৩০৭ নম্বর কক্ষ
একটি রহস্যময় উপন্যাস
লেখক: Unique Writer
দ্বিতীয় অধ্যায় :
কিন্তু সতেরো বছর আগে তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর।
আরিয়ান চিঠিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ঘরের ভেতর পুরোনো টেলিফোনের পাশে জমে থাকা ধুলো আর আয়নায় লেখা সেই বাক্য—সবকিছু যেন তাকে ঘিরে ধরেছে।
“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ, আরিয়ান।”
হঠাৎ পেছন থেকে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম!
আরিয়ান ঘুরে দাঁড়াল। দরজার বাইরে থেকে তালা লাগানোর শব্দ পাওয়া গেল।
“কে ওখানে?” সে চিৎকার করল।
কোনো উত্তর এল না।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কালো টেলিফোনটা বেজে উঠল।
ট্রিং... ট্রিং...
আরিয়ান ধীরে ধীরে রিসিভার তুলল।
ওপাশ থেকে ভেসে এল কাঁপা কণ্ঠস্বর।
“আরিয়ান... তুমি কি এসেছ?”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কে আপনি?”
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সেই কণ্ঠ বলল, “আমার গলার স্বর কি তুমি ভুলে গেছ?”
আরিয়ান রিসিভারটা শক্ত করে ধরল।
“বাবা?”
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এল।
“আমার হাতে সময় খুব কম। মন দিয়ে শোনো। ঘরের উত্তর দিকের দেয়ালে একটা কাঠের আলমারি আছে। ওটার পেছনে একটা দরজা। দরজাটা খুঁজে বের করো।”
“আপনি কোথায়? আপনি কি সত্যিই বেঁচে আছেন?”
“হ্যাঁ, বাবা। কিন্তু এখন আমাকে খুঁজতে এসো না। আগে সত্যিটা জানো। আর মনে রেখো, তোমার সামনে যে মানুষটাকে নিরীহ মনে হচ্ছে, সে-ই হয়তো সবকিছুর জন্য দায়ী।”
লাইনটা কেটে গেল।
আরিয়ান কয়েকবার “বাবা! বাবা!” বলে ডাকল। কিন্তু টেলিফোনের ওপাশে তখন শুধু একটানা শোঁ শোঁ শব্দ।
সে দ্রুত আলমারিটার কাছে গেল। অনেক চেষ্টা করে সেটি একটু সরাতেই পেছনে একটা ছোট লোহার দরজা দেখা গেল। দরজার গায়ে মরচে ধরা তালা।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে একটা চাবি পেল। চাবিটা তালায় ঢোকাতেই দরজা খুলে গেল।
ভেতরে সরু অন্ধকার পথ।
আরিয়ান মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে এগিয়ে গেল।
কয়েক পা যেতেই তার চোখে পড়ল দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো কিছু ছবি, কয়েকটি নথি আর একটি ছোট কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর লেখা—
“আরিয়ান রহমান—ব্যক্তিগত নথি।”
সে বাক্স খুলল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো ডায়েরি, কয়েকটি চিঠি এবং একটি ছবি। ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন হোটেলের মালিকের পাশে। ছবির পেছনে লেখা, “সত্য লুকিয়ে রাখা যায়, মুছে ফেলা যায় না।”
আরিয়ান ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় তার বাবার হাতের লেখা—
“যদি কোনো দিন আরিয়ান এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে সে যেন জানে—তার বাবা স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায়নি।”
পরের পাতাগুলো পড়তে পড়তে আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।
সতেরো বছর আগে তার বাবা, মাহমুদ রহমান, এই হোটেলের হিসাবরক্ষক ছিলেন। হোটেলের তৎকালীন মালিকের অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই প্রমাণ প্রকাশ করার আগের রাতে তাঁকে হোটেলের ৩০৭ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠানো হয়।
সেই রাতেই তিনি নিখোঁজ হন।
হোটেলের সবাইকে বলা হয়েছিল, তিনি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু ডায়েরিতে লেখা ছিল, তাঁকে হোটেলের নিচের গোপন কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। কারণ, তিনি এমন কিছু নথি লুকিয়ে রেখেছিলেন, যা প্রকাশ পেলে হোটেলের মালিকের অপরাধ প্রমাণিত হতো।
আরিয়ান আরও একটি চিঠি বের করল। চিঠির তারিখ সতেরো বছর আগের। নিচে লেখা ছিল তার নিজের নাম—“আরিয়ান রহমান”।
