#আমি_তোমার_হতে_চাই
#পর্ব_৩
#সুরভী_আক্তার
( অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌ )
সকাল সাতটা বেজে তিন মিনিট ।
মিহাজের স্কুল শুরু আটটায় । রিপোর্টিং টাইম সাতটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট অবধি । হাতে আছে আর চল্লিশ মিনিটের মতো । ওকে ঘুম থেকে ওঠানোর দায়িত্বে একজন বেবিসিটার আছেন এ বাড়িতে । ওয়াহাজ খান আগের রাতে বলে রেখেছেন,, আজ মিহাজ স্কুল যাবে । ওকে যেনো সকালে ঘুম থেকে ওঠানো হয় । সেই মোতাবেক ভদ্রমহিলা সেই ছয়টা পঞ্চাশ থেকে মিহাজ কে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন । কিন্তু ঐ ছেলে ঘুম থেকে উঠলেও বিছানা ছাড়ছে না কিছুতেই । চোখ বুজে গেঁথে রয়েছে । কারন স্কুলে যাবে না সে ।
ভদ্রমহিলা মিনিট পনেরো চেষ্টা করার পর বিব্রত হলেন । যা জেদ এই ছেলের, এতো চেষ্টা করেও লাভ নেই । তিনি ঘর থেকে বেরোনোর উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই ঘরে ওয়াহিদা খানের আগমন । তিনি ঠিক আন্দাজ করেছেন, মিহাজ জেদ ধরে থাকবে । উঠবে না ঘুম থেকে । আর তাই হয়েছে । দরজা থেকে বাচ্চা টাকে এখনো শুয়ে থাকতে দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললেন বৃদ্ধা ।
ইশারা করতেই উপস্থিত বেবিসিটার বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে । ওয়াহিদা খান এগিয়ে যান । নাতির শিয়রে বসে ডাকেন মিহি স্বরে.....
" দাদু ভাই,,, সকাল হয়ে গেছে । স্কুলে যাবে না ? কখন থেকে ডাকছে তোমায়, দেরি হয়ে যাচ্ছে তো,, ওঠো এবার ।
মিহাজ চোখ খিচে নেয় । কম্ফোর্টার টেনে মাথা অবধি ঢেকে ফেলে । ঘুম ঘুম স্বরে বলে....
" যাবো না আমি ।
" জেদ করতে নেই দাদু ভাই,, উঠে পড়ো জলদি । আমি রেডি করিয়ে দেবো আজ তোমায় ! চলো,, ওঠো....
" বললাম তো গ্র্যামি,,, স্কুলে যাবো না আমি । আমি এখন ঘুমাবো । চলে যাও আমার ঘর থেকে ।
" সাতটা পেরিয়ে গেছে,, আর কত ঘুমাবে তুমি ? স্কুল শুরু আটটায় । সাতটা পঁয়তাল্লিশ এর মধ্যেই স্কুলে ঢুকতে হবে তোমায় ! এখন বাজে সাতটা আট,,, দুই মিনিটের মধ্যে যদি বিছানা থেকে না ওঠো,, তাহলে এর ফল ভালো হবে না বলে রাখলাম ।
দরজার কাছ থেকে রাশভারী কন্ঠ ভেসে আসলো । সচকিতে সেদিকে তাকালেন ওয়াহিদা খান । টান টান সাদা পাঞ্জাবিতে গুরুভার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় ছেলে ওয়াহাজ খান ।
হাত দুখানি পেছনে গুটিয়ে রাখা । মুখশ্রী স্বভাবসুলভ কঠিন । ওয়াহিদা খান ছেলেকে দেখে তড়িঘড়ি করে সাফাই গান নাতির হয়ে.....
" ওয়াহাজ,,, মিহাজ কে তুলে রেডি করাচ্ছি আমি । তুমি যাও । দাদু ভাই,, দেরি হয়ে যাচ্ছে । উঠে এসো । রেডি হতে সময় লাগবে তো ।
মিহাজ কমফোর্টার মুড়ি দিয়ে আরো বেশি কুকড়ে শোয় ।
ওয়াহাজ খান মায়ের উদ্দেশ্যে বলেন....
" মা,, আপনি যান । আমি দেখছি ।
" কিন্তু..
