" আআআআআআআ বাঁচাওওও.....
গলা ফাটিয়ে তীব্র চিৎকার জুড়ে ভোঁ ছুট লাগালো রমনী । এলোমেলো তার পায়ের তাল । দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য মস্তিষ্ক । বিলাসবহুল #খান বাড়ির পুরো ড্রইং জুড়ে তার এলোমেলো ছোটাছুটি । পেছন পেছন একটা কুকুর । এ বাড়িরই পোষা কুকুর ।
একহাত জিহ্বা বের করে সমান তালে ধাওয়া করছে রমনীকে । মেয়েটা ছুটতে ছুটতে নাজেহাল । কোন কুক্ষনে যে এ বাড়িতে আসতে গেলো কে জানে ? আসা অবধিও ঠিক ছিলো । এতো বড় বাড়ি , ভেতরে ঢুকেই অবাক লোচনে এপাশ ওপাশ চেয়ে দেখার মাঝেই ভুলবশত পা পড়েছিলো ঐ কুকুরের লেজে । আর তৎক্ষণাৎ তেড়ে এসেছে শয়তান টা । কুকুর তো নয়, যেনো বনের বাঘ ।
রমনী ভয় পায়নি প্রথমে । পেট'স পছন্দ তারও । আদুরে হয়ে কুকুরটার দিকে এক কদম এগোতেই উল্টো তেড়ে এসেছে জল্লাদ টা । মেয়েটা কুল পায় নি তাৎক্ষণিক । ছলকে উঠে ছুট লাগিয়েছে ।
এখন তার চিকন কন্ঠের চিৎকারে কাঁপছে পুরো বাড়ি । মুহুর্তেই বাড়ির সব কাজের লোক এসে জড়ো হয়েছেন এক জায়গায় । তাজ্জব বনে মেয়েটার ছোটাছুটি দেখছেন সকলে ।
ওর ছোটার মাঝেই আরো একটা ভড়কানো রিনরিনে কন্ঠ ভেসে আসলো.....
" #ভূমি ,, দাঁড়া ? ছুটিস না ! ও পোষা ডগি । কিচ্ছু করবে না । কিন্তু তুই এভাবে দৌড়ালে তোর পিছু পিছু ও নিজেও ছুটবে । রিল্যাক্স প্লিজ.....
ভূমিকে আটকায় কে ? ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া ! এই খচ্চরের কামড় গায়ে পড়লে রক্ষে নেই ।
এ কথা ভাবতে গিয়ে ছলকে ওঠে মেয়েটা । বিপরীতে চেঁচিয়ে বলে....
" ওও আল্লাহ গো,,,
#দিশা,, আগে ওটাকে থামা প্লিজ । ধরতে পারলেই কামড়াবে আমায় । ভাইইই, প্লিজ থামা ওটাকে ।
হাঁপিয়ে গেছে মেয়েটা । ডাইনিং টেবিল, সোফা, সিঁড়ির পাশে, যেখানেই নিজেকে আড়াল করে লুকোচ্ছে সেখানেই হাজির হচ্ছে বজ্জাতটা । সোফার উপরে উঠেও রেহাই হলো না । নিচ থেকে দু পায়ে ভর করে দুপা সোফায় তুলে ঘেউ ঘেউ হুমকি দিচ্ছে যেনো ।
মেয়েটা কেঁদে ফেলার দশা । এই বিশ বছরের জীবনে এতো বাজে পরিস্থিতিতে পড়েনি কখনো । অচেনা, অজানা, একটা বাড়িতে আসতে না আসতেই এই অঘটন । তাও আবার যার তার বাড়ি নয় ।
ঢাকা দশ আসনের এমপি #ওয়াহাজ_খানের বাড়ি । ভূমি এ বাড়িতে এসেছে তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড দিশা'র সাথে । এর যথাযথ কারন ও আছে বেশ ।
মেয়েটা ছুটতে ছুটতে হয়রান । প্রথমে সে ছুটছে, পেছনে কুকুর টা, আর তার পেছনে দিশা ।
বাড়ির মধ্যে ঘোরপাক না খেয়ে এবার বাইরের পথ বেছে নিলো ভূমি । বাঁচার চেষ্টায় এলোমেলো কদমে ছুটলো সদরের দিকে ।
চৌকাঠ পেরিয়ে দু কদম এগোতেই পায়ে পা জড়িয়ে ঠাস করে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো শক্ত পাথুরে মেঝেতে ।
তীব্র ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো রমনী । ভয়, আতঙ্কের পাশাপাশি এবারে যন্ত্রণার তোপে চোখের কোণে অশ্রুর আভাস মিললো । ভীষণ অসহায় হয়ে চোখ মুখ খিচে ওষ্ঠ কামড়ে ফিকড়ে উঠলো মেয়েটা ।
দিশা তড়তড়ে কদমে হাঁসফাঁস করে ছুটে আসে । হাঁটু মুড়ে বসে দুহাতে আগলে ধরে মেয়েটাকে ।
" ভূমি ,,, লাগলো তো এখন ? তোকে বললাম ছুটবি না ! শুনিস তুই আমার কথা ? ও #টমি । পোষা কুকুর । ও কি খেয়ে ফেলতো তোকে ? তোর ছোটাছুটি দেখে ও নিজেও দিকভ্রান্ত হয়ে পিছু নিয়েছে তোর । এভাবে ছুটতে গেলি কেনো তুই ?
মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠে চোখ খুললো ।
ভিজে গেছে আঁখি কার্নিশ । পিটপিট করে তাকালো রমনী । পাশে দিশার দিকে তাকানোর আগে সামনের দিকে দৃষ্টি পড়তেই কতকগুলো পদ যুগল চোখে পড়লো । এক জোড়া পা সামনে । বাকি কয়েক জোড়া পেছনে ।
মেয়েটা দেখার তাগিদে মাথা উঁচিয়ে ধীরে ধীরে উপরে তুললো ভেজা চোখ জোড়া । অমনি যেনো আঁতকে উঠলো সে । সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাম্ভিক পুরুষের সূচালো দৃষ্টিতে রমনী কেমন ধক্ করে ওঠে । সেই সুঠামদেহী সুপুরুষ লোকটা স্বয়ং ওয়াহাজ খান । বয়স আটত্রিশের ঘরে । পড়নে ধবধবে সাদা টানটান পাঞ্জাবি পায়জামা । ভরা দুপুর,, তার মাথার উপর তপনের তীর্যক তাপোদাহ ঝিকঝিক করছে । মুখখানা অস্পষ্ট রৌদ্রের ঝিলিকে ।
খুব লক্ষ্য করলে সূর্যের ন্যায় তার তীর্যক দৃষ্টি অবলোকন করা যায় ।
মেয়েটা তার সূক্ষ্ম চাহনির সামনে টিকতে পারে না । ধড়ফড়িয়ে দৃষ্টি নামিয়ে পিছিয়ে যায় । কুন্ঠিত হয়ে উঠে দাঁড়ায় তড়িঘড়ি করে । ঘন ঘন পলক ফেলে নিজেকে সামলে নেয় । চোরা চোখে একবার পেছনে তাকায়, বজ্জাত কুকুর টা নেই । এতেই যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সে ।
দিশা ওর স্বাভাবিক অবস্থা দেখে আর কথা বাড়ালো না । সামন ফিরে গলা নামিয়ে আমতা আমতা করে বললো আগ বাড়িয়ে.....
" বড় মামা,,, তুমি এসে গেছো ?
আ...আসলে,, ও আমার ফ্রেন্ড - ভূমি ! টমি কে দেখে ভয় পেয়ে ছুটতে গিয়ে পড়ে গেছে । আর তেমন কিছু না । তু.. তুমি ভেতরে যাও ।
ওয়াহাজ খানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ভূমির পানে । যেনো চেহারা দেখেই গোটা রমনীকে ভেতর থেকে পড়ে ফেলছেন তিনি । ভূমি অপ্রস্তুত হয় তার চাহনি বুঝে । খানিক আগে এনার সামনেই মুখ থুবড়ে পড়েছে, এটা মনে পড়তেই আড়ষ্ট হলো মেয়েটা । ফ্যাল ফ্যাল করে বোকা হেসে মিন মিন করলো.....
" আ... আসসালামুয়ালাইকুম মামা !
মেয়েটার কথা শেষ হলো কি হলো না, উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলো না ওয়াহাজ খান । ফোঁস করে দম্ভ ভরে পা চালিয়ে চলে গেলো পাশ কাটিয়ে ।
ভূমি অপমান বোধ করে কিছুটা । তবে তা প্রকাশ করে না । লোকটার পিছে কতগুলো দেহরক্ষী । সবাই তাকে সদর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিরে এসে গেইট পেরিয়ে চলে গেলেন । দিশা শ্বাস ফেলে । ভূমিকে টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে.....
" ভাইই,, তুই পারিস ও বটে । একটা পোষা প্রাণীকে দেখে ভয় পায় কেউ ? বোকা কোথাকার । চল ভেতরে !
মেয়েটা ওষ্ঠ উল্টে বলে......
" আমি কি এমনি এমনি ভয় পেয়েছি নাকি ? ও তেড়ে আসলো বলেই তো ছুটলাম । যদি কামড়ে দিতো, তাহলে সূচ ফুটাতো আমার শরীরে । তোর শরীরে নয় । আমি আর ভেতরে যাবো না ভাইইই, তুই যা । আমি চললাম হস্টেলে ।
" সে কি,, তুই এখানে কি জন্য এসেছিস ভুলে গেলি ? তুই তো নানুর সাথেই দেখা করলি না এখনো । চল ভেতরে । নানু তোকে দেখলে ভীষণ খুশি হবে ।
ভূমিকে আর কিছু বলতে দিলো না দিশা । হাত ধরে টেনে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো আবার ।
সিঁড়ি বেয়ে নামছেন পঁয়ষট্টি বছর বয়সী #ওয়াহিদা_খান । এ বাড়ির কর্তী । ওয়াহাজ খানের জননী । বৃদ্ধা স্বামী হারিয়েছেন আরো বহু বছর আগে । তার পর থেকেই সাদা শাড়ি বরন করেছেন অঙ্গে । চোখে মেটালের তৈরি সিলভার ফ্রেমের চশমা । তিনি নিচে নেমে আসতেই দিশা তেড়ে গেলো.....
" নানু,,, এই দেখো কাকে নিয়ে এসেছি । ভূমি,, বলেছিলাম না তোমায় ওর কথা ? দেখো দেখো....
ভদ্রমহিলা চকিতে তাকালেন । দিশার পেছনে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভূমি । তিনি ঠোঁট ঠেলে ভরা গালে হাসলেন !
" আরে বাহ্,, ভূমি ? তোমার কথা অনেক শুনেছি দিশার মুখে । এসো দেখি, কাছে এসো ।
এগিয়ে যায় বিংশী রমনী ।
" ভালো আছেন নানু ?
" খুব ভালো আছি , তা তুমি কেমন আছো ?
