পর্ব ০১,
আজ শিল্প প্রদর্শনীর দিন। এজন্য শখ আর ইরা দুইজনই সকাল সকাল বাংলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ইরার ইচ্ছা না থাকলেও শখের জোড়া-জুড়িতে যেতেই হয় তাকে। সেই ছোট্টো বেলা থেকে তারা একসাথে বড় হচ্ছে। একই পাড়ায় বাড়ি তাদের। বাবাদের বন্ধুত্বের খাতিরে ছোটো বেলা থেকেই দুজনের একইসাথে ওঠা-বসা। একই সাথে স্কুল, কলেজ আর এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ইরা পরে ইংরেজি লিটারেচারে। দুইজনের মধ্যে এমন সম্পর্ক যা তাদের বাবারাও এত বছরে গড়ে তুলতে পারেনি। দুটিতে বেশ মিল। একজনকে মারলে আরেক জন কাঁদত।
শখ যেমন অস্থির প্রকৃতির ইরা তেমনি চুপচাপ। দুইজনই পয়সার এপিঠ ওপিঠ। শখের নামের মতই তার জীবনেও শখের কমতি নেই। ঠিক তেমনি একটা শখ হলো ছবি আঁকানো। ছোটো থেকেই ছবি আকাতে ভীষণ ভালোবাসে। শখ বড্ড ছেলেমানুষ। এত বড় হয়ে গেছে তবুও ভিতরের বাচ্চামি এখনো যায় নি। আর ইরা ঠিক তেমনি বুঝদার মেয়ে। সব সময় শখকে আগলে রাখে৷ শখও তেমন কোনো ঝামেলায় পড়লেই আগে ইরার কাছে যায়। ইরাকে সে মাঝে মাঝে হারমাইওনি বলে ডাকে। ইরার জীবনে শখ বলতে সে বই পড়তে খুব ভালোবাসে। নতুন বিষয়ে জানার আগ্রহ তার অনেক। শখ ভাবে ইরার কাছে সব সমস্যার সমাধান আছে। এজন্যই তো অসুস্থ হলে ইরাকে সে ডাক্তার, পড়া না বুঝলে শিক্ষক, কিছু খেতে ইচ্ছা করলে রাধুনির ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। মাঝে মাঝেই নিত্যনতুন নামে তাকে ডাকে শখ। এতে ওর ভালই লাগে। দুজনই দুজনকে রাগাতে অনেক ভালবাসে। আনন্দ পাই অনেক।
তারা দুইজনেই রিকশায় করে যাচ্ছে। বেশ গল্প করতে করতে যাচ্ছিল। এমন সময় হুট করে বৃষ্টি শুরু হলো। এমন ভাবে শুরু হলো যে তারা প্রায় ভিজেই গেলো। তারা রিকশা মামাকে বলল রিকশা এক জায়গায় দাঁড় করাতে। তারপর রিকশা থেকে নেমে পড়ল দুইজন। ভাড়া মিটিয়ে রাস্তার একটা চায়ের দোকানে ছাউনির নিচে গিয়ে দাঁড়াল তারা দুইজন। ভেজা শরীর থেকে হাত দিয়ে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে শখ ইরাকে বললো,
— আব্বু ঠিকই বলেছিল রে ইরা। বাসার গাড়ির করে আসলেই ভালো হতো তাহলে এভাবে ভিজতাম না।
তারপর ইরা বললো,
— তাহলে আসলি না কেনো? এখন কীভাবে যাবি প্রদর্শনী দেখতে? জানিসই তো যে এখন হুটহাট বৃষ্টি শুরু হয়।
শখ বললো,
— আরেহ্, আমার খেয়ালই ছিলো না এসবের। আর গাড়িতে সব জায়গায় যাওয়া যায় নাকি? যায় না। তুই তো জানিস আমার সাধারণ জীবন কত্ত প্রিয়। আর বাকি থাকলো প্রদর্শনী দেখা? ও তুই ভাবিস না দোস্ত। তুফান হলেও আমি তো যাবোই। আর এ তো সামান্য বৃষ্টি।
তারপর ইরা বললো,
— হ্যাঁ, বুঝছি। এখন থাম। চল এক কাপ চা খাই। খাবি?
