🌸আমার শখের পিচ্চি বউ 🌸
লেখিকা: ইসমত জাহান জেনিফা
পর্ব—১
সকালবেলা।
জিনিয়াদের তিনতলা বাড়িটা যেন প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ততায় ভরা। বাড়ির চারপাশে সুন্দর একটা পরিবেশ। ভেতরে পরিবারের সবার ছোটাছুটি, কারও স্কুলে যাওয়ার তাড়া, আবার কেউ সকালের নাশতা নিয়ে ব্যস্ত—সব মিলিয়ে সকাল থেকেই বাড়িটা বেশ জমজমাট।
আজ স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও জিনিয়ার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বরং সে নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গান শুনতে শুনতে সাজগোজে ব্যস্ত।
এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে ফারিয়া বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও জিনিয়ার কোনো দেখা নেই।
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে ফারিয়া নাজমা বেগম খানের কাছে গিয়ে বলল,
— আন্টি, জিনিয়া এখনো রেডি হয় নাই?
নাজমা বেগম খান হেসে বললেন,
— দেখো, হয়তো এখনো রেডি হচ্ছে।
ফারিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— আজকে আমি জিনিয়াকে মাইরা ফেলবো। ও প্রতিদিন দেরি করে!
নাজমা বেগম খান মজা করে বললেন,
— আসতে যা, পড়ে যাবি তুই!
ফারিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— কেন যে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড হতে গেলাম!
অন্যদিকে জিনিয়ার ঘরে তখন পুরোদমে গান বাজছে। জিনিয়া কানে গান শুনতে শুনতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জোরে জোরে নিজেও গান গাইছে।
— “পাতার বাঁশরী পায়েতে ধরি
বাজনা বাজনা এমন,
আগুনে জ্বলি, আমি কি করে বলি
হারালে কি খুঁজে পাবো মন।
বাঁশি আমারে কেবল
মারে বিরহ ছোবল,
বাঁশি আমারে কেবল
মারে বিরহ ছোবল,
কেন কানামাছি কেন এত জ্বালাতন।
চির অভাগী, তোমার লাগি
মরার আগে হয়েছে মরণ,
আগুনে জ্বলি, আমি কি করে বলি
হারালে কি খুঁজে পাবো মন।
আমি হারালে কি খুঁজে পাবো মন...
আমি হারালে কি...”
ঠিক তখনই আর সহ্য করতে না পেরে ফারিয়া জিনিয়ার ঘরে ঢুকে পড়ল।
গান বন্ধ করে দিয়ে রাগী চোখে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই এখানে গান গাচ্ছোস! আমি তোকে এতবার এত কল দিছি, তুই একটা কলও ধরস নাই!
জিনিয়া বিরক্ত চোখে ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কোন বেয়া*দবটা আমার গান বন্ধ করলো!
ফারিয়া আরও রেগে গিয়ে বলল,
— আমি বেয়াদব, তাই না? তুই বেয়াদব! তোর চৌদ্দগুষ্টি বেয়া*দব!
জিনিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
— তুই কখন আসছিস? আমাকে তো বলস নাই আসবি!
ফারিয়া এবার শান্ত গলায় বলল,
— ম্যাম, আপনি একটু আপনার ফোন চেক করবেন? আমি কয়টা কল দিছি সেটা দেখার জন্য।
জিনিয়া নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একের পর এক ফারিয়ার মিসড কল দেখে সে একটু লজ্জা পেল।
তারপর মিষ্টি করে বলল,
— সরি দোস্ত। আসলে আমার মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিল, তাই দেখি নাই। প্লিজ, এবারের মতো মাফ করে দে।
ফারিয়া হতাশ মুখে বলল,
— আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এখন তুই তাড়াতাড়ি রেডি হ। ক্লাস বসে যাবে, যাইতে যাইতে দেরি হয়ে যাবে।
জিনিয়া আবার আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আর একটু ওয়েট কর, আমার হয়ে গেছে।
ফারিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— আরে জিনিয়া, তাড়াতাড়ি আয়! দেরি হয়ে যাচ্ছে!
জিনিয়া ব্যাগটা হাতে নিতে নিতে বলল,
— তুই বেশি কথা বলসো! দেরি হলে কী হবে? তোর মতো নরমাল হয়ে আমি স্কুলে যাব? কখনো না! আমার একটা মান-সম্মান আছে না!
ফারিয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
— তোর এই মান-সম্মানের জন্যই তো প্রতিদিন আমাদের দেরি হয়!