" আলহামদুলিল্লাহ ।
" দিশা তো তোমার কথা অনেক বলে । দেখার ইচ্ছে ছিলো তোমায় । ভারী মিষ্টি মেয়ে ।
তা এতক্ষণ নিচে চেঁচামেচি শুনলাম, কি হয়েছিলো ?
ভূমি আড়চোখে দিশার দিকে তাকায় । মেয়েটা মুখে হাত দিয়ে ফিক করে হাসে, বলে....
" আর বলো না নানু,,,, টমিকে দেখে ভয় পেয়ে পুরো মাথায় তুলেছিলো এই মেয়ে ।
ভদ্রমহিলা নরম সুরে বললেন.....
" টমি আমাদের পোষা,, ওকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই । ভার্সিটি থেকে ফিরেছিস । তোরা দুটো গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় । আমি বসছি এখানে ।
দুই রমনী কথা বাড়ালো না । ভূমিকে সাথে উপরে উঠলো দিশা ।
ওয়াহিদা খানের তিন সন্তান,,, বড় মেয়ে #হামিদা । দ্বিতীয়তে ওয়াহাজ খান । আর তৃতীয়তে ছেলে আরো একটা । তার নাম #ওয়াসিফ_খান । ডাকনাম #নিলয় । হামিদার একটাই মেয়ে, ওর নামই দিশা । ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছে । নানু বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করছে এখন । দিশার একটা ছোট ভাই ও আছে ।
ওয়াহিদা খানের দ্বিতীয় সন্তান ওয়াহাজ খান । দাম্ভিক গোছের পুরুষ তিনি । ভদ্রলোক বটে ।
কঠোর দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি হিসেবেই পরিচিত ধানমন্ডির গন্ডি ছাড়িয়ে রাজধানীর অলিতে গলিতে । সবার প্রিয় এমপি সাহেব ।
বিবাহিত তিনি । নয় বছরের ছেলেও আছে একটা । তবে স্ত্রী নেই । বাচ্চা জন্মের সময়ই ত্যাগ করেছেন দুনিয়ার মায়া । বাচ্চার বয়স অনুসারে তার মৃত্যুর ও নয় বছর হয় । স্ত্রীর মৃত্যুর পর ওয়াহাজ খান বিয়ে করেন নি আর । রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন আগে থেকেই । এটাতেই আছেন এখনো ।
দিশার রুমে গিয়ে দুটোতে মিলে ফ্রেশ হয়ে নেয় । অতঃপর নিচে নামে মিনিট বিশেকের মাথায় ।
ভূমির মাথায় হিজাব ছিলো । এখন খুলে আলতো করে ওরনা টেনেছে কপাল পর্যন্ত । সে বেশ স্নিগ্ধ একটা মেয়ে । উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং । বেশ সচ্ছল পরিবারেরই । বেশ কিছুদিন হলো হোস্টেলে উঠেছে । বাড়ি থেকে রোজ রোজ ভার্সিটি আসা যাওয়াতে অনেক ধকল পোহাতে হয় । এখন হোস্টেলেই আছে ।
দিশা সহ সে নিচে নেমেই ওয়াহিদা খানের পাশে বসলো । লাঞ্চের জন্য বাড়ির স্টাফরা একে একে কিচেন থেকে বেরিয়ে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখছেন ।
ভূমি সেদিকে নজর দিলো এক ঝলক । অতঃপর তার ঘোর কাটলো দিশার কথায়.....
" নানু,,, #মিহাজ কোথায় ?
তাৎক্ষণিক উত্তর করলেন ওয়াহিদা খান.....
" ঘরেই আছে । ওয়াহাজ এসেছে থেকে বেরোয়নি আর ।
" ওওও । আচ্ছা নানু, তোমাকে বলেছিলাম না ভূমির কথা ? মিহাজের জন্য তো টিউশন টিচার প্রয়োজন । তুমি খুব ভালো করেই জানো ও কতটা দুষ্টু । বড় মামা ব্যতীত কারোর কথা শুনতে চায় না, ভয়ও পায় না কাউকেই । এ পর্যন্ত যতগুলো টিউশন টিচার এসেছে, ওর জ্বালাতনে একজন ও টিকতে পারেন নি । কেউ বাধ্য করতে পারেনি ওকে । সবাইকে নাকানিচোবানি খাইয়ে ছেড়েছে ঐ বজ্জাত টা । কারোর কথা মানে নি । বড় মামাও এই নিয়ে ওর উপর চটে আছে । আমি বলছিলাম কি, ভূমি মিহাজকে পড়াতে পারবে । ও তো সবে ক্লাস থ্রিতে । ভূমি পারবে ওকে ম্যানেজ করতে । এমনিতেও বছর শেষ হতে চললো প্রায় । আর তিনটে মাস । সামনে মিহাজের পরীক্ষা । নানু,, তুমি বড় মামাকে আজ একটু বলবে এই ব্যাপারে ? একচুয়েলি, ভূমি একা হোস্টেলে থাকে । ওর এমন একটা টিউশন খুব প্রয়োজন নানু । প্লিজ বলবে ?
ওয়াহিদা খান ভূমির দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকান । মেয়েটার দৃষ্টি নত । কেমন ইতস্তত হয়ে গুটিয়ে বসে আছে । ওর হয়ে দিশা এমন কাকুতি মিনতি করছে , এতে অস্বস্তি হচ্ছে মেয়েটার । ছোট লাগছে নিজেকে । কিন্তু এরকম একটা-দুটো টিউশন ওর খুব প্রয়োজন । অন্তত নিজের হাত খরচ টুকু চালাতে পারবে এতে । দিশাই আগে বাড়িয়ে মিহাজের কথা বলেছে । এমনকি সেই টেনে টুনে ভূমিকে এ কারনেই নিয়ে এসেছে এ বাড়িতে ।
ওয়াহিদা খান ভূমিকে প্রশ্ন করেন মোলায়েম কন্ঠে.....