" কোনো কিন্তু না । আপনি যান এখান থেকে ।
দ্বিরুক্তি না করে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা । ছেলেকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগে বলে গেলেন....
“ রাগারাগী করো না ।
ওয়াহাজ তা শুনে শব্দ হীন শ্বাস ফেলে । বেডের পাশে দাঁড়িয়ে চড়া গলায় বলে ওঠে....
" উঠতে বলেছি,, কথা কানে যাচ্ছে না ?
আমি তুলবো জোর করে ?
শাশানি কাজে লাগলো বোধহয় । এক ঝটকায় উঠে বসলো বাচ্চাটা । বাপের সামনে সর্বদা তার দৃষ্টি নত । আর দৃষ্টি নত থাকার কারনেই হয়তো বরাবরই বাচ্চাটার ছলছল চোখ দুটি ওয়াহাজ খানের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় ।
মিহাজ বিছানা থেকে নেমে সোজা ওয়াশ রুমে ঢোকে । পেছন পেছন ওয়াহাজ খান । ছেলের ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ফ্রেশ করিয়ে আনেন ওকে ।
বিছানার উপর দাঁড় করিয়ে নিজ হাতে চেঞ্জ করিয়ে ইউনিফর্ম পড়িয়ে দেন ।
মিহাজের দৃষ্টি তখনও নিচু । চিবুক মিশেছে গ্রীবা দেশে । ইউনিফর্মের বোতাম লাগানোর সময় ওয়াহাজ খান আজ বহুদিন বাদ চোখ ভরে ছেলেকে দেখলেন । ফুটফুটে একটা বাচ্চা । মায়ের আদল পেয়েছে ।
আলগোছে খানিক হাসলেন ভদ্রলোক । ছেলেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিলেন । গলায় স্টুডেন্ট আইডি ঝুলিয়ে দিতে দিতে বললেন গলা নামিয়ে....
" এক সপ্তাহ পর স্কুল যাচ্ছো আজ । আজকের পর, নেক্সট টাইম যদি স্কুল থেকে কোনো প্রকার কমপ্লেইন আসে, তাহলে ভালো হবে না । মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে । যেভাবে কাল পড়েছো নতুন টিউটরের কাছে, ঠিক সেভাবে । গুড বয় হয়ে থাকবে একদম । আজকের পর সবাই যেনো বুঝতে পারে, আমার ছেলে গুড বয় ।
তার কথা ফুরোতেই তড়াক করে দৃষ্টি তুললো মিহাজ । তার বাবা তাকে গুড বয় বললো ? সত্যিই বললো ? নাকি ভুল শুনলো ? নরম সুরে কথা বললো তার বাবা ? তারমানে মিহাজ আসলেই গুড বয় হয়ে গেছে বাবার কাছে ? বাচ্চাটা এসব ভাবতে গিয়ে চিকচিক করে ওঠে । বাবার চোখে চোখ রেখে উজ্জ্বল মুখে ঝটপট করে প্রশ্ন করে জড়তা ভুলে....
" বাবা,,, মিহাজ গুড বয় ?
ভদ্রলোক মৃদু হাসেন । মাথা নাড়েন ।
ছেলের দুই বাহু ধরে বলেন কোমল সুরে.....
" যারা পড়াশোনা করে, সবার কথা শোনে, তারা গুড বয় হয় । আমার মিহাজ আজ থেকে মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবে । সেও গুড বয় হবে এখন থেকে । ওকে..?
আপ্লুত হলো মিহাজ । তাৎক্ষণিক মাথা নাড়ালো....
" হ্যাঁ বাবা,,, আমি গুড বয় হবো । তাহলে তুমি ভালোভাবে কথা বলবে আমার সাথে ? চুমু খাবে আমার কপালে ? নতুন মিস বলেছে,,, আমি গুড বয় হয়ে গেলে বাবা চুমু খাবে আমার কপালে । আমি গুড বয় হয়ে যাবো বাবা ।
ওয়াহাজ কপাল গুটায় ।
তাৎক্ষণিক মনে পড়ে,, কাল ভূমি ওকে কি কি বলেছিলো । নরম সুরে কথা বলা এবং কপালে চুমু খাওয়ার বিষয়টা মিহাজ মাথায় রেখেছে, এটা দেখেই বিস্মিত হলেন ভদ্রলোক ।
ছেলেকে বিছানা থেকে নামিয়ে বললেন..
