অবাধ্য ভালোবাসা
— তুই আমার কথাটা শুনছিস?
কথাটা শুনেও মেয়েটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে সে। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের কপালে এসে পড়া চুলগুলো সরিয়ে নিল।
মাঝারি গড়নের মেয়েটির গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। কোমর ছুঁয়ে থাকা ঘন কালো চুল, বড় টানা চোখ আর ঘন ভ্রুতে মুখটা বেশ মায়াবী।ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা তিল আছে, যেটা তার মুখের আলাদা সৌন্দর্য।
তার পরনে আকাশি নীল রঙের সুতির কামিজ, সাদা সালোয়ার আর সাদা ওড়না। হাতে রুপালি ঘড়ি, কানে ছোট্ট মুক্তোর দুল। সাজ বলতে এতটুকুই।
— এই মেয়ে! কানে কি তুলা দিয়েছিস?
এবার মেয়েটি আয়না থেকে চোখ সরিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
— কী হয়েছে, ভাইয়া?
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার ছেলেটি রাগী গলায় বলল,
— আমার শার্টটা কোথায় রেখেছিস?
— তোমার শার্ট আমি কোথায় রেখেছি, সেটা আমি জানব কীভাবে?
— কাল তোকে বলেছিলাম আমার ঘরে রাখতে!
— বলেছিলে, কিন্তু আমি কি তোমার ব্যক্তিগত আলমারি?
ভাইয়ের মুখ দেখে মেয়েটির হাসি পেল। তবে হাসিটা প্রকাশ করল না। বরং চিরুনিটা টেবিলে রেখে গম্ভীর মুখে বলল,
— নিজের জিনিস নিজে গুছিয়ে রাখতে শেখো।
— তোর সঙ্গে কথা বলাই বৃথা!
— তাহলে কথা বলো না। সহজ হিসাব।
ছেলেটি কিছুক্ষণ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে চলে গেল।
মেয়েটি আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল। মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠেছে।
নিচতলা থেকে একটি মহিলার ডাক ভেসে এল।
— আহিয়া, নাশতা করতে আয় মা!
— আসছি, আম্মু!
ওড়নাটা ঠিক করে ঘর থেকে বের হলো মেয়েটি।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই রান্নাঘরের সামনে মাকে দেখা গেল। পরনে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি, কপালে ছোট্ট লাল টিপ। চুলগুলো সুন্দর করে খোঁপা করা। মুখে সবসময়কার সেই মায়াভরা হাসি।
— এতক্ষণ লাগে তৈরি হতে?
— আম্মু, আমি কি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি নাকি?
মা হেসে বললেন,
— তোর কথার সঙ্গে পারা যায় না।
আহিয়া মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। টেবিলে রাখা খাবারের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইয়া কোথায়?
— তোর ভাই তো খেয়ে বেরিয়ে গেছে।
— বাহ! আমাকে না ডেকেই?
— তুই তো তখন আয়নার সামনে ব্যস্ত ছিলি।
মেহের মুখ বাঁকাল।
— সবাই শুধু আমার দোষই দেখে!
মা মেয়ের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে মুচকি হাসলেন।
ঠিক তখনই আহিয়ার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
মেহের ফোনটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
— কে ফোন করেছে মা?
আহিয়া ফোনের স্ক্রিনটা মায়ের কাছ থেকে আড়াল করে বলল,
— কেউ না।
কলটা কেটে গেল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার ফোন বেজে উঠল।
এবার আহিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— আম্মু, আমি একটু আসছি।
ফাহিমা বেগম অবাক হয়ে মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আহিয়া বারান্দায় গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই আহিয়ার মুখের ভাব বদলে গেল।
— কী বলছিস তুই?
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আহিয়া ধীর গলায় বলল,
— ঠিক আছে। আমি আসছি।
ফোনটা কেটে দিয়ে সে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল।
সদ্য হাসিখুশি মেয়েটার মুখে এখন আর হাসির ছিটেফোঁটাও নেই।
কী এমন কথা শুনল আহিয়া, যার জন্য মুহূর্তেই বদলে গেল তার মুখের অভিব্যক্তি?
চলবে…
