৩০৭ নম্বর কক্ষ
একটি রহস্যময় উপন্যাস
লেখক: Unique Writer
যে ঘরে কেউ থাকে না
রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের ঘন কালো মেঘের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, পাহাড় আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা একটি পুরোনো হোটেলের সামনে এসে থামল একটি কালো গাড়ি।
হোটেলটির নাম— রয়্যাল হেরিটেজ।
একসময় এই হোটেলে শহরের ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ আর বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা ছিল। কিন্তু সতেরো বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর থেকে হোটেলটির সুনাম ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
স্থানীয় মানুষেরা বলে, হোটেলটির তৃতীয় তলায় ৩০৭ নম্বর একটি কক্ষ আছে, যেখানে রাত বারোটার পর কেউ প্রবেশ করে না।
কারণ, সেই কক্ষে প্রবেশ করা শেষ মানুষটিকে আর কখনো দেখা যায়নি।
গাড়ির দরজা খুলে নামল পঁচিশ বছর বয়সী আরিয়ান রহমান। হাতে একটি কালো ব্যাগ, চোখে ক্লান্তি, আর মুখে এমন এক অভিব্যক্তি—যেন সে কোনো জায়গায় বেড়াতে আসেনি, এসেছে বহুদিনের পুরোনো একটি হিসাব মেটাতে।
হোটেলের প্রধান দরজা খুলে একজন বৃদ্ধ কর্মচারী বেরিয়ে এলেন।
“আপনি কি রুম বুক করেছিলেন, স্যার?”
আরিয়ান পকেট থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল।
“আমার নামে একটা বুকিং থাকার কথা।”
বৃদ্ধ খামটির দিকে তাকাতেই তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
“এই চিঠি... আপনি কোথায় পেলেন?”
“ডাকযোগে পেয়েছি। কে পাঠিয়েছে, জানি না। শুধু এই ঠিকানাটা লেখা ছিল।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনার নাম কী?”
“আরিয়ান রহমান।”
নামটি শুনে বৃদ্ধের হাত কেঁপে উঠল।
“অসম্ভব!”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী অসম্ভব?”
বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি দ্রুত খামটি ফিরিয়ে দিয়ে হোটেলের ভেতরে চলে গেলেন।
আরিয়ান তাঁর পিছু নিল।
রিসেপশনের দেয়ালে একটি বড় ঘড়ি ঝুলছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। দেয়ালের এক পাশে পুরোনো অতিথিদের কয়েকটি সাদা-কালো ছবি। ছবিগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ থমকে গেল আরিয়ান।
একটি ছবির নিচে লেখা—
“১৯ বছর আগে, রয়্যাল হেরিটেজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।”
ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
ছেলেটি দেখতে অবিকল তার ছোটবেলার মতো।
কিন্তু ছবির তারিখ অনুযায়ী তখন তার বয়স হওয়ার কথা মাত্র ছয় বছর। আর ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির মুখ সে চিনতে পারল।
তার বাবা।
যে মানুষটি সতেরো বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
আরিয়ান ছবিটি দেয়াল থেকে নামিয়ে বৃদ্ধ কর্মচারীর সামনে ধরল।
“এই ছবিটা এখানে কীভাবে এল?”
বৃদ্ধ চোখ নামিয়ে বললেন, “স্যার, দয়া করে এসব নিয়ে প্রশ্ন করবেন না।”
“আমার বাবা এখানে এসেছিলেন?”
বৃদ্ধ নীরব।
“আমার বাবা কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা জানেন আপনি?”
এবার বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
“আপনি যদি নিজের ভালো চান, তাহলে আজ রাতেই এই হোটেল ছেড়ে চলে যান।”
“কেন?”
বৃদ্ধের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“কারণ আপনার বাবা নিখোঁজ হননি, স্যার।”
আরিয়ান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
“তাহলে?”
বৃদ্ধ কিছু বলার আগেই হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে একটি বিকট শব্দ ভেসে এল।
ধড়াম!
তারপরই শোনা গেল একজন নারীর চিৎকার।
আরিয়ান সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল।
“স্যার! দাঁড়ান!”
বৃদ্ধের চিৎকার উপেক্ষা করে সে তৃতীয় তলায় উঠে গেল। লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় একটি দরজা।
দরজার গায়ে পিতলের ফলক—
৩০৭।
দরজাটি সামান্য খোলা।
আরিয়ান ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে ভেতরে তাকাল।
ঘরটি সম্পূর্ণ অন্ধকার। জানালার পর্দা বাতাসে দুলছে। মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো কালো টেলিফোন। দেয়ালে ঝুলে থাকা আয়নাটির ওপর লাল কালিতে লেখা—
“তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ, আরিয়ান।”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
ঘরে সে একা নয়।
বিছানার পাশে রাখা কাঠের টেবিলে একটি চিঠি পড়ে আছে। চিঠির ওপর তার নাম লেখা।
কাঁপা হাতে চিঠিটি খুলল সে।
ভেতরে মাত্র তিনটি লাইন—
“তোমার বাবা বেঁচে আছেন।
তবে তাঁকে খুঁজে পাওয়ার আগে তোমাকে জানতে হবে, সতেরো বছর আগে ৩০৭ নম্বর কক্ষে ঠিক কী ঘটেছিল।
আর মনে রেখো—এই হোটেলে কাউকে বিশ্বাস করবে না।”
চিঠির নিচে একটি স্বাক্ষর।
আরিয়ান রহমান।
নিজের নাম দেখে সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ চিঠিটি লেখা হয়েছে আজ থেকে সতেরো বছর আগে।
আর স্বাক্ষরটি তার নিজের।
কিন্তু সতেরো বছর আগে তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর।
২ পর্ব...
— Unique Writer