" ওকে,,, এখন নিচে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে স্কুলে যাবে । দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
আজ আর মিহাজের খুশি দেখে কে ? একটুও মত বিরোধ করলো না বাচ্চাটা । গদগদ হয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়লো ।
ওহায়াজ রোজ রোজ নিজেই ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দেন । আজও তাই করলেন তিনি ।
বারোটা ত্রিশ মিনিটে স্কুল ছুটি হয় মিহাজের । স্কুল থেকে ফিরেছে থেকেই আজ ভীষণ উদগ্রীব হয়ে আছে বাচ্চাটা । এখন বাজে দুপুর সাড়ে তিনটে প্রায় ।
সেই আড়াইটার সময় দিশা ফিরেছে ভার্সিটি থেকে । আজ দিশার সাথে ভূমি আসেনি । হোস্টেলে গেছে, ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করে তারপর আসবে । মিহাজ ভূমির জন্য বড্ড ব্যাকুল হয়ে উঠেছে । ড্রইং রুমে পায়চারি করছে আর ক্ষণে ক্ষণে তাকাচ্ছে সদরের দিকে ।
দিশাও আছে লিভিংয়ে । সোফায় শুয়ে আপন মনে ফোন টিপছে সে । মিহাজ অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে । শেষমেষ মলিন মুখে দিশার কাছে যায়....
" দিশা আপি !
চকিতে চায় দিশা...
" কি হয়েছে ভাই ? কিছু বলবি ?
" আপি,, আমার নতুন মিস আসবে না আজ ? এখনো আসছে না কেনো ?
ধড়ফড় করে শোয়া থেকে উঠে বসলো মেয়েটা । মিহাজের মুখে এমন অভাবনীয় কথা শুনে যেনো আকাশ থেকে পড়লো সে । সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ওয়াহাজ খানের কানেও পড়লো একই কথাটুকু । তিনিও কপালে ভাঁজ ফেললেন ।
দিশা হকচকিয়ে প্রত্যুত্তর করে....
" ভাই, ভূমির কথা বলছিস ? ওর কাছে পড়ে ভালো লেগেছে তোর ?
" হুঁ । নতুন মিস খুব ভালো ! সত্যিই কথা বলে ! তুমি বলো না,, আজ আসবে না ও ? কখন আসবে ?
দিশা উত্তর করার আগেই সদরে কলিং বেল বাজলো । উৎসুক হয়ে ভরা গালে হাসলো মেয়েটা ।
" এসে গেছে তোর নতুন মিস । ওয়েট, ডোর আনলক করে দিয়ে আসি ।
এক লাফ মেরে সে ছুটলো সদরের দিকে । পেছন পেছন মিহাজ । সে ভীষণ খুশি আজ । সোফার কাছে টমি বসে ছিলো । বসে বসে লেজ নাড়ছিলো এতক্ষণ । মিহাজ কে সদরের দিকে যেতে দেখে সেও পিছু নিলো ।
দরজা খুলে দিতেই উৎসুক হয়ে ভেতরে ঢোকে ভূমি ! এক গাল হাসি চোয়ালে । মিহাজ তেড়ে যায় তাৎক্ষণিক.....
" মিস, এসে গেছো তুমি ?
ছুটে গিয়ে হুট করেই মেয়েটার কোমর জড়িয়ে ধরলো বাচ্চাটা । ভূমি থতমত খায় ।
পেছনে টমি ছিলো,, মিহাজের এমন কান্ডে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো সে ।
এবারে ভড়কে যায় ভূমি । মিহাজের পিঠে হাত রেখে এক কদম পেছায় । এই কুকুরটাকে ভয় লাগে । না জানি কখন ধাওয়া করে বসে । শুষ্ক ঢোক গিললো মেয়েটা । মাথা তুলে ওর তটস্থ অবস্থা টুকু দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে মিহাজ । পিছু ফিরে টমির দিকে তাকায় ।
ভূমিকে ছেড়ে টমির দিকে ফেরে । এক হাঁটু মুড়ে বসে চোখ মুখ পাকিয়ে বলে অবলা প্রাণী টার উদ্দেশ্যে.....