" তোমার বাড়ি কোথায় ভূমি ? বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে থাকছো কেনো একা ?
মেয়েটা বিপাকে পড়লো কিছুটা.....
" নানু,,, আসলে বাড়ি থেকে যাতায়াত খুব অসুবিধা হয় । তাই আগের মাসেই হস্টেলে উঠেছি ।
" ওও । তুমি তো এখনও অনেক ছোট । আসলে কি বলোতো,,, মিহাজ খুব দুষ্টু । ওয়াহাজ কে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না । মান্য করে না কাউকে । এমনকি আমাকেও না । জন্মের পর মাকে পায়নি তো, জেদ খুব ওর । ওকে যে কেউ সামলাতে পারে না । জেদ করে পড়তেও চায় না ।
" সমস্যা নেই নানু । আমি পড়াতে পারবো ওকে । আমি বাড়িতেও অনেক বাচ্চাকে টিউশনি পড়িয়েছি । বিশ্বাস করুন, আমি পড়াতে পারি । একবার চেষ্টা করতে পারি । আচ্ছা মিহাজ কোথায় ? ওর সাথে একবার দেখা করলেই বুঝে যাবো । আমাকে ফ্রি হতে হবে ওর সাথে ।
মেয়েটার ছটফটে স্বর । আকুলতা জবানে ।
ওয়াহিদা খান পাল্টা কিছু বলার আগেই সিঁড়ির দিকে নজর পড়লো ।
দম্ভভরে পা চালিয়ে নেমে আসছেন ওয়াহাজ খান । বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়েছেন । পড়নে ভিন্ন সেই সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা ।
তার ডান হাতের মুঠোয় চেপে রাখা একটা বাচ্চার হাত । বাচ্চাটা নত । মাথা নামিয়ে বাপের সাথে পা মিলিয়ে নিচে নামছে ।
উঠে দাঁড়ালেন ওয়াহিদা খান । এখন দুপুরে খাওয়ার সময় । আশপাশ না তাকিয়ে ছেলেকে নিয়ে সোজা খাবার টেবিলে বসলেন ওয়াহাজ খান ।
ওয়াহিদা খান ও এদিক থেকে মনযোগ ফিরিয়ে টেবিলের দিকে এগোলেন । ডাকলেন.....
" দিশা,,, ওকে নিয়ে এসো । খেয়ে নাও আগে । পরে বাকি কথা হবে ।
তাৎক্ষণিক হাত নেড়ে বাঁধ সাধে বিংশী রমনী.....
" না নানু,, আমি খাবো না । ফিরতে হবে আমায় । হোস্টেলে মিল দেওয়া আছে,, আমি গিয়ে খেয়ে নেবো ।
দিশা ওর হাত খানা খপ করে চেপে ধরলো ! চাপা স্বরে বললো.....
" চুপচাপ খেয়ে নিবি চল । বড় মামা রেগে যাবে নয়তো । এখন লাঞ্চের সময় । কথা বলিস না, চল....
মেয়েটাকে এক প্রকার টেনে নিয়ে গেলো সে । বসালো চেয়ার টেনে । বিশাল বড় ডাইনিং টেবিল । গোটাটাই ফাঁকা । টেবিলের খাবার সাজিয়ে একেকজন স্টাফ নতজানু হয়ে কিচেনে ঢুকেছেন । এই অবধি তাদের কাজ শেষ । এখন নিজেদের প্লেটে খাবার সার্ভ করে নেওয়া যার যার কাজ । এটা অবশ্য ওয়াহাজ খানের তৈরি একটা রুলস । এ বাড়িতে তার ধাপে ধাপে অনেক রুলস রয়েছে ।
পাঁচজন ব্যাতীত গোটা টেবিলে আর কেউ নেই । ভূমি গুটিসুটি মেরে বসে আছে । দিশা নিজে থেকে ওর প্লেটে খাবার বেড়ে দিলো । ভূমির নজর তখন মিহাজের দিকে । বাচ্চাটা তখন থেকেই মাথা নামিয়ে রেখেছে । পাশের চেয়ারে বসে একই ভাবে মাথা নামিয়ে গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে খাচ্ছেন ওয়াহাজ খান ।
মিহাজের প্লেটে প্রোটিন স্যালাড ব্যাতীত আর কিছু নেই । বাচ্চাটা বাপের ভয়ে নাক সিটকে সেগুলোই মুখে তুলছে কোনো রকমে । এটা ওর পানিশমেন্ট । আরো চারদিন একই পানিশমেন্ট চলবে । কোনো এক অবাধ্যতার কারনে এক সপ্তাহের শাস্তি দেওয়া হয়েছে ওকে । দুপুরে প্রোটিন মিক্সড স্যালাড ব্যাতীত আর কিছুই খেতে পারবে না সে ।
সামনে বাটিতে বাটিতে কতশত খাবার সাজানো । মাছ মাংস ডিম সব আছে । মিহাজ বাকিসব পছন্দ না করলেও ডিম খেতে বেশ পছন্দ করে ।
এখন ক্ষণে ক্ষণে চোরা দৃষ্টিতে সামনে তাকাচ্ছে বাচ্চাটা । ডিমের অমলেট সামনেই । তবে খাওয়ার উপায় নেই । অসহায় লাগছে নিজেকে । ওয়াহাজ পাশে আছে, কিছু বলতেও পারছে না । এই অখাদ্য স্যালাড নামছে না গলা দিয়ে । লোলুপ দৃষ্টি বারবার আছড়ে পড়ছে ডাবল ডিমের অমলেটের পানে ।
ভূমি খাওয়ার মাঝে ওর এমন চোরা চোরা কান্ড দেখে ফিক করে হাসলো ।
সরল মেয়েটা মাতব্বরি করে বসলো আগ বাড়িয়ে । একটা ডিমের অমলেট মিহাজের প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললো আদুরে গলায়.....
