অধরা আসক্তি
লেখনীতে: Ohona hossan
পর্ব ১ — অচেনা সকাল
সকাল ৭টা ১২ মিনিট।
লন্ডনের আকাশে তখন সকালের নরম রোদ। জানালার সাদা পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বিশাল বেডরুমটায়। ঘরের একপাশে দেয়ালজুড়ে কাচের জানালা, অন্য পাশে সাজানো পোশাকের আলমারি, আর মাঝখানে রাখা কিং-সাইজের বিছানাটা যেন ঘরের বাকি সবকিছুর চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে আছে।
কিন্তু বিছানাটার ওপর যে মানুষটা শুয়ে আছে, তাকে দেখে প্রথম মুহূর্তে বোঝার উপায় নেই—সে আসলে মানুষ, নাকি কোনো সিনেমার দৃশ্য থেকে উঠে আসা অদ্ভুত সুন্দর এক চরিত্র!
উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে। একটা হাত মাথার ওপর ছড়ানো, অন্য হাতটা বালিশের নিচে গুঁজে রাখা। সাদা কমফোর্টার কোমর পর্যন্ত নেমে গেছে। মুখের অর্ধেকটা বালিশে ডুবে আছে বলে চেহারাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
তবে যেটা স্পষ্ট, সেটা হলো তার চুল।
গাঢ় সোনালি-বাদামি রঙের ঘন, লম্বা চুলগুলো বিছানার ওপর দিয়ে ছড়িয়ে মেঝে পর্যন্ত নেমে গেছে। কয়েক গোছা চুল বিছানার কিনারা পেরিয়ে মেঝে ছুঁয়ে আছে। সকালের আলোয় চুলের ওপর সোনালি আভা তৈরি হয়েছে। এলোমেলো চুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন ইচ্ছে করেই সাজিয়ে রেখেছে—অথচ বাস্তবে সেগুলোর মালিক গত রাত থেকে একবারও ঠিকমতো চুল আঁচড়ায়নি।
ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল।
ট্রিং! ট্রিং! ট্রিং!
কোনো সাড়া নেই।
আবার অ্যালার্ম।
এবারও না।
তৃতীয়বার অ্যালার্ম বাজতেই বিছানার ওপর পড়ে থাকা ফোনটা কেঁপে উঠল। পরের মুহূর্তে বালিশের নিচ থেকে একটা হাত বেরিয়ে এল। হাতটা আন্দাজে ফোন খুঁজতে লাগল।
একবার বিছানার চাদর।
দুবার বালিশ।
তিনবার পাশের কম্বল।
ফোন পাওয়া গেল না।
অ্যালার্ম আরও জোরে বাজছে।
অবশেষে বিরক্ত হয়ে মানুষটা মাথা তুলল।
“উফফফফ! কে মরছে সকাল সকাল!”
ঘুমজড়ানো কণ্ঠে কথাটা বলে সে এক চোখ খুলে চারপাশে তাকাল। ফোনটা চোখে পড়তেই হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। স্ক্রিনের দিকে তাকানোর পর তার মুখের অভিব্যক্তি এমন হলো, যেন ফোনটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে ফেলেছে।
সকাল ৭টা ১৫।
মেয়েটা ধীরে ধীরে উঠে বসল।
তার লম্বা সোনালি-বাদামি চুলগুলো পিঠ বেয়ে নেমে বিছানার ওপর ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক গোছা চুল মুখের সামনে এসে পড়েছে। সে বিরক্ত হাতে সেগুলো সরিয়ে দিল, তারপর অ্যালার্ম বন্ধ করে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মারল।
“ধুর! পাঁচ মিনিটও শান্তিতে ঘুমাতে দেয় না!”
কথাটা বলে সে আবার শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ফোনে আরেকটা নোটিফিকেশন এল।
মেয়েটা চোখ বন্ধ রেখেই ফোনটা হাতে নিল।
Mom calling…
দুই সেকেন্ড।
তিন সেকেন্ড।
চার সেকেন্ড।
সে কল রিসিভ করল।
“হুম?”
ওপাশ থেকে পরিচিত নারী কণ্ঠ ভেসে এল।
“মালিহা! এখনো ঘুমাচ্ছ?”
