১৩ নম্বর ঘর
পর্ব ১: রাত বারোটার ডাক
গ্রামটির নাম শালিখাপুর। দিনের বেলায় গ্রামটা আর দশটা গ্রামের মতোই সাধারণ। পুকুর, বাঁশঝাড়, মাটির রাস্তা আর দূরে ধানখেত। কিন্তু সূর্য ডুবে যাওয়ার পর গ্রামটির চেহারা বদলে যায়।
সন্ধ্যার পর গ্রামের মানুষ একটি নির্দিষ্ট রাস্তা এড়িয়ে চলে। রাস্তাটির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বহু বছরের পুরোনো একটি জমিদারবাড়ি। বাড়িটির দেয়ালে শ্যাওলা, জানালায় মরচে ধরা শিকল আর ছাদে বুনো গাছ জন্মেছে।
স্থানীয় লোকেরা বাড়িটিকে বলে—তেরো নম্বর বাড়ি।
কেন এই নাম, তা কেউ স্পষ্ট করে বলতে চায় না।
শহর থেকে গ্রামে বেড়াতে এসেছিল নীলয়। বয়স বাইশ। ছোটবেলা থেকেই ভূতের গল্প শুনতে তার ভালো লাগত, কিন্তু সে এসব বিশ্বাস করত না।
এক সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে সে বাড়িটির কথা শুনল।
এক বৃদ্ধ চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন, “বাবা, ওই বাড়ির কাছে রাতের বেলা যাস না।”
নীলয় হেসে বলল, “কেন? ভূত আছে নাকি?”
বৃদ্ধ তার দিকে স্থির চোখে তাকালেন।
“ভূত আছে কি নেই জানি না। কিন্তু ওই বাড়িতে ঢোকার পর যারা রাত বারোটায় নিজের নাম শুনেছে, তারা আর আগের মতো থাকেনি।”
কথাটা শুনে নীলয়ের কৌতূহল বেড়ে গেল।
সেই রাতেই সে একটি টর্চ আর মোবাইল নিয়ে বাড়িটির দিকে রওনা হলো।
বাড়ির লোহার ফটক ঠেলে খুলতেই দীর্ঘ একটা কর্কশ শব্দ হলো। ভেতরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক হঠাৎ থেমে গেছে।
বাড়ির ভেতরে ঢুকে সে দেখল, মেঝেতে ধুলোর পুরু স্তর। দেয়ালে কয়েকটি পুরোনো ছবি ঝুলছে। ছবিগুলোর মানুষগুলোর মুখ সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে গেছে।
দোতলায় উঠে নীলয় একটি লম্বা করিডর দেখতে পেল। করিডরের শেষে পাশাপাশি বারোটি দরজা। অথচ করিডরের দেয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো নকশায় তেরোটি ঘরের চিহ্ন আঁকা।
শেষ দরজাটির অবস্থান নকশায় স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবে সেখানে শুধু একটি ফাঁকা দেয়াল।
নীলয় মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলল।
ঠিক তখনই তার পেছন থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল—
“আমার ঘর খুঁজছ?”
নীলয় দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো বাইরের বাতাসে কোনো শব্দ হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি দরজা দেখা গেল।
দরজাটিতে মরচে ধরা অক্ষরে লেখা—
১৩।
নীলয় ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেল। দরজার নিচ দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ঠান্ডা বাতাস। সে হাত বাড়িয়ে দরজার হাতল ধরল।
ভেতর থেকে কেউ ফিসফিস করে বলল, “নীলয়, এত দেরি করলে কেন?”
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে কাউকে নিজের নাম বলেনি। এমনকি গ্রামের কেউ জানত না যে সে এই বাড়িতে এসেছে।
ঠিক তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের ফোন।
ফোন ধরতেই মা কাঁপা গলায় বললেন, “নীলয়, তুই কোথায়?”
“জমিদারবাড়িতে। কেন?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মা বললেন, “তুই এখনই বাড়ি ফিরে আয়। আমি স্বপ্নে দেখেছি, তুই একটা বন্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। আর ঘরের ভেতর থেকে কেউ তোকে ডাকছে।”
নীলয় কিছু বলার আগেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
সে দরজার দিকে তাকাল।
এবার ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ বলল—
“এবার তুমি এসেছ। এবার আমরা বের হতে পারব।”
নীলয় এক পা পিছিয়ে গেল।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে তার পেছনের করিডরের সব দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
আর দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবিতে সে দেখতে পেল নিজের মুখ।
ছবির নিচে লেখা তারিখটি ছিল—
১৭ অক্টোবর, ১৯৯৮।
অথচ নীলয়ের জন্ম তারও তিন বছর পরে।
চলবে…