" অমলেট পছন্দ তোমার ? তো বলছো না কেনো ? দেখো, আমি ঠিক বুঝে গেছি । খেয়ে নাও এটা । শুধু স্যালাড খেয়ে হয় ? নিজের পছন্দ অপছন্দের কথা বলতে হয় , বুঝেছো ? আর কি নেবে,,, অমলেট আর স্যালাড খাবে শুধু ?
একাধারে বাক্য গুলো খসিয়ে থামলো মেয়েটা । বসলো নিজের জায়গায় ।
এদিকে পাতে অমলেট পড়তেই তাৎক্ষণিক মিহাজ চোখ তুলে চায় । বাচ্চাটার এই প্রথম চোখাচোখি হয় ভূমির সাথে । মুচকি হাসে ভূমি ।
দিশা গলা খাঁকারি দেয় । আমতা আমতা করে....
" ভূমি, তুই বস । নিজেরটা খেয়ে নে.....
ওদিকে ওয়াহাজ খান চোয়াল শক্ত করেছেন । তবুও বললেন না কিছু । মিহাজ বোধহয় মনে মনে খুশি হলো । স্যালাড ছেড়ে অমলেট টাই খেতে লাগলো সবার আগে ।
আড়চোখে ছেলেকে দেখেন ওয়াহাজ খান । তপ্ত জবান খোলেন মায়ের উদ্দেশ্যে.....
" কে ও ?
এই প্রথম তার কন্ঠ শুনলো ভূমি । স্পষ্ট বাক্যে খাওয়ার মাঝে আকস্মিকই কেমন কেঁপে উঠলো মেয়েটার তন্বী । চট করে দৃষ্টি তুলে তাকালো ।
উত্তর করলো দিশা.....
" মামা,, বললাম না তখন ? ও আমার ফ্রেন্ড, ভূমি !
" তোমার ফ্রেন্ড,, মাতব্বরি করতে বারন করো তাকে । আমার এসব পছন্দ নয় । বলে দিও ।
ভূমি ফের শিহরিত হয় ।
কেমন করে তাকায় । লোকটার গলার স্বর বেশ সুন্দর । কানে বাজলো । মেয়েটা চোখ সংযত করে, অতঃপর বলে নিজেকে সামলে.....
" আমি কিছু ভুল করলাম, মামা ?
ছেলের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ওয়াহিদা খান মুখ খুললেন সোজাসুজি.....
" ওয়াহাজ,,,আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম । মিহাজের সামনে পরীক্ষা । ওর টিউশন টিচার প্রয়োজন । যে ওকে রোজ বাড়ি এসে পড়াবে । পরীক্ষা অবধি ভূমি ওকে পড়ালে কেমন হয় ? ভূমি তো হোস্টেলে থাকছে । হোস্টেল থেকে এসে এসে ও পারবে দাদু ভাইকে পড়াতে ।
" হোয়াট ? শহরে টিচার কম পড়েছে,, যে এই চুনোপুঁটি আমার ছেলেকে পড়াবে ?
ওয়াহাজ খানের কিছুটা গম্ভীর স্বর । তিনি চোখ তুলে চাইলেন মায়ের দিকে । ভূমি অবাক হয় । তাৎক্ষণিক বলে......
" মামা,, আমি চুনোপুঁটি নই । আমার বয়স বিশ । দেখতে ছোট হতে পারি । কিন্তু বিশ্বাস করুন, অভিজ্ঞতা আছে আমার । এর আগেও অনেক টিউশনি করিয়েছি আমি ।
দিশা ফিক করে হাসে ।
ওয়াহাজ খান তাকালেন না । ফের চোখ নামিয়ে খাওয়ায় মনযোগ দিলেন । ছেলের নীরবতায় দ্বিমত বুঝতে পারলেন ওয়াহিদা খান । দিশাও বুঝতে পারলো । মুখ খুললো এবারে.....
" মামা,,, ভূমি পারবে ভাইকে পড়াতে । আসলে ওর হাত খরচের জন্য একটা কাজ প্রয়োজন । এই বড় শহরে একলা কোথায় কি করবে মেয়েটা ? আমিই ওকে বলেছি মিহাজ কে পড়ানোর কথা । একচুয়েলি ওর সৎ মা....
ভূমি তাৎক্ষণিক দিশার হাত চেপে ধরে । থামিয়ে দেয় মেয়েটাকে । ওয়াহাজ খান খাওয়ার মাঝে থামলেন । ওয়াহিদা খান শুধালেন....
" বাকিটা বলো ?
দিশা ভূমির বারন উপেক্ষা করে বলে গড়গড়িয়ে.....