মালিহা চোখ না খুলেই উত্তর দিল, “না, মা। আমি বিছানার সঙ্গে মিটিং করছি।”
“কী?”
“কিছু না। বলো।”
“সাতটা পনেরো বাজে। নিচে আসো। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
“মা, সূর্য উঠেছে?”
“অবশ্যই উঠেছে!”
“তাহলে সূর্যকে বলো আমার হয়ে নাশতা করে নিতে।”
“মালিহা চৌধুরী!”
“জি, আম্মাজান?”
“পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে না এলে তোমার ঘরে উঠে আসব।”
মালিহা এবার এক চোখ খুলল।
তার মায়ের এই কথাটার অর্থ সে ভালো করেই জানে। জেসমিন চৌধুরী একবার ঘরে উঠে এলে শুধু ঘুমই ভাঙবে না, সঙ্গে গত এক সপ্তাহের সব অভিযোগও শুনতে হবে।
তাই মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আচ্ছা, আসছি।”
কল কেটে দিয়ে ফোনটা পাশে রাখল সে।
তারপর বিছানার ওপর পা গুটিয়ে বসে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ রইল।
ঘুমজড়ানো চোখ, এলোমেলো চুল, আর মুখজুড়ে এমন এক বিরক্তি—যেন পৃথিবীর সব সমস্যার শুরু হয়েছে এই সকালবেলা থেকে।
অথচ এই মেয়েটার নাম শুনলে লন্ডনের বেশ কিছু ব্যবসায়ীও সম্মান দিয়ে কথা বলে।
মালিহা চৌধুরী।
বয়স তেইশ।
চৌধুরী পরিবারের ছোট মেয়ে। CR Corporation-এর কো-সিইও। নিজের ক্যাফের মালিক। আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীনচেতা, আর নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভীষণ একগুঁয়ে।
কিন্তু এতসব পরিচয়ের বাইরেও তার আরেকটা পরিচয় আছে—
সে ভয়ংকর রকমের ঘুমকাতুরে।
আর সকালে কেউ তাকে বিরক্ত করলে তার রাগের সামনে বড় বড় ব্যবসায়ীর আত্মবিশ্বাসও টিকবে কি না, সন্দেহ আছে।
মালিহা অবশেষে বিছানা থেকে নামল।
মেঝেতে পা রাখতেই তার লম্বা চুলের কয়েক গোছা পায়ের কাছে এসে পড়ল। সে নিচু হয়ে চুলগুলো এক হাতে জড়ো করল, তারপর আয়নার দিকে তাকাল।
আয়নায় দেখা মেয়েটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল সে।
তারপর নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল,
“Girl, তোমার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে গতকাল রাতে কেউ তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করে গেছে।”
একটু থেমে নিজেই উত্তর দিল,
“আর জিতেছেও।”
নিজের কথায় নিজেই হেসে ফেলল মালিহা।
তারপর আলমারি খুলে একটা কালো ওভারসাইজড শার্ট বের করল। শার্টটা গায়ে চাপিয়ে চুলগুলো হাত দিয়ে সামলাতে সামলাতে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
আজ তার অনেক কাজ।
ক্যাফেতে যেতে হবে, অফিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, আর বিকেলে বাবার সঙ্গে একটা ব্যবসায়িক আলোচনায় বসতে হবে।
সবকিছুই স্বাভাবিক।
অন্তত আপাতত।
কারণ মালিহা তখনো জানে না—আজকের এই সাধারণ সকালটাই তার জীবনের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিনগুলোর একটার শুরু।
আর শহরের অন্য প্রান্তে, একটি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে, একজন মানুষ ইতিমধ্যে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।
।
একই সকাল — লন্ডনের একটি প্রাইভেট হাসপাতাল
সকাল ৭টা ১৫ মিনিট।
হাসপাতালের করিডোরে তখন ব্যস্ততা। সাদা আলোয় উজ্জ্বল অপারেশন থিয়েটারের বাইরে কয়েকজন চিকিৎসক অপেক্ষা করছেন। ভেতরে একজন রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন—মস্তিষ্কের জটিল সমস্যার কারণে জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।
অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে আয়ান রহমান।
পরনে গাঢ় নীল সার্জিক্যাল স্ক্রাবস, মাথায় অপারেশন ক্যাপ, মুখে মাস্ক। শুধু তার তীক্ষ্ণ কালো চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। চোখে কোনো অস্থিরতা নেই, নেই অপ্রয়োজনীয় তাড়াহুড়ো। মনোযোগ সম্পূর্ণ রোগীর দিকে।
তার সামনে মনিটরে রোগীর মস্তিষ্কের স্ক্যান দেখা যাচ্ছে।
“Latest scan আবার দেখাও,” শান্ত গলায় বলল আয়ান।
পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসক স্ক্যানটি বড় করে দেখালেন।
আয়ান কয়েক সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করে বলল, “Bleeding-এর জায়গাটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোব। প্রতিটি ধাপের আগে আমাকে আপডেট দেবে।”
“জি, ডক্টর রহমান।”
আয়ান হাত বাড়িয়ে দিল।
“Scalpel.”
