উপন্যাস: অপূর্ণ গল্পের শেষ পৃষ্ঠা...
লেখিকা: জান্নাতুল মাওয়া
পর্ব ০১
আম্মু, তুমি আমার সাথে এমনটা করো না, প্লিজ। আমি পড়াশোনা করতে চাই। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। তোমরা আমাকে এইভাবে জোর করতে পারো না। আর আমি কেবল এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, আর এর মাঝেই তোমরা বিয়ে বিয়ে করছো। রেজাল্টটাও এখনো পাইনি। তোমরা যদি এইভাবে আমাকে জোর করো, তাহলে আমি পুলিশকে কল করতে বাধ্য হবো। আমার বয়স এখনো ১৮ হয়নি। তোমরা কী জানো না, বাল্যবিবাহ একটি অপরাধ? জেনে-বুঝে কেন তোমরা এমন করছো আমার সাথে? আমি এই বিয়ে করবো না, মানে করবো না। দেখি, তোমরা কী করো। আজ যদি আব্বু বেঁচে থাকতো, তাহলে হয়তো আমাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। কিন্তু ভালো করে শুনে রাখো, ওই ছেলেকে আমি বিয়ে করতে পারবো না। তার বয়স ২৫ আর আমার বয়স ১৭। আমার থেকে ৮ বছরের বড়। আমি এই বুড়া বেডাকে বিয়ে করতে পারবো না। আজ পর্যন্ত আমি তোমাদের অবাধ্য হইনি, কিন্তু আর না। এটা আমার জীবনের বিষয়। আমি চাই না, আমার থেকে ৮ বছরের বড় কোনো বুড়া বেডাকে বিয়ে করতে। তাই এইসব ফালতু চিন্তা বাদ দাও।
এক নিঃশ্বাসে কথা শেষ করে নিজের রুমে চলে গেলো তৃথা।
বাড়ির ছোট মেয়ে তৃথা তালুকদার।
তিন ভাইবোন তারা...
বড় ভাই ফাহিম তালুকদার, তার স্ত্রী মেঘলা।
মেজো বোন তৃষ্ণা তালুকদার আর ছোট বোন তৃথা তালুকদার।
প্রচণ্ড রাগী, জেদি, একটু চঞ্চলা আর দুষ্ট প্রকৃতির তৃথা। কিন্তু মনটা অনেক নরম। অল্পতেই কষ্ট পায়, আবার অল্পতেই অনেক খুশি হয়ে যায়।
রুবিহা খাতুন চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি ভালো করেই বুঝতে পারছেন, তৃথা এই বিয়েতে এত সহজে রাজি হবে না। রুবিহা খাতুন তার ছেলে আর বৌমার দিকে তাকালেন। মেঘলা হয়তো শাশুড়ির মনের কথা বুঝতে পারলো। মেঘলা রুবিহা খাতুনের পাশে বসে বলে...
আম্মু, এত টেনশন করছো কেন? তোমার শরীর খারাপ হবে তো!
রুবিহা খাতুন মুচকি হেসে বলেন—
কিছু হবে না, আম্মু। তোমরা একটু ওকে বোঝাও যে বিয়ের পর পড়াশোনা করা যায় আর বয়সটা কোনো বিষয় না। মানুষটা সঠিক নাকি ভুল, সেটা দেখা উচিত, বয়স না। আরিশ অনেক ভালো ছেলে। আমার বান্ধবীর ছেলে বলে বলছি না, সে ভালো, ভদ্র, দায়িত্ববান ছেলে। আমার মতে, এই যুগে এমন ছেলে অনেক কমই আছে। তাই আমি চাই, আমার মেয়েকে ওর সাথে বিয়ে দিতে। কিন্তু বোকা মেয়েটা কিছু বুঝতে চায় না। যাই হোক, তোমরা ওকে একটু বোঝাও।
ঠিক সেই মুহূর্তে রুবিহা খাতুনের ফোনে একটা কল এলো। তিনি কল রিসিভ করে বলেন...