" ভূমির আপন মা নেই । বাবা আর সৎ মা আছে । ওর সৎ মা ওকে দেখতে পারে না । এতো দিন বাড়িতে ছিলো, তাই সবসময় বিয়ে দিয়ে বিদায় করতে চাইতো ওকে ! কিন্তু ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর ওর বাবা ওকে পড়ানোর জন্য হোস্টেলে পাঠিয়েছেন । যাতে ও ওর সৎ মার থেকে দূরে থাকতে পারে । কিন্তু এখন ওর বাবার জব নেই । রিটায়ার্ড তিনি । সংসার চালানো, ভূমির পড়াশোনা, ওর ছোট বোনের পড়াশোনা, সব মিলিয়ে একটু চাপে পড়েছে ওরা । তার উপর ওর ঐ জল্লাদ মা ওর বাবাকে ভূমির জন্য টাকা পাঠাতে দেন না ।
তাই ভূমি চাইছিলো নিজের খরচ নিজে চালাতে । যতদিন না পড়াশোনার পাশাপাশি একটা ছোট পার্ট টাইম জব পায় , ততদিন ওর কিছু একটা করতে হবে । আমিই ওকে এই টিউশনের কথা বলেছি তাই । প্লিজ মামা,, ভাইতো এখনো ছোট । ওকে পড়াতে খুব একটা ডিগ্রি অর্জনের প্রয়োজন নেই নিশ্চয়ই । একবার ভেবে দেখো....
ভূমির মাথা নত ।
কুঞ্চিত হলো সে । দিশা থামতেই নিমিষেই থমথমে পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়লো । ওয়াহিদা খান সামলালেন.....
" ভূমি,, মাথা নত করছো কেনো ? আমরা আমরাই তো ! অপ্রস্তুত হওয়ার কিছু নেই মা । যাই হোক,, যতদিন না পার্ট টাইম কিছু করতে পারছো ততদিন দাদু ভাইকে পড়াবে তুমি । আমি পারমিশন দিচ্ছি । তোমার হাত খরচের জন্য যা লাগে, তোমাকে তাই দেওয়া হবে ।
ভূমি কিচ্ছুটি বললো না । মাথাও তুললো না । প্লেটের বাকি খাবার টুকু মুখে রুচবে না আর । মেয়েটা কাষ্ট হাসে । উঠে দাঁড়াতেই ভেসে আসে রাশভারী কন্ঠ....
" দিশা,,, তাকে বলে দাও, খাবার নষ্ট করা আমার পছন্দ না ।
তাৎক্ষণিক থমকে যায় রমনী । তাকায় কপাল গুটিয়ে । লোকটা তখনো নতজানু । তবুও বুঝলো কি করে, যে সে খাওয়া ফেলে উঠছে ?
দিশা চোখের ইশারায় বলে.....
“ বস , বাকিটা খেয়ে নে । বড় মামা রেগে যাবে নয়তো ।
দ্বিধা সত্ত্বেও বসলো ভূমি ।
ওয়াহাজ খানের খাওয়া শেষ । ছেলের দিকে তাকালেন তিনি । দুপুরে প্রোটিন মিক্সড স্যালাড ব্যাতীত মিহাজকে আর কিছু খাওয়ানো হতো না । কিন্তু আজ এই মেয়ে মাতব্বরি করেছে । যেটা তার পছন্দ নয় । মেজাজ চড়ে গেলেও স্বভাবের বশে ঠান্ডা রইলেন ভদ্রলোক । খাওয়া শেষ বাপ ছেলের । তিনি ছেলেকে নিয়ে গটগটিয়ে উপরে উঠে গেলেন ।
দিশা হাঁফ ছাড়ে বুক ফুলিয়ে ।
" নানু,, তোমার ছেলেটা এতো গম্ভীর হয়েছে কেনো হ্যাঁ ? সামনে থাকলে দম নিতেও পারি না ঠিকমতো । এখন ভূমি কি ভাইকে পড়াবে ? মামা তো কিছুই বললো না !
ভদ্রমহিলার উত্তর.....
" দ্বিমত থাকলে সোজাসুজি বারন করে দিতো । আমি যখন বলেছি, তখন ওয়াহাজ আমার কথার হেরফের করবে না । ভূমি পড়াবে দাদু ভাইকে । ভূমি, কবে থেকে আসবে ?
মেয়েটা চিকচিক করে ওঠে....
" নানু,, কাল থেকে পড়াই ?
ভার্সিটি থেকে হোস্টেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেবো, তারপর তিনটে থেকে পাঁচটা অবধি পড়াবো মিহাজকে । তারপর সন্ধ্যার আগে আগে হোস্টেলে ফিরতে পারলেই হলো । আর কোনো ঝামেলা নেই । দু ঘন্টা পড়ালে হবে না ?
" আলবাত হবে !
