিল।
একটি ছবির সামনে এসে আয়রা থেমে গেল।
ছবিতে এক রাজা, এক রানি এবং দুটি শিশু।
একটি শিশুর গলায় রুপালি লকেট।
অন্য শিশুটির চোখ নীল।
আয়রা ছবির নিচে লেখা নাম পড়ল।
“রাজা রায়ান ইবনে ভলকভ, রানি সায়রা এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীরা।”
তার বুক ধক করে উঠল।
— নায়রা, এখানে আমার ভাইয়ের ছবি কেন?
নায়রা ছবিটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল,
— কারণ এই ছবির ছোট ছেলেটিই আরিয়ান নয়…
সবাই থমকে গেল।
আয়রা অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
— কী বললেন?
নায়রা ছবির নীল চোখের শিশুটিকে দেখিয়ে বলল,
— এই শিশুটির নাম ছিল জারিফ। আর তোমার ভাইয়ের পরিচয় এর চেয়েও বড় একটি রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে দরজায় তিনবার আঘাত পড়ল।
ঠক! ঠক! ঠক!
তারপর শিশুটির কণ্ঠ শোনা গেল।
— আপু, দরজা খোলো না! বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে জারিফ নয়!
আয়রা ধীরে ধীরে পেছনে ফিরল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জারিফের নীল চোখ দুটো তখন সম্পূর্ণ কালো।
আর তার পায়ের কাছে…
কোনো ছায়া নেই।
চলবে… 🌙👻