হ্যাঁ, শায়লা বল...!
ওপাশ থেকে শায়লা বেগম বললেন—
এই সপ্তাহের শুক্রবারে আমরা তৃথা মা-কে দেখতে আসবো। কোনো অজুহাত শুনবো না।
রুবিহা খাতুন জোরপূর্বক হেসে বলেন—
তো আয় না, আমি কী তোদের নিষেধ করছি নাকি?
শায়লা বেগম মুচকি হেসে বলেন—
আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে ওই কথাই রইল। এই সপ্তাহের শুক্রবারে আমাদের দেখা হচ্ছে...!
আরও কিছুক্ষণ কথা বললেন তারা বিয়ের বিষয়ে...
এদিকে তৃথা তার কাছের ২ বান্ধবী সামিয়া আর সুমাইয়াকে সব কথা খুলে বললো।
সুমাইয়া চিল্লিয়ে বলে উঠলো—
আরে বইন, মিষ্টি কই...?
তৃথা রেগে বললো—
মিষ্টি কীসের মিষ্টি? আমি তো আমার বিয়ে ভাঙার জন্য।
সামিয়া তৃথাকে শান্ত করে বলল...
ওর কথা বাদ দে তো। এখন বল, তুই কী চাস?
তৃথা বলল...
ভাই, বিশ্বাস কর, আমি এইসব বিয়ে-টিয়ের মধ্যে নেই।
সুমাইয়া তৃথার কথার মাঝে বাম হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলল...
তো কী করবি? একেবারে কী বাসর করবি? মানে, তুই তো বলিস, আমি এইসব বিয়ে-টিয়ের মধ্যে নেই, তাই আর কী!
তৃথা এবার প্রচণ্ড রেগে বলল...
জাস্ট শাট আপ, সুমাইয়া! কী শুরু করছিস তুই? আমি কী তোদের সাথে মজা করছি? দেখ ভাই, আমি সিরিয়াসলি বলছি, এই বিয়ে আমি করবো না।
সামিয়া বলল...
আচ্ছা, বুঝলাম, তুই এই বিয়ে করবি না। এখন বল, আমরা তোকে কীভাবে সাহায্য করবো?
তৃথা আরাম করে বসে বলল...
তেমন কিছুই না। তোরা শুধু ওই বাড়িতে ফোন করে আমার নামে উল্টাপাল্টা অনেক কিছু বলবি, তাহলেই হবে। আর ওদের নাম্বার আমি দিচ্ছি তোদেরকে...
সামিয়া চোখ বড় বড় করে বলল...
পাগল নাকি, ভাই? আমরা কেন এইসব ফালতু কথা বলে যাবো তোর নামে?
সুমাইয়া এত সময় নীরব দর্শক হয়ে সব দেখছিলো। হঠাৎ সুমাইয়া বললো...
ডার্লিং, ওদের নাম্বারটা দে। আমি দেখছি কী করা যায়।
তৃথা আর কোনো কথা বাড়ায় না। সে নাম্বার দেয় আর বলে—
দেখ ভাই, আমি বিয়ে করবো না, তাই তোদের বলছি। এখন কীভাবে কী করে আমার বিয়ে ভাঙাবি, সেটা তোরা জানিস। আমি কিছু জানি না।
সুমাইয়া উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল—
চিল, বেবি! সকাল সকাল গুড নিউজ পাবা। এখন আরামে ঘুমাও।
সকাল ১০টা বাজে।
তৃথা ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের গতিতে রুমে প্রবেশ করে সুমাইয়া আর সামিয়া।
ওদেরকে দেখে তৃথা অবাক হয়ে বলল...
কী রে, তোরা কোথা থেকে এইভাবে আসছিস?
সামিয়া তৃথার পাশে বসে বলল...