দিশার উত্তর ।
ভূমি উদ্বিগ্ন হয় মনে মনে । বুক থেকে বিশাল এক ভার নামলো বোধহয় । ইশশ্, এখান থেকে যে টাকাটাই আসবে, সেটা হলেই অনেক কিছু হবে । অন্তত নিজের খরচ টুকু চলবে । বাবার পেনশনের টাকায় ঘাটতি হবে না এই অনেক । তাকে আর হাত পেতে টাকা চাইতে হবে না পরিবারের কাছে ।
★
হোস্টেলে ফিরে রাতের দিকে পড়তে বসেছিলো ভূমি । আঁকুপাঁকু লাগছে । শান্তি হচ্ছে না কিছুতেই । খানিক আগেও বাড়ি থেকে ফোন এসেছিলো । ভূমির সৎ মা, অর্থাৎ #নিলুফা_নাজমিনের চেঁচামেচি শোনা গেলো কথার মাঝে । বাবার সাথে কথা বলছিলো মেয়েটা । ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা কি কি বলছিলেন কে জানে । ভূমি যতটুকু বুঝলো, সেই অনুযায়ী ওকে বাড়ি ফিরতে বলা হচ্ছে । কিন্তু #আহাদ_আলি মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে নেবেন না এখন । তিনি একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার । গত বছর অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন । তখন থেকেই পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পেরেছেন,,, তার মেয়েটা সৎ মায়ের ঘরে ভালো ছিলো না । এখন অনেক ভাবনা চিন্তার পর মেয়েকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে বাইরে রেখেছেন । আর যাই হোক, মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করতে চান তিনি ।
নিলুফা নাজমিনের আঁচ থেকে আপাতত দূরে আছে মেয়েটা । তবুও হাজার দ্বিধায় ভুগতে হয় । হাত পেতে টাকা চাইতে গেলে ইতস্তত লাগে ।
আর সে কারনেই একটা পার্ট টাইম জবের প্রয়োজন ছিলো মেয়েটার । ভাগ্যিস দিশা এই টিউশনির কথা বললো ।
ভাবতে গিয়ে বুক ফুলিয়ে দম ছাড়লো ভূমি ।
ওর রুমমেট নেই আপাতত । বাড়িতে গেছে । গোটা ঘরে মেয়েটা একা । নয়টা বাজতে না বাজতেই শুয়ে পড়লো আজ । ভার্সিটি আছে পরদিন ।
,,,,,
আজ দুপুরের দিকে ভার্সিটি শেষ হয় ওদের । রোজ রোজ বাড়ি থেকে দিশাকে গাড়ি ড্রপ করে নিতে আসে । আজও এসেছে । গেটের বাইরে দাঁড়ানো গাড়িটাতে উঠলো দু'জনে । ভূমি চেয়েছিলো হস্টেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তারপর খান বাড়িতে যাবে । কিন্তু দিশার জোরাজুরিতে তা আর হলো না । এই পথেই সোজা রওনা দিলো দু'জনে । গাড়ি স্টার্ট করতেই ভূমিকে চেপে ধরে হাজার কথা জুড়ে বসলো মেয়েটা । বেশ ভালোই বকবক করতে জানে দিশা । আপাতত মিহাজের সম্পর্কে বলছে এটা ওটা । আজ থেকে ভূমির কাঁধে বিরাট বড় দায়িত্ব । মিহাজের মতো খচ্চর কে সামলাতে হবে, মানিয়ে গুছিয়ে পড়াতে হবে । সে তো আবার পড়তে চায়না । ভূমি ছোট মানুষ,, এর কথা শুনবে কিনা কে জানে । বেশ তটস্থ হয়ে গেছে মেয়েটা ।
এক ধ্যানে পকর পকর করতে গিয়ে আকস্মিক ড্রাইভিং সিটের দিকে মনযোগ পড়লো দিশার । অমনি থতমত খেলো সে । ড্রাইভিং সিটে ড্রাইভার নেই । আছে ওয়াহাজ খানের এসিস্ট্যান্ট #অরিধ_জাওয়াদ । চোখে কালো রোদ চশমা । পড়নে ফিটফাট ফর্মাল পোশাক । চমকে ওঠে দিশা । গাড়িতে ওঠার সময় ড্রাইভারের দিকে লক্ষ্য দেওয়া হয় নি । এখন ড্রাইভারের জায়গায় এনাকে দেখে হুবড়ি খেয়ে সামনের দিকে এগোয় মেয়েটা । ছটফট করে বলে....
" এ কি,, জাওয়াদ সাহেব যে ? ড্রাইভার আসেনি আজ ! আপনি এসেছেন ?
অরিধ বেশ গুরুগম্ভীর একটা ছেলে । কাজ ব্যাতীত কোনো দিকেই ফোকাস থাকে না তার । ওয়াহাজের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট সে । দিশার সাথে ওর চেনা পরিচয় এই সূত্রেই । অল্প বয়স তারও । হবে ছাব্বিশ কি সাতাশ । ওয়াহাজের সাথে যুক্ত আছে বছর দুয়েক ধরে । শ্যাম বর্ণের সুদর্শন যুবক বলা চলে । দাম্ভিকতা টা তার সৌন্দর্য কে বাড়িয়ে তোলে দ্বিগুণ ।
দিশার প্রশ্ন টাকে অহেতুক ধরে উত্তর করলো না সে । মেয়েটা মুখ মলিন করে ।
" কথা বলছেন না কেনো ? আজ হঠাৎ মামার পিছু ছেড়ে আমাদের ড্রপ করতে আপনি আসলেন যে ?
" মেয়র সাহেব পাঠিয়েছেন ।
ছেলেটার তিন শব্দের রাশভারী উত্তর । দিশা পিছিয়ে বসে । হাসি হাসি মুখে পরিচয় করায়.....
" জাওয়াদ সাহেব,, দেখুন ও আমার ফ্রেন্ড ভূমি ।
আর ভূমি, উনি হলেন অরিধ জাওয়াদ । বড় মামার এসিস্ট্যান্ট ।
ভূমি বোকার মতো হাসে । মুখ ফসকায় ভুল করে....
" তারমানে উনি অরিধ মামা ?
তাৎক্ষণিক বিষম খেলো দিশা । তড়াক করে অরিধের দিকে চাইলো । পরক্ষণে ভূমির দিকে । খেইখেই করে বললো.....
" ভাই,,, ওনাকে দেখে কোন দিক দিয়ে মামা মনে হচ্ছে তোর ? উনি মামা টাইপ ?
" তো ? মামার এসিস্ট্যান্ট,,, ঐ মামাই তো হলো !
" চুপ কর ভাইইই,,, মামা না । অন্যকিছু বলে ডাকবি ।
" কি শুনি ?
দিশা ওষ্ঠপূটে দাঁত বসায় । ফ্রন্ট মিররে কপালে ভাঁজ বিশিষ্ট যুবকের পানে চেয়ে বিড়বিড় করে....