" টমি,,, সি ইজ মাই নিউ টিচার । ডোন্ট বদার অ্যান্ড ডোন্ট স্কেয়ার হার এনিমোর । ওকে ?
প্রাণিটা কি বুঝলো কে জানে । চুপচাপ লেজ নাড়িয়ে গুটিয়ে বসলো । ভূমি অবাক হয়, সাথে দিশাও । সিঁড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা স্বয়ং ওয়াহাজ খান নিজেও আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে পৌঁছালেন ছেলের এমন অকল্পনীয় ব্যবহার দেখে । চোখ সরু করে ছেলেকে পরখ করলেন তিনি ।
মিহাজ উঠে দাঁড়িয়ে গদগদ হয়ে ভূমির দিকে ফেরে । হাত টেনে ধরে হিড়হিড়িয়ে এগোতে এগোতে বলে.....
" মিস,, চলো পড়বো আমরা । দেরি হয়ে যাচ্ছে তো । দেরি করে আসলে কেনো আজ ? তুমি জানো,, আমি অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য ।
টানতে টানতে সিঁড়ির দিকে এগোয়,, এলোমেলো কদম ফেলতে গিয়ে হতচকিত হয়ে যায় ভূমি....
" মিহাজ,, পড়ে যাবো তো । ছাড়ো, আমি যাচ্ছি ।
ওদের দুজনের সামনে সটান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ওয়াহাজ খান । দু'জনেই চকিতে চোখ তোলে । ভূমি হাসি টেনে তাৎক্ষণিক বলে ওঠে.....
" আসসালামুয়ালাইকুম মামা । ভালো আছেন ?
ওয়াহাজ খানের দৃষ্টি ছেলের দিকে । হয়তো মনে মনে উত্তর করলেন । তবে ফিরেও তাকালেন না ।
ভূমি উপেক্ষিত হয় । হাসি চুপসে যায় । মিহাজ বলে ঝটপট....
" বাবা,, দেখো আমরা এখন পড়তে যাচ্ছি । পরে কথা বলবো, কেমন ? মিস, চলো তুমি...
আর কোনো কথা না বলে ভূমিকে টানতে টানতে উপরে উঠলো বাচ্চাটা ।
দিশা মুচকি হেসে বলে ওদের দুটোর দিকে তাকিয়ে....
" দেখেছো বড় মামা,, আমি বলেছিলাম না ভূমি ভাইকে মানিয়ে নিয়ে পড়াতে পারবে । দেখো, এক দিনেই ভাই কেমন বাধ্য হয়ে গেছে । ভূমি খুব মিশুক মামা,,তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো ।
,,,
ঘরে এসে সোজা পড়ার টেবিলে বসেছে মিহাজ । ভূমি নিজেও আশ্চর্য । সে শুধালো অবাক হয়ে....
" মিহাজ,,, কি হয়েছে তোমার ?
" মিহাজ গুড বয় হয়ে গেছে । মিস, ইউ আর সো গুড । তুমি ঠিক বলেছো, গুড বয় হয়ে গেলে বাবা আদর করবে আমায় । বাবার আদর পাওয়ার জন্য আমি আজ থেকে গুড বয় হয়ে থাকবো,, পাক্কা প্রমিস ।
ছটফট করে পাশের চেয়ারে বসলো মেয়েটা....
" বাবা আদর করেছে তোমায় ?
" উঁহু, ভালোভাবে কথা বলেছে । আদর করে চুমু খায়নি এখনো....
" একদিনে কি সব পাওয়া যায় ? তুমি সত্যি সত্যিই গুড বয় হয়ে থাকলে বাবা আদর করে চুমুও খাবে খুব তাড়াতাড়ি । তাহলে আজ থেকে মিহাজ গুড বয় হয়ে থাকবে, নাকি উপর উপর গুড বয় হওয়ার নাটক করবে ?
" গুড বয় হবে মিহাজ ।
ভূমি খুশিতে চিকচিক করে ওঠে । হাত বাড়িয়ে জোর গলায় বলে....
" ওক্কে মাই বয়,,,, হাইফাই হয়ে যাক ?