বাসা থেকে আসলাম, তা ছাড়া আর কোথা থেকে আসবো? আমার কী সুমাইয়ার মতো বাবু-সোনা আছে নাকি, যে তার সাথে ঘুরতে যাবো?
সুমাইয়া সামিয়াকে বালিশ দিয়ে মেরে বলল...
সামিয়া, তুই সব জায়গায় আমার জানেমানটাকে টানিস কেন? কী করেছে সে? হুম, বল, বল!
তৃথা বলল...
আহা গো, কী সুন্দর ভালোবাসা! আজ কেউ নেই বলে জানেমান বলতে পারি না। এই কষ্ট আমি কাকে দেখাই? চল, সামিয়া, দুজন মিলে কচু গাছের সাথে ফাঁসি নিবো। এদের পিরিত দেখার থেকে মরে যাওয়া অনেক ভালো।
সামিয়া বিরক্ত হয়ে বলল...
চুপ থাক, নাটকবাজ! তুই কেন কচু গাছের সাথে ফাঁসি নিবি? দুই দিন পরে তুইও তোর জামাইয়ের সাথে পিরিত করবি। আর আমি তোদের পিরিত দেখতে দেখতে মরবো। সুমাইয়া কী কম ছিলো, যে এখন তোরও কুচুপুচু হবে? শালার, আমার কী ভাগ্য! সারাজীবন সিঙ্গেলই মরবো মনে হয়। এই শালার গোলামের পুত যে কী করে, আল্লাহ জানে।
সুমাইয়া মজা করে বলল...
তোর গোলামের পুত মনে হয় কোনো মাইয়ার ইনবক্সে বলছি, জান, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।
সামিয়া অসহায় কণ্ঠে বলল...
বইন, তুই প্রথমে আমার মাথাব্যথা উঠাইছিস, এখন কি আমার বুকে ব্যথা উঠায়ে আমাকে মারার পরিকল্পনা করছিস?
সুমাইয়া বলল...
ছিঃ, বান্ধবী, ছিঃ! এইসব কী বলো তুমি? এই ছিলো তোমার মনে? তোমার কথা শুনে আমি অনেক কষ্ট পাইলাম।
তৃথা নীরব দর্শকের মতো এদের নাটক দেখছে আর হাসছে। তৃথার হুট করে কী মনে হলো? তাই সে সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল।
আচ্ছা, বইন, তুই তোর বয়ফ্রেন্ডকে ১০০% এর মধ্যে কত পারসেন্ট বিশ্বাস করিস?
সুমাইয়া দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল...
১০০% এর মধ্যে ৮০% বিশ্বাস করি।
সামিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল...
তোদের রিলেশন ৩ বছরের। তুই ভাইয়াকে যা বলিস, ভাইয়া তো তাই করে। তাহলে তুই ৮০% বিশ্বাস করিস কেন? বাকি ২০% বিশ্বাস করিস না কেন?
সুমাইয়া বলল...
হুম, করি তো বিশ্বাস। ওই যে ৮০%। আর ২০% করবো তো যেই দিন ও আমাকে বিয়ে করবে, সেই দিন ৯০% বিশ্বাস করবো।
সামিয়া আর তৃথা একসাথে বলল...
আর ১০%?
সুমাইয়া লজ্জা পাওয়ার ভান করে বলল...
আমাদের যখন একটা বেবি হবে, তখন থেকে আমি ওকে ১০০-তে ১০০% বিশ্বাস করবো।
তৃথা আর সামিয়া বলল...
মাফ চাই, বইন আমার। তোর কাহিনি আমরা আর শুনতে চাই না। এই বিশ্বাসের কাহিনি শুনলে না জানি ওই বেচারা হার্ট অ্যাটাক করে।
কিছু সময় এইভাবে মজা-ফাজলামি করে তারা। এবার তৃথা বলল...
আচ্ছা, অনেক তো ফাজলামি করলাম, এখন মেইন কোথায় আসি...??
চলবে............