" দুলাভাই বলতে পারিস !
" হ্যাঁ ?
" ওওও কিছু না । ভাইয়া বলে ডাকবি ।
ঘাড় ঝাঁকায় ভূমি ।
খান বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর আড়াইটা বেজেছে প্রায় । অরিধ ওদের দুজনকে নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেছে আবারো ।
দিশা আর ভূমি ভেতরে ঢোকে । সোজা এগোয় সিঁড়ির দিকে । মিহাজের ঘরটা আগের দিন দেখেছে ভূমি । দিশা নিজের রুমে ঢুকলেও সে ডিরেক্ট মিহাজের রুমে ঢুকলো । গোছানো পরিপাটি একটা ঘর । পড়ার টেবিলে বসে আছে মিহাজ । আগে থেকেই পড়ার সময় জানানো হয়েছে ওকে । খানিক আগে ওয়াহিদা খান পড়ার টেবিলে বসিয়ে গেছেন ।
বাচ্চাটাকে শান্ত ভাবে টেবিলে বসে থাকতে দেখে মুচকি হাসলো ভূমি । কে বলে এই বাচ্চাটা দুষ্টু ? বেশ শান্তই তো । আগের দিন ও একটা কথা বলতে দেখেনি ওকে । আজও ভদ্র হয়ে পড়ার টেবিলে বসে আছে ।
ভূমি এগিয়ে গেলো । ডাকলো মোলায়েম কন্ঠে.....
" হায় মিহাজ !
চোখ তুললো না মিহাজ । ভূমি আবার বলে...
" মিহাজ, আমি তোমার নতুন টিচার । চিনতে পেরেছো ? কাল দেখলে তো আমায় ! আচ্ছা শোনো,,, পরীক্ষার আগ অবধি আমিই পড়াবো তোমাকে । ওয়েলকাম করো ।
চোখ তুলে চাইলো বাচ্চাটা । বাপের মতোই তীক্ষ্ণ চোখ তার । ঝট করে উঠে দাঁড়ালো ।
বুকে হাত গুটিয়ে বড়দের মতো করে বললো ভারী গলায়....
" পড়বো না আমি ।
" ও মা,, কেনো ?
" পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না । আপনি চলে যান ।
ভূমি মৃদু হাসে । হাঁটু মুড়ে বাচ্চাটার সমান হয় । নাকে আলতো টোকা মেরে বলে ফিসফিস করে.....
" তুমিই জানো, পড়াশোনা আমার ও ভালো লাগতো না । তুমি আর আমি সেম সেম । খুব বোরিং এই পড়াশোনা, তাই না ?
চোখ সরু করে মিহাজ । এই মেয়ের মতলব বুঝতে পারছে না সে । নরম আছে, কারন কাল এই মেয়েটার জন্যই ডিম খেতে পেরেছিলো । নতুবা এতক্ষণে কেলেঙ্কারি কিছু ঘটিয়ে বিদায় করতো এটাকেও ।
তবুও বললো আঙুল তুলে......
" বাবাকে বলে দেবো !
" কি বলবে ?
" পড়াশোনা কে বোরিং বলেছেন আপনি !
" তো বোরিংই তো !
" তাহলে আমাকে পড়াতে এসেছেন কেনো ?
ভূমির কন্ঠ নেমে আসলো আরো বেশি । ফিসফিস করলো....
" পড়াতে আসিনি ।
তোমাকে পানিশমেন্ট থেকে বাঁচাতে এসেছি । বাবা পানিশমেন্ট দেয় খুব, তাই না ? দিশা বলেছে আমায় । আচ্ছা শোনো,,, আমি তোমার দিশা আপুর ফ্রেন্ড । আমাকেও আপু বলবে, ওকে ? ওসব টিচার-ফিচার মানতে হবে না । তুমি নাকি টিচার দের জ্বালাতন করো খুব ? আমাকেও জ্বালাতন করবে ?
মিহাজ সরে আসলো । বিছানার একপাশে উঠে বসলো । কিছুতে কান না দিয়ে মুখ থমথমে করে আবার বললো....
" পড়বো না আমি । আপনি যান ।
" উঁহু, তুমি যদি এক্ষুনি পড়ার টেবিলে আসো, তাহলে ডাবল ডিমের অমলেট করে নিয়ে আসবো তোমার জন্য ! আজও লাঞ্চে ওসব স্যালাড খেয়েছো, তাই না ?
হকচকিয়ে তাকালো মিহাজ ।
" আর ইউ টেম্পটিং মি ?
" একদম না ।
চলে এসো,,, বসো টেবিলে ।
" নো !
" শুনবে না আমার কথা ?
আচ্ছা তুমি বসো,, আমি নানুকে বলে তোমার ফেভারিট কিছু বানিয়ে আনছি । পড়তে পড়তে খাবে, ওকে । বড় মামা, আই মিন তোমার বাবা বাড়িতে নেই । চুপিচুপি খেয়ে নিও । বসো,,, আমি আসছি এক্ষুনি.....
লোভ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরোলো ভূমি ।
মিহাজের বিষয়ে যতটুকু জেনেছে, ওকে সোজা কথায় কিংবা ভয় দেখিয়ে বশ করা যাবে না । লোভ দেখালে মন্দ হয় না । ভূমি মনে মনে ফন্দি আঁটে । ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার সামনেই ঠাস করে খাম্বা মতো কিছু একটার সাথে ধাক্কা খায় মেয়েটা ।
#চলবে........
#সূচনা_পর্ব
#আমি_তোমার_হতে_চাই
#সুরভী_আক্তার