যন্ত্রটি তার হাতে তুলে দেওয়া হলো।
পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা তার পৃথিবী সীমাবদ্ধ রইল অপারেশন টেবিল, মনিটরের সংকেত আর রোগীর জীবন বাঁচানোর দায়িত্বের মধ্যে। বাইরে কী ঘটছে, ফোনে কতগুলো কল আসছে, কিংবা পৃথিবীর অন্য কোথাও কী চলছে—কোনো কিছুই তার মনোযোগ সরাতে পারল না।
আয়ান রহমান নিজের কাজে দক্ষ। কিন্তু তার কাছে দক্ষতা কখনো অহংকারের বিষয় নয়; একজন রোগীর জীবন তার কাছে দায়িত্বের চেয়েও বেশি কিছু।
অবশেষে দীর্ঘ অস্ত্রোপচার শেষে সে বলল, “প্রাথমিক কাজ শেষ। রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখবে। পরবর্তী নির্দেশনা আমি দিয়ে যাচ্ছি।”
টিমের একজন চিকিৎসক স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
“Good work, Doctor.”
আয়ান শুধু মাথা নাড়ল।
“রোগী স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ভাববে না।”
অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে সে মাস্ক খুলল। কপালের কাছে প্ল্যাটিনাম-ব্লন্ড চুলের কয়েকটি গোছা ক্যাপের নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে। ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট, কিন্তু চোখে সেই একই স্থিরতা।
কেবিনে ফিরে ফোনটা হাতে নিতেই একের পর এক নোটিফিকেশন চোখে পড়ল।
বন্ধুদের কয়েকটি মেসেজ। পরিবারের কল। আর একটি অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজ।
UNKNOWN: Some people are about to enter your life, Doctor Rahman. Make sure you know who they really are.
আয়ানের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
সে মেসেজটির উত্তর দিল না। নম্বরটাও পরিচিত নয়।
ফোনটা টেবিলে রেখে কফির কাপ হাতে নিল সে।
ঠিক তখনই দরজায় নক হলো।
“Come in.”
একজন নার্স দরজা খুলে বললেন, “ডক্টর রহমান, আপনার পরবর্তী রোগীর ফাইল এসেছে। আর মেডিক্যাল ডিরেক্টর আপনাকে দুপুরের আগে দেখা করতে বলেছেন।”
“ফাইলটা রেখে যান। আমি দেখে নিচ্ছি।”
নার্স বেরিয়ে যাওয়ার পর আয়ান চেয়ারে হেলান দিল।
আজকের দিনটা ইতিমধ্যেই দীর্ঘ হয়ে গেছে। অথচ তার জানা ছিল না—এই দিনেই এমন একজন মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হতে চলেছে, যার উপস্থিতি একসময় তার সমস্ত হিসাব বদলে দেবে।
একজন মেয়ে।
যার নাম মালিহা চৌধুরী।
আর তাকে প্রথম দেখার পর আয়ান রহমানের জীবনে এমন এক অধ্যায় শুরু হবে, যেখানে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতাটুকুও একদিন তার কাছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