কিন্তু লেখাটা তার নিজের ছিল না।
চিঠির পাশে পেন্সিলে লেখা একটি ছোট্ট নোট তার চোখে পড়ল—
“শিশুটির নাম ব্যবহার করো। কেউ সন্দেহ করবে না।”
তার মাথায় যেন বজ্রপাত হলো।
এই চিঠি সে লেখেনি। কেউ তার নাম ব্যবহার করে চিঠিটি তৈরি করেছিল, যাতে ভবিষ্যতে তাকে এই হোটেলে ফিরিয়ে আনা যায়। আর আয়নায় লেখা কথাগুলোও কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়—কেউ আগে থেকেই তার আগমনের অপেক্ষায় ছিল।
হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আরিয়ান ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকার পথের মুখে সেই বৃদ্ধ কর্মচারী দাঁড়িয়ে আছেন।
“আপনি!” আরিয়ান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল। “আপনি সব জানতেন, তাই না?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নত করলেন।
“হ্যাঁ, স্যার। আমি সব জানতাম।”
“তাহলে এত বছর চুপ ছিলেন কেন? আমার বাবাকে কোথায় রেখেছেন?”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
“আমি আপনার বাবাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমি খুব দুর্বল ছিলাম। হোটেলের মালিকের লোকজন আমাকে ভয় দেখিয়েছিল। আমি মুখ খুললে আপনার বাবাকে মেরে ফেলা হবে—এমন হুমকি দিয়েছিল।”
“তাহলে আজ আমাকে এখানে আসতে দিলেন কেন?”
বৃদ্ধ পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করলেন।
“কারণ আজ আর সেই মানুষটা নেই। পুরোনো মালিক মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর অপরাধের প্রমাণ এখনও এই হোটেলের দেয়ালের মধ্যে লুকানো আছে। আর আপনার বাবা... তিনি এখনও এখানেই আছেন।”
বৃদ্ধ দেয়ালের অন্য পাশে থাকা একটা লোহার দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। চাবি দিয়ে তালা খুলতেই ভেতর থেকে ক্ষীণ কাশির শব্দ এল।
আরিয়ান দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।
ছোট্ট একটা ঘর। একটা বিছানা, পাশে ওষুধের বোতল আর জানালাহীন দেয়াল। বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির চুল প্রায় সাদা, মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। তবু সেই চোখ দুটো আরিয়ানের পরিচিত।
“বাবা!”
মানুষটি ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।
কয়েক সেকেন্ড ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তাঁর ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“আরিয়ান... আমার ছেলে!”
আরিয়ান বাবার পাশে বসে তাঁর হাত ধরে ফেলল। এত বছর ধরে জমে থাকা প্রশ্নগুলো একসঙ্গে বেরিয়ে এল।
“আপনি কোথায় ছিলেন? সবাই বলেছে আপনি পালিয়ে গেছেন। আমাকে একবারও খুঁজলেন না কেন?”
মাহমুদ রহমানের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“আমি পালাইনি, বাবা। আমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। প্রথম কয়েক বছর পালানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা আমাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ভয় দেখাত, আর তোমার ক্ষতি করার হুমকি দিত। পরে অসুস্থ হয়ে পড়ি। এই বৃদ্ধ মানুষটা গোপনে আমাকে খাবার আর ওষুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
আরিয়ান বৃদ্ধের দিকে তাকাল। বৃদ্ধ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
“কিন্তু আমাকে এখানে ডাকা হলো কেন?” আরিয়ান জিজ্ঞেস করল।
তার বাবা বালিশের নিচ থেকে একটা ছোট ধাতব বাক্স বের করলেন।
“কারণ আমি জানতাম, একদিন সত্যিটা প্রকাশ করার সময় আসবে। তোমাকে যে চিঠি পাঠানো হয়েছে, সেটা আমি লিখেছি। কিন্তু তোমার নামের নিচের স্বাক্ষরটা আমার করা নয়। ওটা করেছিল হোটেলের পুরোনো মালিকের লোকেরা, যেন তোমাকে বিভ্রান্ত করা যায়। তারা চেয়েছিল তুমি এখানে এসে ভয় পেয়ে ফিরে যাও। আমি চিঠির ভেতরে এমন কিছু সংকেত রেখেছিলাম, যা শুধু এই ডায়েরি আর নথিগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে পারবে।”
“তাহলে ওই নারীর চিৎকার?”