চট করে হাত মিলিয়ে হাইফাই করলো দু'জনে । পরক্ষণে শব্দ করে হেসে উঠলো ।
দরজার আড়ালে ওয়াহাজ খান দাঁড়িয়ে । মেয়েটার চেহারা ব্যাতীত নিজের ছেলের খুশি সহ সবটুকু তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করলেন তিনি । এতো কম সময়ে নিজের ছেলেকে এতোটা ফ্রি হতে দেখেননি কারোর সাথে । ইনফ্যাক্ট, মিহাজ কারোর চোখে চোখ রেখে কথাও বলে না কখনো । অথচ এই মেয়েটার সাথে এতো সহজে মানিয়ে নিলো ? ব্যাপারটা অদ্ভুত বটে !
★
মাঝে কেটেছে বেশ কয়েকদিন ।
দিন যত এগোচ্ছে, তত ইলেকশনের সময় ঘনিয়ে আসছে । বাড়ছে চাপ, ব্যস্ততা । বিরোধী দলের নানান ষড়যন্ত্রের কবলে এখন থেকেই পড়ছেন ওয়াহাজ খান । তিনি এখনো ঢাকা দশ আসনের এমপি হিসেবে বহাল রয়েছেন । সংসদ ভাঙেনি , তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেওয়া হয়েছে গত চারদিন আগে । পরের তিন মাসের অন্তরেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । অর্থাৎ নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ তিন ডিসেম্বর ।
এবারে ওয়াহাজ খানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে #আরিফুল_ইশরাকের একমাত্র পুত্র #নাভিদ_ইশরাক । গেলো নির্বাচনে ওয়াহাজ খানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আরিফুল ইশরাক ছিলেন । কিন্তু তাকে পিছু ফেলে ঢাকা দশ আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলো ওয়াহাজ খান ।
এবারের নির্বাচনে তার ছেলে রয়েছে ওয়াহাজ খানের বিরুদ্ধে । নাভিদের বয়স হবে ত্রিশের ঘরে । ওয়াহাজ খানের চরম শত্রু বলা চলে । বাবার হয়ে বড্ড ক্ষোভ পুষে রেখেছে সে । এখন সব ক্ষোভ নিংড়াবে এই নির্বাচনের যাঁতাকলে ।
অবশ্য ওয়াহাজ খান সেসবে তোয়াক্কা করেন না ।
আজ প্রতিক বরাদ্দ করা হলো ।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল পাঁচটা বেজেছে তার । সেই কাক ভোরে বেরিয়ে গেছিলেন । ফিরলেন এই কেবল । সাথে অরিধ আছে ।
সদরের দরজা বাড়ির স্টাফ খুলে দেয় । ভেতরে পা রাখা মাত্রই ড্রইং রুমে হুটোপুটি দেখে থমকে যান ভদ্রলোক । দৃষ্টি কুঁচকে জড়ো হয় কপাল ।
মিহাজ, দিশা আর ভূমি মিলে হুল্লোড় জুড়েছে । টিভিতে গান বাজছে ফুল সাউন্ডে ।
ওরা তিনটে মিলে লাফালাফিতে ঘর মাতিয়েছে । ওয়াহাজ খান অবাক হলেন,, ওদের সাথে নীলয় ও আছে । সে আয়েশি ভঙ্গিতে পায়ে পা তুলে বসে পাগলামো দেখছে তিনটের । হাসছে মিটিমিটি ।
পড়া ফেলে এসব করছে ওরা । কলিং বেলের আওয়াজ ও কানে পৌঁছায় নি কারোর !
অরিধ ভ্যাবাচ্যাকা খায় এসব দেখে ।
বিংশী রমনীদের সাথে পিচ্চি এক ছানা । গান বাজছে হিজিবিজি কোন এক ভাষায় ।
ওদের এমন পাগলাটে হয়ে নাচতে দেখে চোখ নামিয়ে খুকখুক করে কেশে ওঠে যুবক ।
ওয়াহাজ খান মাড়ি খিচে নেন । এগিয়ে গিয়ে রিমোট তুলে ঝট করে অফ করে দেন টিভি ।
বাঁধা পেতেই চরম বিরক্ত হয় উন্মাদ তিন জনাই । মুখ ফসকে ঝেড়ে ওঠে ভূমি....
" কে রেএএএএএ.....
