প্রথম অধ্যায় সেদিন সকাল তখন ঠিক নয়টা বাজে। নিহারিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরম যত্নে নিজেকে তৈরি করছিল। প্রতিদিনের বাকি পাঁচ-দশটা চেনা দিনের মতো আজকের এই দিনটা মোটেও সাধারণ ছিল না; আজকের দিনটা ছিল তার জীবনের অনেক, অনেক স্পেশাল একটা দিন। অন্যান্য দিন স্কুলে যাওয়ার সময় যে চেনা বোরকাটা সে গায়ে জড়িয়ে নেয়, আজ বন্ধুদের ভীষণ জোরাজুরি আর মিষ্টি আবদারের কাছে হেরে গিয়ে সেটাকে একপাশে তুলে রাখলো। আলমারি থেকে বের করলো সাদা রঙের ওপর লাল পাড়ের একটা চমৎকার জামদানি শাড়ি। সুনিপুণ হাতে শাড়িটা জড়িয়ে, মাথায় ম্যাচিং হিজাব পরলো সে। আর সবশেষে সুরক্ষার জন্য মুখের ওপর টেনে নিলো একটা চা রঙের মাস্ক। আয়নায় নিজেকে শেষবারের মতো দেখে একটা তৃপ্তির হাসি হাসলো নিহারিকা। এরপর যখন সে চিরচেনা পথটায় এসে নামলো, চারপাশের কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় নিজের মনেই হেঁটে যাচ্ছিলো। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। রাস্তার মোড়ে এসে যখন সে রাস্তাটা পার হতে গেলো, ঠিক তখনই ঘটলো সেই আকস্মিক, বুক কাঁপানো ঘটনাটি! রাস্তায় তখন বেশ ভিড়। হঠাৎ করেই একটা চকচকে কালো রঙের বেপরোয়া প্রাইভেট কার তীব্র গতিতে এসে নিহারিকাকে সজোরে ধাক্কা দিলো! সেই আকস্মিক আর তীব্র ধাক্কা সামলাতে না পেরে নিহারিকা ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়লো শক্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর। ওভাবে ছিটকে পড়ার প্রচণ্ড ঝটকায় নিহারিকার মুখের চা রঙের মাস্কটি হুট করে খুলে গেলো। শক্ত রাস্তায় পড়ে যাওয়ায় সে হাতে ভীষণ চোট পেলো। তীব্র আর অসহ্য যন্ত্রণায় তার পুরো চোখ-মুখ কুঁচকে এলো। ব্যথায় নীল হয়ে যাওয়া হাতটা চেপে ধরে নিহারিকা যখন ঝাপসা চোখে সামনের দিকে তাকালো, দেখলো ঠিক তার সামনেই সেই প্রাইভেট কারটি কড়া ব্রেক চেপে দাঁড়িয়ে পড়েছে। গাড়ির সামনের সিটে বসা ড্রাইভার বা আরোহী—যার নাম নিহাল—দ্রুত গাড়ির দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। দুর্ঘটনার পর গাড়ি থামিয়ে গাড়ির গ্লাস বা খোলা দরজা দিয়ে যখন সে নিহারিকার দিকে তাকালো, নিহারিকার মনে হলো সে যেন এক নিমেষে অন্য কোনো এক অচেনা দুনিয়ায় হারিয়ে গেলো! মাস্কটা খুলে যাওয়ায় নিহারিকার মায়াবী মুখাবয়ব আর তার চোখের সেই আকুলতা দেখে নিহালও যেন সম্পূর্ণ খেই হারিয়ে ফেললো। সে ক্ষণিকের জন্য মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। গাড়ির পেছনের সিটে বসে থাকা তার বন্ধুটি বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো, "এই নিহাল, কী হয়েছে তোর? এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?" বন্ধুর এই আচমকা ডাক আর কর্কশ আওয়াজে নিহাল যেন কোনো এক গভীর মোহ থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। ও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো, তারপর এক পা দুপা করে দ্রুত নিহারিকার দিকে এগিয়ে এলো। নিহালের চোখে-মুখে তখন একরাশ অপরাধবোধ, তীব্র ছটফটানি আর দুশ্চিন্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে অত্যন্ত নরম আর মার্জিত সুরে নিহারিকার চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলো, "আই এম সো সরি... আপনি কি খুব বেশি আঘাত পেয়েছেন, ম্যাম?" নিহাল দ্রুত নিহারিকার দিকে ঝুঁকে আসলো এবং তাকে আলতো করে আগলে ধরলো। ঠিক তখনই নিহালের আতঙ্কিত দৃষ্টি চলে গেলো নিহারিকার রক্তাক্ত হাতের দিকে। নিহালের চোখের সেই আকস্মিক চমকে ওঠা আর ভয় দেখে নিহারিকার নিজের চোখও চলে গেলো নিজের হাতের ওপর। সেদিকে তাকাতেই নিহারিকার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো, মুহূর্তেই যেন তার পুরো পৃথিবীটা থমকে গেলো! শাড়ির সাথে মিলিয়ে পরা কাঁচের রিনিঝিনি চুড়িগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে মাংসের ভেতরে ঢুকে গেছে, আর সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে তাজা রক্ত ঝরছে। তীব্র সেই সুঁই ফোটার মতো যন্ত্রণা আর নিজের হাতের ওই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত দশা দেখে নিহারিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। চোখের সামনে চারপাশের আলো আঁধারে মিলিয়ে যেতে লাগলো, পুরো পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে এলো। আর পরক্ষণেই সে নিহালের চোখের সামনেই, একদম সংজ্ঞাহীন হয়ে ধুলোবালির রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো...।