জিনিয়া হেসে ফেলল।
তারপর দুই বান্ধবী একসঙ্গে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
🌸 জিনিয়ার পরিচয়
আমি জিনিয়া।
আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বয়স ১৪ বছর । ছোটবেলা থেকেই আমি একটু দুষ্টু আর চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে। সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা, বন্ধুদের সঙ্গে দুষ্টুমি আর নতুন নতুন কাণ্ড করা—এগুলো যেন আমার নিত্যদিনের কাজ।
আমার বাবা জুবায়ের খান আর মা নাজমা বেগম খান।
আমরা তিন বোন। আমার বড় বোনের নাম সায়রা খান। আমি আমাদের পরিবারের মেজো মেয়ে। আর আমার ছোট বোনের নাম রাইসা খান।
আমাদের পরিবারটা বেশ বড়। আমার জ্যাঠার নাম রফিকুল খান আর জ্যাঠীর নাম রেহেনা খান। তাঁদের দুই ছেলে রায়হান খান ও রাফি খান। ওরা আমার জ্যাঠাতো ভাই।
আবার আমার চাচার নাম হাসান খান আর চাচীর নাম লিপি খান। তাঁদের এক মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়ের নাম হুমাইরা খান আর ছেলের নাম হামিদ খান। ওরা আমার চাচাতো ভাই-বোন।
আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িটা সবসময় হাসি-আনন্দে ভরা থাকে। কারও সঙ্গে কারও খুনসুটি, আবার কখনো ছোটখাটো ঝগড়া—সব মিলিয়ে আমাদের পরিবারটা বেশ জমজমাট।
আর এতক্ষণ যে মেয়েটা আমাকে তাড়া দিচ্ছিল, সে আমার ছোটবেলার বান্ধবী এবং আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু—ফারিয়া।
ফারিয়া দেখতে অনেক সুন্দর। তবে ও আমার মতো এতটা চঞ্চল না। ও একটু শান্ত স্বভাবের। তার ওপর ওর একটা বয়ফ্রেন্ডও আছে। তাই ও সবসময় একটু নরমালভাবেই চলাফেরা করে।
আরে! এতক্ষণে ওর নামটাই ঠিকমতো বলা হয়নি!
ওর নাম ফারিয়া।
ছোটবেলা থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। ঝগড়া করি, আবার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে যাই। একজন ছাড়া আরেকজনের দিনই যেন কাটে না।
কথা বলতে বলতে কখন যে আমরা স্কুলে চলে এসেছি, বুঝতেই পারিনি।
স্কুলে ঢুকেই আমরা আমাদের বন্ধুদের কাছে চলে গেলাম।
জিনিয়া হাসতে হাসতে বলল,
— কিরে, কী খবর তোদের?
সামিয়া বলল,
— এই তো ভালো। তোরা আজকে এত দেরি করছোস যে!
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— আর বলিস না ভাই! এই জিনিয়ার জন্যই এত দেরি। ও তো মেকআপ না করে ঘর থেকে বের হতেই পারে না! তাই দেরি হইছে।
জিনিয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল,
— তোদের মতো নাকি আমি সুন্দর করে রেডি হবো না? আর আমি মেকআপ করি না, বুঝছিস!
সামিয়া হেসে বলল,
— হ্যাঁ, বুঝছি!
সবাই হেসে উঠল।
এরপর ফারিয়া হঠাৎ বলল,
— আজকে বলে নতুন ক্লাস টিচার আসবে, সত্যি নাকি?
সামিয়া বলল,
— হুম ভাই, নতুন ক্লাস টিচার আসবে।
জিনিয়া কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— ছেলে নাকি মেয়ে টিচার?
সামিয়া বলল,
— এটা জানি না ভাই। কিন্তু ছেলে হলে ভালো হবে ভাই।
জিনিয়া মাথা নেড়ে বলল,
— হুম, ভালো হবে। কিন্তু বুড়া হলে ভালো হবে না।
কথাটা শুনেই সবাই হাসতে শুরু করল।
কিন্তু তাদের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজার সামনে একজন এসে দাঁড়ালেন।
হঠাৎ পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেল।
সবাই অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
কারণ নতুন ক্লাস টিচার একজন পুরুষ।
শুধু তাই নয়, তাকে দেখে যেন পুরো ক্লাসই অবাক হয়ে গেল।
তিনি দেখতে ভীষণ সুন্দর। পরিপাটি পোশাক, সুন্দর চেহারা আর ব্যক্তিত্বে আলাদা একটা আকর্ষণ। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়—তার বয়সও খুব বেশি নয়।
মাত্র ২৭ বছর।
জিনিয়া সামিয়ার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
— দেখলি? বুড়া না!
সামিয়া মুখ চেপে হাসল।
নতুন স্যার ধীর পায়ে ক্লাসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
— সবাই বসো। আমি তোমাদের নতুন ক্লাস টিচার।
সবাই নিজেদের জায়গায় বসে গেল।
স্যার কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
— আশা করি, তোমাদের সঙ্গে আমার সময়টা ভালো কাটবে। তোমরাও নিয়ম-কানুন মেনে চলবে।
জিনিয়া কৌতূহলী চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে।
স্যার এবার বোর্ডের দিকে এগিয়ে গিয়ে চক হাতে নিলেন। বোর্ডে নিজের নাম লিখে পুরো ক্লাসের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বললেন,
— আমার নাম ইমন চৌধুরী।
জিনিয়া সামিয়ার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,
— নামটাও কিন্তু সুন্দর!
ফারিয়া সঙ্গে সঙ্গে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— চুপ কর! প্রথম দিনেই স্যারের সামনে কোনো কাণ্ড করিস না।
জিনিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আমি আবার কী করলাম?
ফারিয়া মুচকি হেসে বলল,
— তুই থাকলে কাণ্ড নিজে থেকেই হয়ে যায়।
ঠিক তখনই ইমন স্যার তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই যে, কিছু বলছো তুমি?
জিনিয়া চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে বলল,
— না স্যার! আমি কিছু বলি নাই।
পুরো ক্লাস হেসে উঠল।
ইমন স্যারও মৃদু হেসে বললেন,
— ভালো। তাহলে ক্লাসে মনোযোগ দাও।
জিনিয়া লজ্জায় ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— প্রথম দিনেই ধরা খেয়ে গেলাম!
ফারিয়া হাসি চেপে বলল,
— তুই তো এমনই।
আর এভাবেই শুরু হলো জিনিয়ার জীবনের নতুন একটি অধ্যায়।
তখনও জিনিয়া জানত না, ইমন চৌধুরীর এই আগমন তার জীবনে কতটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
চলবে... 🌸