শেষের শব্দটা দীর্ঘ হলো ওয়াহাজ খানের নিরেট মুখাবয়ব চোখে পড়তেই । মেয়েটার আত্মা যেনো ছলকে উঠলো । দ্রুত দাঁড়ালো সোজা হয়ে । অস্ফুটে আওড়ালো.....
" মা...মামা,,,
দিশা আর মিহাজ জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায় সহসা । ভূমি শুষ্ক ঢোক গেলে । ভদ্রলোক ধমকে ওঠেন দিশার দিকে দৃষ্টি ফেলে.....
" কি হচ্ছে এখানে ? বাড়িটাকে মাথায় তুলেছো তোমরা ? দিশা, ছোট বাচ্চা তুমিও ? আর মিহাজ,, পড়াশোনা নেই তোমার ? পড়া ফেলে নাচানাচি করছো এখানে ? কিসের ধুমধাম শুরু করেছো ?
শেষে নীলয়ের দিকে দৃষ্টি তাক করতেই ঝাড়ি খাওয়ার আগে তাৎক্ষণিক দুহাত তুলে সমর্পণ করে যুবক । অসহায় হয়ে ভালো সাজে....
" ভাইয়া, ট্রাস্ট মি,,, আমি কিছু জানি না । আমি ওদের বারন করেছি,,ওরা শোনেনি আমার কথা ।
হতভম্ব হয় তিন বিচ্ছু । দিশা খেইখেই করে ওঠে....
" ছোট মামা মিথ্যে বলছে । গান বাজিয়ে আমাদের বিগড়ে দিয়েছে মামা নিজেই । এখন মিথ্যে কেনো বলছো মামা ?
" মোটেও না,, আমি তোদের বিগড়ে দেইনি । ভূমিকাই তো বললো, তোরা নাকি বোর ফিল করছিস । আমাকে গান বাজাতে বললো সে । তাইতো বাজালাম । আমার দোষ কোথায় ? নাচতে বলেছি আমি তোদের ?
পিটপিট করে ওয়াহাজের দিকে তাকায় ভূমি । সেই ভদ্রলোক এতো দিনেও কখনো ওর দিকে তাকায় নি । এই কদিনে হাতে গুনে দুবার চোখাচোখি হয়েছে দুজনের । জড়োসড়ো হয়ে যায় মেয়েটা । দিশা, নীলয়, বা মিহাজ কে তিনি ধমকাতে পারলেও ভূমিকে কিচ্ছু বলবেন না ওয়াহাজ খান । তাই নীলয় বুদ্ধি করে ভূমির উপর বর্তালো সবটা । চোখের ইঙ্গিতে সামলে নিতেও বললো ।
রমনী ঢোক গেলে আরেকবার । মুখ খোলে....
" স্যরি মামা । মিহাজের পড়া শেষ হয়ে গেছে । একটু বোর ফিল করছিলাম । তাই ঐ আরকি....
মেয়েটার মিনমিন করার মাঝেই ওয়াহিদা খান নিচে নামলেন । ছেলেকে দেখে ব্যস্ত হয়ে শুধোলেন....
" ওয়াহাজ,, এসে গেছো বাবা ? প্রতিক বরাদ্দ হলো আজ ? কি প্রতিক পেয়েছো তুমি ?
শান্ত হন ভদ্রলোক ।
কন্ঠে মিষ্টতা টেনে সংক্ষিপ্ত উত্তর করেন.....
" ঘড়ি !
দিশা তেড়ে গেলো । বললো খুশি হয়ে.....
" বড় মামা, তোমার প্রতিক ঘড়ি ? আই মিন ঘড়ি মার্কা ?
ভদ্রলোক মাথা নাড়েন । ভূমি আর মিহাজ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো । ভূমি আর পারলো না চুপ করে থাকতে । হাত উঠিয়ে গলা চিরে বলেই উঠলো.....