শখ বললো,
— খাবি খাবি না করে খাওয়ালেই তো হয়। শুধু শুধু সময় নষ্ট। যা মামাকে বল দুই কাপ কড়া করে দুধ চা বানাতে। জানিসই তো আমি আবার দুধ চা ছাড়া খেতে পারি না।
ইরা একথা শুনে হেসে বললো,
— হুম জানি তো, আচ্ছা তুই দাড়া আমি অর্ডার দিয়ে আসছি।
শখ উত্তরে মাথা নেড়ে সায় দিলো আর বৃষ্টি দেখতে লাগলো।
ওদিকে বিলাস বহুল গাড়ির স্পিডমিটারের কাঁটা ২৮০ তে রেখে বজপাখির গতিতে আসছে শহরের নামকরা রিয়েল এস্টেট এন্ড কনস্ট্রাকশন বিজনেসের সব থেকে বড় কম্পানি অরেভান গ্রুপ এর একমাত্র সিইও আদ্রিয়ান রহমান। তার গাড়ির গতি তখনই বেশি হয় যখন তার মাথায় রাগ চড়ে থাকে। আর আজ রাগের কারণ হলো তার দাদি প্রায় তার বিয়ের কথা তোলে তেমনি আজকেও তাই। সকাল সকাল খাবার টেবিলে বসে আয়েশা বেগম তার একমাত্র আদরের বড় নাতির জন্য বিয়ের কথা তোলেন। অতীতে আদ্রিয়ানেরই এক ক্লাসমেটের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। সেই মেয়ে সম্পর্কের ৮ মাসের মাথায় গিয়ে আদ্রিয়ানকে ঠকিয়ে অন্য এক ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ায় আর পুরো ক্যাম্পাসের সামনে আদ্রিয়ানকে অপমান করে। ঠিক সেদিনের পর থেকে বিয়ে-সাদি, প্রেম ভালোবাসার উপর থেকে তার মন একেবারে উঠে যায়। যার কারণে তার দাদির এই হঠাৎ হঠাৎ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা সে একেবারেই পছন্দ করে না। কিন্তু তার দাদি তো নাতি বউয়ের মুখ না দেখে মরবে না। তাই নিজেরই ছোটো বেলার সইয়ের নাতনির সাথে তার নাতির বিয়ের কথা চালাচ্ছেন। এসব শুনে আদ্রিয়ান রীতিমতো বাধ্য হয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠতে উঠতে বললো,
— দেখো দাদু যদি চাও তাহলে তোমার রহমান সাহেবের সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরে তোমার জন্য একটা সতিন, বাবা-চাচা-ফুপির জন্য নতুন মা আর ভাই-বোনদের জন্য নতুন দাদি নিয়ে আসতে পারো। তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এখন আমি আমার বিয়ে নিয়ে ভাবছি না। আসছি আমি। আমার অফিসে মিটিং আছে।
এই বলেই সে চলে গেল। আর আয়েশা বেগম বললেন,
— দেখেছো তোমরা? আদ্রি কি বলে গেলো। ও পেয়েছে কি জীবনের? একটা মেয়ের জন্য এভাবে জীবন নষ্ট করে কেও?
কিন্তু দাদিকে কে বোঝাবে যে আদ্রিয়ান ওই মেয়ের জন্য না বরং সেদিনের সেই অপমানের জন্য এভাবে রেগে যায়। বিয়ের কথা বা কোনো মেয়ের কথা শুনলেই তার সেদিনের কথা মনে পড়ে জমিয়ে রাখা রাগ বেরিয়ে আসে।
ইরা আর শখ চায়ে চুমুক দিতে দিতে বৃষ্টি উপভোগ করছে। ঠিক তখনই আদ্রিয়ানের গাড়ির অতিরিক্ত গতি থাকার কারণে রাস্তার কাদা ছিটলে লাগলো শখের গায়ে। আদ্রিয়ান বুঝতে পেরে তৎক্ষনাৎ গাড়ি থামালো। মেয়েদের উপর রাগ থাকলেও সম্মান সে ঠিকই করে। আচমকা গায়ে কাদা লাগায় শখ আর ইরাও হকচকিয়ে গেলো। শখের সাদা রঙের জামা একদম কাদায় ভরে গেছে। শখ দ্রুত গাড়ির দিকে গেলো। আদি ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে।
গাড়ি থেকে নামার পড়ে আদ্রিয়ান যেই সরি বলতে যাবে তখনই শখ তার দিকে তেড়ে যায়। আর বলে,
— এই যে মি. টেসলা সাহেব আপনি কি রাস্তাটাকে আকাশ পেয়েছেন? যে আপনার টেসলা নিয়ে উড়তে উড়তে যাচ্ছেন। আশে পাশে যে মানুষ থাকতে পারে এটার ধারণা হয় নি আপনার? আর এত স্পিডে কেউ গাড়ী চালাই? আপনি জানেন না? এত স্পিডে গাড়ী চালানো আইন বহির্ভূত কাজ। কি রে ইরা, আমি ঠিক বলেছি না বল?
শখ পিছনে ইরার দিকে ঘুরে কথাটা বলেই আবার পুনরায় আদ্রিয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। ইরা নিজেও বুঝতে পারছে না যে সে কি বলবে তাই সেও মাথা নাড়িয়ে বললো যে,
— হ্যাঁ, আইনের বাইরে।
তারপর আদ্রিয়ান এসব শুনে ঠান্ডা গলায় বললো,
— সরি।
তারপর শখ বললো,
— সরি? শুধু সরি? আপনি এত বড় আকাম করলেন আমার সাথে এর জন্য শুধু সরি? এর অহংকার তো কম না।
শেষ কথাটুকু ইরা বেশ ঠেস মেরেই বললো।
তারপর আদ্রিয়ান বললো,
— আপনি এমন ভাবে বলছেন যেনো কাজটা আমি ইচ্ছে করে করেছি। সরি তো বললাম তাতেও এভাবে রিয়েক্ট করার কি আছে? মানুষ এমনি এমনি তো আর বেশি স্পিডে গাড়ী চালায় না। I had to drive fast as I had something very important to handle.
শখ আরও রেগে যাচ্ছে দেখে ইরা শখকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। শখ তারপরেও বলে যে,
— এইবারের মতো ছেড়ে দিলাম। নেক্স টাইম আমার সামনে আসলে একদম উচিত শিক্ষা দিয়ে দিবো।
এটা শুনে আদ্রিয়ান মনে মনে বলে,
— সকাল সকাল এসব পাগলের সাথে আজই দেখা হলো। এমনিতেই মেজাজ বিগ্রে আছে তার উপর চাশমিস পাগল...
বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদ্রিয়ান গাড়ী চালাতে শুরু করলো। তবে এবার গাড়ীর স্পিড স্বাভাবিক রাখলো।
তারপর...............
গল্পের পরবর্তী অংশ ২য় পর্বে