বৃদ্ধ এবার উত্তর দিলেন।
“ওটা ছিল রেকর্ড করা শব্দ। পুরোনো মালিক ভয় ছড়াতে চাইতেন, যাতে কেউ তৃতীয় তলার ওই ঘরে না আসে। কিন্তু আজ রাতে কেউ রেকর্ডটা চালু করেছে, যাতে আপনি ছুটে গিয়ে ৩০৭ নম্বর কক্ষে ঢোকেন। আসল নথিগুলোর পথ দেখানোর জন্য আপনার বাবা ওই ঘরে চিঠিটা রেখেছিলেন।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আর ছবিটা? সেখানে আমার ছোটবেলার মতো একটা ছেলেকে দেখলাম।”
মাহমুদ রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ছবিটা সত্যি, কিন্তু তারিখের ফলকটি পরে বদলে দেওয়া হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে আমি তোমাকে একবার হোটেলে নিয়ে এসেছিলাম। তুমি তখন ছোট ছিলে। পুরোনো মালিক ছবিটা রেখে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন, একদিন তোমাকে ব্যবহার করে নিজের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে চাইবেন। কিন্তু তিনি তা করতে পারেননি।”
আরিয়ান বাবার হাতে থাকা ধাতব বাক্সটা খুলল। ভেতরে ছিল হিসাবের খাতা, স্বাক্ষর করা দলিল এবং কয়েকটি পুরোনো রেকর্ডিং। সবকিছুই হোটেলের মালিকের অপরাধের প্রমাণ।
“এগুলো এত বছর লুকিয়ে রেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ। আমি জানতাম, সত্যি একদিন তোমার হাতে পৌঁছাবে।”
ঠিক তখনই দূরে সাইরেনের শব্দ শোনা গেল।
আরিয়ান অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।
“পুলিশ?”
বৃদ্ধ বললেন, “আমি আগেই খবর দিয়েছিলাম। এত বছর ভয় পেয়েছি, কিন্তু আর চুপ থাকতে চাইনি।”
কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ হোটেলে পৌঁছাল। তারা গোপন কক্ষ থেকে মাহমুদ রহমানকে উদ্ধার করল এবং নথিগুলো জব্দ করল। তদন্তে পুরোনো মালিকের অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেল। যারা এত বছর ধরে সত্য লুকিয়ে রেখেছিল, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আরিয়ান বাবার হাত ধরে আছে। সতেরো বছরের অন্ধকার যেন ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে।
কিন্তু যাওয়ার আগে সে আরেকবার তৃতীয় তলায় উঠল।
৩০৭ নম্বর কক্ষের দরজা এখন খোলা। আয়নার ওপরের লাল লেখাটা মুছে ফেলা হয়েছে। কালো টেলিফোনটা নিঃশব্দে টেবিলের ওপর পড়ে আছে।
আরিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল দরজার ভেতরের দিকে খোদাই করা একটি বাক্যে—
“সত্যের দরজা একবার খুললে, তাকে আর বন্ধ করা যায় না।”
সে কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দরজাটা বন্ধ করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশের এক কোণে সূর্যের আলো ফুটছে।
সতেরো বছর ধরে যে রহস্য তাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে, তার উত্তর সে পেয়েছে। বাবা ফিরে এসেছেন, অপরাধের প্রমাণ প্রকাশ পেয়েছে, আর ৩০৭ নম্বর কক্ষের ভয়াবহ রহস্যের অবসান ঘটেছে।
তবু হোটেল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে আরিয়ান একবার পেছনে তাকাল।
রয়্যাল হেরিটেজের তৃতীয় তলার জানালায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই।
কোনো চিৎকার নেই। কোনো অদ্ভুত শব্দ নেই।
শুধু একটি পুরোনো হোটেল, যার দেয়ালের ভেতর চাপা পড়ে ছিল বহু বছরের সত্য।
আরিয়ান বাবাকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে শহরের দিকে এগিয়ে গেল।
৩০৭ নম্বর কক্ষের দরজা বন্ধ হলো।
আর এবার, সত্যিই শেষবারের মতো।
সমাপ্ত।
— Unique Writer