" মামা,, প্রচারণায় এই লাইনটা অবশ্যই লাগাবেন..... ওয়াহাজ মামার সালাম নিন,, ঘড়ি মার্কায় ভোট দিন । ভোট দিবেন ভাই কোনখানে,, ঘড়ি মার্কার মাঝখানে ।
হন্তদন্ত হয়ে চেঁচিয়ে ওঠে মেয়েটা । মিহাজ মজা পায় এমন ছন্দে, মুখ টিপে হেসে ওঠে শব্দ করে ।
ওয়াহাজ খান না চাইতেও আজ তৃতীয় বার তাকালেন মেয়েটার দিকে । চোখাচোখি হলো আচমকা । এতেই থতমত খেয়ে যায় ভূমি । অদ্ভুত শিহরণে অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত চোখ নামায় । ওয়াহাজ খান পাত্তা দিলেন না । বিষন্ন হয়ে বললেন মায়ের উদ্দেশ্যে....
" মা, খিদে পেয়েছে খাবার দিতে বলুন । আপাতত রুমে দুই কাপ কফি পাঠিয়ে দিন আমাদের জন্য । অরিধ, রুমে চলো ।
দুজনায় উঠতে ধরে সিঁড়ি বেয়ে । কয়েক ধাপ উঠে থামেন ভদ্রলোক । ঘাড় ফিরিয়ে আস্তে করে তাকান পেছনে । ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলেন.....
" মিহাজ,, পড়েছো আজ তুমি ? নাকি নাচানাচি করছো শুধু ?
লোকটার কথা টেনে বরাবরের ন্যায় আগ বাড়িয়ে উত্তর করে চঞ্চলা রমনী....
" ও পড়েছে মামা । দেড় ঘন্টা পড়েছে আজ । আপনাকে ওর পড়া নিয়ে ভাবতে হবে না, আমি আছি ওর পড়াশোনা দেখার জন্য ।
চোখ পাকিয়ে নেন ওয়াহাজ খান । মেয়েটার এতো এতো চঞ্চলতায় বিব্রত হন তিনি । এই মেয়ে এতো কথা বলে কেনো ? আর সারাক্ষণ মামা-মামা বলেই বা কেনো ? বিরক্তি লাগে ওর মুখে এই ডাক শুনলে !
ওয়াহাজ খান দৃষ্টি ফিরিয়ে কন্ঠ দৃঢ় করলেন । বললেন ভাগ্নিকে উদ্দেশ্য করে.....
" দিশা, তাকে বলে দাও আমি তার মায়ের ভাই নই । সেও আমার বোনের মেয়ে নয় । তাই, সারাক্ষণ মামা মামা বলে যেনো কানের মাথা না খায় আমার ।
কথা টুকু আওড়িয়ে গটগটিয়ে উপরে উঠে গেলেন তিনি । ভূমি আহম্মক হয় । মুখের উপর এভাবে কে বলে এসব ? তিনি তো মামাই, মামা বলবে না তো কি বলবে ?
এমনিতেও মেয়েটা একা একাই বকবক করে, প্রত্যুত্তরে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না । এ অবধি এক বাক্যেও তার সাথে কথা হয়নি ঠিকমতো ।
দিশার কাছে এই লোকের গম্ভীরতা সম্পর্কে যতটুকু শুনেছে, তার থেকেও বেশি গুরুগম্ভীর এই লোক । ভেংচি কাটে ভূমি । দেরি হয়ে যাচ্ছে, হোস্টেলে ফিরতে হবে এখন । মেয়েটা সোফার উপর থেকে নিজের ব্যাগ তুলে নিলো । মিহাজের গালে হাত রেখে বললো আদুরে গলায়....
" মিহাজ,,, আমি আসছি । যা যা হোমওয়ার্ক দিয়েছি, গুড বয়ের মতো সব করে রাখবে । ওকে ?
রোজ ড্রাইভার পৌঁছে দেয় ভূমিকে । আজ নীলয় বেরোবে বাইরে । সে বললো হাসি মুখে....
" ভূমিকা,, আমি বাইরে যাচ্ছি । চলো একসাথে যাই । ড্রপ করে দেবো তোমায়....
তার দিকে ফিরে মুচকি হাসে রমনী । এই বাউন্ডুলে লোকটা বেশ ভালো । মিশুক আর চঞ্চল । দেখতে একদম বড় ভাইয়ের মতো গুরুগম্ভীর হলেও ভেতর থেকে সম্পুর্ন আলাদা । অনামিকা আর ভূমি, দুটো নাম মিলিয়ে ভূমিকা সম্বোধনে ডাকে ভূমিকে ।
ওরা দুজন বেরিয়ে যেতেই দিশা সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় । পেছনে একজন স্টাফ আসছেন । হাতের ট্রেতে দুটো কফির মগ ।
দিশা কিছু একটা ভাবলো । চটপট থেমে বললো,,,
" আমাকে দিন, আমি নিয়ে যাচ্ছি ।
বিনা বাক্যে ওর হাতে ট্রে ধরিয়ে দিলেন স্টাফ ভদ্রমহিলা । দিশা ঠোঁট কামড়ে হাসে ।
করিডোর পেরিয়ে ওয়াহাজ খানের ঘরের দরজায় নক করে । ভেতরে ঢোকার অনুমতি আসে অরিধের থেকে । বাইরে থেকে গলা বাড়িয়ে একবার ভেতরটায় নজর বুলিয়ে নেয় দিশা । বেড বরাবর সামনের ডিভানে বসে আছে অরিধ । কোলে ল্যাপটপ । কানে এয়ার পড । ওয়াহাজ নেই, নিশ্চয়ই ওয়াশ রুমে । হাঁফ ছাড়ল মেয়েটা । দ্রুত ঘরে ঢুকলো । কদম বাড়াতে বাড়াতে গলা খাঁকারি দিলো ।
কাজের মাঝে মেয়েটার রিনরিনে স্বর কানে পড়তেই হাত থমকায় যুবকের । নিরেট চোয়াল বেঁকে যায় কিছুটা । চোখের নিশানা বদলে সূক্ষ্ম হয় । তবুও চোখ তুলে চায় না যুবক । ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে কাজে মনযোগ দেয় আবার ।
দিশা আঁখি লতা কুঁচকে ফেলে নাক বরাবর । বলে গলা চড়িয়ে....
" কফি এনেছি !
" রেখে যান ।
খট করে ডিভানের সামনে ট্রে রাখলো মেয়েটা । পাশে বসে ল্যাপটপে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বললো নরম গলায়....
" কি করছেন ?
" কাজ !
" সবসময় এতো কাজ করে পান ?
" মাসে শেষে মাইনে পাই !
" মাইনে দিয়ে কি হয় ?
মেয়েটার অবান্তর প্রশ্ন । কথা বলার বাহানা খুঁজছে সে । তার মনোভাব বেশ বুঝতে পারে যুবক । তবুও উত্তর করে সাবলীল ভাবে....
" সংসার চলে !
" সংসার আছে বুঝি আপনার ? কে কে আছে সেই সংসারে ?
" সব জানেন আপনি ! কাজ করছি, অবান্তর প্রশ্ন করে জ্বালাবেন না, প্লিজ ।
চুপসে আসে মেয়েটার মুখ । মলিন মুখে বলে গলা নামিয়ে.....
" জ্বালাচ্ছি আমি আপনাকে ? এমন কেনো আপনি ? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারেন না ?
" মেয়েদের দিকে তাকানো হারাম ।
" তো আমাকে হালাল বানিয়ে নিন ।
আকস্মিক মেয়েটার এহেন কথায় দ্বিতীয় বার হাত সহ গোটা হৃদয় থমকে যায় যুবকের । দিশা নিজেও মুখ ফসকে বলে ফেলেছে । বেফাঁস বলেছে বোঝা মাত্রই থেমে গেছে সহসা । কেঁপে উঠেছে অন্তঃস্থল ।
অরিধ চোখ বুজে দম ফেললো শব্দহীন । বাধ্য হয়ে তাকালো এবার । অমনি চোখাচোখি হলো মেয়েটার সাথে । দিশা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নেয় । ভারী গলায় মুখ খোলে যুবক.....
" দেখুন দিশা,,, কাজ করছি আমি । কফি দেওয়া হয়ে গেছে,, আপনি এখন আসতে পারেন । প্লিজ.....
নতজানু হয়ে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটা ।
ওয়াশ রুমের দরজা খোলার শব্দ হতে হতেই এক ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে । রমনীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে যুবক । মাথা নাড়ে দুটিকে ।
🛑 কেমন লাগলো বাচ্চারা ? জানাবেন অবশ্যই ! ঝটপট রেসপন্স করবেন ওকে ? হ্যাপি রিডিং । 🛑
#চলবে........
